ঢাকা, বুধবার 21 June 2017, ০৭ আষাঢ় ১৪২8, ২৫ রমযান ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

বিচিত্র সব ব্যাংকনোট

জাফর ইকবাল : সারা বিশ্বেই এখন ব্যাংকনোটের গুরুত্ব অপরিসীম। মুদ্রার প্রচলন শেষ হয়েছে অনেক আগে। আধুনিক সমাজে ব্যাংকনোট ছাড়া কল্পনাও করা যায় না। ব্যাংকনোট প্রচলনের শুরু থেকেই বিচিত্র সব নোট আবিষ্কার করে মানুষ। সে সব নোট নিয়েই এবারের বিশেষ আয়োজন।
প্রথম নোটের অস্তিত্ব: প্রায় তেরশ’ বছর আগে চীনে প্রথম কাগজের নোটের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। তারপর মার্কো পোলোর হাত ধরে চীন থেকে প্রথমে ইউরোপ, তারপর গোটা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে। ব্যাংকনোটের এই বিশাল ইতিহাসের মাঝেও অদ্ভুত কিছু গল্প লুকিয়ে থাকতে পারে। সে সব বিচিত্র গল্পগুলোই জানা যায় একসময়।
পুরনো নোট: প্রথম ব্যাংকনোট সপ্তম শতাব্দীতে তৈরি হলেও সাধারণভাবে এর প্রচলন শুরু হয় দশম শতাব্দীতে। সং রাজবংশের হাত ধরে। সিচুয়ান সাম্রাজ্যের রাজধানী চেংডুতে ব্যবহার শুরু হয় ‘জিয়াওজি’ নামের ব্যাংকনোট। মুদ্রা বিশেষজ্ঞরা এই নোটকেই প্রথম ব্যাংকনোট হিসেবে ঘোষণা করেন। নকল হতে পারে ভেবে নোটের উপর প্রচুর সিল মারা হতো।
সবচেয়ে বড় নোট : ফিলিপাইনের ১ লক্ষ পেসোর লিগ্যাল সাইজের কাগজ দিয়ে বানানো সাড়ে আট বাই চৌদ্দ ইঞ্চির বিশাল নোটই ইতিহাসের সবচেয়ে বড় নোট। কিন্তু নোটটি সাধারণ ব্যবহারের জন্য তৈরি হয়নি। ফিলিপাইনের স্বাধীনতার ১০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে সংগ্রাহকদের জন্য বিশেষভাবে বানানো হয়েছিল। আর ১ লক্ষ পেসোর নোট পেতে খরচ করতে হয়েছিল ১ লক্ষ ৮০ হাজার পেসো যা প্রায় ৩ লক্ষ টাকার সমান!
বড় অঙ্কের নোট: ২০০৯ সালে জিম্বাবুয়ে মুদ্রাস্ফীতির রেকর্ড গড়েছিল। শেষমেশ জিম্বাবুইয়ান রিজার্ভ ব্যাংক সিদ্ধান্ত নেয় ১০০ ট্রিলিয়ন জিম্বাবুইয়ান ডলারের ব্যাংক নোট বের করার! তার মানে ১ এর পর ১৪টা শূন্য! অবাক হওয়ার কিছু নেই, জিম্বাবুয়েতে ৩০০ বিলিয়ন ডলার নিয়ে বাজারে গেলে আপনি বড়জোর এক টুকরো পাউরুটি কিনতে পারবেন! কিন্তু এরও ২০ বছর আগে ১৯৮৯ থেকে শুরু হয়ে ১৯৯৪ সালে নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা হওয়ার আগ পর্যন্ত যুগোস্লাভিয়ায় ৫০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০ এর মতো বড় নোটের প্রচলন ছিল! ৫ এর পর ২০টা শূন্য! এটিই পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অঙ্কের ব্যাংকনোট!
নটজেল্ড প্রিন্ট: প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়েই জার্মানিতে নিকেল, তামাসহ অন্যান্য ধাতু যুদ্ধে ব্যবহৃত গুলি বানানোর কাজে বাজার থেকে সরিয়ে ফেলা হয়। ফলে হঠাৎ করেই পয়সার আদান-প্রদান প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন বেসরকারি কোম্পানি নটজেল্ড প্রিন্ট দেওয়া শুরু করে। একেবারে সাদা কাগজ, কাঠ, সিরামিক এমনকি চামড়ার উপরেও ২৫, ৫০, ১০০ ফেনিখ (জার্মান পয়সা) লিখে বাজারে ছেড়ে দেওয়া হয়। অবশেষে ১৯২৩ সালে রাইখসব্যাংক নতুন মুদ্রা ‘রেনটেনমার্ক’র প্রচলন শুরু করলে নটজেল্ড আমলের অবসান ঘটে।
কনপ্রেন্ট্রশন ক্যাম্প নোট : চেকোস্লোভাকিয়ার থেরেসিয়েনস্টাডট কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প মূলত ছিল নাৎসিদের শো-পিস ক্যাম্প। নাৎসিরা রেড ক্রসকে ধোকা দেওয়ার জন্য অর্থাৎ রেড ক্রস এজেন্টদের বোকা বানানোর জন্য এই নোটগুলো বানানো হয়। যা কখনোই ব্যবহার করা হয়নি।
কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প নোট, ওরানিয়েনবার্গ: বার্লিনের ঠিক বাইরেই অবস্থিত ওরানিয়েনবার্গ কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে ইহুদিদের ধরে নিয়ে আসার পর তাদের কেনাবেচার জন্য কোনো রকম দুমড়ানো-মোচড়ানো ছেঁড়া-ফাটা নোট বানানো শুরু হয়। যদিও এসব নোট কোনো কাজেই লাগত না।
মোবুটু নোট: বেলজিয়ামের কাছ থেকে স্বাধীনতা অর্জন করার কিছুদিনের মধ্যেই গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে জায়ার। জনগণের ভোটে বিজয়ী লুমুম্বাকে অপসারণ এবং খুন করার পিছনে থাকা প্রধান ব্যক্তি জোসেফ মোবুটুকেই সিআইএ জায়ারের শাসনভার দেয়। মোবুটু ৩১ বছর জায়ারে স্বৈরশাসন চালানোর পর ১৯৯৭ সালে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মরোক্কোতে পালিয়ে যাওয়ার পর জায়ারের মুদ্রায় পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু ব্যাংকনোটের অপ্রতুলতায় ২০,০০০ মুদ্রামানের নোটে মোবুটুর ছবি কেটে ফেলে তা দিয়েই বহুদিন কাজ চালানো হয়!
আইনস্টাইন নোট: ১৯৫২ সালে ইসরাইল প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী ডেভিড বেন-গুরিয়ন আইনস্টাইনকে রাষ্ট্রপতি হওয়ার প্রস্তাব দেন। আইনস্টাইন প্রস্তাব ফিরিয়ে দিলেও তাকে সম্মান জানানোর জন্য ১৯৬৮ সালে ইসরায়েলি মুদ্রার নতুন সংস্করণের ৫ লিরোতের নোটে তার ছবি যুক্ত করা হয়।
জর্জ বেস্ট নোট: ফুটবল কিংবদন্তি জর্জ বেস্টের মৃত্যুর এক বছর পর সে দেশের ব্যাংক ৫ পাউন্ডের নোটে স্মারক হিসেবে জর্জ বেস্টের ছবি যুক্ত করে। এক মিলিয়ন কপির সবকয়টি নোটই বের হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যে সংগ্রাহকদের হাতে চলে যায়।
ইন্টারগ্যালাকটিক কুইড: ইংল্যান্ডের ন্যাশনাল স্পেস সেন্টার ছোট ছোট নার্ফ বল প্লাস্টিকের মধ্যে মুড়িয়ে তাকেই মহাকাশের মুদ্রা হিসেবে ঘোষণা করে। যার নাম দেওয়া হয় Quasi Universal Intergalactic Denomination (QUID)। নার্ফ বলগুলো সূর্য আর আটটি গ্রহকে প্রতিনিধিত্ব করে। টেফ্লন দিয়ে বানানো এই মহাকাশের মুদ্রাগুলোর প্রতিটির দাম সাড়ে বারো ডলারের সমান।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ