ঢাকা, বুধবার 21 June 2017, ০৭ আষাঢ় ১৪২8, ২৫ রমযান ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

চাঁদাবাজির মহোৎসব

পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে আবারও চাঁদাবাজির ধুম পড়ে গেছে। ক্ষমতাসীনদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রশ্রয়ে চাঁদাবাজরা যথারীতি মাঠে নামবে বলে ধরে নেয়া হলেও অনেকের ধারণা ছিল, রাজনৈতিক অঙ্গনে যেহেতু সম্ভাব্য সংসদ নির্বাচন নিয়ে জোর আলোচনা চলছে সেহেতু এবারের ঈদের প্রাক্কালে সরকার চাঁদাবাজদের রাশ টেনে ধরবে। অন্যদিকে বাস্তবে অবস্থার বরং আরো অবনতি ঘটেছে। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত খবরে জানা গেছে, ‘লীগ’ নামধারী পুরনোদের সঙ্গে মৌসুমী চাঁদাবাজরা তো বটেই, মাঠে নেমেছে এমনকি পুলিশও। তারা আইজিপি এবং ডিমপি কমিশনারের নির্দেশের প্রতিও প্রকাশ্যে অবজ্ঞা দেখাচ্ছে।
এ বিষয়ে ডিমপি কমিশনার এবং মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যানের কাছে বিভিন্নজনের লিখিত অভিযোগের তথ্যও রয়েছে রিপোর্টে। বাড্ডা ও খিলগাঁওসহ কয়েকটি থানার ওসি, এসআই, এএসআই এবং কনস্টেবলদের নাম উল্লেখ করে অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন, কতটা নিষ্ঠুরতার সঙ্গে নির্যাতন চালিয়ে এবং মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে তাদের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করা হয়েছে। ওদিকে পেশাদার চাঁদাবাজরা আবার ‘ডিজিটাল’ পদ্ধতি অনুসরণ করছে। তারা অস্ত্রহাতে নিজেদের সেলফি তুলে সেসব সেলফিসহ চাঁদার দাবি জানিয়ে টার্গেট লোকজনের মোবাইলে পাঠাচ্ছে। সঙ্গে থাকছে জীবনের হুমকি। কেউ কেউ শুধু হুমকি দিয়েই থেমে থাকছে না, গুলি চালিয়ে হত্যার চেষ্টা করেও প্রমাণ দিচ্ছে যে, তারা যা বলে তা করে। এরকম এক ঘটনায় বনানীর মহাখালী এলাকায় এক হোটেল ব্যবসায়ী গুলিবিদ্ধ হয়েছেন গত মঙ্গলবার। তার অপরাধ, মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে দ্বিতীয়বার তিনি এক লাখ টাকা চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন।
এভাবেই ঈদের প্রাক্কালে চাঁদাবাজি মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। বিক্রি এবং লাভ হোক-না হোক চাঁদা ব্যবসায়ীদের দিতে হচ্ছেই। চাঁদার পরিমাণও চমকে ওঠার মতো। সাধারণ সময়ে ফুটপাতের একটি দোকান থেকে যেখানে দেড়শ’ বা দুইশ’ টাকা চাঁদা ওঠানো হয় এবারের ঈদ উপলক্ষে সেখানে চাঁদার পরিমাণ সাড়ে তিনশ’ থেকে হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়ে গেছে। ফুটপাতের ব্যবসায়ীরা এবং তাদের সমিতির নেতারা জানিয়েছেন, প্রায় তিন লাখ ক্ষুদে ব্যবসায়ীর কাছ থেকে প্রতিদিন ছয় থেকে সাত-আট কোটি টাকা চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। এসবের বাইরে টহল পুলিশও যেখানে যেভাবে পারছে চাঁদা আদায় করছে। সব মিলিয়েই রাজধানীজুড়ে এবার চাঁদাবাজির মহোৎসব শুরু হয়েছে! পেশাদার সন্ত্রাসী-চাঁদাবাজ, স্থানীয় গুন্ডা-মাস্তান এবং আওয়ামী হকার লীগ ধরনের সাইনবোর্ড সর্বস্ব সংগঠনের নেতারা তো রয়েছেই, তাদের সঙ্গে জোট বেঁধেছে সরকারি দলের এলাকাভিত্তিক নেতা-কর্মীরাও। পুলিশও এবার এমনভাবেই নেমেছেÑ যেন ‘বখড়া’ কম দেয়া হতে পারে বলে ধারণা জন্মেছে তাদের মনে! অর্থাৎ পুলিশও এখন আর আওয়ামী চাঁদাবাজদের বিশ্বাস করতে পারছে না!
পুরনো ঢাকার অলি-গলি থেকে শুরু করে তেজগাঁও, মিরপুর, পল্লবী, বাড্ডা, রামপুরা, মৌচাক, মগবাজার, এলিফ্যান্ট রোড এবং উত্তরা পর্যন্ত সব এলাকাতেই বাস্তবে চাঁদাবাজির মহোৎসব চলছে। গুলশান-বনানীর মতো অভিজাত এলাকার কথা সম্ভবত বলার অপেক্ষা রাখে না। এ দুটি এলাকার ব্যবসায়ীসহ অধিবাসীদেরকেও বুঝিয়ে দেয়া হচ্ছে, ক্ষমতায় কোন দল রয়েছে এবং দলটি কোন ধরনের লোকজনকে লালন-পালন করে। সব মিলিয়েই অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছে গেছে, যখন ব্যবসায়ী থেকে চাকরিজীবী ও সাধারণ মানুষ পর্যন্ত সকলকেই প্রমাদ গুণতে হচ্ছে। তারা পুলিশের শরণাপন্ন হতেও ভয় পাচ্ছেন। কারণ নালিশ করলে উল্টো বিপদ বাড়তে পারে। এমন অবস্থায়ও রাজধানীর বিভিন্ন থানায় জিডি বা সাধারণ ডায়েরি করেছেন কয়েকশ’ মানুষ। তাদের মধ্যে ব্যবসায়ী, ঠিকাদার ও চাকরিজীবী যেমন রয়েছেন তেমনি রয়েছেন পাড়া-মহল্লার ক্ষুদে দোকান মালিকরাও। কোনো কোনো থানায় টার্গেট ব্যবসায়ীদের স্ত্রী-সন্তানরাও পুলিশ ও সরকারের উচ্চ পর্যায়ে লিখিত নালিশ জানিয়েছেন। এদিকে থানায় জিডি করতে গেলে শুধু নয়, পুলিশের কাছে টেলিফোনে নালিশ জানাতে গেলেও উল্টো বিপাকে পড়তে হচ্ছে। মুহূর্তে বেড়ে যাচ্ছে দাবিকৃত চাঁদার পরিমাণ। কারো কারো কাছে দ্বিগুণেরও বেশি টাকা চাওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ থানা-পুলিশ তথা সরকারের কাছে কোনো সাহায্যই পাচ্ছেন না ব্যবসায়ী ও নাগরিকরা। তারা বলেছেন, চাঁদাবাজ-সন্ত্রাসীদের কবল থেকে রক্ষা করার পরিবর্তে পুলিশ নিজেই আজকাল টাকার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ছে। কখনো আবার দাবি অনুযায়ী চুপচাপ চাঁদা দিয়ে ‘রফা’ করার পরামর্শ দিচ্ছে পুলিশ!
বলার অপেক্ষা রাখে না, এবারের রমযানেও চাঁদাবাজ-সন্ত্রাসীদের দৌরাত্ম্য সামান্য কমেনি বরং সব দিক থেকে তারা অনেক বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। ক্ষমতাসীনরা সময়ে সময়ে ‘কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার’ যে ঘোষণা দিয়ে থাকেন এবং এবারও দিয়েছেন সে ঘোষণা বা ধমক পাত্তাই পাচ্ছে না। রাতের বেলায় র‌্যাবের প্রহরাকেও তোয়াক্কা করছে না চাঁদাবাজ-সন্ত্রাসীরা। বড় ব্যবসায়ীরা তো বটেই, চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্যের মুখে অসহায় হয়ে পড়েছেন এমনকি পাড়া-মহল্লার ক্ষুদে ব্যবসায়ীরাও। রাজধানীর অনেক এলাকায় চাকরিজীবীদের কাছ থেকেও চাঁদা আদায় করছে গুন্ডা-মাস্তানরা। কিন্তু কোনো একটি ক্ষেত্রেই সরকারের তৎপরতা চোখে পড়ছে না। অনেকে এমনকি ক্ষমতাসীন নেতাদের দিকেও আঙুল তুলেছেন। তারা মনে করেন, ক্ষমতাসীনদের মদদ ও যোগসাজশ না থাকলে কোনো গোষ্ঠীর পক্ষেই এভাবে চাঁদাবাজি করতে পারার কথা নয়। এখানে ছিনতাই-রাহাজানির কথাও বলা দরকার। কারণ, অলিতে-গলিতে পর্যন্ত ছিনতাইয়ের ধুম পড়ে গেছে। কিন্তু এ ব্যাপারেও সরকার তথা র‌্যাব ও পুলিশকে মোটেও তৎপর দেখা যাচ্ছে না।
বস্তুত সব মিলিয়েই এবারের রমযানে এক ভয়ংকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ভীতি-আতংক ও আপত্তির কারণ হলো, ছিনতাই-চাঁদাবাজি ধরনের অপরাধ দমনে লম্বা আশ্বাস শোনানোর বাইরে সরকার ফলপ্রসূ কোনো উদ্যোগ নেয়নি। এমনকি পরিস্থিতি ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠার পরও সরকারকে নড়াচড়া করতে দেখা যাচ্ছে না। এজন্যই জনগণ লাভবান বা উপকৃত হতে পারেনি। আমরা মনে করি, মুসলমানদের সবচেয়ে বড় উৎসব পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে ব্যবসায়ীরা যাতে চাঁদাবাজ-সন্ত্রাসী ও পুলিশের অত্যাচার থেকে মুক্তি পেতে পারেন এবং সাধারণ মানুষ যাতে মার্কেট ও শপিং মলগুলোতে নির্বিঘ্নে গিয়ে কেনাকাটা করতে পারে তার আয়োজন এখনই নিশ্চিত করা দরকার। এজন্য ছিনতাইকারী ও চাঁদাবাজ-সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। অর্থনীতির এই সহজ কথাটা বুঝতে হবে যে, ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে যে টাকা চাঁদার নামে আদায় করা হয় সে টাকা ব্যবসায়ীরা পণ্যের দাম বাড়িয়ে ক্রেতা তথা সাধারণ মানুষের ঘাড়ে চাপিয়ে দেন। অর্থাৎ চাঁদাবাজি আসলে জনগণের কাছ থেকেই করা হচ্ছে। এমন অবস্থা চলতে দেয়া যায় না। আমরা আশা করতে চাই, ঈদের আগের বাকি কয়েকদিনে সরকার দ্রুত ব্যবস্থা নেবে। চাঁদাবাজ-সন্ত্রাসীদের পাশাপাশি পুলিশকেও ছাড় দেয়া চলবে না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ