ঢাকা, বৃহস্পতিবার 6 July 2017, ২২ আষাঢ় ১৪২8, ১১ শাওয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

ফরহাদ মজহার অপহরণ মামলা ডিবিতে

স্টাফ রিপোর্টার : কবি, প্রাবন্ধিক ও রাজনৈতিক ভাষ্যকার ফরহাদ মজহারকে অপহরণের অভিযোগে করা মামলার তদন্ত করবে পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়ার আদেশে মামলাটি গতকাল বুধবার আদাবর থানা থেকে ডিবির কাছে হস্তান্তর করা হয়। গতকাল দুপুর ১২টার দিকে এ তথ্য জানান পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) বিপ্লব কুমার সরকার। তিনি বলেন, ‘ফরহাদ মজহারকে অপহরণের অভিযোগে হওয়া মামলাটি ডিবির কাছে হস্তান্তরের জন্য মঙ্গলবার ডিএমপির কমিশনার মহোদয় আদেশ দিয়েছেন। মামলাটি ডিবির কাছে হস্তান্তরের জন্য তদন্ত কর্মকর্তাকে বলা হয়েছে।’

ফরহাদ মজহারের পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, গত সোমবার ভোর পাঁচটার দিকে শ্যামলীর হক গার্ডেনের বাসা থেকে বের হন ফরহাদ মজহার। ভবনের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, ভোর ৫টা ৫ মিনিটে ফরহাদ মজহার খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে সিঁড়ি ভেঙে নিচে নামেন। ভোর সাড়ে পাঁচটার দিকে একটি অপরিচিত নম্বর থেকে ফরহাদ মজহার স্ত্রী ফরিদা আখতারকে ফোন করে বলেন, ‘ওরা আমাকে নিয়ে যাচ্ছে। ওরা আমাকে মেরে ফেলবে।’

ওই দিন রাত সাড়ে ১১টার দিকে যশোরের অভয়নগর এলাকায় খুলনা থেকে ঢাকাগামী হানিফ পরিবহনের একটি বাস থেকে তাকে উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারের পর প্রথমে ফরহাদ মজহারকে খুলনায় পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে সেখান থেকে মঙ্গলবার সকাল পৌনে নয়টার দিকে তাকে ঢাকার আদাবর থানায় আনা হয়। সেখান থেকে সকাল সাড়ে ১০টার পর তাকে নিয়ে যাওয়া হয় মিন্টো রোডে গোয়েন্দা পুলিশের কার্যালয়ে। ডিবি কার্যালয় থেকে দুপুর আড়াইটার দিকে ফরহাদ মজহারকে আদালতে নিয়ে যাওয়া হয়।

এর আগে মিন্টো রোডে সংবাদ ব্রিফিংয়ে ডিবির যুগ্ম কমিশনার আবদুল বাতেন বলেন, ফরহাদ মজহার তাদের বলেছেন যে, মাইক্রোবাসে তোলার পর তিনি আর কিছু জানেন না। আদাবর থানায় হওয়া একটি মামলার ‘ভিকটিম’ হিসেবে ফরহাদ মজহারকে জবানবন্দী দেয়ার জন্য আদালতে পাঠানো হবে। পুলিশ বলেছে, আদাবর থানায় ফরহাদ মজহারের পরিবারের করা অপহরণের অভিযোগটি মামলা হিসেবে নেয়া হয়েছে। আদালতে জবানবন্দী রেকর্ডের পর তার ভিত্তিতেই তদন্ত চলবে।

ডানপন্থি অধিকার কর্মী হিসেবে পরিচিত কবি প্রাবন্ধিক ফরহাদ মজহার সোমবার ভোরে ঢাকার শ্যামলীর রিং রোডের বাসা থেকে বেরিয়ে ‘অপহৃত’ হন বলে তার পরিবারের অভিযোগ। ওই অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ মোবাইল ফোন ট্র্যাক করে অনুসন্ধান শুরু করে এবং রাতে যশোরে একটি বাস থেকে ফরহাদ মজহারকে উদ্ধারের কথা জানানো হয় র‌্যাবের পক্ষ থেকে।

তার আগেই ফরহাদ মজহারের স্ত্রী ফরিদা আখতার আদাবর থানায় একটি লিখিত অভিযোগ করেন, যা পরে মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করা হয় বলে গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার আবদুল বাতেন মঙ্গলবার সাংবাদিকদের জানান। যশোর থেকে ঢাকায় নিয়ে আসার পর ফরহাদ মজহারকে গোয়েন্দা কার্যালয়ে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পরে তিনি হাকিম আদালতে ১৬৪ ধারায় বিচারিক জবানবন্দী দেন এবং বিচারকের কাছ থেকে নিজের জিম্মায় বাড়ি ফেরার অনুমতি পান। রাতে তাকে ঢাকার একটি হাসপাতালে ভর্তি করেন স্বজনরা।

ফরিদা আখতারের মামলায় বলা হয়, “আমার স্বামী সাধারণত খুব ভোরে ঘুম থেকে জাগেন এবং লেখালেখি করেন। সকাল ৫টার দিকে আমার ঘুম ভাঙার পর আমি উনাকে লেখার টেবিলে না দেখতে পেয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ি এবং সারা ঘরে খুঁজতে থাকি। ইতোমধ্যে সকাল ৫ টা ২৯ মিনিটে আমার স্বামী তার ফোন থেকে আমাকে কল দেন। তিনি ভয়ার্ত কণ্ঠে বলেন, ‘ওরা আমাকে নিয়ে যাচ্ছে, মেরে ফেলবে’। এরপর ফোনটি কেটে যায়।” পরে পুলিশের উপস্থিতিতেই সারা দিনে ফরহাদ মজহারের ফোন থেকে আরও চার বার কল পান ফরিদা। সেসব ফোনালাপে ফরহাদ মজহার জানান, অপহরণকারীরা ৩৫ লাখ টাকা চেয়েছে; ওই টাকা পেলে তারা তাকে ছেড়ে দেবে।

 গোয়েন্দা পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে ফরহাদ মজহার বলেছেন, সোমবার ভোরে ওষুধ কেনার জন্য তিনি বাসা থেকে বের হলে কয়েকজন একটি মাইক্রোবাসে করে তাকে তুলে নিয়ে যায়।

তবে যশোরে তাকে বাস থেকে যেভাবে উদ্ধার করা হয়েছে, তাতে অপহরণের কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি পায়নি জানিয়ে পুলিশের খুলনা রেঞ্জের উপ-মহাপরিদর্শক দিদার আহম্মেদ বলেছিলেন, এটা ‘অপহরণের নাটক’ বলে মনে হয়েছে তাদের।

‘এখনও আতঙ্কিত’

ফরহাদ মজহার এখনও ট্রমাটাইজড। তাকে দেখে বোঝা যায় তিনি এখনও আতঙ্কিত। কিছুক্ষণ পরপর চমকে ওঠেন। তার জীবনে যা ঘটে গেল এখনও সেই ঘোর কাটেনি। এসব কথা জানিয়েছেন বেসরকারি সংস্থা উবিনীগের পরিচালক সীমা দাস। হাসপাতালে এখন তিনিই ফরহাদ মজহারকে দেখাশুনা করছেন। গতকাল বুধবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ফরহাদ মজহারের শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে এসব কথা বলেন সীমা দাস। বারডেম হাসপাতালের ১১ তলার কেবিনে ইন্টারনাল মেডিসিন বিভাগের প্রধান ডা. এ কে এম মুসার অধীনে চিকিৎসাধীন তিনি। 

সীমা দাস বলেন, ‘‘তিনি আগে থেকে ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের রোগী। কিন্তু নিখোঁজ থাকার সময়ে কোনও ওষুধ খাওয়া হয়নি। ফলে স্বাভাবিকভাবেই সেটার প্রভাব পড়েছে। চিকিৎসকরা বলেছেন, ‘তার হার্টে ছোট একটি সমস্যা দেখা দিয়েছে।’ ৪৮ ঘণ্টার কিছু টেস্ট দিয়েছে। সেগুলো সম্পন্ন হলে চিকিৎসকরা তার শারীরিক অবস্থার আপডেট জানাবেন। এর বাইরে আমরা আর কিছু বলতে পারছি না। তবে সুস্থ হয়ে তিনি প্রেস ব্রিফিং করবেন।’’

ঘটে যাওয়া ঘটনা সম্পর্কে জানতে চাইলে সীমা দাস জানান, তার মানসিক এবং শারীরিক অবস্থা ভালো না। আমরাও তাকে এ সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞেস করিনি। তিনি এখনও ট্রমাটাইজড।’

এদিকে অধ্যাপক ডা. এ কে এম মুসার চেম্বারে গেলে তিনি বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে কিছু বলবো না।’ কিছুক্ষণ পর আবারও দেখা হলে ডা. মুসা বলেন, ‘উনি ভালো আছেন। শুধু এটুকু জেনে রাখুন।’

উদ্বিগ্ন পরিবার: কবি, প্রাবন্ধিক, রাজনৈতিক ভাষ্যকার ফরহাদ মজহারকে উদ্ধারের পর তার স্ত্রী ফরিদা আক্তার একাধিক গণমাধ্যমের মুখোমুখি হন । এ সময় তিনি গণমাধ্যম কর্মীদের প্রশ্নবানে জর্জরিত হয়ে পড়েন । এক এক করে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তরও দেন , যদিও এ সময় তাকে খুব উদ্বিগ্ন ও বিধ্বস্ত মনে হচ্ছিল । তিনি এক প্রশ্নের উত্তরে বলেছেন, যদিও পরিস্থিতির শিকার ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনী প্রক্রিয়া আমার জানা নেই। তবু থানা থেকে ডিবি অফিস, ডিবি অফিস থেকে কোর্টে নিয়ে জবানবন্দী নেয়ার বিষয়টি অবাক লেগেছে। তিনি তো শুধুমাত্র একজন পরিস্থিতির শিকার। তার সাথে আইনী আচরণ করা কতোটা যৌক্তিক সেটা দেখার বিষয়।

ফরহাদ মজহারে স্ত্রী এবং তার পরিবার অপহরণ বিষয়ে কোন কিছুই বুঝে উঠতে পারছেন না। শারীরিক অসুস্থতার কারণে পরিবারের সঙ্গে তার ঘটনা সম্বন্ধে বিশেষ কোন কথা বলারও সুযোগ ঘটেনি। শুধু তার শরীরিক পরিস্থিতি নিয়ে কথা হয়েছে। উদ্ধারের পর আদাবর থানায় স্ত্রী ফরিদা আক্তারের সঙ্গে ফরহাদ মজহারের যখন দেখা হয় তিনি তাকে ভীষণ বিধ্বস্ত অবস্থায় দেখেন। তাকে দেখেই মনে হচ্ছিলো তিনি প্রচন্ড ক্লান্ত ও অসুস্থ।

থানায় গিয়ে সাক্ষাতের সময় ফরহাদ মজহারকে অপহরণকারীরা নির্যাতন করেছে অথবা কোন প্রকার ওষুধ খাওয়ানো হয়েছিলো বলে মনে হচ্ছিলো?

এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সারাদিন তার চোখ বাঁধা ছিলো। চোখ-মুখ ফোলা ছিলো। নির্যাতন করা হয়েছিলো কিনা সেটা তার সঙ্গে কথা বলেই বোঝা যাবে। এসব প্রসঙ্গে তার সাথে কোন কথা হয়নি। তিনি যেহেতু প্রাত্যহিক ওষুধগুলো খাননি এবং সারাদিন না খাওয়া অবস্থায় ছিলেন পাশাপাশি যথেষ্ট আতঙ্কিত ছিলেন- সবমিলে তাকে অন্যরকম দেখাচ্ছিলো। কাজেই চিকিৎসকের মাধ্যমে পরীক্ষা না করে কিছুই বলা যাচ্ছে না।’

কারা-কীভাবে তাকে অপহরণ করেছিলো সে সম্পর্কে কোন ইঙ্গিত পেয়েছেন কিনা, তা জানতে চাইলে তার স্ত্রী ফরিদা আক্তার বলেন, ‘আসলে আদাবর থানায় তার সাথে কথা বলার সময়ই পাইনি। এরপর ডিবি অফিসে নিয়ে যাওয়া হলো। সেখান থেকে সারাদিন কোর্টে নিয়ে যাওয়া হয়। কাজেই ঘটনা সম্বন্ধে তার কাছ থেকে কিছুই শোনার সময় হয়ে ওঠেনি।’

এর আগে যারা অপহরণের শিকার হয়েছেন তারা সুস্থতার পর সংবাদ মাধ্যমের সামনে মুখ খোলেননি। ফরহাদ মজহার সাংবাদিকদের মুখোমুখি হবেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা আগে তার সুস্থতা আশা করছি। আমরা আপ্রাণ চেষ্টা করবো তাকে সুস্থ করতে। পরে তিনি চাইলে সংবাদ মাধ্যমের মুখোমুখি হবেন।’

মিডিয়ার সঙ্গে কথা বলতে অথবা সংবাদ সম্মেলন করতে পারা-না পারা নিয়ে পুলিশের কোন দিকনির্দেশনা এসেছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে আদেশ-নিষেধ কোনটিই করা হয়নি। শুধু উদ্ধার হওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এ বিষয় নিয়ে এখন যদি মিডিয়াতে কথা বলি তবে ঘটনার তদন্ত বাধাগ্রস্ত হতে পারে। আমরাও এমনটিই মনে করি। কারণ, তথ্য সরাবরাহ বেশি হলে তা তদন্তে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে, অপহরণকারীরাও সতর্ক হয়ে যেতে পারে। সেক্ষেত্রে আমরাও পুলিশকে সহযোগিতা করেছি। সবকিছু না জেনে আসলে আমরা কোন মন্তব্য করতে চাই না। কেন না, না জেনে মন্তব্য করলে তথ্য বিভ্রাট এবং জটিলতা তৈরি হতে পারে। যেহেতু আমরা খ- খ- তথ্য পাচ্ছি সেহেতু আমরা তেমন উদ্যোগ নেইনি। ফরহাদ মজহার বারডেম হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ