ঢাকা, বৃহস্পতিবার 6 July 2017, ২২ আষাঢ় ১৪২8, ১১ শাওয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

নির্বাচনকালীন ব্যবস্থা নিয়ে গ্রহণযোগ্য সমাধান না হলে সরকারকে চরম মূল্য দিতে হবে

স্টাফ রিপোর্টার : আগামী নির্বাচন কীভাবে হবে, সেই প্রশ্নে সৃষ্ট সঙ্কট নিরসনে আলোচনার মাধ্যমেই বরফ গলাতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, আমরা আশাবাদী, সমঝোতার মাধ্যমে বরফ গলবে। তা না হলে সরকারকে ‘চরম মূল্য’ দিতে হবে। ‘আমি প্রতি মুহূর্তে আশা করি, গুড থিংস উইল কাম আউট, ভালো জিনিস আসবেই। বরফ একদিনে নাও গলতে পারে, গলতেও পারে। তবে আমি আশাবাদী, বরফ গলতেই হবে। এই ধরনের অচলাবস্থা চলতে পারে না। এটা বিজ্ঞান বলে না, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বলে না। গতকাল বুধবার নয়া পল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে নিজের কক্ষে অস্ট্রেলিয়া থেকে ফিরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আগামী নির্বাচনসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন। 

বিএনপি মহাসচিব বলেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন হতে হবে নির্দলীয় সহায়ক সরকারের অধীনে। শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে তা মেনে নেয়া হবেনা। এমনকি সেই নির্বাচন হতেও দেয়া হবেনা। তিনি বলেন, আমি বিশ্বাস করি, শেষ পর্যন্ত তাদের (ক্ষমতাসীনদের) শুভবুদ্ধির উদয় হবে। আলোচনার মধ্য দিয়ে একটা সমঝোতার রাস্তা বেরুবে।

সঙ্কট উত্তরণ না হলে তার দায় ক্ষমতাসীনদের নিতে হবে মন্তব্য করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, নইলে মূল্য দিতে হবে তাদেরকে, দায়টা তাদের ওপরেই বর্তাবে। এ ক্ষেত্রে বিএনপির করণীয় জানতে চাইলে ফখরুল বলেন, তার দল আছে ‘অপজিশনে’, তাও সংসদে নেই। যা যা করা দরকার আমরা বলে দিয়েছি। এখন আপনি সেটা গ্রহণ করবেন কি-না, কতটুক গ্রহণ করবেন, আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টা ঠিক করুন।

 বিএনপি সব সময়ই সংলাপ ও আলোচনার কথা বলে এলেও সরকারের পক্ষ থেকে সাড়া পায়নি দাবি করে মির্জা ফখরুল বলেন, আমরা বার বার বলছি যে সেইভ দি কান্ট্রি, সেইভ দি নেশন। এটা করতে হলে অবশ্যই বিরোধীদলের সাথে আলোচনা করতে হবে, বসতে হবে। আপনারা দেখবেৃ মরুভূমিতে ঝড় এলে উটপাখির মত বালুর তলে মাথা ঢুকিয়ে দেবেনৃ তাতে ঝড় যাবে না। অন্ধ হলে কী প্রলয় বন্ধ হবে? হবে না। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিভিন্ন সময়ে সংলাপের মাধ্যমে সমাধানের উদ্যোগের কথা বলতে গিয়ে ফখরুল স্বাধীনতার আগে পাকিস্তানের শাসকদের সঙ্গে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আলোচনার প্রসঙ্গও তোলেন। এদেশের ইতিহাসে দেখবেন বহুবার আলোচনা হয়েছে। আলোচনা করেই সব ঠিক-ঠাক হয়েছে। আপনাদের নেতা কি আইয়ুব খান, ইয়াহিয়া খানের সাথে বৈঠক করে নাই? বহুদিন পর্যন্ত তখন আলোচনা হয়েছে। কেন হবে না?

মির্জা ফখরুল বলেন, নির্বাচন কীভাবে হওয়া উচিৎ- সে বিষয়ে বিএনপির মতামত ইতোমধ্যে তারা জাতির সামনে তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, আমরা নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করার ব্যাপারে প্রস্তাব দিয়েছি। নির্বাচনের সময়ে সেনা বাহিনীর ভূমিকা কী হওয়া উচিৎ তা বলেছি। এখানে গোপন কিছু নেই। নিরপেক্ষ ও ইনক্লুসিভ এবং সকল দল অংশগ্রহণে যাতে নির্বাচন করা যায়, সেজন্য নিরপেক্ষ সহায়ক সরকারের কথা বলে দিয়েছি। খুব শিগগিরিই আমাদের নেত্রী সহায়ক সরকারের ব্যাপারে প্রস্তাব নিয়ে জনগণের কাছে আসবেন। আমরা মনে করি, তা সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে।

ফখরুলের ভাষায়, স্বাভাবিক অবস্থায় নির্বাচন হলে ‘ক্ষমতা ধরে রাখা যাবে না বুঝতে পেরেই’ আওয়ামী লীগ নিজেদের অধীনে নির্বাচন করার অবস্থান নিয়েছে। উনারা কী চান আমি বুঝতে পারি না, সরকার আসলে কী চায়? তারা কী এখানে আফগানিস্তানের মত হামিদ কারজাই মার্কা একটা সরকার চালাতে চান? তারা কি এখানে একটা লিবিয়া, ইরাক বা সিরিয়ার মতো সরকার চালাতে চান? আমরা বলতে চাই, এটা বাংলাদেশে সম্ভব হবে না। কারণ এদেশের মানুষ ২০০ বছর ধরে ডেমোক্রেটিক মাইন্ডের, গণতন্ত্রের জন্য তারা সংগ্রাম করেছে, মুক্তিযুদ্ধ করেছে। ইট ইজ নট পাকিস্তান, এটা আফগানিস্তানও না। এখানকার মানুষ অত্যন্ত সচেতন, গণতন্ত্রের জন্য তারা যুদ্ধ করেছে।

বিএনপি মহাসচিব বলেন, ১৯৭০ এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও তখনকার পাকিস্তানি শাসকরা শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রধানমন্ত্রীত্ব না দেওয়ায় বাংলাদেশের মানুষ সে সময় ‘অধিকার রক্ষায়, গণতন্ত্রের জন্য’ আন্দোলনে নেমেছিল। দুঃখের বিষয়, আফটার লিবারেশন ওই দলটি, ওই মানুষগুলো আমাদের অধিকার কেড়ে নিয়েছে। কোথায় যাব আমরা? এজন্য আমরা বুঝি- লড়াই করতে হবে, যুদ্ধ করতে হবে যতদিন পর্যন্ত জয়ী না হওয়া যায়।

অপর এক প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল বলেন, সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীতে আদালতের রায় সরকারের বিরুদ্ধে যাওয়ায় ফরহাদ মজহারকে অপহরণ করা হয়েছে বলে আমি মনে করি। তিনি বলেন, যখনই সরকারের বিরুদ্ধে কোনো কিছু যায় তখনই এমন ঘটনা ঘটে। ষোড়শ সংশোধনীর রায়টি দেয়ার পরই এ ঘটনাটি ঘটেছে। এটি একটি ড্রাইভার্সন। মজার কথা হচ্ছে, ফরহাদ মজহারকে আজকে যদি না পাওয়া যেত আমরা কি করতাম? কি করার ছিল? কারণ পুলিশ যেভাবে কথা বলছে, তাতে করে বোঝা যাচ্ছে অপরাধ ফরহাদ মজহারেরই। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, ফরহাদ মজহারের কোনো দোষ এখনও আমরা পাইনি এমন বক্তব্যের কড়া সমালোচনা করে তিনি বলেন, হোয়াট ডাস ইউ মিন ইট দ্যাট? তারা কি বুঝাতে যান? আমি অবাক হয়ে যাই। সরকার কোনো ঘটনারই কোনো প্রকৃত তথ্য তুলে ধরে না।

ষোড়শ সংশোধনী নিয়ে বিএনপি মহাসচিব বলেন, আমরা সব সময় বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে কথা বলছি। আমরাই সবচেয়ে বড় ভিকটিম। বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার যে অবস্থা তাতে আমরা যারা বিরোধী দল করি তারা এটার বড় ভোগান্তি পোহাচ্ছি। ষোড়শ সংশোধনীর ব্যাপারটা যখন এল এবং পার্লামেন্টকেই তারা ক্ষমতা দিল। তখন আমরা আতঙ্কিত হয়ে উঠেছিলাম। কারণ বিচারকরা সঠিক বিচার করতে পারবে কি না সন্দেহ থাকবে। সেদিক থেকে আমি মনে করি এটি একটি নন স্টেপ ফরওয়ার্ড। এখন বিচারপতিরা আইনগতভাবে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে। তাদের মধ্যে ভীতি থাকবে না। কিন্তু আমাদের এটি দেখতে হবে যে পূর্ণাঙ্গ রায়ে কি আসে।

তিনি বলেন, উচ্চ আদালতের কিছুটা আসলেও নিম্ন আদালতের অবস্থা আরও খারাপ। আমরা যারা প্রতিনিয়ত কোর্টে যাচ্ছি তারা জানি সরকার কীভাবে নিম্ন আদালতের ওপর প্রভাব বিস্তার করছে। সরকারের নির্বাচনী প্রচারণার সমালোচনা করে তিনি বলেন, সরকার মুখে নির্বাচনের ধোঁয়া তোলার চেষ্টা করছে। একটা আবহ তৈরি করতে চাচ্ছে। কিন্তু অন্যদিকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিরোধী দলকে সুযোগ সুবিধা ভোগ করার যে অধিকার দিতে হবে তার কোনো লক্ষণই দেখছি না। উপরন্তু আমরা দেখছি যারা ভিন্ন মত পোষণ করছে, সরকারের কাজের সমালোচনা করে তাদের ওপর অত্যাচার নির্যাতন আরও বেড়েছে।

বিএনপি মহাসচিব বলেন, আমরা কখনও চিন্তাও করিনি যে কবি ফরহাদ মজহারের মত একজন মানুষকে অপহরণ করা হবে। এটি একটি অবিশ্বাস্য বিষয়। কিন্তু আসলে এটি অবিশ্বাস্য নয়। কারণ সরকার আমাদের অনেক নেতাকেই গুম করছে। আমাদের সিনিয়র নেতা থেকে শুরু করে ছাত্রদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, যুবদলের নেতাকর্মীদের গুম করছে।

সরকারি দলের নেতা-কর্মীরা নির্বাচনী প্রচারে নেমে পড়েছেন বলে মনে করেন বিএনপি মহাসচিব। তিনি বলেন, সরকার মুখে নির্বাচনের ধোঁয়া তোলার চেষ্টা করছে। একটা আবহ তৈরি করতে চাচ্ছে। কিন্তু অন্য দিকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিরোধী দলকে সুযোগ সুবিধা ভোগ করারা যে অধিকার দিতে হবে তার কোন লক্ষণই দেখছি না। উপরন্তু আমরা দেখতেছি যারা ভিন্ন মত পোষণ করছে, সরকারের কাজের সমালোচনা করে তাদের উপর অত্যাচার নির্যাতন আরো বেড়েছে। স্বাভাবিকভাবে নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসবে না এবং এটা তারা বিভিন্ন মাধ্যমে জেনেছে বলেও দাবি করেন বিএনপি মহাসচিব। তিন বলেন, ‘আর ক্ষমতায় না আসতে পারলে কী হবে তা তাদের সাধারণ সম্পাদক বলে দিয়েছেন। আমি আর বলতে চাই না। সে জন্যই তারা আবারও অবৈধভাবে নির্বাচন করে ক্ষমতায় আসতে চায়।

হাবিবকে দেখতে গেলেন মহাসচিব: ঈদ শেষে ঢাকায় ফেরার পথে সড়ক দুঘর্টনায় গুরুতর আহত দলের চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য হাবিবুর রহমান হাবিবকে দেখতে যান বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। গতকাল সকালে কাকরাইলের ইসলামী ব্যাংক সেন্ট্রাল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন হাবিবসহ পরিবারের আহত সদস্যদের সাথে কথা বলেন মির্জা ফখরুল এবং চিকিৎসকদের কাছ থেকে তাদের অবস্থার খোঁজ-খবর নেন। গত ১ জুলাই নাটোরের গুরুদাসপুরে প্রাইভেটকারের সঙ্গে ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে হাবিবুর রহমান হাবিব (৬৫), তার স্ত্রী নাজমা হাবিব (৫২), মেয়ে বাবলী হাবিব (১৮) ও অনিতা হাবিব অন্তরা (১২) এবং গাড়িচালক নিশানও (৩৫) আহত হয়। এছাড়া একই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ঠাকুরগাঁয়ের স্থানীয় নেতা ও সাংবাদিক মামুন হোসেন এবং ছাত্র দলের কেন্দ্রীয় ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক সৈয়দ মাহমুদও দেখতে যান বিএনপি মহাসচিব এবং তাদের চিকিৎসার খোঁজখবর নেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ