ঢাকা, সোমবার 3 July 2017, ১৯ আষাঢ় ১৪২8, ৮ শাওয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

ট্যুর গাইডিং পেশায় মানি  রহমানের সফলতার গল্প

 

আব্দুর রাজ্জাক রানা : ‘পৃথিবীর বিভিন্ন ম্যাগাজিনে পড়েছি নতুন নতুন পর্যটন কেন্দ্রের তালিকায় বাংলাদেশের নাম আছে, তাও উপরের দিকেই। সেদিন হয়তো বেশী দূরে নয়, যেদিন বাংলাদেশে ১০/১৫ লাখ ট্যুরিষ্ট আসবে প্রতি বছর। কিন্তু তার আগে নিজেদেরকে প্রস্তত করাটা খুব জরুরি। পৃথিবীর অন্যতম আকাঙ্খিত পেশার তালিকাভুক্ত এই ট্যুর গাইডিং পেশাটি আমাদের দেশে এখনো অনেকটাই অপ্রচলিত। বিশ্বায়নের এই যুগে এই নতুন পেশাগুলোকে গ্রহণ করতে শিখতে হবে আমাদের’। ছোটবেলা থেকেই নতুন নতুন জিনিস বা জায়গার প্রতি বেশ আগ্রহ ছিল শেখ আহাদুর রহমান ওরফে মানি রহমানের। চলতি পথে মায়ের কাছে হরেক রকমের প্রশ্নও করতো তিনি। নিজে হেঁটে হেঁটে ঘুরে দেখতেন খুলনা শহর। একটু বড় হবার পর বন্ধুদের সাথে দলবেঁধে ঘুরে বেড়িয়েছেন। বড় ভাই নাকি বিদেশীদের নিয়ে সুন্দরবনসহ দেশের দর্শনীয় জায়গায় ঘুরে বেড়ান। তার মুখে এ সব শুনে মানি রহমানের বেশ ভাল লাগত। একদিন বড় ভাই নিজেই ট্যুরিজম ব্যবসা শুরু করেন। মূলত সেখান থেকেই পথচলা শুরু। খুলনা মহানগরীর মৌলভীপাড়াস্থ ৩৮ নম্বর সুলতান আহমেদ রোডের বাসিন্দা মানি রহমান এভাবেই বলছিলেন তার জীবনের কথা। মানি রহমান ইতোমধ্যে লাটভিয়ার বর্তমান ও সাবেক স্পীকারকে নিয়ে ঢাকা সিটি ট্যুর করার পাশাপাশি বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মত আসা ক্রুজ শীপ ট্যুরে গাইডিং করার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। এছাড়া দেশের স্বনামধন্য ব্যক্তিদের মধ্যে ড. জাফর ইকবাল, আসাদুজ্জামান নূর, ইউসুফ আবদুল্লাহ হারুনের মত মানুষদের সাথেও ভ্রমণের সুযোগ তার হয়েছে।

মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নেয়া এই মানি রহমান এক সময় কষ্ট করেই লেখাপড়া করেছেন। অদম্য ইচ্ছা ছিল পরিবারের টাকায় নয়, নিজের রোজগার করা অর্থেই পড়াশুনা করে বড় হবেন। এ জন্য অনেক অসহ্য যন্ত্রণাও সহ্য করতে হয়েছে তাকে। আর ট্যুরিজমের সাথে জড়িত হবেন বলে ফ্লোরিং করে লঞ্চে সুন্দরবনে যাওয়ার ঘটনাতো রয়েছেই। বিনা পয়সায় ট্যুরিজম কোম্পানিতে কাজ করার অভিজ্ঞতাও আছে তার। সেইসব কষ্টের দিনগুলি আজ ভুলিয়ে দেয় যখন তিনি রাজধানী ঢাকার গুলশানের মত জায়গায় বাসা ভাড়া করে থাকেন। বিদেশীদের আগমনকালে পাঁচ তারকা হোটেলে থাকারও সৌভাগ্য হয়েছে তার। আর আর্থিকভাবে নিজেকে স্বাবলম্বী করার বিষয়টিতো রয়েছেই।

ট্যুরিজম ব্যবসা নয়, তবে একজন সফল ‘ঁট্যুর গাইড’ হিসেবে নিজেকে সফল দাবি করে মানি রহমান বললেন, বাংলাদেশে রয়েছে পর্যটন শিল্প বিকাশের অপার সম্ভাবনা। এজন্য আগে তৈরি করতে হবে একঝাঁক প্রশিক্ষিত গাইড। কারণ একজন গাইডই পারেন বিদেশীদের কাছে বাংলাদেশকে তুলে ধরতে। আবার একজন গাইডের কারণেই বাংলাদেশের পরিচয় ভূলুন্ঠিত হতে পারে। উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, চলতি বছরের প্রথম দিকে ইউরোপের বিলাসবহুল ভ্রমণতরী সিলভার ডিসকভারযোগে ৯০ জন পর্যটকের মহেশখালী ভ্রমণের সময় তিনি তাদেরকে গাইড করার সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন। এটি তার জীবনের জন্য এক বড় অর্জন। ওই ৯০জন পর্যটকের কাছে তিনি বাংলাদেশকে যেভাবে উপস্থাপনের সুযোগ পেয়েছেন তারা দেশে ফিরে অবশ্যই বাংলাদেশের পরিচয় তুলে ধরবেন তাদের দেশের মানুষের কাছে। এরপর তারাও আগ্রহী হবে বাংলাদেশ ভ্রমণের।

ঈদ-উল-ফিতরের ছুটিতে খুলনায় আসা মানি রহমানের সাথে দেখা হওয়ার সাথে সাথেই জীবনের অনেক গল্প শোনালেন তিনি। বললেন, সরকারের ইচ্ছা থাকলে বাংলাদেশকে পর্যটন শিল্পে এগিয়ে নেয়া খুব বেশি সময়ের প্রয়োজন হয় না। তবে পর্যটন শিল্পের বিকাশে অনেকগুলো ক্ষেত্র তৈরি করা প্রয়োজন উল্লেখ করে তিনি বলেন, হোটেল, মোটেল ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের পাশাপাশি কিছু প্রশিক্ষিত গাইড তৈরি করা আবশ্যক।

কিভাবে জড়িত হলেন ট্যুর গাইডিং পেশায় জানতে চাইলে মানি রহমান বললেন, পড়াশুনা অবস্থায়ই তিনি বিভিন্ন ট্যুরিজম প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িয়ে পড়েন। ফ্রি সার্ভিসও দেন কোন কোন প্রতিষ্ঠানে। একদিন বড় ভাই শেখ হাবিবুর রহমান ট্যুরিজম ব্যবসা শুরু করলে সেখানেও তিনি কাজ করেন। দেশী-বিদেশী পর্যটকদের নিয়ে সুন্দরবনে যান। ছোটবেলা থেকেই তিনি ইংরেজীতে ভাল ছিলেন। তবে অংকের কারণে বেশ পিছিয়ে যেতে হয়েছে তাকে। গাইড পেশায় টিকে থাকতে হলে ইংরেজীকে আরও রপ্ত করতে হবে। তাই তিনি ইংরেজীটা আরও ভালভাবে শিখে নিলেন। কিছুদিন পরই দেশের শীর্ষস্থানীয় একটি কোম্পানিতে চাকরি পেয়ে যান। অনেক ভাল ভাল ট্যুর করতে থাকেন। নিজের কাজের ধরনও বদলাতে শুরু করেন।

কথা প্রসঙ্গে মানি রহমান বললেন, কাজের চাপ অনেক বেশী হওয়ায় তিনি ঠিকভাবে পড়াশোনা করতে পারছিলেন না। এক পর্যায়ে ওই কোম্পানি ছেড়ে দিয়ে পড়াশোনায় মনোনিবেশ করেন। কিন্তু ট্যুরিজমতো তার মাথার মধ্যে ঘুরে বেড়ায় সারাদিন। এবার খুলনার কিছু কোম্পানীর সাথে কাজ শুরু করলেন। সাথে নিজের ভাইয়েরটাও ছিল। টুকটাক কাজও পান। এভাবেই দিন চলতে থাকে।

২০১৩ সালের দিকে যখন দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা শুরু হলো তখন একে একে সব ট্যুর বাতিল হতে থাকে। যেহেতু ওই সময় তার ভ্রমনের  বেশিরভাগ ছিল খুলনা ও বাগেরহাটকেন্দ্রিক অর্থাৎ সুন্দরবন ভিত্তিক সেহেতু ঢাকা থেকে পর্যটকরা এ অঞ্চলে আসতে সাহস পাচ্ছিল না। ২/১ বছর শীতকালে এমন রাজনৈতিক অস্থিরতা চলতে থাকে। দেশের ট্যুরিজম ব্যবসা তখন থমথমে অবস্থায় ছিল। অনেকে পেশা পরিবর্তন করতে শুরু করে, বা নতুন কিছু করার চেষ্টায় নেমে পড়ে। তিনিও বিপদে পড়ে গিয়েছিলেন। কোথাও কাজ নেই, বিদেশী ট্যুরিস্টতো দূরের কথা, দেশী ট্যুরিস্টদের ট্যুরও হয় না। খুব চিন্তিত হয়ে পড়েন মানি রহমান। তবুও তিনি পেশা বদলাননি।

একদিন চলে গেলেন ঢাকায়। বেশ কিছুদিন কেটে গেলো। কোন ভাল খবর আসে না। ২/১টি কোম্পানীতে ইন্টারভিউ দেয়ার পর তারা নেয়ার আগ্রহও দেখায়। কিন্তু তাদের বেতন কম। টিকে থাকতে একদিন তিনি একটি রেষ্টুরেন্টে ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন করেন। সেখানে কর্মরত অবস্থায়ই জার্নিপ্লাস নামের একটি ট্যুরিষ্ট কোম্পানিতে ডাক আসে। ইন্টারভিউ দেন। চাকরিও হয়। এখন তিনি ওই কোম্পানির সিনিয়র ট্যুর এক্সিকিউটিভ।

জার্নিপ্লাসে কাজ করার মধ্যদিয়ে মানি রহমান অনেক স্বপ্ন দেখতে থাকেন। কিন্তু সে স্বপ্ন ম্লান হয়ে যায় একটি ঘটনার মধ্যদিয়ে। গত বছর(২০১৬) পয়লা জুলাই গুলশানে হলি আর্টিজান হামলার পর বাংলাদেশের ট্যুরিজম ব্যবসায় ধস নেমে আসে। অনেকদিন কাজ ছিল না। আবারো পেশা পরিবর্তনের পালা শুর হলো। অনেকে পেশা বদলালেও তিনি টিকে ছিলেন, এখনও আছেন। বছর খানেকের মধ্যেই সবকিছু ঠিকঠাক হতে শুরু করলো।

ট্যুর গাইডিং পেশা সম্পর্কে কথা হয় বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের মহাব্যবস্থাপক(ডিএফও) মো. মহসীন’র সাথে। তিনি বলেন, ট্যুর গাইডিং-এর জন্য জাতীয় হোটেল ও পর্যটন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট-এনএসটিটিআই’র মাধ্যমে একটি কোর্স করানো হয়। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে এ পেশায় কেউ থাকতে আগ্রহী হয় না। এনএসটিটিআই থেকে পড়াশুনা করে অনেকেই ট্রাভেল এজেন্সিতে চলে যায়। তবে কেউ যদি ট্যুর গাইডিং পেশায় টিকে থাকতে পারে তার ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ