ঢাকা, শনিবার 24 June 2017, ১০ আষাঢ় ১৪২8, ২৮ রমযান ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

অর্থমন্ত্রীর পক্ষে-বিপক্ষে আওয়ামী সমাচার

আশিকুল হামিদ : আজকের নিবন্ধে সমাজতন্ত্র সম্পর্কে কিঞ্চিৎ আলোচনা করার দরকার পড়বে। তার আগে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেট এবং এর পক্ষে-বিপক্ষে ক্ষমতানসীদের নাটকীয় অভিনয়ের কথা উল্লেখ করতে হবে। কারণ, জাতীয় সংসদে নির্বাচিত কোনো প্রকৃত বিরোধী দল না থাকায় সে দলের ভূমিকায় আজকাল আওয়ামী লীগের মন্ত্রী-এমপিদেরকেই দেখা যাচ্ছে। তারা ভাষাও যথেষ্ট কঠিনই ব্যবহার করছেন। সাবেক মন্ত্রী এবং এখনো ক্ষমতাধর নেতা হিসেবে পরিচিত শেখ ফজলুল করিম সেলিম তো অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতকে ‘কথা কম’ বলার উপদেশও দিয়েছেন। ধমকের সুরে বলেছেন, আপনার বয়স হয়েছে, এখন কথা কম বলুন! জাতীয় পার্টির কয়েকজনকেও শেখ সেলিমের সঙ্গে সুর মেলাতে দেখা গেছে। মনে হচ্ছিল যেন মিস্টার মুহিতের যাই-যাই অবস্থা হতে চলেছে। কিন্তু না, এক দিনের মধ্যেই তার পক্ষে দাঁড়িয়ে গেছেন তোফায়েল আহমেদ এবং আমির হোসেন আমুর মতো জাঁদরেল মন্ত্রী ও নেতারা। ফলে বিতর্ক জমে উঠেছে। লক্ষণীয় বিষয় হলো, সাধারণ মানুষও কিন্তু অন্তরালের উদ্দেশ্য বা আয়োজন সম্পর্কে বুঝে ফেলেছে। এতে আবশ্য ক্ষমতাসীনদের কিছু যায়-আসে না। বাজেট তারা ঠিকই পাস করিয়ে নেবেন এবং মিস্টার মুহিতও অর্থমন্ত্রীর পদে টিকে যাবেন। তার নামে জয়ধ্বনিও শোনা যাবে। কে জানে, সে মিছিলের পুরোভাগেও শেখ সেলিমকেই দেখা যাবে কি না!
এভাবে শুরু করার পেছনে বিশেষ কারণ রয়েছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংকে জমানো টাকার ওপর চাপানো আবগারি শুল্কের কথাই ধরা যাক। অর্থমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, কারো ব্যাংকের ব্যক্তিগত বা সঞ্চয়ী অ্যাকাউন্টে এক লাখ টাকার বেশি জমা হলেই তাকে ৮০০ টাকা আবগারি শুল্ক দিতে হবে। এই হিসাবের মধ্যে কিন্তু বড় ধরনের মারপ্যাঁচ আছে। কারণ, কারো সঞ্চয়ী অ্যাকাউন্টে এক লাখ এক টাকা জমা থাকলে বছর শেষে তার লাভ বা মুনাফা হয় ৪০০ টাকা। আগে এই লাভ থেকে আয়কর বা ইনকাম ট্যাক্স কাটা হতো ৬০ টাকা। এর বাইরে এতদিন বছরে ৫০০ টাকা কাটা হতো আবগারি শুল্ক হিসেবে। সে পরিমাণকেই এবার ৮০০ টাকা করতে চেয়েছেন অর্থমন্ত্রী। এটা আসলে শুরুর অংক মাত্র। এর সঙ্গে রয়েছে চেক বইয়ের জন্য ২০০ টাকা এবং এটিএম কার্ডের জন্য ৩০০ টাকা। এভাবে বছর শেষে এক লাখ টাকা উল্টো কমে দাঁড়াবে ৯৮ হাজার ৫৪০ টাকা। অর্থাৎ কোনো মানুষ যদি ব্যাংকে এক লাখ এক টাকা জমা রাখে তাহলে বছরশেষে লাভ বা মুনাফা পাওয়ার পরিবর্তে মাশুল ও শুল্কের নামে তাকে উল্টো ১৪৬০ টাকা বাড়তি গুনতে হবে। অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ব্যাংক অ্যাকাউন্টে যাদের লাখ টাকার বেশি আছে তারা নাকি ‘যথেষ্ট সম্পদশালী’! সুতরাং বছরে ৮০০ টাকা আবগারি শুল্ক দিতে হলে ওই ব্যক্তির কোনো ‘সমস্যা হবে না!’
সমস্যার শুরু হয়েছিল এখান থেকেই। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যে হস্তক্ষেপ করবেন এবং ‘জনস্বার্থে’ তিনি যে টাকার সীমায় পরিবর্তন করতে বলবেন- এ সম্পর্কে জানা গিয়েছিল প্রাথমিক পর্যায়েই। এখন শোনা যাচ্ছে, অর্থমন্ত্রী যেখানে এক লাখ এক টাকার ওপর আবগারি শুল্ক চাপানোর কথা বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেখানে সীমা বাড়িয়ে ২০ লাখ টাকা পর্যন্তও করতে পারেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি আরো বেশি জনপ্রিয়তা অর্জন করবেন বলে তাকে বোঝানো হয়েছে। এতে আমাদের আপত্তি নেই। আপত্তির কারণ আসলে অন্যখানে। যেমন যাদের অ্যাকাউন্টে ১০ লাখ এক টাকা থেকে এক কোটি টাকা পর্যন্ত থাকবে তাদের ওপর আবগারি শুল্ক ধরা হয়েছে ২৫০০ টাকা। দ্বিতীয়ত, জমার পরিমাণ এক কোটি এক টাকা  থেকে পাঁচ কোটি পর্যন্ত হলে আবগারি শুল্ক হবে ১২ হাজার টাকা; এবং তৃতীয়ত, যাদের অ্যাকাউন্টে পাঁচ কোটি টাকারও বেশি থাকবে তাদের কাছ থেকে আবগারি শুল্ক কাটা হবে ২৫ হাজার টাকা। মাত্র এক লাখ এক টাকার জন্য যেখানে ৮০০ টাকার আড়ালে ১৪৬০ টাকা আদায় করা হবে সেখানে কোটিপতিদের বিষয়টি অবশ্যই বিস্ময়কর। কারণ, পাঁচ কোটি টাকার বেশি পরিমাণের জন্য ২৫ হাজার টাকা শুল্কের প্রকৃত অর্থ হলো, ওই ব্যক্তিকে প্রতি এক লাখ টাকার জন্য গড়ে মাত্র ২০ টাকা শুল্ক দিতে হবেÑ যেখানে সাধারণ মানুষের ওপর চাপানো হয়েছে ১৪৬০ টাকা! অর্থাৎ সরকার উদারতা দেখিয়েছে কোটিপতিদের ব্যাপারে। এর মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয়েছে, এই সরকার আসলেও এমন কিছু বিশেষ শ্রেণী ও গোষ্ঠীর স্বার্থে কাজ করছে, যেখানে সাধারণ মানুষের কোনো স্থান নেই। সরকার শুধু সেই আওয়ামী কোটিপতিদের স্বার্থ রক্ষার জন্যই ব্যস্ত রয়েছে- যাদের জন্ম, বিকাশ ও প্রতিষ্ঠা ঘটেছে বর্তমান সরকারের আমলে।
এ ধরনের কৌশলের পরিপ্রেক্ষিতে রাজনৈতিক অঙ্গনে আরো একবার ‘আওয়ামী সমাজতন্ত্র’ নিয়ে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। হঠাৎ করে সমাজতন্ত্র, তাও আবার আওয়ামী তকমা লাগানো সমাজতন্ত্রের কথা শুনে পাঠকরা বিভ্রান্ত হতে পারেন। কারণ, চীন এবং উত্তর কোরিয়ার মতো দু’-চারটি দেশে এখনো সমাজতন্ত্র থাকলেও তা রয়েছে আসলে নামকাওয়াস্তে। সমাজতন্ত্র তথা কমিউনিজমের ‘তীর্থস্থান’ হিসেবে পরিচিত রাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকেই ভেঙে খান-খান হয়ে গেছে। ভেঙেছেও সমাজতন্ত্রের ঠ্যালা বা ধাক্কাতেই। দুই বিপ্লবী নেতা লেনিন ও স্ট্যালিনের বড় সাধের কমিউনিস্ট রাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়নের নাম এখন কেবলই রাশিয়া। দেশটি থেকে সমাজতন্ত্র ও কমিউনিজমকেও ঝেঁটিয়ে বিদায় করেছেন ভøাদিমির পুতিন নামের কঠিন এক স্বৈরশাসক- যিনি জনগণের ভোটে কখনো প্রেসিডেন্ট হন, আবার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার প্রতি সম্মান দেখিয়ে কখনো হন ‘নির্বাচিত’ প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রীর যে পদেই থাকুন না কেন, রাশিয়াকে চলতে হয় পুতিনের একার ইচ্ছায়। এটাই সাধারণভাবে সমাজতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য- যে সম্পর্কে হাড়ে হাড়ে টের পেতে হয়েছে ভøাদিমির ইলিচ উলিয়ানভ লেনিন ও যোসেফ স্ট্যালিনের নেতৃত্বাধীন অধুনালুপ্ত সোভিয়েত ইউনিয়নকে এবং প্রায় একই সময়কালে চেয়ারম্যান মাওসেতুং-এর নেতৃত্বাধীন রাষ্ট্র গণচীনকে (মাওসে তুংকে আজকাল সেদেশে ‘মাও জে দং’ বলা হয়)। রাশিয়ার বর্তমান প্রেসিডেন্ট পুতিনের সঙ্গে ওই তিন বিপ্লবী নেতার পার্থক্য হলো, তারা যেখানে জনমত তথা নির্বাচনের ধার ধারতেন না, পুতিন সেখানে সংবিধানের নির্দেশনা অনুয়ায়ী নির্ধারিত সময়ের পরপর নির্বাচনের আয়োজন করে থাকেন। শুধু তা-ই নয়, তিনি যে অন্য দেশের নির্বাচনেও নাক গলান তার সর্বশেষ বড় ধরনের প্রমাণ পাওয়া গেছে এবারের মার্কিন নির্বাচনে। বলা হচ্ছে, পুতিনের বদৌলতেই নাকি প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচিত হতে পেরেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প!
এবার বলি কেন আওয়ামী সমাজতন্ত্রের প্রসঙ্গ টেনে আনা হয়েছে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ যখন স্বাধীন হয়েছিল সারাবিশ্বে তখন সমাজতন্ত্রের ঢেউ বইছিল। চীন ও সোভিয়েত ইউনিয়নসহ সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর প্রতিষ্ঠা ঘটেছিল সশস্ত্র বিপ্লবের মধ্যদিয়ে। সেদিক থেকে বাংলাদেশও সমাজতন্ত্রের অভিমুখেই যাত্রা শুরু করেছিল- যদিও শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ আগে কখনো সমাজতন্ত্রের কথা বলেনি। তৎকালীন পাকিস্তানে কমিউনিস্টদের বাইরে সমাজতন্ত্রের কথা বলতেন শুধু মওলানা ভাসানী। তিনি আবার সমাজতন্ত্রের আগে ‘ইসলামী’ শব্দটি যোগ করেছিলেন- বলতেন ইসলামী সমাজতন্ত্র। ওদিকে বাংলাদেশকে সাহায্যকারী রাষ্ট্র ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীও সমাজতন্ত্রের ঢেউয়ে ভেসে যাওয়ার অভিনয় করছিলেন। তার দরকার ছিল তখনও পর্যন্ত সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত সোভিয়েত ইউনিয়নের সাহায্য নিশ্চিত করা। এজন্য তিনি ভারতের কয়েকটি বড় বড় ব্যাংক-বীমা ও শিল্প-কারখানা রাষ্ট্রায়ত্ত করেছিলেন। বলা দরকার, সমাজতান্ত্রিক কোনো রাষ্ট্রে ব্যক্তির মালিকানায় বড় কোনো শিল্প-কারখানা বা ব্যাংক-বীমা কোম্পানি রাখার বিধান ছিল না। সে সবের মালিকানা সরকার নিয়ে নিতোÑ সে প্রক্রিয়াটিকে বলা হতো ন্যাশনালাইজেশন বা রাষ্ট্রায়ত্তকরণ। অর্থাৎ মালিকানা চলে আসতো সরকারের অধীনে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্যক্তি মালিকদের কিছুটা ক্ষতিপূরণ দেয়া হলেও ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী সোজা দখলে নেয়ার পন্থায় এগিয়েছিলেন।
স্বাধীন বাংলাদেশেও রাষ্ট্রায়ত্তকরণের প্রশ্নটি জোরেশোরে উঠেছিল। এর কারণ, শতকরা ৯০ ভাগেরও বেশি শিল্প-কারখানার মালিক ছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানিরা। যুদ্ধের পর তারা বাংলাদেশ ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। ফলে স্বাভাবিকভাবেই তাদের ফেলে যাওয়া শিল্প-কারখানার মালিকানা কার দখলে যাবে সে প্রশ্নটি না উঠে পারেনি। এখানেই শুরু হয়েছিল আওয়ামী সমাজতন্ত্রের খেলা। ইন্দিরা গান্ধী যেহেতু সমাজতন্ত্রের অভিমুখীন ব্যবস্থা নিতে শুরু  করেছিলেন সেহেতু বাংলাদেশের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত আওয়ামী লীগ সরকারকেও সমাজতন্ত্রের স্লোগান দিতে হয়েছিল। এ ব্যাপারে যুদ্ধকালীন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ নাকি ‘সততার সঙ্গে’ এবং ‘সিরিয়াসলি’ সমাজতন্ত্রের পক্ষে ছিলেন। অন্যদিকে প্রথমে রাষ্ট্রপতি এবং পরে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত শেখ মুজিবুর রহমান জীবনে কখনো সমাজতন্ত্রের পক্ষে ছিলেন বলে জানা যায় না। শুধু তাই নয়, তার অতি ঘনিষ্ঠ সহকর্মী ও প্রভাবশালী মন্ত্রী খন্দকার মোশতাক আহমদসহ অনেকেই প্রকাশ্যে ছিলেন সমাজতন্ত্রের ঘোর বিরোধী। কিন্তু তা সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানকে ইন্দিরা গান্ধীর পদাংক অনুসরণ করতে হয়েছিল। বলা হয়, পাকিস্তানি মালিকদের ফেলে যাওয়া শিল্প-কারখানা বা ব্যাংক-বীমা কোম্পানিগুলোকে নিলাম বা অন্য কোনো পন্থায় বাংলাদেশিদের কাছে বিক্রি করে দেয়ার প্রস্তাবও দেয়া হয়েছিল। প্রস্তাবের উত্থাপকরা বলেছিলেন, বাস্তব অর্থনৈতিক কারণেই যেহেতু কোনো ব্যক্তি বাঙালি পুঁজিপতির পক্ষে এককভাবে কোনো প্রতিষ্ঠান কেনা সম্ভব ছিল না সেহেতু কয়েকজনের সমন্বয়ে গ্রুপ বা লিমিটেড কোম্পানি গঠন করে তাদের কাছে বিক্রি করা হোক। অমনটি করা হলে মুনাফাসহ নিজেদের স্বার্থেই ব্যক্তি মালিকরা শিল্প-কারখানা এবং ব্যাংক-বীমা কোম্পানিগুলোকে টিকিয়ে রাখতেন এবং পর্যায়ক্রমে লাভজনক করে তুলতেন।
কিন্তু প্রথম আওয়ামী লীগ সরকারের ঘাড়ে সাফল্যের সঙ্গে সমাজতন্ত্রের ভূতকে সওয়ার করানো হয়েছিল। পাঠকরাও লক্ষ্য করলে দেখবেন, অমন অবস্থায় পাকিস্তানিদের ফেলে যাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাঙালি ব্যক্তি মালিকদের লিমিটেড কোম্পানির কাছে বিক্রি না করার সিদ্ধান্তে আসার পর নিজের দখলে নেয়া ছাড়া সরকারের আর কোনো উপায় ছিল না। সরকার সেটাই করেছিল। কিন্তু বাধ্য হয়ে নেয়া এ পদক্ষেপটিকেই সরকার সমাজতন্ত্র বলে চালিয়ে দেয়ার হাস্যকর কিন্তু অতি ধ্বংসাত্মক সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কারণ, রাষ্ট্রায়ত্ত করার মাধ্যমে সরকারের মালিকানায় নেয়ার পর এগুলোকে পরিচালনা করার ব্যাপার ছিল। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিল হাজার হাজার বাঙালি শ্রমিক। আর তখনই শুরু হয়েছিল আওয়ামী সমাজতন্ত্রের আসল ‘ম্যাজিক’। সরকার প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে একজন করে প্রশাসক বা অ্যাডমিনিস্ট্রেটর নিযুক্তি দিয়েছিল। তাদের সঙ্গে ছিল কয়েক ডজন পর্যন্ত নানা নামের অফিসার। এরা কারা হতে পারেন- সে সম্পর্কে নিশ্চয়ই বুঝিয়ে বলার দরকার পড়ে না। প্রত্যেকেই ছিলেন যাকে বলে আওয়ামী লীগের ‘পরীক্ষিত’ লোকজন। এদের নেতৃত্বেই স্বাধীন বাংলাদেশে লুটপাটের ভয়ংকর রাজত্ব কায়েম হয়েছিল। সে সময় যেমন তেমনি পরবর্তীকালেও প্রমাণসহ জানা গেছে, প্রশাসকসহ আওয়ামী লীগের নিযুক্তি পাওয়া লোকজন কারখানার কাঁচামাল ও উৎপাদিত বিভিন্ন পণ্য তো বটেই, এমনকি মেশিনপত্রের যন্ত্রাংশ পর্যন্ত বিক্রি করে খেয়েছিল। তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিল আওয়ামী শ্রমিক নেতারাও। টঙ্গি থেকে আদমজী এবং চট্টগ্রাম থেকে খুলনা পর্যন্ত প্রতিটি শিল্পাঞ্চলেই লুটপাটের কর্মকাণ্ড চলেছে বাধাহীনভাবে। ফলে লাটে উঠেছিল সব শিল্প-কারখানা।
এদিকে সমাজতন্ত্র যে নিছকই প্রতারণাপূর্ণ একটি স্লোগান ছিল তার প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল সরকারের অন্য কিছু সিদ্ধান্ত ও কার্যক্রমেও। যেমন জাতীয় পুঁজির বিকাশ ছিল সমাজতন্ত্রের প্রাথমিক একটি পূর্বশর্ত। কিন্তু প্রথম আওয়ামী লীগ সরকার পুঁজির সর্বোচ্চ সিলিং নির্ধারণ করেছিল তিন লাখ টাকা। ওই পরিমাণ টাকা দিয়ে তখন এমনকি একটি গেঞ্জির কারখানাও করা যেতো না। প্রবল  নিন্দা ও সমালোচনার ফলে বিষয়টি অনুধাবন করার পর ১৯৭২ সালেই সরকার সিলিং বাড়িয়ে করেছিল ৩০ লাখ টাকা। এই পরিমাণ টাকায়ও সে সময় কোনো কারখানার জন্য যথেষ্ট ছিল না। এর মধ্যদিয়ে বরং সরকারের প্রকৃত উদ্দেশ্যই উন্মোচিত হয়ে পড়েছিল। সে উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশকে শিল্পায়নের দিক থেকে পেছনে ঠেলে দেয়া, যাতে ভারতের পণ্যে দেশের বাজার ছেয়ে যেতে পারে। অর্থাৎ সমাজতন্ত্রের আড়াল নিয়ে প্রথম আওয়ামী লীগ সরকারই বাংলাদেশের শিল্প ও অর্থনীতিকে ভারতের অধীনস্থ করে ফেলার পদক্ষেপ নিয়েছিল। পাশাপাশি ছিল অন্য একটি তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়ও। লুটপাটের মাধ্যমে স্বাধীনতা পরবর্তী দু’-তিন বছরের মধ্যেই আওয়ামী লুটেরা ধনিক শ্রেণীর সৃষ্টি হয়েছিল। তাদের হাতে জমেছিল প্রচুর অর্থ-বিত্ত। এই অর্থ-বিত্ত যাতে শিল্প-কারখানায় বিনিয়োগ করা হয় সে জন্যই প্রথমে তিন লাখ থেকে ৩০ লাখ এবং ১৯৭৪ সালে তিন কোটি টাকা পর্যন্ত সর্বোচ্চ পুঁজির সিলিং নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান চাইলেও আওয়ামী লীগের লুটেরা ধনিক শ্রেণী পুঁজি বিনিয়োগের কোনো উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারেনি। এজন্যই বাংলাদেশ ভারতীয় পণ্যের বাজারে পরিণত হয়েছিল।
কৃষির ক্ষেত্রেও প্রথম আওয়ামী লীগ সরকারের নীতি ও পদক্ষেপ ছিল অতি ধ্বংসাত্মক। যেমন সমাজতন্ত্রের স্লোগান দিয়ে এবং গরীব কৃষকদের উপকার করার নামে সরকার ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা মওকুফ করার ঘোষণা দিয়েছিল। কিন্তু শুনতে আহা মরি ধরনের মনে হলেও এর মাধ্যমে গরীব কৃষকরা উপকৃত হতে পারেনি। কারণ, ওই সময় কৃষিকাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের অর্ধেকের বেশিই ছিল ভূমিহীন এবং এক একর তথা তিন বিঘার কম জমির মালিক। তাছাড়া সরকার কিন্তু ভিটেবাড়ির খাজনা মওকুফ করেনি। ফলে প্রকৃত কৃষকরা কোনোদিক থেকেই উপকৃত বা লাভবান হতে পারেনি। লাভবান হয়েছিল আসলে জোতদাররাÑ যাদের প্রায় সবাই ছিল আওয়ামী লীগের লোকজন। শুধু তাই নয়, সরকার ব্যক্তিমালিকানাধীন কৃষি জমির সর্বোচ্চ সিলিং নির্ধারণ করেছিল ১০০ বিঘা। এতেও ভূমিহীন এবং প্রকৃত কৃষকদের কোনো লাভ হয়নি। সরকার একই সাথে এমনভাবেই পরিবারের সংজ্ঞা নির্ধারণ করেছিল, যার ফলে সংজ্ঞা ও আইনের ফাঁক গলিয়ে একই ব্যক্তি কয়েকশ’ বিঘা জমির মালিক থাকতে পারতো। থেকেছেও এবং অনুসন্ধানে দেখা গেছে, তাদের প্রায় সকলেই আওয়ামী লীগের লোকজন।
এখানে কৃষি ও জমির পরিমাণ সম্পর্কে বলার কারণ হলো, সমাজতন্ত্রের একটি প্রধান পূর্বশর্তই ছিল সমাজে কোনো জোতদার থাকতে পারবে না এবং খাস ও ধনিকদের জমি রাষ্ট্রায়ত্ত করে সেসব জমি ভূমিহীনদের মধ্যে বিতরণ করতে হবে। কিন্তু প্রথম আওয়ামী লীগ সরকারের নীতি-কৌশলের আড়ালে দলীয় লোকজনই শুধু আরো বেশি জমির মলিক হয়েছিল। অন্যদিকে সমাজতন্ত্রের শর্ত অনুযায়ী যাদের জন্য জোতদার বিরোধী নীতি হওয়ার কথা সেই ভূমিহীন ও গরীব কৃষকরা আরো কঠিন অবস্থার মধ্যে পড়তে বাধ্য হয়েছিল।
এতক্ষণে পাঠকরা সম্ভবত সমাজতন্ত্রের প্রসঙ্গ টেনে আনার কারণ বুঝতে পেরেছেন। এখানে অবশ্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সম্ভাব্য ‘সদিচ্ছার’ কথাও বলা দরকার। যেহেতু তার সরকারের উদার নীতি-কৌশল এবং চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজি ধরনের কর্মকাণ্ডে প্রশ্রয়ের সুযোগে এই কোটিপতিদের বিকাশ তথা উত্থান ঘটেছে সেহেতু নেত্রী হিসেবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এমন আশা করতেই পারেন যে, দলীয় কোটিপতিরা তাদের অর্থ দেশের ভেতরে বিনিয়োগ করবেন এবং তার ফলে জাতীয় অর্থনীতির সমৃদ্ধি ঘটবে। মানুষ চাকরি পাবে। অন্যদিকে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার হয়ে যাওয়ার তথ্য কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর আশাবাদের পক্ষে যায় না। একই কারণে না বলে উপায় থাকে না যে, মিস্টার আবুল মাল আবদুল মুহিতকে সামনে রেখে বর্তমান সরকারও প্রথম আওয়ামী লীগ সরকারের মতোই প্রতারণাপূর্ণ কৌশল নিয়ে এগোতে চাচ্ছে। পার্থক্য হলো, প্রথম সরকার সমাজতন্ত্রের আড়াল নিয়েছিল। অন্যদিকে বর্তমান সরকার সমাজতন্ত্রকে রীতিমতো ঘোষণা দিয়ে বিতাড়িত করে পা বাড়িয়েছে মুক্তবাজার অর্থনীতির দিকে- যেটাও আসলে প্রতারণারই নামান্তর মাত্র। কারণ, সমাজতন্ত্রের মতো মুক্তবাজার অর্থনীতিও জাতীয় শিল্প ও পুঁজির বিকাশ ঘটানোর কথাই বলে। কিন্তু বর্তমান বাংলাদেশে তো কেবল টাকা পাচারই বেড়ে চলেছে! এক বছরে ৭৪ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত পাচার হরা হলে বিনিয়োগের জন্য টাকা কোথায় পাবেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী- এমন প্রশ্ন তো উঠতেই পারে। উঠতেও শুরু করেছে বেশ জোরেশোরেই।  

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ