ঢাকা, সোমবার 3 July 2017, ১৯ আষাঢ় ১৪২8, ৮ শাওয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

চারঘাট থেকে হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী খয়ের শিল্প

চারঘাট (রাজশাহী) : খয়ের তৈরি করছেন চারঘাটের এক গৃহবধূ -সংগ্রাম

মো. শহীদুল ইসলাম, চারঘাট (রাজশাহী) : খয়ের শিল্পের জন্য রাজশাহীর চারঘাট সারাদেশে পরিচিতি লাভ করেও সেই ঐতিহ্যবাহী খয়ের শিল্প বর্তমানে বিলুপ্তির পথে। ১৯৫২ সালে মুন্সী নুরুল হকের উদ্যোগে চারঘাটে খয়ের শিল্পের যাত্রা শুরু হয়। পঞ্চাশের দশকে ভারত থেকে আগত বিহারীদের মাধ্যমে এই শিল্পের উন্নয়ন ও প্রসার ঘটে। সে সময় স্থানীয় ব্যক্তিরা ব্যাপকভাবে এই শিল্পের সাথে জড়িয়ে পড়েন।
খয়ের প্রধানত খাদ্য হিসেবে পানের সাথে ব্যবহৃত হলেও রঙ, ওষুধ, কেমিক্যাল প্রভৃতি তৈরিতেও ব্যবহৃত হয়। খয়েরের বৈজ্ঞানিক নাম ‘একাচিয়া ক্যাটেচু’। খয়ের শিল্পের কাঁচামাল খয়ের গাছ। রাজশাহীর চারঘাট ছাড়াও দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট, কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারী, ঈশ্বরদী, পাবনা, নাটোর ও কুষ্টিয়া অঞ্চলে খয়ের গাছ উৎপন্ন হয়। উৎপাদন প্রক্রিয়ার দিক থেকে খয়ের দুই প্রকার। লালি খয়ের ও গুটি খয়ের। খয়ের গাছের বাকল তুলে সার অংশটুকু কুচি করে কেটে পানিতে দুই ঘণ্টা ফোটালে কাঠ থেকে যে নির্যাস বের হয় তা জাল করলে খয়ের উৎপন্ন হয়। এভাবে উৎপন্ন খয়েরকে লালি খয়ের বলে। লালি খয়ের স্থানীয় বাজারে মনপ্রতি ১৪/১৫ হাজার টাকা দরে বেচাকেনা হতো। চারঘাট ছাড়াও উৎপাদিত লালি খয়ের রংপুর, দিনাজপুর, সৈয়দপুর, জামালপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, গাইবান্ধাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে বিক্রি হতো। লালি খয়ের বিশেষভাবে প্রক্রিয়াজাত করে চাপ মেশিনের মাধ্যমে রস বের করা হয়। তারপর প্রাকৃতিক পরিবেশে ২/৩ মাস শুকিয়ে সাইজ করে কেটে বিক্রির জন্য প্রস্তুত করা হয়। এই খয়েরই গুটি খয়ের বা জনকপুরী খয়ের নামে পরিচিত। ঢাকার মৌলভীবাজার ও চকবাজারের মহাজনরা চারঘাট থেকে ৩৫/৩৬ হাজার টাকা মণ দরে গুটি খয়ের ক্রয় করে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করত। বিগত শতাব্দীর ষাট, সত্তর ও আশির দশক ছিল খয়ের শিল্পের সুবর্ণ সময়। সেই সময় চারঘাটের প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ খয়ের শিল্পের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করতো। কিন্তু নব্বই-এর দশকের প্রথম দিক থেকে নানা কারণে এই শিল্পে ধস নামতে শুরু হয়। খয়ের শিল্পকে টিকিয়ে রাখার জন্য ব্যবসায়ীরা ঐক্যবদ্ধ হন এবং ১৯৯৫ সালে ‘চারঘাট বাজার খয়ের ব্যবসায়ী বহুমুখী সমবায় সমিতি’ গঠন করেন। পরে চারঘাট পৌরসভা খয়ের ব্যবসায়ী সমিতি নামে আরেকটি সমিতি গঠিত হয়। তারপরেও খয়ের ব্যবসায় টিকে থাকা অনেকের পক্ষেই সম্ভব হয়নি। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা খয়ের শিল্পের কয়েকটি সুনির্দিষ্ট সমস্যার কথা উল্লেখ করেছেন। তা হলো-প্রাচীন উৎপাদন পদ্ধতি, আমদানিকৃত বিদেশি খয়েরের সাথে অসম প্রতিযোগিতা, কাঁচামালের অভাব, ইজারাদার ও মধ্যস্বত্বভোগী দালালদেও দৌরাত্ম্য, নির্দিষ্ট সময়ে বিক্রি বা বাজারজাতকরণের অসুবিধা, বিক্রিত পণ্যের মূল্য পেতে দীর্ঘসূত্রতা ও হয়রানি এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাব। এক সময়ের বিষিষ্ট খয়ের ব্যবসায়ী ইব্রাহিম খলিল বলেন, সরকারি উদ্যোগে খয়ের গাছের উৎপাদন বৃদ্ধি করা, উৎপাদন পদ্ধতির আধুনিকীকরণ, শিল্পের সাথে জড়িত মালিক ও শ্রমিকদের কারিগরি জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা, মধ্যস্বত্বভোগী দালালদের উচ্ছেদ করা, অভ্যন্তরীণ বাজার সৃষ্টি ও বিদেশে রফতানির ব্যবস্থা করা এবং বিদেশি খয়ের আমদানির উপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হলে চারঘাটের ঐতিহ্যবাহী খয়ের শিল্পের সুদিন আবারও ফিরে আনা যাবে এবং জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ