ঢাকা, শুক্রবার 7 July 2017, ২৩ আষাঢ় ১৪২8, ১২ শাওয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

সরকারের কাছে নয় দফা প্রস্তাব হিউম্যান রাইটস ওয়াচের

স্টাফ রিপোর্টার : ২০১৩ সাল থেকে শত শত মানুষকে অবৈধভাবে আটকে রাখা হয়েছে এবং গোপন স্থানে আটকে রয়েছে বলে একটি প্রতিবেদনে বলছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ-এইচআরডব্লিউ। যাদের মধ্যে কয়েকজন বিরোধী নেতাও রয়েছেন। অবিলম্বে এই প্রবণতা বন্ধ করে এসব অভিযোগের তদন্ত করা, নিখোঁজদের পরিবারের কাছে ব্যাখ্যা তুলে ধরা আর এসব ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, বাংলাদেশ সরকারের উচিত জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারকে এসব অভিযোগ তদন্ত করার আহ্বান জানানো এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। রিপোর্টে সরকারের উদ্দেশে ৯ দফা প্রস্তাব দিয়েছে হিউম্যান রাইট্স ওয়াচ। 

ওয়েব সাইটে প্রকাশিত ৮০ পৃষ্ঠার ওই প্রতিবেদনের শিরোনাম, “তিনি আমাদের কাছে নেই: বাংলাদেশে গোপন আটক আর গুম”, যেখানে অন্তত ৯০ জনের তথ্য রয়েছে, যাদের শুধুমাত্র ২০১৬ সালেই গুম করা হয়েছে। এদের মধ্যে বেশিরভাগকে এক সপ্তাহ বা একমাস গোপনস্থানে আটকে রাখার পর আদালতে হাজির করা হয়েছে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের কাছে তথ্য রয়েছে যে, এরকম আটক ২১ জনকে পরে হত্যা করা হয়েছে আর ৯ জনের কোন তথ্যই আর জানা যায়নি। এই ৯০ জনের তালিকায় মানবতা বিরোধী অপরাধে ফাঁসি কার্যকর হওয়া তিন বিরোধী নেতার তিন সন্তান রয়েছে, যাদের একজন ছয়মাস পরে ফিরে এসেছেন। বাকি তিনজনের এখনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে, ২০১৭ সালের প্রথম পাঁচ মাসে এরকম ৪৮ জনের নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এইচআরডব্লিউ এর এশিয়া পরিচালক ব্রাড অ্যাডামস বলেন, নিখোঁজের বিষয়ে যথেষ্ট তথ্যপ্রমাণ থাকলেও, বাংলাদেশের সরকার এই বিষয়ে আইনের খুব একটা তোয়াক্কা করছে না। তিনি বলেন, মানুষজনকে আটক করে তারা দোষী না নির্দোষ নির্ণয় করা, শাস্তি নির্ধারণ করা, এমনকি তারা বেঁচে থাকবে কিনা, সেই সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতাও যেন বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের দেয়া হয়েছে।

ওই প্রতিবেদনে বিএনপির ১৯ জন কর্মীর তথ্য রয়েছে, যাদের ২০১৪ সালের জানুয়ারির নির্বাচনের পূর্বে বিভিন্ন এলাকা থেকে তুলে নেয়া হয়।

প্রতিবেদন তৈরি করতে গিয়ে নিখোঁজ পরিবারের সদস্য ও প্রত্যক্ষদর্শীসহ একশোজনের বেশি মানুষের সাক্ষাৎকার নিয়েছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। সেখানে পুলিশের কাছে করা অভিযোগ ও অন্যান্য আইনি কাগজপত্রও রয়েছে। সংস্থাটি বলছে, এসব অভিযোগের বিষয়ে ব্যাখ্যা চাইলেও তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষ। এ ধরণের ঘটনায় র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন এবং ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিখোঁজদের পরিবারের সদস্যদের, যে সংস্থা দুটির বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহারের দীর্ঘ অভিযোগ রয়েছে।

২০১৩ সালের ৫ জানুয়রি আদনান চৌধুরীকে তুলে নিয়ে যায় র‌্যাবের সদস্যরা। তার বাবা রুহুল আমিন চৌধুরী সংস্থাটিকে বলছেন, তাদের বলা হয়েছিল, পরদিন র‌্যাব সদস্যরা তাদের ছেড়ে দেবে।

''তারা বললো, আমরা তাকে নিয়ে যাচ্ছি, আমরাই আবার তাকে ফেরত দিয়ে যাবো। কিন্তু তারা আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করেছে, সংস্থাটিকে বলেছেন মি. চৌধুরী।”

প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৬ সালে যাদের তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে এবং তাদের অবস্থান এখনও অজানা, তাদের মধ্যে ছিলেন মীর আহমেদ বিন কাসেম এবং আমান আযমী, বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর দুই বিশিষ্ট নেতার ছেলে, যাদেরকে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়। সেই সাথে ২০১৬ সালে জামায়াতের ১২ জন কর্মীকে অবৈধভাবে আটকে রাখার পর তাদের হত্যা করা হয়। 

২০১৭ সালের প্রথম পাঁচ মাসে এরকম ৪৮ জনের নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে, বলছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। 

প্রতিবেদনে বলা হয়, নিখোঁজ বিএনপি নেতা সাজেদুল ইসলাম সুমনের পরিবারের কাছে একজন জ্যেষ্ঠ র‌্যাব কর্মকর্তা গোপনে জানিয়েছেন, সুমনসহ আরো পাঁচজন তার হেফাজতে ছিল। কিন্তু তিনি তাদের হত্যা করতে অস্বীকৃতি জানানোর পর অন্য র‌্যাব কর্মকর্তারা তাদের নিয়ে যান। তার ধারণা, এই ছয়জনের কেউ বেঁচে নেই।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, ‘নিখোঁজ’ হওয়া ব্যক্তিদের খুব কমসংখ্যক পরিবার আইনের আশ্রয় নিয়েছেন। অনেকেই হিউম্যান রাইটস ওয়াচকে বলেছেন, আইনের আশ্রয় নিলে তাদের আত্মীয়ের নিরাপত্তা চরমভাবে বিঘিœত হবে-বেশীর ভাগ পরিবার মনে করে তাদের কিছু সময় গোপন ও অবৈধভাবে আটকে রাখার পর ছেড়ে দেয়া হবে। 

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এই মানবাধিকার সংস্থাটি বলছে, এ ধরনের আটকের ঘটনা সবসময় অস্বীকার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং সরকারি কর্মকর্তারাও তাদের এই দাবির সমর্থন দিয়ে আসছেন। বরং কখনো কখনো উল্টো বলা হয় যে, এসব ব্যক্তিরা নিজেরাই লুকিয়ে রয়েছেন। 

এইচআরডব্লিউ বলছে, জোরপূর্বক নিখোঁজ ছাড়াও, রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তার গোপন হেফাজতে থাকাকালীন সময়ে মৃত্যুর হার বেড়ে যাবার একটি প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। এমন একটি ঘটনা ঘটেছে ২৪ বছর বয়সী জামায়াতে ইসলামীর কর্মী, শহিদ আল মাহমুদের সাথে। তাকে ২০১৬ সালের ১৩ই জুন “[ঘর] থেকে টেনে নিয়ে একটি কালো মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়,” শহিদের বাবা রজব আলী, হিউম্যান রাইটস ওয়াচকে এ বলেছেন। তিনি আরও বলেছেন, যে গ্রেফতারের সময় পুলিশ অফিসাররা উপস্থিত ছিল, যদিও পরে তারা মাহমুদকে আটকে রাখার বিষয়টি অস্বীকার করে। দুই সপ্তাহ পরে, ১লা জুলাই, পুলিশ বলেছে যে অপরাধীদের সাথে বন্দুকযুদ্ধের পর শহিদের লাশ পাওয়া যায়। শহিদের বাবা হিউম্যান রাইটস ওয়াচকে বলেছেন যে, পুলিশ মিথ্যা কথা বলেছে: পুলিশ আমার ছেলেকে অপহরণ করে এবং তার হত্যা গ্রহণযোগ্য করার জন্য ‘বন্দুকযুদ্ধের’ নাটক সাজায়।

আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে “শূন্য সহনশীলতার” প্রতিশ্রুতি করে, কিন্তু বিচার বহির্ভূত হত্যা এবং জোরপূর্বক নিখোঁজের ঘটনা এখনও ঘটছে। মানবাধিকার সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী ২০০৯ সাল থেকে সর্বমোট ৩২০টি নিখোঁজের ঘটনা ঘটেছে। নিখোঁজ হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছে সন্দেহভাজন অপরাধী, সেনাবাহিনী এবং বিরোধীদলের সদস্যবৃন্দ।

আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধি দ্বারা জোরপূর্বক নিখোঁজ স্বাধীনতা খর্ব করে, স্বাধীনতা খর্ব অস্বীকার করা কিংবা তাদের ভাগ্য নির্ধারণ করা অথবা তাদের অবস্থান সম্পর্কে অবহিত না করার ফলে তারা আইনের সুরক্ষার বাহিরে অবস্থান করে।

বাংলাদেশ সরকারের উচিত স্বাধীন ও কার্যকর তদন্ত পরিচালনার জন্য মানবাধিকার হাই কমিশনারকে বাংলাদেশে ভ্রমণের জন্য আমন্ত্রণ জানানো এবং  তারা যাতে তদন্ত পরিচালনা করতে পারে এবং সেই সাথে বিচার, জবাবদিহিতা এবং নিরাপত্তা বাহিনীকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিয়ে তা পুনর্গঠনের যথাযথ প্রস্তাব উপস্থাপন করতে পারে, সেসব সুনিশ্চিত করা। বাংলাদেশ সরকারের আরও উচিত সংশ্লিষ্ট জাতিসঙ্ঘের বিশেষ কার্যসম্পাদক, নির্বিচার ও বিচার বহির্ভূত হত্যাকা- বিষয়ক বিশেষ দূত, জোরপূর্বক ও অবৈধভাবে নিখোঁজের উপর কার্যরত সংস্থার বিশেষ দূতদের বাংলাদেশে আমন্ত্রণ জানান এবং তারা যাতে সকল স্থান ও মানুষদের সাথে বিনা বাঁধায় দেখা করতে পারে তার অনুমতি গ্রাহ্য করা।

অ্যাডামস বলেছেন, বাংলাদেশ সরকার মানবাধিকার, মানুষের জীবন এবং আইন-শৃঙ্খলার প্রতি পরোয়া না করাকে একটি অভ্যাসে পরিণত করেছে। এমনকি সরকার এসব অভিযোগগুলো অস্বীকার করার প্রয়োজন মনে করছে না, তার পরিবর্তে নীরব থাকছে এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর থেকেও একই প্রত্যাশা করছে। এই নীরবতা ভঙ্গ করা প্রয়োজন।

গোপনে আটক এবং হত্যা: ২০১৬ সালের ১৮ই মার্চ আবু জার গাফারির তুলে নিয়ে যাওয়া হয় এবং ২০১৬ সালের ১৩ই এপ্রিল গুলীবিদ্ধ অবস্থায় তার লাশ উদ্ধার করা হয়। তার পিতা নুর ইসলাম বলেন, “আমার ছেলে যখন জুম্মার নামাজ শেষে মসজিদ থেকে বের হয়ে আসছিল, তখন কিছু লোক মোটরসাইকেলে চড়ে আমার ছেলের কাছে এসে দাঁড়ালো। আমার ছেলে তার নাম বলার পর তারা তাকে হাতকড়া পরিয়ে দিল এবং বন্দুকের মুখে তাকে টেনে মোটরসাইকেলে ওঠালো। কিছু স্থানীয় লোক তাদের প্রতিহত করার চেষ্টা করেছিল কিন্তু তারা তাদের বন্দুক উঁচিয়ে তাদের কাজে বাঁধা না দেবার আদেশ করে এবং বলে যে তারা তাদের ‘প্রশাসনিক দায়িত্ব' পালন করছে। 

২০১৬ সালের ১৩ই জুন তুলে নিয়ে যাবার একদিন পর শহিদ আল মাহমুদের লাশ পাওয়া যায়। তার পিতা রজব আলী বলেন, “মধ্যরাতের পরে, দুইজন লোক বাঁশের বেড়া ভেঙ্গে আমাদের ঘরের চত্বরে প্রবেশ করে এবং শহিদের নাম ধরে এমনভাবে ডাকে যেন তারা তার রাজনৈতিক সহকর্মী। আমার স্ত্রী এবং আমি উঠে দরজার কাছে গিয়েছি এবং বেসামরিক পোশাক পরিহিত দুইজনের একজন একটি বন্দুক আমাদের দিকে তাক করে রাখে। তারা শহিদকে কাপড় বদলানোর অনুমতি দেয়। তারপর তাকে টেনে নিয়ে যায় এবং কালো একটি মাইক্রোবাসে নিয়ে তোলে। সেখানে আরও কিছু লোক উপস্থিত ছিল, তাদের পরনে পুলিশের পোশাক ছিল।”

নিখোঁজ অব্যাহত: ২০১৬ সালের ২৬শে জানুয়ারি থেকে নিখোঁজ মোয়াজ্জেম হোসেন টিপু। তার ভাই মনিরুল হোসেন অপু বলেন, “আমরা দ্রুত আমাদের এপার্টমেন্টে চলে গেলাম। সেখানকার একজন প্রহরী আমাদের বলেছিল যে সাধারণ পোশাক পরিহিত তিনজন লোক আমাদের এপার্টমেন্ট ঢুকে আমার ভাইকে মধ্যরাতের দিকে তুলে নিয়ে যায়। যখন প্রহরী তাদের থামানোর চেষ্টা করে, তারা নিজেদের গোয়েন্দা বিভাগের সদস্য বলে পরিচয় দেয়।”

২০১৬ সালের ৯ই আগস্ট থেকে নিখোঁজ রয়েছেন মীর আহমেদ বিন কাসেম। তার বোন তাহেরা তাসনিম বলেন, “যখন দরজা খোলা হয়েছে, তখন লোকগুলো আমার ভাবীকে জিজ্ঞেস করল, ‘আপনার স্বামী কোথায়?’ আমার ভাই তখন দরজার কাছে আসল এবং লোকগুলো তাকে বলল, ‘আপনাকে আমাদের সাথে আসতে হবে।’ আমার ভাই জিজ্ঞেস করল, 'আমি কি আপনারদের পরিচয় পেতে পারি?' আপনারা কোন বাহিনী থেকে এসেছেন? আপনারা কি র‌্যাব, সিআইডি, ডিবি?' তারা নিজেদের পরিচয় দেয়নি। তিনি কয়েকবার জিজ্ঞেস করেছেন। তোদের পরনে কোন সামরিক পোশাক এবং কোন গ্রেফতার পরোয়ানা ছিল না। তারা বলেছিল, 'আমাদের সাথে আসুন।' আমার ভাই তখন বলেছেন, 'আমি একজন আইনজীবী এবং আমার তা জানা প্রয়োজন।' তখন তারা আমার ভাইকে জবাব দিল, 'আমরা আপনাকে তৈরি হওয়ার জন্য পাঁচ মিনিট দেব। তৈরি হয়ে আমাদের সাথে আসুন।' ...... আমি আমার ভাইয়ের সামনে দাঁড়িয়ে তাদের একজনের হাত ধরেছিলাম। লোকটি আমার হাত সরিয়ে আমার ভাইকে ধরেছিল। আমরা তার পেছনে দৌড়াতে শুরু করলাম। আমরা দ্বিধান্বিত ছিলাম। তাকে একটি সাদা মাইক্রোবাসে ঢুকানো হল। তারপর তারা চলে গেল।”

২০১৩ সালের ৪ই ডিসেম্বর বসুন্ধরা থেকে ছয়জন লোকের নিখোঁজের ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, “হঠাৎ করে আমরা দেখলাম একটি গাড়ি আমাদের দিকে আসছে। সেখানে একাধিক গাড়ি ছিল, কিন্তু আমি সঠিক সংখ্যাটি জানিনা। কালো পোশাক পরিহিত কিছু লোক গাড়ি থেকে বের হয়ে আসল। তাদের কাছে অস্ত্র ছিল। গাড়িগুলোর বাতি জ্বালানো ছিল, তাই আমি তাদের এবং তাদের পোশাকের রং দেখতে পেরেছিলাম। সেখানে একটি গাড়িতে র‌্যাব-১ লিখা ছিল। আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি যে তারা র‌্যাব ছিল কারণ আমি তাদের পোশাক এবং গাড়িতে র‌্যাব-১ লিখা দেখেছিলাম।”

২০১৩ সালের ১২ই ডিসেম্বর থেকে নিখোঁজ নিজামউদ্দিন মুন্না। তার পিতা সামসুদ্দিন বলেন, “আমি স্থানীয় পুলিশ ফাঁড়িতে গেলাম। কর্তব্যরত অফিসার আমাকে বলেছিল যে পুলিশ র‌্যাব অথবা অন্য কোন আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার বিরুদ্ধে অভিযোগ গ্রহণ করবে না। আমাকে বলা হয়েছিল যে যদি আমার একটি অভিযোগ দায়ের করতে চাই তাহলে আমাকে বলতে হবে যে আমার ছেলে হারিয়ে গেছে।”

২০১৩ সালের ১২ই ডিসেম্বর থেকে নিখোঁজ সেলিম রেজা পিন্টুর স্ত্রী তারান্নুম নাহাস বলেন, “দরজা খোলার সাথে সাথে তারা জিজ্ঞেস করল যে সে পিন্টু কিনা। সে বলেছিল, 'হ্যাঁ, আমিই পিন্টু।' তখন তাদের দুইজন পিন্টুকে ধরে ফেলেছিল... পিন্টু তাদের পরিচয় জানতে চেয়েছিল। তারা বলেছিল, 'আমরা প্রশাসন থেকে এসেছি।' পিন্টু তাদের পরিচয়পত্র দেখতে চেয়েছিল এবং তখন তারা বলেছিল, 'এটা কোন সমস্যা না। আপনি আমাদের সাথে নিরাপদে থাকবেন।' আমার স্বামী কোন বাঁধা দেননি।”

নিখোঁজের ব্যাপারে আওয়ামীলীগের পরস্পর বিরোধী অবস্থান: আওয়ামী লীগ নিখোঁজের অভিযোগের ব্যাপারে পরস্পর বিরোধী অবস্থান নিয়েছে। ২০১৬ সালের নভেম্বরে বিরোধী দলের সমর্থকদের জোরপূর্বক গুম করার ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ভয়েস অফ আমেরিকাকে বলেন, এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন। তিনি বলেন, নিখোঁজ হওয়া ব্যক্তি সরকারকে বিশ্বের কাছে বিব্রত করার উদ্দেশ্যে গোপনে লুকিয়ে আছেন। ২০১৭ সালের মার্চে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক যদিও জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিটিতে নিখোঁজের ঘটনা ঘটেছে বলে স্বীকার করেন, তবে এ সংখ্যা অনেক কমিয়ে আনা হয়েছে বলে তিনি দাবী করেন। আইনমন্ত্রী আরো বলেন, বাংলাদেশের আইননে জোরপূর্বক নিখোঁজ বলতে কিছু নেই, দেশে অপহরণের অভিযোগ করা সমস্ত মামলার তদন্ত প্রতিবেদন সুষ্ঠু পরিবেশে অত্যন্ত সফলতার সাথে তদন্ত করা হয়েছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা দ্বারা সংগঠিত অপরাধের ব্যাপারে সরকার ‘শূন্য সহনশীল’। তিনি বলেন, ‘কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়, কেউই।’

সরকারের উদ্দেশ্যে প্রস্তাব: রিপোর্টে সরকারের উদ্দেশ্যে ৯ দফা প্রস্তাবনা দিয়েছে হিউম্যান রাইট্স ওয়াচ। প্রস্তাবনাগুলো হলো, (এক) অতিসত্ত্বর চলমান সকল জোরপূর্বক নিখোঁজ অভিযোগের তদন্ত পরিচালনা করা এবং যারা নিরাপত্তা বাহিনী দ্বারা অবৈধভাবে আটক আছে, তাদের সনাক্ত ও মুক্তি দেয়া এবং দোষীদের বিচারের সম্মুখীন করা। এ বিচার আওতায় বিরোধী দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সদস্য অথবা তাদের সমর্থকদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলাগুলো আনা উচিত।

(দুই) নিরাপত্তা বাহিনীর হেফাজতে থাকাকালীন সময়ে তথাকথিত বন্দুকযুদ্ধে অথবা গুলীবিনিময়কালে সংগঠিত সকল মৃত্যুর অভিযোগ তদন্ত করা এবং এ মৃত্যুর জন্য দায়ী সকল কর্মকর্তাদের বিচারের সম্মুখিন করা। 

(তিন) পুলিশ স্টেশনগুলোকে অভিভোগ গ্রহণের নির্দেশনা দেয়া, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, যেমন র‌্যাব ও ডিবি পুলিশের বিরুদ্ধে আনা পরিবারের অভিযোগগুলোর সাধারণ ডাইরী ও এফআইআর করতে হবে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার বিরুদ্ধে জোরপূর্বক নিখোঁজের অভিযোগের তদন্ত করতে পুলিশকে ক্ষমতা ও উৎসাহ প্রদান করা। 

(চার) স্বাধীন ও কার্যকর তদন্ত পরিচালনার জন্য মানবাধিকার হাই কমিশনার, সংশ্লিষ্ট জাতিসংঘের বিশেষ কার্য সম্পাদক, নির্বিচার ও বিচার বর্হিভূত হত্যাকান্ড বিষয়ক বিশেষ দূত, জোরপূর্বক ও অবৈধভাবে নিখোঁজের উপর কার্যরত সংস্থা, নির্যাতন এবং অন্যান্য নিষ্ঠুর, অমানবিক বা অপমানজনক শাস্তি বিষয়ক বিশেষ দূতকে বাংলাদেশে ভ্রমণের জন্য আমন্ত্রণ জানানো।

(পাঁচ) জাতীয় মানবাধিকার কমিশন দ্বারা পাঠানো বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর অতিদ্রুত প্রদান করা। 

(ছয়) জোরপূর্বক ও অবৈধভাবে নিখোঁজের উপর কার্যরত সংস্থার বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর অতিসত্বর প্রদান করা।

(সাত) আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ সকল স্তরের কর্মকর্তারা যারা জোরপূর্বক নিখোঁজের জন্য দায়ী, তাদের বিচারের সম্মুখীন করা। আদেশকারী অফিসার ও সরকারী ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা যারা এ নিদের্শ দিয়েছেন কিংবা এ নির্যাতন সম্পর্কে অবহিত, তাদের শাস্তির ব্যবস্থা করা। 

(আট) জোরপূর্বক নিখোঁজে জড়িত থাকার অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে দৃঢ় তথ্য ও প্রমাণ রয়েছে, তাদের অতিসত্ত্বর বরখাস্ত করা, পুরো তদন্ত পরিচালনা করা এবং র‌্যাব, ডিবি ও অন্যান্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থা থেকে বরখাস্ত করা।

(নয়) অগণিত ও গুরুতর মানবাধিকার লংঘনে জড়িত থাকার কারণে র‌্যাবকে অব্যাহতি দেয়া এবং তার পরিবর্তে একটি বেসামরিক সন্ত্রাস দমন বিভাগ তৈরি করা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ