ঢাকা, বুধবার 5 July 2017, ২১ আষাঢ় ১৪২8, ১০ শাওয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

গার্মেন্টস খাতের দুঃসময় কাটছে না ॥ রফতানি আয় কমছে

কামাল উদ্দিন সুমন : আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমার সাথে সাথে প্রতিযোগী দেশগুলোও তাদের দেশে তা সমন্বয় করেছে। কিন্তু বাংলাদেশে তা সমন্বয় করা হয়নি। বিপরীতে গত দুই বছরে গার্মেন্টস শ্রমিকের মজুরি, জ্বালানি ও পরিবহন ভাড়াসহ তৈরি পোশাক খাতের ব্যয় বেড়েছে ১৮ শতাংশ। এছাড়া গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলার পর এখনও এর নেতিবাচক প্রভাব থেকে রেহাই পাচ্ছে না গার্মেন্টস খাতের শিল্প উদ্যোক্তারা। এখনও অনেক দেশের ক্রেতা তৈরি পোশাকের অর্ডার দিতে বাংলাদেশে আসতে ভয় পাচ্ছেন। আর এসব কারণে গার্মেন্টস খাতের দু:সময় কাটছেনা। পরিস্থিতির কোন উন্নতি দেখছেনা ব্যবসায়িরা। বরং আন্তজার্তিক বাজারে দেশের রফতানি আয়ে তৈরি পোশাক খাতের অবদান কমে যাচ্ছে। 

সূত্র জানায়, গুলশান হামলার ঘটনার পর পরই বাংলাদেশে বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে ঋণমানের ঝুঁকি নির্ধারণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলার পূর্বাভাস দিয়েছিল আন্তর্জাতিক ঋণমান নির্ধারণকারী প্রতিষ্ঠান মুড’স। ওই সময় সংস্থাটির বক্তব্য ছিল, ‘গুলশানের ঘটনা বাংলাদেশে বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে সরাসরি প্রভাব ফেলবে। আর সেটি হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে তৈরি পোশাক রফতানি খাত। তৈরি পোশাক বাংলাদেশের রফতানি আয়ের প্রধান চালক। বাংলাদেশের জিডিপিতে রফতানি খাতের অবদান ১৬ শতাংশেরও বেশি। এটি ধরে রাখতে হলে বস্ত্রখাতে বৈদেশিক বিনিয়োগ টিকিয়ে রাখতে হবে। কারণ, বাংলাদেশের রফতানি আয়ের ৮০ শতাংশই বস্ত্র খাতনির্ভর।

আর মুড়’স এর বক্তব্যের মিল খুজে পাওয়া যায় বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানে। তৈরি পোশাক নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের বড় বাজার ইউরোপীয় ৯টি দেশ। এর মধ্যে পাঁচটি দেশই বাংলাদেশের তৈরি পোশাক আমদানি কমিয়ে দিয়েছে। অর্থাৎ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় বিদায়ী অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে ৯ দেশের মধ্যে পাঁচ দেশেই সর্বনিম্ম ১ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ২৭ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, স্পেন, বেলজিয়াম ও কানাডা রয়েছে। সবচেয়ে বেশি কমেছে বেলজিয়ামে। দেশটি আগের গত অর্থবছরের (২০১৫-১৬) তৃতীয় প্রান্তিকে বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক আমদানি করেছিল ২২ কোটি ৬৫ লাখ ডলারের। বিদায়ী অর্থবছরের (২০১৬-১৭) একই সময়ে তা কমে নেমেছে ১৬ কোটি ৬৮ লাখ ডলারে। এক বছরের ব্যবধানে তিন মাসে দেশটির আমদানি কমেছে প্রায় ২৭ শতাংশ। 

তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, রফতানিকারকদের যে প্রাইস সক্ষমতা কমে গেছে তার অন্যতম প্রমাণ হলো এ রফতানি প্রবৃদ্ধি। তারা আশঙ্কা করছেন, পরিস্থিতি উন্নত করার বাস্তব পদক্ষেপ না নিলে এ খাতে আরো ভয়াবহ অবস্থা দাঁড়াবে, ফলে দেশের বেকারত্বের হার আরো বেড়ে যাবে বলে তারা আশঙ্কা করছেন।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের সবচেয়ে বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্রে এক বছরে তৈরি পোশাক রফতানি সাড়ে চার শতাংশ কমে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, গত বছরের প্রথম তিন মাসে (জানুয়ারি-মার্চ) যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি হয়েছিল ১৩৩ কোটি ৮০ লাখ ডলারের পণ্য। চলতি বছরের একই সময়ে তা না বেড়ে বরং কমে নেমেছে ১২৮ কোটি ডলারে।

সূত্র জানায়, গত বছরের প্রথম তিন মাসে ৮৮৭ কোটি ১৩ লাখ ডলারের পণ্য রফতানি হয়েছিল। এর মধ্যে তৈরি পোশাক খাতেরই ছিল ৭৫০ কোটি ৪৪ লাখ ডলারের। যা মোট রফতানি আয়ের প্রায় ৮৫ শতাংশ। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে বিদেশে রফতানি হয়েছিল ৯১৪ কোটি ৭৯ লাখ ডলারের পণ্য। এর মধ্যে তৈরি পোশাক রফতানি হয়েছে ৭২১ কোটি ৯১ লাখ ডলারের। যা মোট রফতানি আয়ের ৭৮ দশমিক ৯২ শতাংশ। 

রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালের জুলাই থেকে ২০১৭ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ১০ মাসে তৈরি পোশাক খাত থেকে দুই হাজার ৪৬৩ কোটি ডলার আয় করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু লক্ষ্যের তুলনায় ৯ দশমিক ৫৮ শতাংশ আয় কম হয়েছে ওভেন গার্মেন্টে। আর নিটওয়্যার খাত লক্ষ্যমাত্রা থেকে ২ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ দূরে রয়েছে। 

এদিকে গার্মেন্টস খাতে রফতানী কমে যাওয়ার অন্যান্য কারণের মধ্যে একটি হলো গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলার ঘটনা। এখনও এর নেতিবাচক প্রভাব থেকে রেহাই পাচ্ছে না গার্মেন্টস খাতের শিল্প উদ্যোক্তারা। এখনও অনেক দেশের ক্রেতা তৈরি পোশাকের অর্ডার দিতে বাংলাদেশে আসতে ভয় পাচ্ছেন।

জানা গেছে, বাংলাদেশে বিদেশী ক্রেতা ও পর্যটকরা আসা কমিয়ে দেওয়া শুরু করে মূলত ইতালি নাগরিক তাভেল্লা সিজার হত্যার পর থেকেই। এরপর আরও কয়েকজন বিদেশীর ওপর জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটে? বিশেষ করে গুলশানে হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গিরা ১৭ বিদেশীকে হত্যার পর থেকে বাংলাদেশে সফরে আসার ব্যাপারে অত্যন্ত সতর্ক হয়ে পড়ে বিদেশীরা।

নিটওয়্যার রফতানি কারক ও প্রস্তুতকারকদের সংগঠন বিকেএমইএ'র সাবেক সভাপতি ফজলুল হক জানান, হলি আর্টিজানে হামলার এক বছর পরও বিদেশী ক্রেতাদের অনেকে বাংলাদেশে আসতে চাইছেন না। এখনও অনেকে ক্রেতা ভয় পাচ্ছেন। তিনি বলেন, আমার একজন জার্মানির বায়ার (ক্রেতা) এই মাসে আসার কথা ছিল। কিন্তু তিনি এখনও ঢাকায় আসতে সাহস পাচ্ছেন না। তিনি বলেন, হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার পর খুবই খারাপ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল। তবে ঘটনার পর সরকারের যথাযথ উদ্যোগের ফলে পরিস্থিতি সামাল দেয়া সম্ভব হয়েছে। সরকার ও ব্যবসায়ীদের চেষ্টার ফলে পরিস্থিতির উন্নতি হলেও ক্রেতাদের মধ্যে ভয় কাটেনি।

বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি ও বাংলাদেশ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিইএ) সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী জানিয়েছেন, নানা কারণে তৈরি পোশাক খাতে রফতানি কমে যাচ্ছে। তিনি জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম কমে যাচ্ছে। অব্যাহতভাবে কমে যাচ্ছে পণ্যের দরপত্র। অন্য দিকে, আন্তর্জাতিক নানা নীতির সাথে রফতানি আয় ঠিক রাখতে প্রতিযোগী দেশগুলো তাদের অভ্যন্তরে সমন্বয় করছে। যেমন আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমার সাথে সাথে প্রতিযোগী দেশগুলোও তাদের দেশে তা সমন্বয় করেছে। কিন্তু আমাদের দেশে তা সমন্বয় করা হয়নি। বিপরীতে গত দুই বছরে শ্রমিকের মজুরি, জ্বালানি ও পরিবহন ভাড়াসহ তৈরি পোশাক খাতের ব্যয় বেড়েছে ১৮ শতাংশ। অন্য দিকে বাধ্যতামূলকভাবে রাজধানী থেকে কারখানা সরিয়ে ফেলতে হচ্ছে। ফলে দেশের তৈরি পোশাক খাতের রফতানিকারকদের প্রাইস সক্ষমতা কমে গেছে। এরই প্রতিফলন ঘটেছে সামগ্রিক রফতানিতে। 

তিনি জানান, প্রাইস সক্ষমতা বাড়াতে হলে রফতানিমুখী শিল্পে কোনোভাবেই করের বোঝা বাড়ানো যাবে না। নীতি সহায়তা বাড়াতে হবে। দিতে হবে বিশেষ প্রণোদনা। যেসব তৈরি পোশাক কারখানা ঢাকার বাইরে নিতে হচ্ছে ওই সব উদ্যোক্তাদের কারখানায় নিরবচ্ছিন্নভাবে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ দিতে হবে। নতুন উদ্যোক্তাদেরও একই সুবিধা দিতে হবে। আর তবেই গত দশ বছর ধরে তৈরি পোশাক খাতের যে প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা ছিল তা বজায় রাখা সম্ভব হবে। অন্যথায় দেশে বেকারত্বের হার আরো বেড়ে যাবে বলে তিনি আশঙ্কা করেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘গুলশান হামলা হওয়ার পর থেকেই মানুষের মধ্যে ভীতি কাজ করছে। এখন দেশের ভেতরে হয়তো সেই ভয়টা নেই। তবে দেশের বাইরে এই ভীতিটা এখনও আছেই। কিন্তু, এই ধরনের ভীতি অর্থনীতির জন্য খুবই ক্ষতিকর।’ তিনি বলেন, ভীতি নিয়ে বিদেশীরা এই দেশে বিনিয়োগ করতে চাইবেন না। নিরাপত্তার ঝুঁকি নিয়ে কেবল বিদেশীরাই নয়, দেশি উদ্যোক্তারাও বিনিয়োগ করতে চাইবেন না। হয়ত এ কারণেই দেশে বিনিয়োগ বাড়ানো যাচ্ছে না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ