ঢাকা, রোববার 25 June 2017, ১১ আষাঢ় ১৪২8, ২৯ রমযান ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

অবগুণ্ঠন উন্মোচন ॥ আসিফ আরসালান

অনেক দিন ধরেই বাংলাদেশের বিভিন্ন মহলে একটি অভিযোগ চলে আসছে যে, আমরা যেসব প্রকল্প তৈরি করি বা বাস্তবায়ন করি সেসব প্রকল্প শেষ হলে খরচ অনেক বেশি পড়ে যায়। এই অভিযোগটা আরো বেশি ওঠে অবকাঠামো নির্মাণ বিশেষ করে সড়ক অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে। বাংলাদেশে অনেক সড়ক নির্মিত হয়েছে এবং আরো নির্মিত হচ্ছে। এখন ঢাকার সাথে সবগুলো জেলার সড়ক সংযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং অনেক উপজেলার সাথেও সড়ক সংযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বা হওয়ার পথে। এছাড়া মহাসড়কগুলোর ওপর যানবাহনের ক্রমবর্ধমান চাপ হ্রাস করার জন্য ঢাকা চট্টগ্রাম এবং ঢাকা ময়মনসিংহে ৪ লেনের মহাসড়ক তৈরি হচ্ছে। ৪ লেনের এই মহাসড়ক প্রকল্প ধীরে ধীরে উত্তর বঙ্গেও বিস্তৃত হবে বলে বলা হচ্ছে। এগুলো ছাড়াও অন্তত ২০ বছর আগে থেকেই ফ্লাইওভার নির্মাণ শুরু হয়েছে এবং এখনো নতুন ফ্লাইওভার নির্মিত হচ্ছে। এই ধরণের খবরের পাশাপাশি আবার আরেক ধরণের খবরও পাওয়া যাচ্ছে। ঐসব খবরে বলা হচ্ছে যে, একেকটি অবকাঠামো বিশেষ করে সড়ক অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্পে অরিজিনাল এস্টিমেটের চেয়ে যখন প্রকল্পটি শেষ হচ্ছে তখন প্রকল্প ব্যয় ৪ থেকে ৬ গুণ বেড়ে যাচ্ছে। রাস্তা ঘাটের মেগা প্রকল্প এবং ফ্লাই ওভারের ক্ষেত্রে এই সব অভিযোগ বিভিন্ন মহল থেকে উত্থাপন করা হচ্ছে এবং সেই সব অভিযোগের কিছু কিছু সত্যতাও পাওয়া যাচ্ছে। কেন মূল এস্টিমেটের চেয়ে শেষ পর্যায়ে খরচ ৪ থেকে ৬ গুণ বেশি হয় সেটি নিয়ে ইতোমধ্যে বিভিন্ন ধরণের মন্তব্য এসেছে এবং কারণ বর্ণনা করা হয়েছে। দুইটি ফ্যাক্টরকে প্রকল্প ব্যয়ের অস্বাভাবিক বৃদ্ধির কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই দুটি ফ্যাক্টরের একটি হলো, প্রকল্প সমাপ্তির দীর্ঘ সূত্রতা। অর্থাৎ যখন প্রকল্পটি হাতে নেয়া হয় তখন থেকে প্রকল্পটি যখন শেষ হয় সেই দুটি সময়ের মধ্যবর্তী সময় অনেক লম্বা হয়। ক্ষেত্র বিশেষে দেখা যায় যে এই সময়টি নির্ধারিত সময়ের চেয়ে ৫ বছর, ৬ বছর এমনকি ৮ বছরও লেগে যায়। ফলে প্রকল্প ব্যয় প্রতি বছর বেড়েই চলে। ২য় ফ্যাক্টর হলো, দুর্নীতি। সকলেই বলেন যে, দুর্নীতি শুধুমাত্র দেশীয় ব্যবসা বাণিজ্যেই হয় না, বরং আন্তর্জাতিক পার্টিরা কাজ পেলেও সেখানে দুর্নীতি হানা দেয়। এমন অভিযোগও পাওয়া গেছে যে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ঘুষ প্রদানকে একটি পার্সেন্টেজে ডাকা হয়। যেমন, মিস্টার ১০ পার্সেন্ট, মিস্টার ১৫ পার্সেন্ট ইত্যাদি। এই দুর্নীতি বা উৎকোচ প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধির প্রধান কারণ বলে দেশের সাধারণ মানুষের অভিযোগ তো রয়েছেই, এখন বিশ্ব ব্যাংকও সেই অভিযোগ লালন করছে। এতদিন যে কথা লোক মুখে ঘোরা ফেরা করছিল সেই কথা এখন বিশ্ব ব্যাংকের কাগজে কলমে এসেছে। তারা এখন সাংবাদিক সম্মেলন করে উচ্চকন্ঠে এসব কথা জানিয়ে দিচ্ছে। তারা যেসব কথা ঢাকায় প্রেস কনফারেন্স করে বলছে সেই কথা পরদিন শুধুমাত্র ঢাকার পত্র পত্রিকাতেই নয়, ইংল্যা- এবং আমেরিকার যেসব পত্র পত্রিকা পৃথিবী বিখ্যাত, সেই সব পত্র পত্রিকাতেও এই সব খবর প্রকাশ পাচ্ছে। ইতোমধ্যেই বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ খবর ইংল্যান্ডের দুটি জনপ্রিয় পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে, যে গুলোতে পলিটিক্যাল রেজিমেন্টেশন এবং অর্থনৈতিক করাপশন হাইলাইট করা হয়েছে। আমরা এতক্ষণ ধরে যা বললাম, তারই প্রমাণ মিলেছে বিশ্ব ব্যাংকের সর্বশেষ সংবাদ সম্মেলনে। সেই সংবাদ সম্মেলনেও যেসব অভিযোগের কথা আমরা কিছুক্ষণ আগে উল্লেখ করেছি সেগুলোর পুনরুল্লেখ করা হয়েছে এবং তাদের অভিযোগের সপক্ষে তথ্য প্রমাণ এবং পরিসংখ্যান দেয়া হয়েছে।
॥দুই॥
বিশ্ব ব্যাংকের এক তথ্যে প্রকাশ, বাংলাদেশে অবকাঠামো নির্মাণ, বিশেষ করে রাস্তা ঘাট নির্মাণের খরচ প্রতিবেশী ভারত এবং গণচীনের চেয়ে ৫ থেকে ৬ গুণ বেশি। এই তথ্য প্রকাশ করেছে বিশ্ব ব্যাংকের বাংলাদেশ চ্যাপ্টার। গত ২০ জুন মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে বিশ্ব ব্যাংকের বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর কিমিয়াও ফান এবং বিশ্ব ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হাসান এসব তথ্য প্রকাশ করেন। তারা বলেন যে, বাংলাদেশে ৪ লেন সড়ক নির্মাণে প্রতি কিলোমিটারে খরচ হয় ৬.৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার থেকে ১১.৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। অথচ, একই দৈর্ঘ্য ও প্রস্থের এক কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণ করতে ভারতে খরচ হয় ১ থেকে ১.৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং গণচীনে ১.৩ থেকে ১.৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে বাংলাদেশে অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্প ব্যয়বহুল বলে স্থানীয় অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী এবং বিরোধী দলীয় রাজনীতিবিদরা বেশ কিছুদিন থেকে বলে আসছেন। যেসব কারণে বাংলাদেশে প্রকল্প ব্যয় এত বেশি সেসব কারণের মধ্যে রয়েছে দুর্নীতি এবং গাফিলতির ফলে অনাবশ্যক দীর্ঘ সূত্রতা। বাংলাদেশের বড় বড় রাস্তা এবং ফ্লাইওভার নির্মাণ ব্যয়ে দেখা যায় যে, যে প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় নির্মাণ ব্যয় ধরা হয় ১২ থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা, সেটি চলমান থাকা অবস্থাতেই সময় যতই বয়ে যায় ততই নির্মাণ ব্যয় বাড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত ১৫ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প ৩৫ থেকে ৪০ হাজার কোটি টাকায় শেষ হয়। মহাখালী ফ্লাইওভার, হানিফ ফ্লাইওভার, খিলগাঁও ফ্লাইওভার প্রভৃতি সবগুলো ফ্লাইওভার নির্মাণের ব্যয় দেখা গেছে যে যখন প্রকল্পটি শেষ হয়েছে তখন যে ব্যয় হয়েছে সেটি অরিজিনাল এস্টিমেটের চেয়ে ৩-৪ গুণ বেশি হয়েছে। প্রত্যেকটি ক্ষেত্রেই দেখা গেছে অনাবশ্যক দীর্ঘসূত্রতা এবং প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধি। রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে বিভিন্ন মহল এমনকি সংবাদপত্রেও অভিযোগ করা হয়েছে যে এই সব প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধির কারণ শুধুমাত্র দীর্ঘসূত্রতা নয়, বরং দুর্নীতি প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধির একটি বড় কারণ।
পদ্মা সেতু বাংলাদেশের স্বপ্নের সেতু। পদ্মা সেতু নিয়ে বিশ্ব ব্যাংকের সাথে বাংলাদেশ সরকারের টানা পোড়েনের কথা জনগণ এত সহজেই ভুলে যায়নি। যাই হোক, এই সেতু নির্মাণের সময় যে প্রকল্প ব্যায়ের এস্টিমেট করা হয়েছিল সেটি সময়ের আবর্তনে এবং দীর্ঘসূত্রতার কারণে প্রায় তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়েছিল। বিদেশী সাহায্য সহ যে প্রকল্প ব্যয় ধরা হয়েছিল ১৫ থেকে ১৮ হাজার কোটি টাকা সেটি এখন কত হাজার কোটি টাকায় এসে ঠেকেছে সে সম্পর্কে সর্বশেষ কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে অসমর্থিত খবরে প্রকাশ, প্রকল্পটি শেষ হলে ব্যয় নাকি ৫০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছবে।
কিন্তু দীর্ঘসূত্রতাই বলা হোক, আর যাই বলা হোক, প্রকল্প ব্যয়ের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি বিশ্ব ব্যাংকের ঐ তথ্যকে সমর্থন করে যে, ভারত বা চীনের তুলনায় বাংলাদেশের অবকাঠামো বিশেষ করে সড়ক অবকাঠামো ব্যয় ৩ থেকে ৫ গুণ বেশি।
বেইজিংয়ে কিছু বাংলাদেশী প্রকৌশলী কাজ করেছেন এবং কিছু প্রকৌশলী এখনো কাজ করে যাচ্ছেন। তাদের সূত্রে জানা যায় যে, বেইজিংয়ে বড় বড় রাস্তা বা ফ্লাইওভার নির্মাণ করতে ২ বছরের বেশি সময় দেয়া হয়না। তাই দেখা যায় যে, অনেক ক্ষেত্রে এ ধরণের মেগা প্রকল্প ২ বছরেরও কম সময়ে সম্পন্ন হয়। বাংলাদেশে যদি গণচীনের এই দৃষ্টান্ত অনুসরণ করা সম্ভব হতো তাহলে প্রকল্প ব্যয় অর্ধেকে নেমে আসতো বলে সংশ্লিষ্ট মহল মনে করেন।
॥তিন॥
বিশ্ব ব্যাংকের বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হাসান আরো বলেছেন যে, দুর্নীতি ছাড়াও আরো যেসব কারণে বাংলাদেশে প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধি পেতে থাকে তার মধ্যে অন্যতম হলো টেন্ডার প্রতিযোগীতায় অপর্যাপ্ত টেন্ডার দাখিল এবং নি¤œ স্তরের চেয়ে উচ্চ স্তরে অবৈধ অর্থ উপার্জনের অশুভ প্রবণতা। তিনি আরো বলেছেন যে, সময় ক্ষেপণ, দুর্নীতি এবং অপর্যাপ্ত দরপত্র প্রতিযোগিতা নিরসনের কোনো দিক নির্দেশনা বর্তমান বাজেটে নেই।
বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রকল্পসমূহের নেতিবাচক দিক হলো এই যে, দীর্ঘসূত্রতা ও দুর্নীতি ছাড়াও দেখা গেছে যে, উন্নয়ন বাজেটে এ ধরনের প্রকল্পের জন্য যে অর্থ বরাদ্দ করা হয় সেই অর্থও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে খরচ করা যায় না। প্রতি বছরই দেখা যায় যে, বাংলাদেশের উন্নয়ন বাজেটের ৭০ শতাংশের ওপর খরচ হয় না। অর্থ বছরের অর্ধেক কেটে যায়। তবুও বরাদ্দকৃত অর্থের অর্ধেকও খরচ হয় না। এমন পরিস্থিতিতে সংসদ সদস্যরা তাড়া হুড়ো করে কিছু অর্থ খরচ করে। আর এই তাড়া হুড়ো করতে গিয়ে সুষ্ঠুভাবে যেমন সে অর্থ খরচ করা হয় না, অন্যদিকে তেমনি দেখা যায় যে, এই তাড়া হুড়োর ফলে ঐ খরচে অনেক দুর্নীতি ও অনিয়ম ঢুকে পড়ে। এভাবে তাড়া হুড়ো করে ২০ শতাংশ অর্থ খরচ করার পরেও ৭০ শতাংশের ওপর বরাদ্দ অর্থ খরচ হয় না। ৩০ শতাংশ অর্থ ফেরৎ যায়। এর ফলে অবকাঠামো খাত বিশেষ করে সড়ক অবকাঠামো এই ৪৬ বছরে যতখানি উন্নত এবং আধুনিক হওয়ার কথা ছিল, ততখানি উন্নত এবং আধুনিক হয়নি। চট্টগ্রাম ও ময়মনসিংহ এলাকায় ৪ লেনের প্রকল্প বাস্তবায়নে শম্বুক গতি তার একটি বড় নজির।
যাই হোক, সড়ক অবকাঠামো নির্মাণ বিশেষজ্ঞদের অনেকে মনে করেন যে, বিশ্ব ব্যাংকের এই অভিযোগ যদি গুরুত্বের সাথে নেয়া হয় এবং সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করা হয় তাহলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশে অবকাঠামো নির্মাণ ব্যায়ে হাজার হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হবে। বিশেষ করে তারা মনে করেন যে চীনের মতো যদি এসব মেগা প্রকল্পে ২ বা ৩ বছরের সময় সীমা বেঁধে দেয়া হয় এবং সেই সময় সীমা সরকার যদি কঠোরভাবে মেনে চলে তাহলে সব ধরনের অবকাঠামো নির্মাণে যুগান্তকারী ও বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ