ঢাকা, বৃহস্পতিবার 6 July 2017, ২২ আষাঢ় ১৪২8, ১১ শাওয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

নিহতদের বিরুদ্ধেই হত্যা মামলা!

গাজীপুর থেকে মোঃ রেজাউল বারী বাবুল : গাজীপুরে মাল্টিফ্যাবস পোশাক কারখানায় ভয়াবহ বয়লার বিস্ফোরণ ও হতাহতের ঘটনায় পুলিশ বাদি হয়ে মঙ্গলবার দিবাগত গভীর রাতে জয়দেবপুর থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় নিহত তিন কর্মীর নামোল্লেখ করে অজ্ঞাত আরো ৮/১০ জনকে আসামি করা হয়েছে। এদিকে নিখোঁজের তালিকায় কোন ব্যাক্তি না থাকায় আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্ধার কাজ সমাপ্ত ঘোষণা করেছে গাজীপুর জেলা প্রশাসন ও ফায়ার সার্ভিস। বয়লার বিস্ফোরণের ঘটনায় নিহত সবার লাশ ইতোমধ্যে তাদের স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। ওই ঘটনায় এ পর্যন্ত ১৩ জন নিহত হয়েছে। অপরদিকে ঘটনার তদন্তে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে বুধবার তদন্ত কমিটির সদস্যরা ঘটনাস্থল পরিদর্শণ করেছেন। 

গাজীপুর ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক আক্তারুজ্জামান লিটন ও স্থানীয়রা জানান, গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের কাশিমপুর নয়াপাড়া এলাকাস্থিত মাল্টিফ্যাবস লিমিটেড নামের পোশাক কারখানায় সোমবার (৩ জুলাই) সন্ধ্যা সোয়া ৭টার দিকে বয়লারের ভয়াবহ বিষ্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে কারখানার একটি চারতলা ভবনের নীচতলা ও দ্বিতীয় তলার দুই পাশের দেয়াল, দরজা-জানালা ও মেশিনপত্র উড়ে যায় এবং দুমড়ে মুচড়ে বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে ধ্বংসস্তুপে পরিনত হয়। কারখানায় ভয়াবহ বিষ্ফোরণ ও ভেঙে পড়া কাঠামোর নিচে চাপা পড়ে এবং বিষ্ফোরিত বয়লারের টুকরোর আঘাতে কর্মকর্তাসহ এপর্যন্ত ১৩ মারা গেছে এবং প্রায় অর্ধশত আহত হয়েছে। এদের প্রায় কারখানার কর্মী। হতাহতদের সন্ধানে ঘটনার পর থেকে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে ‘রেস্কিউ অপারেশন’ (উদ্ধার অভিযান) শুরু করে। ঘটনার রাতে কারখানার ভেতরের ধ্বংস্তূপ থেকে উদ্ধার করা হয় ৯জনের লাশ এবং আহত ৪৭ জনকে হাসপাতালে পাঠানো হয়। পরে আহতদের মধ্যে হাসপাতালে আরো তিন জন মারা যায়। ঘটনার পরদিন মঙ্গলবার সকালে ধ্বংসস্তুপ থেকে ক্ষতবিক্ষত আরো একজনের বিকৃত লাশ এবং বিকেলে আরো ৩জনের উদ্ধার করে উদ্ধারকর্মীরা। 

নিহতদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা : গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের কাশিমপুর নয়াপাড়া এলাকায় মাল্টি ফ্যাবস লিমিটেড পোশাক কারখানায় বয়লার বিস্ফোরণে হতাহতের ঘটনায় পুলিশ বাদি হয়ে মঙ্গলবার দিবাগত গভীর রাতে জয়দেবপুর থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। 

জয়দেবপুর থানার ওসি মো. আমিনুল ইসলাম জানান, চক্রবর্তী পুলিশ ফাঁড়ির এএসআই আব্দুর রশীদ বাদি হয়ে মঙ্গলবার রাতে কারখানার তিন কর্মীর নামোল্লেখ করে অজ্ঞাত আরো ৮/১০ জনকে আসামি করে ওই মামলা করেছেন। মামলার নামীয় আসামিরা হলেন কারখানার বয়লার অপারেটর চট্টগ্রামের মীরের সরাই থানার বামন সুন্দর গ্রামের মোরশেদ আহমেদের ছেলে আব্দুস সালাম (৪৮), একই জেলার বোচাগঞ্জ থানার মনিপুর গ্রামের মৃত মোস্তফা চৌধুরীর ছেলে এরশাদ হোসেন (৩৭) ও নারায়নগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জ থানার গোলাকান্ডাইল গ্রামের লুৎফল হকের ছেলে মনসুরুল হক (৪১)। তদন্তের পর পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া হবে। তারা নিহত হলেও দোষী হলে কিংবা দায়ি না হলে অভিযোগ পত্রে তাদের দায়মুক্তি দেয়া হবে।

মামলার বিবরণে বলা হয়েছে, গত ২৫ জুন থেকে ৩ জুলাই পর্যন্ত কারখানাটি নয় দিনের ছুটি ছিল। কারখানা ছুটি হওয়ার আগে গত ২৪ জুন বয়লারটির মেয়াদ শেষ হওয়ায় নবায়নের জন্য ইঞ্জিনিয়ার দিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষার শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ বয়লার অধিদপ্তরে আবেদন করেন কারখানা কর্তৃপক্ষ। কিন্তু ৪ জুলাই কারখানা খোলার কথা থাকলেও তার আগের দিন ডাইং সেকশনের অধিকাংশ শ্রমিক কর্মস্থলে যোগ দেন। বয়লার অধিদপ্তরের পরীক্ষা নিরীক্ষার আগেই কারখানা ছুটি থাকা অবস্থায় বয়লার অপারেটর আব্দুস সালাম, এরশাদ হোসেন ও মনসুরুল হক কর্তৃপক্ষকে না জানিয়ে বা অনুমতি না নিয়ে ৩ জুলাই সন্ধ্যায় বয়লারটি চালু করে। বয়লারটি চালুর কিছুক্ষণের মধ্যেই তা বিস্ফোরিত হয়ে ভবনের একাংশ ধসে পড়ে ও মেশিনপত্র দুমড়ে-মুচড়ে যায়। এতে ১৩ নিহত এবং ৪০ জন আহত হন।

এ ব্যাপারে গাজীপুর জেলা ত্রাণ ও পূনর্বাসন কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) ডা. মো. মামুন শিবলী ও গাজীপুরের নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট একেএম গোলাম মোরশেদ খান জানান, মামলায় উল্লেখকৃত নাম তিনটি তাদের তৈরি করা মৃতদের তালিকায় রয়েছে। মঙ্গলবার রাতের মধ্যেই তাদের পরিবারকে জেলা প্রশাসনের তরফ থেকে ২০হাজার টাকা করে অনুদানের টাকা ও লাশ হস্তান্তর করাহয়েছে। 

মামলার বাদি এএসআই আব্দুর রশীদ জানান, মৃতদের বিরুদ্ধে তিনি মামলা করেছেন, কিন্তু মৃতদের বিরুদ্ধে মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ওই ফাড়ি ইনচার্জ এসআই হারুন অর রশিদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। 

উদ্ধার অভিযান সমাপ্ত ঘোষণা : গাজীপুরের জেলা প্রশাসক ড. দেওয়ান মোহাম্মদ হুমায়ুন কবীর জানান, বয়লার বিষ্ফোরণের ঘটনায় আর কোন ব্যাক্তি নিখোঁজ না থাকায় মঙ্গলবার রাতে আনুষ্ঠানিক ভাবে উদ্ধার কাজ সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। গাজীপুরের জেলা প্রশাসক ড. দেওয়ান মোহাম্মদ হুমায়ুন কবীর ও ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন এন্ড মেইনটেন্যান্স) একেএম সাকিল নেওয়াজ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে এ উদ্ধার কাজ সমাপ্ত ঘোষণা করে। ঘটনার পর থেকে জয়দেবপুর, কালিয়াকৈর, টঙ্গী ও সাভার ইপিজেড ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে উদ্ধার কাজ করছিল।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ