ঢাকা, বুধবার 5 July 2017, ২১ আষাঢ় ১৪২8, ১০ শাওয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

ঢাকার ঘরে ঘরে চিকুনগুনিয়ার মোটা কষ্ট ॥ কর্ম ক্ষমতা হারাচ্ছে অনেকেই

তোফাজ্জল হোসেন কামাল : গণমাধ্যমকর্মী সাদেকুর রহমান ও মো: শহিদুল ইসলাম একই জাতীয় দৈনিকের প্রাণবন্ত দু‘কর্মী। তাদের উপস্থিতিতে ওই দৈনিকের অন্যান্য সহকর্মীরাও প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে পান। কিন্তু গেল ঈদুল ফিতরের আগের ও পরের কয়েকটা দিন তাদের অনুপস্থিতিতে ওই দৈনিকটির বার্তা বিভাগের কর্মচাঞ্চল্যে ভাটা পড়ে যায়। খোঁজ খবর নিয়ে জানা যায়, তারা দু‘জনই বর্ষার মশাবাহিত রোগ ‘চিকুনগুনিয়ায়’ আক্রান্ত হয়ে একজন হাসপাতালে, অন্যজন বাসায় কাতরাচ্ছেন। ৫ থেকে ৬ দিনের ধকল কাটিয়ে ওঠে ওই দু‘গণমাধ্যমকর্মীর অফিস ফেরা যখন, তখন দেখা গেল তারা আর আগের মতন নেই। উধাও হয়ে গেছে প্রাণচাঞ্চল্যভাব, মুখে লেগে আছে সুঠাম দেহের ওপর বয়ে যাওয়া চিকুনগুনিয়ার ছাপ। অফিসে এসেও তারা উঠতে বসতে যেন ‘ট্রমাটাইজড’। মুখের কোনে এক ফালি সহজসুলভ হাসি রেখে বললেন, ভাইরে সর্বাঙ্গে ব্যাথা। দেখা গেল তাদের কর্মক্ষমতাতেও ভাটার টান পড়েছে। আরও জানা গেল, গেল ঈদটা তাদের নিরানন্দেই বিছানায় কেটেছে। এই দু‘সহকর্মীর মত শত শত চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার যে খবর নিয়ত পাওয়া যাচ্ছে, তাদের সকলের কাছেই ওই রোগের বর্ণনা একই ধরনের।

এ তো গেল একটি প্রতিষ্ঠানের দু‘সহকর্মীর চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার খবর। এর আগে ও পরে একই প্রতিষ্ঠানের একাধিক ব্যক্তি ওই রোগে আক্রান্ত হয়ে বিছানায় ছিলেন। যারপর নাই কষ্ট ভোগ করেছেন। তাদের কষ্টটা ভাগ করতে গিয়ে বোঝা গেল ‘ চিকুনগুনিয়ার মোটা কষ্টের কথা’।

এ অবস্থা এখন রাজধানী ঢাকার ঘরে ঘরে। কবে নাগাদ এই রোগ প্রতিরোধের সুখবর পাওয়া যাবে, তার কোন সুদত্তুর নেই। তবে আতংকের কারণ, ‘বর্ষা পর্যন্ত থাকছে চিকুনগুনিয়া’। ঢাকা দক্ষিণের মেয়র সাঈদ খোকন সোমবার এক বৈঠকে চার থেকে ছয় সপ্তাহে চিকুনগুনিয়া নিয়ন্ত্রণে আসবে বলে আশা প্রকাশ করলেও বৃষ্টি বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত চিকনগুনিয়ামুক্ত হওয়া নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ।

চিকুনগুনিয়ার প্রাদুর্ভাব নিম্নগামী নাকি ঊর্ধ্বগামী সে বিষয়ে তথ্য নেই জানিয়ে তিনি বলেন, “চিকুনগুনিয়া বেড়েছে না কমেছে এটা সম্পর্কে এ মুহূর্তে কিছু বলতে পারব না। গতকালও বৃষ্টি হয়েছে, বৃষ্টি যেহেতু শুরু হয়েছে, তাই আমরা এডিস মশা মুক্ত হব বা চিকুনগুনিয়া মুক্ত হব এমন পরিস্থিতি হয়ত হবে না। তবে এ বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত যতক্ষণ বৃষ্টি বন্ধ না হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত আমাদের এ সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে।”

এডিস প্রজাতির এডিস ইজিপ্টি এবং এডিস এলবোপিকটাস মশা থেকেই চিকুনগুনিয়া রোগের সংক্রমণ ঘটে। চিকুনগুনিয়া ভাইরাসটি টোগা ভাইরাস গোত্রের ভাইরাস। মশাবাহিত হওয়ার কারণে একে আরবো ভাইরাসও বলে। ডেঙ্গু ও জিকা ভাইরাসও এই মশার মাধ্যমে ছড়ায় এবং রোগের লক্ষণ প্রায় একই রকম বলে চিকিৎসকরা জানান।

চিকুনগুনিয়া প্রথম ধরা পড়ে ১৯৫২ সালে আফ্রিকায়, পরে বিশ্বের অন্য দেশেও তার বিস্তার ঘটে। বাংলাদেশে প্রথম ২০০৮ সালে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে এ ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। ২০১১ সালে ঢাকার দোহার উপজেলায় এই রোগ দেখা গেলেও পরে বিচ্ছিন্ন দু-একটি রোগী ছাড়া এ রোগের বিস্তার আর বাংলাদেশে লক্ষ্য করা যায়নি বলে আইডিসিআর জানায়।

জানা গেছে, বর্ষার পর পর যখন মশার উপদ্রব বাড়ে, তখন চিকুনগুনিয়ার ঝুঁকিও বাড়ে। এবার মৌসুমের শুরুতে অতিবর্ষণের মধ্যে চিকুনগুনিয়ার প্রকোপও লক্ষ্য করছেন বলে জানান আইইডিসিআরের জ্যেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. এ এস এম আলমগীর। তবে কী পরিমাণ রোগী আক্রান্ত হয়েছে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য তিনি দিতে পারেননি। একটি পরিবারের একজন আক্রান্ত হলে অন্যদেরও আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, “মশা খুব দ্রুতই একজন থেকে অন্যজনের দেহে এই রোগ নিয়ে যায়। তাই মশারি ব্যবহার করতে হবে, এমনকি দিনের বেলায়ও।” আইইডিসিআর বলছে, এ ধরনের মশা সাধারণত ভোর বেলা অথবা সন্ধ্যার সময় কামড়ায়।

চিকুনগুনিয়ার লক্ষণ অনেকটা ডেঙ্গুর মতোই। প্রথমে জ্বর আসে, এরপর হয় গায়ে ব্যথা। “তবে চিকুনগুনিয়ায় ভীষণ ব্যথা হয়, অনেক সময় নড়াচড়াই করা যায় না। ব্যথা হয় সব অস্থিসন্ধিতে,” বলেন ডা. আলমগীর। গিটে গিটে ব্যথার পাশাপাশি মাথা কিংবা মাংসপেশিতে ব্যথা, শরীরে ঠান্ডা অনুভূতি, চামড়ায় লালচে দানা, বমি বমি ভাবও চিকনগুনিয়ার লক্ষণ।

চিকুনগুনিয়া পরীক্ষার জন্য অপেক্ষা না করে জ্বর হলে প্যারাসিটামল সেবনের পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকরা। এ রোগ প্রতিরোধের কোনো টিকা নাই। সাধারণত রোগটি এমনি এমনিই সেরে যায়, তবে কখনও কখনও গিটের ব্যথা দীর্ঘদিন থাকতে পারে। আক্রান্ত ব্যক্তিকে বিশ্রাম নেওয়ার পাশাপাশি প্রচুর পানি ও তরল জাতীয় খাবার খেতে পরামর্শ দিয়েছে আইইডিসিআর। গিটের ব্যথার জন্য ঠান্ডা পানির সেক এবং হালকা ব্যয়ামও করা যেতে পারে।প্রাথমিক উপসর্গ ভালো হওয়ার পর যদি গিটের ব্যথা ভালো না হয় তবে চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

চিকুনগুনিয়ার ক্ষেত্রে প্রতিরোধকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে আইইডিসিআর। এক্ষেত্রে মশার কামড় থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায় গ্রহণের পাশাপাশি এই পতঙ্গের আবাসস্থল ধ্বংস করতে বলা হয়েছে। বাসার আশেপাশে ফেলানো মাটির পাত্র, কলসী, বালতি, ড্রাম, ডাবের খোলা ইত্যাদি যে সব স্থানে পানি জমতে পারে, সেখানে এডিস মশা প্রজনন করে। তাই এসব স্থানে যেন পানি জমতে না পারে সে দিকে লক্ষ্য রাখতে এবং নিয়মিত বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার করতে হবে।

ঢাকার ২৩ এলাকায় চিকুনগুনিয়ার ‘ঝুঁকি বেশি’ : চিকুনগুনিয়ার জন্য অধিক ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে ঢাকার ২৩টি এলাকাকে চিহ্নিত করেছে রোগ পর্যবেক্ষণকারী সরকারের সংস্থা আইইডিসিআর। গত ৮ জুন বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে চিকুনগুনিয়া বিস্তার প্রতিরোধ সংক্রান্ত সভায় এই গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আইইডিসিআর। এলাকাগুলো হলো- ধানমন্ডি ৩২, ধানমন্ডি ৯/এ, উত্তরা ৯ নম্বর সেক্টর, মধ্যবাড্ডা, গুলশান-১, লালমাটিয়া, পল্লবী, মগবাজার, মালিবাগ চৌধুরী পাড়া, রামপুরা, তেজগাঁও, বনানী, নয়াটোলা, কুড়িল, পীরেরবাগ, রায়ের বাজার, শ্যামলী, উত্তরা ৪ নম্বর সেক্টর, মণিপুরিপাড়া, মোহাম্মদপুর, মহাখালী, মিরপুর-১ ও কড়াইল বস্তি। “গবেষণায় দেখা গেছে রাজধানীর এই ২৩টি এলাকায় চিকুনগুনিয়ার বাহক মশার ঘনত্ব বেশি,” বলা হয়েছে প্রতিবেদনে।

আইইডিসিআরের জ্যেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. এ এস এম আলমগীর বলেন, “চিকুনগুনিয়ায় ভীষণ ব্যথা হয়, অনেক সময় নড়াচড়াই করা যায় না। ব্যথা হয় সব অস্থিসন্ধিতে।” গিটে গিটে ব্যথার পাশাপাশি মাথা কিংবা মাংসপেশিতে ব্যথা, শরীরে ঠান্ডা অনুভূতি, চামড়ায় লালচে দানা, বমি বমি ভাবও চিকনগুনিয়ার লক্ষণ।

ওই সভায় চিকুনগুনিয়ার বিস্তার প্রতিরোধে এডিস মশা ও এর লার্ভা নিধনের ‘ক্র্যাশ প্রোগ্রাম’ অব্যাহত রাখতে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের প্রতি আহ্বান জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম।

এদিকে, গত ১৭ জুন চিকুনগুনিয়া রোগের সংক্রমণ প্রতিরোধে জনসচেতনতা বাড়াতে ঢাকার ৯২টি পয়েন্টে সাদা অ্যাপ্রন পরে প্রচারণা চালিয়েছে মেডিকেল শিক্ষার্থীরা। ওই দিন সকালে ধানমন্ডিতে সরকারি-বেসরকারি মেডিকেলের শিক্ষার্থীদের চালানো সচেতনতামূলক এই কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম।

চিকনগুনিয়া প্রতিরোধ সচেতনামূলক এ অভিযানে ঢাকা শহরের সরকারি-বেসরকারি মেডিকেল কলেজ, ডেন্টাল কলেজ, নার্সিং ইনস্টিটিউট, ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজি এবং মেডিকেল অ্যাসিসট্যান্ট ট্রেনিং স্কুলসহ সব চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের প্রায় ১০ হাজার শিক্ষার্থী অংশ নেয়। চিকনগুনিয়া জ্বরের বাহক এডিস মশার প্রজনন ক্ষেত্র ধ্বংস করতে এবং এ রোগ নিয়ে জনসচেতনতা তৈরি করতে মাঠে পর্যায়ে মেডিকেল শিক্ষার্থীরা ঢাকার বিভিন্ন এলাকা ভাগ করে এই কার্যক্রম পরিচালনা করেন।

‘বর্ষা পর্যন্ত থাকছে চিকুনগুনিয়া’ : ঢাকা দক্ষিণের মেয়র চার থেকে ছয় সপ্তাহে চিকুনগুনিয়া নিয়ন্ত্রণে আসবে বলে আশা প্রকাশ করলেও বৃষ্টি বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত চিকনগুনিয়ামুক্ত হওয়া নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ।

চিকুনগুনিয়ার প্রাদুর্ভাব নিম্নগামী নাকি ঊর্ধ্বগামী সেবিষয়ে তথ্য নেই জানিয়ে তিনি বলেন, “চিকুনগুনিয়া বেড়েছে না কমেছে এটা সম্পর্কে এ মুহূর্তে কিছু বলতে পারব না। চিকুনগুনিয়া বিষয়ে সচেতনায় মিডিয়া যথেষ্ট পরিমাণে এগিয়ে এসেছে মন্তব্য করে এজন্য তাদের ধন্যবাদ জানান স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক।” তিনি বলেন, “ঢাকার লেকের মশায় চিকুনগুনিয়া হয় না তা কিউলিক্স মশা; মিডিয়ায় সেই লেকের বিষয়টি উঠে আসছে। অ্যাপার্টমেন্টগুলোতে এডিস মশা বিস্তার করছে তা দেখায় না।” “চিকুনগুনিয়া নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে একটি কন্ট্রোলরুম চালু করা হয়েছে, কোথায় মশা আছে বা প্রতিরোধে কোন ওষুধ কাজ করবে- এসব বিষয় সমন্বিতভাবে কাজ করতে সহায়তা করা হবে এবং আরো জনসচেতনা প্রচার করা হবে।” শুধু ঢাকা নয়, ঢাকার বাইরেও সচেতনতায় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান অধ্যাপক আজাদ।

চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধ : কার কাজ কে করে? : মশা নিধনের দায়িত্ব ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি ও ডিএনসিসি)। প্রতিবছর এ খাতে কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হলেও মশার যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাচ্ছে না নগরবাসী। এর ফলে বাড়ছে মশাবাহিত নানা রোগ। এডিশ মশার কারণে ডেঙ্গু রোগ বাড়লেও এ বছর সে রীতি ভেঙে চিকুনগুনিয়া রোগের পাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। এরপরও টনক নড়ছে না সংস্থা দু’টির। ফলে বাধ্য হয়েই রাস্তায় নেমেছেন মেডিক্যাল শিক্ষার্থীরা। যদিও কাজটি তাদের নয়।

নিয়মিত মশা নিধন করা হচ্ছে দাবি করে প্রতিবছর সপ্তাহব্যাপী বাড়তি কর্মসূচি হাতে নেয় দুই সিটি করপোরেশন। তাও তেমন কাজে আসছে না। কেননা এডিস মশার প্রজনন স্থল কিউলেক্স মশার মতো ঝোপঝাড় বা পুকুর নর্দমা নয়। এর জন্ম ঘরের ভেতর বা আশপাশের অল্প স্বচ্ছ পানিতে।

সিটি করপোরেশনের ঘরের বাইরে স্প্রে ও ফগিং কর্মসূচি তেমন কোনও কাজে আসছে না। নিরাপত্তার কারণে সংস্থার মশক নিধনকর্মীরা কারও বাড়ির ভেতরে যেতে পারেন না। এদিকে, সিটি করপোরেশনের মশক নিধনকর্মীর সংখ্যাও অপ্রতুল বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ। এ কারণে গত ১৭ জুন সরকারি-বেসরকারি মেডিক্যালের শিক্ষার্থীরা সকাল ১০টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত সচেনতনতামূলক কার্যক্রম চালান। তবে মেডিক্যাল শিক্ষার্থীদের এ সচেতনতামূলক কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে খোদ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরেই।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা বলেন, মশা নিধনের কাজ কার, এটা সবাই জানেন। মশা নিধনের কাজ রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা, স্বাস্থ্য অধিদফতরের না। ঢাকা শহরের ৫০ লাখ বাসায় ঢোকা মেডিক্যাল শিক্ষার্থীদের পক্ষে সম্ভব না। কিন্তু এরপরও আমরা স্বাস্থ্য অধিদফতরের পক্ষ থেকে একটি প্রতীকী সচেতনতামূলক কর্মসূচি দিয়েছি, যেখানে শিক্ষার্থীরা রাস্তার পাশের আবজর্না ধ্বংস করতে পারলেও বাসা–বাড়িতে ঢুকতে পারেননি।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের কর্মকর্তা বলেন, ঢাকা শহরে এভাবে কারও বাসায় ঢোকা আসলেই খুব কষ্টকর কাজ। কেউ কাউকে বিশ্বাস করেন না। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা বিষয়টি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তারা বলেন, মশা নিধনের কাজ যাদের, তারা যদি ঠিকমতো তাদের কাজ করতেন, তাহলে মশা থাকতো না। যাদের কাজ তারা ঠিকমতো তাদের দায়িত্ব পালন করছেন না বলেই আজ ঘরে ঘরে চিকুনগুনিয়া ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু সরকারি পদে থেকে আরেকটি প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে এভাবে বলতে পারি না বলেই মুখ বুজে থাকতে হচ্ছে।

এদিকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, মশাবাহিত চিকুনগুনিয়া রোগের ঝুঁকি রয়েছে রাজধানীর প্রায় ২৩টি এলাকায়। এর সবকটিই উত্তর সিটি করপোরেশনে। বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে গত ২১ জুন বিকেলে ডিএনসিসির নগর ভবনে বাজেট পেশ অনুষ্ঠানে মেয়র আনিসুল হক বলেন, ‘আমরা চাইলেও অনেক এলাকায় মশার ওষুধ ছিটাতে পারি না। বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, উত্তরার কিছু এলাকা ও সেইানিবাস এলাকায় আমাদের ওষুধ ছিটানোর অনুমতি নেই। ওইসব এলাকায় মশা জন্মায়। সেখান থেকে ডিএনসিসির বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে যায়। তবু আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। এছাড়া নগরবাসীর অসচেতনতাও অন্যতম কারণ।’

ওই দিন ডিএনসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এসএমএম সালেহ ভূঁইয়া বলেন, ‘বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেও চিকুনগুনিয়ার প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কাসহ অন্যান্য দেশে এ বছর রোগটি ছড়িয়েছে। এ রোগ প্রতিরোধে প্রয়োজন সচেতনতা। সচেতন হলে এ রোগ এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব।’

এদিকে, চলতি বছর চিকুনগুনিয়া রোগের প্রাদুর্ভাবের শুরুতে প্রায় সপ্তাহ ধরে দক্ষিণ সিটি এলাকায় মানসম্পন্ন কোনও ওষুধ না থাকায় ওষুধ ছিটানো বন্ধ ছিল বলে ডিএসসিসির স্বাস্থ্য বিভাগের নির্ভর একটি যোগ্য সূত্র জানিয়েছে। সূত্রটি আরও জানায়, ১১ মে থেকে ১৭ মে পর্যন্ত এক সপ্তাহ ধরে সংস্থায় মশার ডিম মারার ওষুধ লার্ভিসাইড ছিল না। ওষুধ সরবরাহকারী ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান মানহীন ওষুধ সরবরাহ করায় ডিএসসিসি সেগুলো ফিরিয়ে দেয়। নতুন ওষুধ আসতে প্রায় এক সপ্তাহ লেগে যায়। যে কারণে সপ্তাহজুড়ে কর্মীরা নগরীতে সকালে লার্ভিসাইড ওষুধ ছিটাতে পারেননি। এতে মশা বেড়েছে। ছড়িয়ে পড়েছে নতুন রোগ চিকুনগুনিয়া।

সিটি করপোরেশন জানিয়েছে, দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় মশা নিধনের জন্য ৬ শতাধিক কর্মী রয়েছেন। এর মধ্যে দক্ষিণ সিটিতে ২৮৬ জন। করপোরেশনের প্রতিটি ওয়ার্ডে আয়তন ভেদে ৩-৫ জন কর্মী রয়েছেন। এসব কর্মী সিটি করপোরেশনের প্রতিটি অঞ্চলের সহকারী স্বাস্থ্য কর্মকর্তার তদারকিতে কাজ করেন। গত ১৫-১৬ অর্থবছরে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে মশা নিধনের জন্য ১১ কোটি ৯৬ লাখ টাকা বরাদ্দ ছিল। এ বছর (২০১৬-১৭) এর পরিমাণ বাড়িয়ে করা হয়েছে ১২ কোটি ৫০ লাখ টাকা। উত্তর সিটি করপোরেশনে গত অর্থবছরে (২০১৬-১৭) এ বাজেট ছিল ২৩ কোটি ২৫ লাখ টাকা। কিন্তু এর মধ্যে ব্যয় করা হয়েছে ১৬ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। প্রায় ৬ কোটি টাকা খরচ করা হয়নি। এ বছর বরাদ্দ কমিয়ে রাখা হয়েছে ২০ কোটি টাকা। প্রয়োজন না হওয়ায় মশা নিধন খাতে বরাদ্দের বাকি টাকা খরচ করা হয়নি বলে দাবি করেছেন ডিএনসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ