ঢাকা, বুধবার 26 September 2018, ১১ আশ্বিন ১৪২৫, ১৫ মহররম ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

বাইবেল থেকে কোরআন যেভাবে স্বাতন্ত্রে অবস্থান করে

 

প্রফেসর শাহুল হামীদ:

অনুবাদ: মুহাম্মদ আবুল হুসাইন

খৃস্টানদের একটি সাধারণ অভিযোগ হচ্ছে, কোরআন বাইবেলেরই নকল মাত্র, নবী মুহাম্মদ (সা.) বাইবেল ঘেটে-ঘুটে তার থেকে ভাব ও বিষয় নকল করে তাঁর গ্রন্থ রচনা করেছেন
কথা ঠিক যে, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)এর উপর পবিত্র কোরআন অবতীর্ণ হয়েছে বাইবেলের পরে এবং বাইবেলের বিষয় সমূহ ও কোরআনের মধ্যে অনেক বিষয়ে মিল খুঁজে পাওয়া যায়, কিন্তু খৃস্টান সমালোচকগণ যা বলতে চান যে, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) বাইবেল অধ্যয়ন ও গবেষণা করে তা থেকে ভাব, বিষয় ইত্যাদি নকল করে নিজে নিজেই কোরআন রচনা করেছেন; তা নিতান্তই অলিক, উদ্ভট, ভিত্তিহীন, অযৌক্তিক অভিযোগ এবং তা যে মোটেই সমর্থনযোগ্য নয় তা নিম্নের কারণগুলো থেকেই দিবালোকের মত সুস্পষ্ট হয়ে উঠবে

১. বাইবেলের ভাষা প্রসঙ্গ :

প্রথম কথা হচ্ছে, বাইবেলের ভাষা কিন্তু হিব্রু, আরবি নয় এবং মহানবীর সময়ে তখনও আরবি ভাষায় বাইবেলের অনুবাদ শুরু হয়নিস্বয়ং একজন খৃস্টান পন্ডিতের গবেষণা থেকেই এটি প্রমাণিত হয়েছেখৃস্টান পন্ডিত Ernst WÜrthwein তাঁর The Text of the Old Testament গ্রন্থে আমাদেরকে এ তথ্য প্রদান করেছেন তিনি লিখেছেন : With the victory of Islam the use of Arabic spread widely and for Jews and Christians in the conquered lands it became the language of daily life. This gave rise to the need of Arabic versions of the Bible, which need was met by a number versions mainly independent and concerned primarily for interpretation. (WÜrthwein 104). অর্থা : ইসলামের বিজয়ের সাথে সাথে আরবির ব্যবহারও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে এবং এটি অধিকৃত ভূখন্ডের ইহুদি ও খৃস্টানদেরও প্রাত্যহ্যিক ভাষা হয়ে ওঠেএরফলে আরবি ভাষায় বাইবেলের অনুবাদের প্রয়োজন জোরালো হয়ে ওঠে এবং এই প্রয়োজনের কারণেই তখন বাইবেলের বেশকিছু আরবি সংস্করণ দেখা যায় যেগুলো প্রধানত ছিল স্বাতন্ত্র্যমন্ডিত এবং দ্বিভাষিকতার পক্ষে প্রথম প্রচেষ্টা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ
সুতরাং, হিব্রু বাইবেলের আরবি অনুবাদ সর্ব প্রথম দৃষ্টিগোচর হয় ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতির পরআর বাস্তবিকই আরবি ভাষায় ওল্ড টেস্টামেন্টের প্রাচীন যে পান্ডুলিপি পাওয়া যায়, সেটি নবম শতকের প্রথমার্ধ কালের

এতো গেল ওল্ড টেস্টামেন্টের কথাআর নিউ টেস্টামেন্টের খবর? এ প্রসঙ্গে সিডনী এইচ গ্রিফিথ [Sidney H Griffith], যিনি জনসমুক্ষে প্রথম প্রকাশিত আরবি বাইবেল এবং নিউ টেস্টামেন্ট নিয়ে ব্যাপক গবেষণা করেছেন, তিনি লিখেছেন, আরবি ভাষায় যিশুর জীবন কাহিনী ও শিক্ষা (Gospels) সম্বলিত প্রাচীন পান্ডুলিপি সমূহ রামলেহ-এর স্টিফেন কর্তৃক ৮৯৭ খৃস্টাব্দে লিখিত হয়। [Griffith পৃঃ ১৩১-১৩২]অথচ মহানবী ইন্তেকাল করেন খৃস্টীয় সপ্তম শতাব্দীর প্রথমার্ধে, ৬৩২ খৃস্টাব্দে

২. মহানবী ছিলেন একজন অক্ষর-জ্ঞানহীন মানুষ :

দ্বিতীয়ত, হযরত মুহাম্মদ (সা.), যিনি ছিলেন মূলত একজন অক্ষরজ্ঞানহীন মানুষ, তাঁর বিরুদ্ধে শুধু হিব্রু ভাষায় রচিত বাইবেল অধ্যয়ন ও গবেষণাই নয়, খৃস্টান, ইহুদি, জরোস্ট্রেইন, হানিফ সহ প্রাচীন আরব ধর্ম সমূহ - এই উস সমূহ থেকে প্রাপ্ত জ্ঞান-বিজ্ঞান সমূহ আত্মস্থ করে নিজে নিজে কোরআন রচনার অভিযোগ শুধু অসংগতই নয়, কষ্ট-কল্পনা ও এক ধরনের উপহাসও বটে! মহানবী যে একজন নিরক্ষর মানুষ ছিলেন, এই স্বীকৃতি আজ থেকে ১৪ শ বছর আগে মক্কার পৌত্তলিক আরবরাই প্রদান করেছে এবং এমনকি সে সময় তাঁর শত্রুরা পর্যন্ত তাঁর নিরক্ষর হওয়ার ব্যাপারে কখনো কোন প্রশ্ন উত্থাপন করেনিএমন কোন রেকর্ড নেই যে, মক্কার পৌত্তলিক কোরাইশরা অভিযোগ করছে যে, মুহাম্মদ (সা.) আসলে একজন শিক্ষিত লোক হওয়া সত্তেও নিরক্ষর হওয়ার ভান করছেনতাছাড়া হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর অশিক্ষিত হওয়ার বিষয়টি পবিত্র কোরআনেও বর্ণিত হয়েছে, অথচ এ নিয়ে মক্কার লোকেরা কেউ কখনো কোন প্রশ্ন তোলেনিপবিত্র কোরআন মজিদে বলা হয়েছে : হে নবী, তোমার উপর এ কিতাব নাযিল হওয়ার পূর্বে তো তুমি কোন গ্রন্থ পড়নি এবং তুমি তোমার ডান হাত দিয়ে কখন কিছু লেখওনিতুমি যদি তা করতে, তাহলে বিরোধীরা সন্দেহ পোষণ করতে পারতোআসলে এগুলো হচ্ছে উজ্জ্বল নিদর্শন, সেসব লোকের উপলব্ধির জন্য, যাদেরকে জ্ঞান দেয়া হয়েছেআর নিতান্ত জালেম লোক ব্যতীত, আমার নিদর্শনগুলোকে কেউ অস্বীকার করে না’-[ সূরা আনকাবুত : ৪৮-৪৯]

বস্ত্তত, মহানবীর নিরক্ষরতা সম্পর্কে মক্কার লোকদের মনে যদি তিল পরিমাণ সন্দেহও থেকে থাকতো, তাহলে তারা অবশ্যই আল কোরআনের এই আয়াতের প্রতিবাদ করতো, যাতে তাঁর নিরক্ষরতাকে সত্যায়িত করা হয়েছে

৩. আল কোরআন কোন অনুবাদ গ্রন্থ নয় :

তৃতীয়ত, আল কোরআন কোন অনুবাদগ্রন্থ নয়, এটি একটি মৌলিক গ্রন্থ এবং এটি এর মূল আরবি ভাষাতেই লিপিবদ্ধ হয়েছেঅর্থা, হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ভাষা আরবি এবং এটি আরবি ভাষাতেই নাযিল হয়েছেমূলত এটি সেই মূল আরবি ভাষায় লিপিবদ্ধকোরআন’, যাকে তার আসল নামেই ডাকা হয়, কোন ভাষান্তরিত ভাষায় একে ডাকা হয় নাঅন্যদিকে, ওল্ড টেস্টামেন্টের ভাষা ছিল প্রাচীন হিব্রু এবং যেশাস ছিলেন একজন ইহুদি, যিনি এরামেইক [Aramaic] ভাষায় কথা বলতেন, যা ছিল হিব্রু ভাষার একটি উপভাষা এবং পূর্বাঞ্চলীয় সেমিটিক ভাষার অন্তর্গতআবার গসপেল সহ নিউ টেস্টামেন্টের গ্রন্থগুলো গ্রীক ভাষায় লিখিত যা পাশ্চাত্য ভাষাগুলোর অন্যতম এবং যিশুখৃস্টের তিরোধানের কিছু পরে লিখিত হয়
মূলত বাইবেল হল ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে বিভিন্ন লেখকদের লেখার একটি সংকলন খৃস্টানদের বহু ধর্মীয় গোষ্ঠীই কেনন [canon]-কে (চার্চ কর্তৃক অনুমোদিত বাইবেলের তালিকাভুক্ত পুস্তকাবলীকে) যথার্থ ঐশীগ্রন্থ হিসেবে গ্রহণ করতে নারাজকিছু কিছু গ্রন্থ এমনও আছে, যা সর্বজনীন ভাবে স্বীকৃত নয়এ বিষয়ে The Catholic Encyclopedia’র বক্তব্য নিম্নরূপ :

The idea of a complete and clear-cut canon of the New Testament existing from the beginning, that is from Apostolic times, has no foundation in history. The Canon of the New Testament, like that of the Old, is the result of a development, of a process at once stimulated by disputes with doubters, both within and without the Church, and retarded by certain obscurities and natural hesitations, and which did not reach its final term until the dogmatic definition of the Tridentine Council. [`Canon of the New Testament’]
অর্থ :একটি সম্পূর্ণ এবং সুনির্দিষ্ট ক্যাননের অস্তিত্বের যে ধারণা, শুরু থেকেই অর্থা যিশুখৃস্টের শিষ্যদের সময়কাল থেকেই এর কোন ঐতিহাসিক ভিত্তি ছিল নাওল্ড টেস্টামেন্টের মত নিউ টেস্টামেন্টের ক্যানন গুলোও একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার ফলএই ধারাবাহিকতা ছিল চার্চের ভিতরে অথবা চার্চকে বাদ দিয়ে বিতর্ক ও সংশয়ের যুগপ উত্তেজনার সুনির্দিষ্ট একটি প্রক্রিয়া, যা ছিল কুসংস্কার ও প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধকতা দ্বারা দমিত এবং ট্রাইডেন্টাইন কাউন্সিল দ্বারা যুক্তিহীন বিশ্বাসভিত্তিক সংজ্ঞা নিরূপণের আগ পর্যন্ত যা কোন চূড়ান্ত পরিভাষায় উপনীত হতে ব্যর্থ হয়

দেখা যাচ্ছে, বাইবেলের প্রাচীন পাঠের অস্তিত্ব নিয়ে খৃস্টানদের মধ্যেও প্রচুর সন্দেহ-সংশয় বিদ্যমান রয়েছেবাইবেলের সবচেয়ে প্রাচীন পান্ডুলিপির নিদর্শন হল the Codex Vaticanusএটি ভ্যাটিকানের লাইব্রেরীতে সংরক্ষিত আছে বলে মনে করা হয়তবে এটি লিখিত হয় কডেক্স সিনাটিকাস (Codex Sinaticus) বা বৃটিশ লাইব্রেরীতে সংরক্ষিত বাইবেলের সামান্য আগেএই দুটি প্রাচীন পান্ডুলিপিই চতুর্থ শতকে লিপিবদ্ধ হয়

অনুরূপ ভাবে জেসাসের জীবন-কাহিনীর উপর প্রথম ও দ্বিতীয় শতকে কমপক্ষে ৫০ টি গসপেল লিখিত হলেও তার মধ্যে মাত্র ৪টি অফিসিয়ালভাবে কেনান হিসেবে স্বীকৃতি পায় খৃস্টীয় চতুর্থ শতকেকিন্তু কোন একটি গসপেলের মূলকপি বিদ্যমান নেইহাতে লেখা যে কপিগুলো এখন সংরক্ষিত আছে, সেগুলো অসংখ্যবার প্রতিলিপিকৃত হয়ে বর্তমান অবস্থায় বিদ্যমানতো সেগুলোর মূল্যায়ন সম্পর্কে একটি ধারণা পাওয়া যায় বিংশ শতকে নিউ টেস্টামেন্ট স্টাডিজের প্রখ্যাত অধ্যাপক রুডল্ফ বাটমানের একটি মন্তব্যেজেসাসের জীবনীগুলো প্রসঙ্গে তিনি বলেন : `We can now know almost nothing concerning the the life and personality of Jesus, since the early Christian sources show no interst in either, are moreover fagmentary and often legendary; and other sources about Jesus do not exist.’ -(Bultmann 8) ‘জেসাসের জীবন এবং ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে এখন আমরা বলতে গেলে কিছুই জানতে পারি নাপ্রথম থেকেই এ ব্যাপারে খৃস্টীয় সূত্রগুলোর তেমন কোন আগ্রহ যেমন পরিলক্ষিত হয় না, তেমনি যা কিছু পাওয়া যায় তার বেশির ভাগই অসম্পূর্ণ এবং এবং প্রায়ই পৌরাণিক কল্প-কাহিনী নির্ভর; এছাড়া আর কোন সূত্র বিদ্যমান নেই
খৃস্টান স্কলারদের মতে, প্রাচীন ৪টি গসপেল মার্কের, এগুলো লিখিত হয়েছে ৫৭ থেকে ৭৫ চার্চ বসরে বাকী গসপেলগুলো লিখিত হয়েছে এর অনেক পরে, ৮৫ থেকে ১০০ খৃস্টীয় বসরে সবগুলো সগপেলেরই মূলভাষা ছিল গ্রীক এবং তাদের লেখস্বত্ব নিয়ে রয়েছে তীব্র মত-পার্থক্য

৪. আত্মপরিচয় (Self-Reference) :

বাইবেল তার নিজের সম্পর্কে কোন অবহিতি বা স্বীকৃতি প্রদান করে নাঅর্থা বাইবেলে কোন Self-Reference পাওয়া যায় নাএর মানে হচ্ছে, ‘বাইবেলশব্দটির মধ্য দিয়ে আমরা যে ঐশী প্রত্যাদেশ পাওয়ার প্রত্যাশা করি, বাইবেলের মধ্যে তা পাওয়ার কোন নিশ্চয়তা বা গ্যারান্টি নেইআর বাস্তবিকই, খৃস্টানদের মধ্যে খুব অল্প-সংখ্যক গ্রুপ রয়েছে যারা বাইবেলকে অখন্ডভাবে একটি ঐশী প্রত্যাদেশ মনে করেনঅত্যাধিক অসঙ্গতি ও সুস্পষ্ট প্রশ্নবিদ্ধ ধারণার উপস্থিতি এর দাবীকে অসমর্থনীয় করে তুলেছে

অন্যদিকে পবিত্র কোরআন আল্লাহর বাণী হওয়ার দাবী করে অত্যন্ত সুস্পষ্ট ও দ্ব্যাথহীনভাবেএর মূলে রয়েছে এই বাস্তবতা যে, কোরআনের কথাগুলো হল স্বয়ং আল্লাহর কালাম; তিনিই কোরআনের বক্তা এবং এগুলো সরাসরি মানুষের উদ্দেশ্যে বলা হয়েছেকোরআনের মধ্যে আল্লাহ ছাড়া আর কারো কোন বাণী প্রক্ষিপ্ত হয়নিআর মহানবীর যে বাণী গুলো, যাদেরকে হাদীস বলা হয়, সেগুলো সংকলিত হয়েছে পৃথক গ্রন্থসমূহেঅর্থা নবীর কোন কথাও কোরআনে স্থান পায়নি, কোরআন অখন্ডভাবেই আল্লাহর বাণীস্বয়ং আল কোরআনেও বার বার দাবী করা হয়েছে যে এটি আল্লাহর বাণী, এ বিষয়ে কোন ধরনের সন্দেহ-সংশয়ের অবকাশ নেইআল কোরআনে ৭০টি স্থানে কোরআনশব্দটির উচ্চারণ করে দাবী করা হয়েছে যে, এটি আল্লাহর বাণী

৫. আল কোরআনের হেফজি করণ বা মুখস্তকরণ :

পবিত্র কোরআন মজিদের আয়াতগুলো মহানবীর প্রতি প্রত্যাদিষ্ট হয়েছে তাঁর জীবনের দীর্ঘ ২৩ বছরে, ইসলাম ধর্মকে প্রতিষ্ঠিত করার প্রেক্ষিতে বিভিন্ন ঘটনা ও পরিস্থিতি মোকাবেলায় ঐশী পথ-নির্দেশ হিসেবেআর হযরত জিবরিল (আ.) আল্লাহর পক্ষ থেকে যখনই কোন আয়াত বা আয়াতগুচ্ছ মহানবীর উপর নাযিল করতেন, তখন সাথে সাথেই তা সংরক্ষণের জন্য তিনি তা তাঁর অনুসারীদের সম্মুখে পেশ করতেন, তাঁদেরকে আল্লাহর কালাম আবৃত্তি করে শোনাতেনআর তাঁর মহান সাহাবীরা শুধু যে আল্লাহর রাসূলের উপর নাযিলকৃত আয়াতগুলোকে সাথে সাথে লিখে রাখতেন তাই নয়, সাথে সাথে তাঁরা পরম আগ্রহ ও মমতায় আল্লাহর কালামকে মুখস্ত করে তাঁদের হৃদয়পটেও সংরক্ষণ করে রাখতেনএ লক্ষে সাহাবীদের মধ্যে দুটি দলই ছিল, এঁদের একটিকে বলা হতো কাতেবঅর্থা লিপিবদ্ধকারী দল এবং মুহফিজবা মুখস্তকারী দলযার কারণে মহানবীর সময়কালেই সমগ্র কোরআন লিপিবদ্ধ হওয়া ছাড়াও বহু হাফেজে কোরআনও গড়ে ওঠেন, যাঁরা সমগ্র কোরআনকে তাঁদের বক্ষে ধারণ করেনমহানবীর ইন্তেকালের পরেও হেফজি কোরআনের এ ধারা এখনও অব্যাহত রয়েছে এবং ইনশায়াল্লাহ তা অব্যাহত থাকবে কিয়ামতের আগ পর্যন্তআল্লাহর কালামের প্রতি মুসলমানদের মহববত এবং এর মাধ্যমে স্রষ্টার সন্তুষ্টি অর্জনের প্রেরণাই হেফজি কোরআনের এই ধারাকে অব্যাহত রেখেছেসুতরাং আমরা বলতে পারি, পবিত্র কোরআন মজিদ অবতীর্ণ হওয়ার প্রথম দিন থেকেই তা মুসলমানদের শুধু হাতেই নয়, তাদের বুকেও সংরক্ষিত হয়ে আসছেমহানবীর মৃত্যুর পূর্বেই সমগ্র কোরআন লিপিবদ্ধ হয়ে যায় এবং তিনি নিজে কোরআন সংরক্ষণের প্রক্রিয়াকে নিরীক্ষা ও সত্যায়নের কাজ সম্পন্ন করে যান

এ কারণেই পবিত্র কোরআন নাযিলের প্রথম দিন থেকে আজ পর্যন্ত আল্লাহর কালাম আল কোরআন সব ধরনের দুষ্কৃতি ও বিকৃতির হাত থেকে নিরাপদ ও পবিত্র থাকতে পেরেছেযেহেতু প্রথম থেকেই কোরআন লিপিবদ্ধ করা হয়েছে এবং এর কয়েকটি সর্বজনগ্রাহ্য অখন্ড পান্ডুলিপি মুসলমানরা লাভ করেছিলেন এবং অসংখ্য কোরআনে হাফেজ তৈরী হয়ে গিয়েছিলেন, যার কারণে এর মধ্যে বিকৃতি ঘটার কোন পথ খোলা ছিল নাসবচেয়ে বড় কথা, স্বয়ং আল্লাহ রাববুল আলামীন পবিত্র কোরআনকে সব ধরনের বিকৃতি ও দুষ্কৃতির হাত থেকে রক্ষা করার অঙ্গীকার করেছিলেনআল্লাহ রাববুল আলামিন স্বয়ং ঘোষণা করেছেন : নিশ্চয় আমরা এ জিকর (আল কোরআন) নাযিল করেছি এবং আমরাই একে রক্ষা করবো’ -[আল হিজর ১৫ : ৯]

মহানবীর মৃত্যুর অব্যবহিত সময়-কালেই তাঁর সাহাবীরা ইতিমধ্যেই তাঁদের কাছে থাকা পবিত্র কোরআনের অংশগুলোকে একত্রিত করে একটি অখন্ড গ্রন্থে [volume] তা সংকলিত করেনএটি ছিল প্রথম খলিফা হযরত আবু বকরের সময়েতখন পবিত্র কোরআনের একজন শীর্ষস্থানীয় আলেম [scholar] ও অনুলেখক হযরত জায়িদ ইবনে দাবিতকে কোরআনের অংশগুলোকে একত্রিত করে এর একটি রাষ্ট্রীয় কপি তৈরী করার জন্য নিয়োগ করা হয়অত্যন্ত যত্ন ও সতর্কতার সাথে তিনি এই দায়িত্ব পালন করে আল কোরআনের একটি standard volume বা official collection তৈরী করেনএকে মুসহাফ [mushaf] বলা হয়

. আল কোরআন : সবচেয়ে বড় we®§q :

আল কোরআনের অব্যাহত অবিকৃতির একটি বড় কারণ হলো, এটি তার আসল ভাষায় সংরক্ষিত হয়েছে, যা বাইবেলের বেলায় সম্ভব হয়নিমুসলিম বিশ্বে এমন কোন ব্যক্তিকে খুঁজে পাওয়া যাবে না, যে আল কোরআনের কোন অনুবাদ বা ভাষান্তরিত সংস্করণকে মূল কোরআনের স্থলাভিসিক্ত করার কথা চিন্তা করতে পারেএর ফলে আমরা আজও পবিত্র কোরআনকে ঠিক সেই অবস্থাতেই পাচ্ছি, যে অবস্থায় এটি স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা কর্তৃক মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি অবতীর্ণ হয়েছিলআল কোরআনের যথার্থতা ও এর অকৃত্রিমতা তাই প্রশ্নাতীত

মূলত এটি আল কোরআনের একটি বিরাট মোজেজা এবং আল্লাহ তায়ালার একটি বিরাট মেহেরবানী যে, আজ থেকে ১৪ বছর আগে অবতীর্ণ এই গ্রন্থের ভাষা আজকের আরবি ভাষাভাষী লোকেরাও অত্যন্ত স্বাচ্ছন্দের সাথে পড়তে ও বুঝতে সক্ষম হচ্ছেনঅথচ সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে প্রতিটি ভাষারই পরিবর্তন হচ্ছেআমরা জানি একটি ভাষায় বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটার জন্য দুই/এক শো বছরই যথেষ্টআর ভাষার ইতিহাসের নিয়ম সম্পর্কে যারা অবহিত তারা এ বিষয়ে একমত হবেন যে, যুক্তি অনুযায়ী চৌদ্দ শো বছর আগের একটি গ্রন্থ আল কোরআনের ভাষা আজকের আরবি ভাষী লোকদের মোটেই পড়তে ও বুঝতে পারার কথা নয়অথচ বাস্তবতা হচ্ছে বিগত চৌদ্দ শো বছরের প্রতিটি বছরের ৩৬৫ দিনের প্রতিটি ঘন্টা, প্রতিটি মিনিট ও প্রতিটি সেকেন্ডের প্রতিটি মুহূর্তে আল্লাহর এই কালাম পঠিত হয়ে আসছে, বিগত ১৪ শো বছরের প্রতিটি মুহূর্তে আল্লাহর কালাম আল কোরআন তেলাওয়াত, অধ্যয়ন ও গবেষণার মধ্য দিয়ে ছিল জীবন্ত, এবং এ ধারা এখনও অব্যাহত আছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে ইনশায়াল্লাহশুধু তাই নয়, আসন্ন মাল্টি মিডিয়ার যুগে এই ধারা আরো অনেক বেশি বেগমান হবে, এর সুর ও ব্যাপ্তি অকল্পনীয় ভাবে বিস্তার লাভ করবে
বস্ত্তত, এটি আল কোরআন এবং মহান প্রভুর তরফ থেকে প্রাপ্ত এটি মহানবীর একটি চিরন্তন মোজেজা এবং এই মোজেজার সামনে তাঁর প্রতিপক্ষগণ অত্যন্ত নিস্প্রভএ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ পাক বলেন : এটি এমন একটি গ্রন্থ, যাতে রয়েছে নিশ্চিত পথনির্দেশ তাদের জন্য, যারা আল্লাহকে ভয় করে এবং এই কোরআনে সন্দেহ-সংশয়ের কোন অবকাশ নেই’ -[আল বাকারা ২ : ২] অন্যত্র আল্লাহ আরো ঘোষণা করেন : সত্য সমাগত, মিথ্যা বিতারিতমিথ্যার পতন অবশ্যম্ভাবী’ -[আল ইসরা ১৭ : ৮১]

তথ্যসূত্র :
- Bultmann, Rudolf. Jesus and the Word. Charles Scribner’s Sons, New York, 1958
- `Canon of the New Testament.’ Catholic Encyclopedia (WWW.newadvent.org).
- Griffith, Sidney H. `The Gospel in Arabic : An Enquiry into Its Appearance in the First Abbasid Century.’ in Oriens Christians, volume 69, pp.131-132
- WÜrthwein, Ernst. The Text of the Old Testament. Grand Rapids, Michigan: William B. Eerdmans Publishing Company, 1988.

 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ