ঢাকা, বুধবার 21 June 2017, ০৭ আষাঢ় ১৪২8, ২৫ রমযান ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

ঈদকেন্দ্রিক লক্কর-ঝক্কর লঞ্চ মেরামত চলছে পুরোদমে

কামাল উদ্দিন সুমন : বুড়িগঙ্গার তীরে সারি সারি লঞ্চ,কেউ রংয়ের কাজ করছে, কেউবা করছে ওয়েল্ডিয়ের কাজ। আর কয়েকদিন পর ঈদ। তাই ঈদ কেন্দ্রিক লক্কর ঝক্কর এসব লঞ্চ মেরামত চলছে পুরোদমে। যাত্রী নিয়ে এসব ঝুঁকিপূর্ণ লঞ্চ ছুটবে গন্তব্যে তাই সকাল থেকে রাত অবধি শ্রমিকরা খুব ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন।
বুড়িগঙ্গার তীরে গড়ে ওঠা চরকালিগঞ্জ ও চরমিরেরবাগ , হাসনাবাদ, দোলেশ্বর এলাকার ডকইয়ার্ডগুলোতে দেখা গেছে- টুংটাং শব্দে চলছে যাত্রীবাহী ও বড় কার্গোবাহী লঞ্চগুলোর মেরামত কাজ। সকাল থেকে রাত অবধি শ্রমিকরা খুব ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। কেউ ওয়েলডিং আবার কেউ রঙ মাখাতে ব্যস্ত। ঈদের আগে জোড়াতালি দিয়ে তড়িঘড়ি করে লঞ্চগুলো মেরামত করা হচ্ছে।
সূত্র জানায়, প্রতিবছরই ঈদকে কেন্দ্র করে লঞ্চ মালিকদের একটি অংশ বেশি লাভের আশায় পুরোনো ও ঝুকিপূর্ণ লঞ্চ পরিচালনা করেন। সদরঘাটের ডকইয়ার্ডগুলোতে লঞ্চের রঙ-কালি ও রি-পিয়ারিংয়ের কাজ শুরু করে। ঈদের দুই-তিন মাস আগ থেকেই এ কাজ শুরু হয়। লক্কড়-ঝক্কড় মার্কা লঞ্চ হয়ে ওঠে চকচকা। দেখে বোঝার থাকে না, এগুলো ঝুঁকিপূর্ণ। যাত্রীরাও না বুঝে রঙমাখা লঞ্চগুলোতে চলাচল করেন।
ঈদে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের বাড়ি ফেরার একমাত্র ভরসা নৌপথ। রাজধানী ঢাকার সঙ্গে সরাসরি কোনও সড়ক যোগাযোগ না থাকায় লঞ্চেই যাতাওয়াত করেন এ অঞ্চলের লাখো মানুষ। ঈদের সময় ঘরে ফেরা মানুষের ভীড় থাকায় লঞ্চের চাহিদাও থাকে বেশি। আর এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে এক শ্রেণির লঞ্চ মালিক ঝুকিপূর্ণ লক্কড়-ঝক্কড় লঞ্চে রঙ লাগিয়ে নৌপথে ব্যবসা চালিয়ে যান। এদিকে, সাধারণ যাত্রীরাও নিরাপত্তার বিষয়টি চিন্তা না করেই এসব লঞ্চে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যাতাওয়াত করেন। এর ফলে ঘটে দুর্ঘটনা।
প্রতিবছরের মতো এবারও ঈদকে সামনে রেখে ১০ থেকে ১২টি স্পেশাল সার্ভিসের ব্যবস্থা করেছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন সংস্থা (বিআইডব্লিউটিসি) ও বেসরকারি লঞ্চ মালিকরা। কিন্তু এই লঞ্চ প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই কম। এছাড়া এ সময় যাত্রীদের ভিড় বেশি থাকায় লঞ্চের ধারণ ক্ষমতার কয়েকগুণ বেশি যাত্রী নিয়ে চলাচল শুরু করে।
নিরাপদ নৌপথ বাস্তবায়ন আন্দোলনের একটি পরিসংখ্যান থেকে জানা গেছে, শুধু বুড়িগঙ্গার সাড়ে চার হাজার বিভিন্ন ধরনের লঞ্চের মধ্যে ফিটনেস পরীক্ষা করা হয়েছে মাত্র ৭৮২টির। এসব লঞ্চের ৫০ শতাংশের কোনও রেজিস্ট্রেশন নেই। এসব কারণে গত ৩০ বছরে নৌ-দুর্ঘটনায় ১০ হাজারেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী দুর্ঘটনায় সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটছে ২০০৩ সালে। ওই বছর তিনটি নৌ-দুর্ঘটনায় মারা গেছে এক হাজার ১৫ জন যাত্রী। এছাড়া ১৯৯৯ সালে ১০৪ জন, ২০০০ সালে ১০৪ জন, ২০০১ সালে ৪০ জন, ২০০২ সালে ৬০, ২০০৭ সালে ৫০৩ জন, ২০০৮ সালে ১১২ জন, ২০০৯ সালে ২৩২ জন, ২০১৩ সালে ৩৯ জন এবং ২০১২ সালে ১৫০ জন মারা যান।
সুরভি-৭ লঞ্চেরসুপারভাইজার হোসাইনুল কবির বলেন, ‘লঞ্চটির প্রায় দুই মাস ধরে লঞ্চটির বিভিন্ন কাজ চলছে। কাজ শেষে ২৪-২৫ রোজার মধ্যে এটি বুড়িগঙ্গায় ভাসানো সম্ভব হবে বলে আমরা আশা করছি।’
বেবি সাহেবের ডকের শ্রমিক সামসুল ইসলামা জানান, ঈদ এলেই আমাদের ব্যস্ততা বেড়ে যায়। ক্ষতিগ্রস্ত লঞ্চগুলো দিনরাত পরিশ্রম করে মেরামত করছি। যে সব লঞ্চ এখন ভাল করা হচ্ছে ওই সব লঞ্চ কয়েকদিন আগে পড়ে ছিল।
তবে বিআইডাব্লিটিএর নৌ-সংরক্ষণ ও পরিচালন বিভাগ জানিয়েছে, গত ৬৬ বছরে দেশে দুই হাজার ১২২টি নৌ-দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে ছয় হাজারের মতো যাত্রী নিহত হয়েছেন। মামলা হয়েছে প্রায় ২০ হাজার। এর মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ১৪১টি মামলা। বাকি মামলাগুলো ঝুলে রয়েছে বছরের পর বছর। কিছু মামলার কোনও হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। নিষ্পত্তি হওয়া মামলাগুলোরও উল্লেখ যোগ্য কোনও শাস্তিহয়নি।
বিআইডব্লিউটিসির যুগ্ম পরিচালক জয়নাল আবেদীন বলেন, ‘লক্কড়-ঝক্কড় লঞ্চ নদীতে নামতে দেওয়া হবে না। ঈদের পাঁচ দিন আগেই বেশ কয়েকটি মোবাইল কোর্ট থাকবে। র‌্যাব, পুলিশ,আনসারসহ পর্যাপ্ত আইনশৃঙ্খলালক্ষা বাহিনীর সদস্য থাকবে। অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে কোনও লঞ্চ চলতে পারবে না। কঠোর নজরদারি থাকবে।
তিনি বলেন,অন্য বছরের তুলনায় এ বছর লঞ্চের বিশেষ সার্ভিস বাড়ানো হয়েছে। আশা করি ঘাটতি থাকবে না। যেসব লঞ্চ যাত্রীদের আকৃষ্ট করতে রঙ করা হচ্ছে, সেগুলোর দিকে আরও বেশি নজর রয়েছে। কোন মালিক কিভাবে ফাঁকি দিতে পারে, আমরা সবই বুঝি।
অভ্যন্তরীণ নৌচলাচল সংস্থার (জাব) সিনিয়র সহ-সভাপতি বদিউজ্জামান বাদল বলেন,সদরঘাট থেকে যেসব লঞ্চ বিভিন্ন রুটে চলাচল করে তার কাগজপত্রে কোনও ত্রুটি নেই। ঈদের আগে প্রতিটি টার্মিনালের জাহাজগুলো চেক-আপ হয়। যেসব লঞ্চে ত্রুটি-বিচ্যুতি রয়েছে তখন সেগুলো ঠিক করতে ডকইয়ার্ডে নেওয়া হয়। তারা ত্রুটি বিচ্যুতি ঠিক করে পুরো জাহাজকে রঙ করে নেন। আর স্টিল বড়িতে যতো রঙ করা হয়, ততো ভালো থাকে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ