ঢাকা, মঙ্গলবার 4 July 2017, ২০ আষাঢ় ১৪২8, ৯ শাওয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

উত্তরায় আগুনে পুড়লো তিন ভবন ॥ ২ লাশ উদ্ধার

গতকাল সোমবার ভোরে উত্তরা ৫নং সেক্টরের হোটেল সি সেলসহ ৩টি ভবনে অগ্নিকাণ্ড -সংগ্রাম

# নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় অগ্নি নির্বাপক স্থাপনের আহ্বান মেয়র আনিসুল হকের

স্টাফ রিপোর্টার : রাজধানী ঢাকার উত্তরায় পাশাপাশি তিনটি ভবন ভয়াবহ আগুনে পুড়ে গেছে; এর মধ্যে একটি আবাসিক হোটেল থেকে দুই জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। আগুন লাগা একটি ভবনের চারতলায় হোটেল সি সেলের ৩০২ নম্বর কক্ষ থেকে ওই দুজনের অগ্নিদগ্ধ লাশ উদ্ধার করেছে ফায়ার সার্ভিস। তাদের মধ্যে একজন নারী ও একজন পুরুষ। তাদের এক জনের পরিচয় জানা যায়নি। দুজনের লাশ ঢাকা মেডিকেল কলেজের মর্গে পাঠানো হয়েছে। ফায়ার সার্ভিস বলছে, সি শেল হোটেলের অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা দুর্বল ছিল। দুই মাস আগে তাদের নোটিশও দেওয়া হয়।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) মেজর এ কে এম শাকিল নেওয়াজ জানান, গতকাল সোমবার ভোর ৫টার দিকে উত্তরার রাজলক্ষ্মী ভবনের বিপরীত দিকে রাস্তার পূর্বপাশে ৪ নম্বর সেক্টরে চারতলা সি-শেল রেস্তোরাঁর তিনতলায় প্রথম আগুন লাগে। পরে তা পাশের ছয়তলা সি-শেল আবাসিক হোটেল ও তার পাশের এ কে টাওয়ারে ছড়িয়ে পড়ে।

ফায়ার সার্ভিসের ১৬টি ইউনিট সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা চেষ্টার পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয় বলে নিয়ন্ত্রণ কক্ষের কর্মকর্তা মাহামুদুল হক জানান।

উত্তরা পূর্ব থানার ওসি নূরে আলম সিদ্দিক জানান, আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পর সি-শেল আবাসিক হোটেলে তল্লাশি চালিয়ে চতুর্থ তলার ৩০২ নম্বর কক্ষ থেকে দুইজনের লাশ উদ্ধার করেন ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা।

ওই থানার এসআই সুমন শিকদার জানান, নিহতদের মধ্যে একজনের সঙ্গে থাকা মোবাইল ফোনের মাধ্যমে তার পরিচয় তারা জানতে পেরেছেন। মো. রাসেল মিয়া নামের ৩৫ বছর বয়সী ওই ব্যক্তি ঢাকায় প্রাণ আরএফএল গ্রুপে কাজ করতেন। তিনি চাঁদপুরের হাইমচরের নূর মোহাম্মদের ছেলে; ঢাকায় থাকতেন পল্লবীর এক বাসায়। তার সঙ্গে একই কক্ষ থেকে আনুমানিক ২৫ থেকে ৩০ বছর বয়সী এক নারীর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। তবে তার পরিচয় পুলিশ জানতে পারেনি।

ভেতরে আরও কেউ আছে কিনা জানতে চাইলে ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তা শাকিল নেওয়াজ বলেন, “হোটেলের মালিক দাবি করেছিল, ভেতরে কেউ আটকা নাই। তারপরও দুইজনকে পাওয়া গেছে। হতাহত অন্য কাউকে আমরা দেখিনি।” ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা আসার পর সি শেল রেস্তোরাঁতেও কোনো কর্মচারীকে দেখা যায়নি বলে জানান তিনি। “কর্মচারীরা আগুন নেভানোর চেষ্টা করেনি। পুলিশের কাছে খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসকর্মীরা আসে। তার আগেই তারা সবাই পালিয়ে যায়।”

খোঁজ খবর নিয়ে দেখা গেছে , ক্ষতিগ্রস্ত তিন ভবনের মধ্যে মাঝখানের চার তলা ভবনের পুরোটা জুড়ে ছিল সি-শেল রেস্তোরাঁ। ওই ভবনের পুরোটাই পুড়ে গেছে। তার উত্তরের ছয় তলা ভবনটির চতুর্থ তলা থেকে ষষ্ঠ তলা পর্যন্ত ছিল সি-শেল হোটেল অ্যান্ড রেসিডেন্স। আর তৃতীয় তলায় ছিল পার্টি সেন্টার। ভবনটি নিচতলায় রয়েছে একুশে সুইটস অ্যান্ড বেকারি এবং রহিম আফরোজের একটি আউটলেট আর দোতলায় আইসিবি ইসলামিক ব্যাংকের কার্যালয়।

শাকিল নেওয়াজ জানান, আগুনে সি-শেল হোটেল ও পার্টি সেন্টার বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দক্ষিণ দিকের এ কে টাওয়ারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শীতাতপ নিয়ন্ত্রণযন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

সি-শেল রেস্তোরাঁর মালিক আমানউল্লাহ আমান নামের এক ব্যবসায়ী। তিনি পাশের ভবনের একটি অংশ ভাড়া নিয়ে আবাসিক হোটেল চালাচ্ছিলেন। ছয় তলা ওই ভবনের মালিক উত্তরখান থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবু হানিফ। আবু হানিফের স্ত্রী ইসমে আরা হানিফ বলেন, “আমাদের চার তলা থেকে ছয় তলা ভাড়া দিয়েছি আমানুল্লাহ আমানের কাছে। তিনিই হোটেল চালাচ্ছিলেন। আমাদের ভবনে অগ্নি নির্বাপনের সব ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু ভবনে আমাদের কোনো কর্মচারী ছিল না।”

উত্তরা পূর্ব থানার এসআই সুমন শিকদার জানান, রাতে তার ওই এলাকায় ডিউটি ছিল। আগুন লাগার খবর জানতে পেরে তিনি ঘটনাস্থলে যান এবং ফায়ার সার্ভিস, তিতাস গ্যাসসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে খবর দেন।

এ কে টাওয়ারের ব্যবস্থাপক আলাউদ্দিন বলেন, খবর পাওয়ার পরে তিনি এসে ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের আগুন নেভাতে দেখেন। কীভাবে আগুন লেগেছে সে বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না। ফায়ার সার্ভিস কর্মীরাও তাৎক্ষণিকভাবে অগ্নিকান্ডের কারণ বা ক্ষয়ক্ষতির আর্থিক পরিমাণ জানাতে পারেননি।

উত্তরা ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের দায়িত্বরত কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম জানান, সি শেল হোটেলের অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা দুর্বল ছিল। ফায়ার সার্ভিস দুই মাস আগে হোটেল কর্তৃপক্ষকে নোটিশ দেয়। তিনি বলেন, ‘আমরা বলেছি অগ্নিনির্বাপণের নিজস্ব ব্যবস্থা রাখতে। হোটেল কর্তৃপক্ষ তা করেনি। নোটিশের জবাবও দেয়নি।’

সি শেল হোটেলের পাশের বাসিন্দা মো. তসিকুল বলেন, প্রধান সড়কের পাশে এই হোটেল। সিটি করপোরেশন সব ভবনে নিজস্ব গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা রাখার কথা বলে। কিন্তু সি শেল হোটেল ও আশপাশের ভবনের কর্তৃপক্ষ তা মানেনি।

ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা গেছে, সি শেল আবাসিক হোটেলের নিচে পার্কিংয়ের কোনো ব্যবস্থা নেই।

ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম আরও জানান, একটি ভবনের সঙ্গে দুই থেকে তিনটি ভবন সংযুক্ত। এ কারণে আগুন পাশের ভবনেও ছড়িয়ে পড়ে। ভোর পাঁচটার দিকে তারা আগুন লাগার খবর পান। পরে ১৪টি ইউনিট ঘটনাস্থলে যায়।

হোটেলের ব্যবস্থাপক মো. সোহেল বলেন, ফায়ার সার্ভিসের নোটিশ আমরা পাইনি। তবে আমরা প্রতিটি কক্ষে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা রেখেছিলাম। তিনি অভিযোগ করেন, ফায়ার সার্ভিস দেরিতে এসেছে। এ কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়েছে। যে কয়টা ইউনিট এসেছিল তাতে পানি কম ছিল বলেও তিনি জানান।

গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা রেখেছেন কি না জানতে চাইলে মো. সোহেল বলেন, আবাসিক হোটেলের নিচে অল্প জায়গা আছে। সিটি করপোরেশনের নিয়ম অনুযায়ী পার্কিংয়ের জায়গা রাখা হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। ভবনটি রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) অনুমোদিত বলেও দাবি করেন সোহেল।

নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় অগ্নি নির্বাপক স্থাপনের আহ্বান আনিসুল হকের

ঢাকার বাণিজ্যিক ভবনসহ সব ধরনের ভবনে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় অগ্নি নির্বাপক ব্যবস্থা স্থাপনের আহ্বান জানিয়েছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র আনিসুল হক। গতকাল সোমবার দুপুরে অগ্নিকান্ডে ক্ষতিগ্রস্ত উত্তরা-৪ নম্বর সেক্টরের সী-শেল চাইনিজ রেস্তোরাঁ পরিদর্শনকালে মেয়র এ আহ্বান জানান। 

পরির্দশনকালে মেয়র উপস্থিত ফায়ার ব্রিগেড, র‌্যাব কর্মকর্তা ও স্থানীয় জনসাধারণের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি অগ্নিকান্ডে হতাহতদের পরিবারসহ ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতি সমবেদনা জানান। এসময় তিনি অগ্নিকান্ড থেকে রক্ষা পেতে সব ভবনে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় অগ্নি নির্বাপক ব্যবস্থা স্থাপনের আহ্বান জানান।

পরিদর্শনকালে ডিএনসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মেসবাহুল ইসলাম, অঞ্চল-১ এর নির্বাহী কর্মকর্তা হেমায়েত হোসেন, স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. আফছার উদ্দিন খান, সংরক্ষিত আসনের কাউন্সিলর শাহনাজ পারভিনসহ ডিএনসিসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ