ঢাকা, শুক্রবার 7 July 2017, ২৩ আষাঢ় ১৪২8, ১২ শাওয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

ভুল বিচার করলে আল্লাহ ক্ষমা  করবেন না

স্টাফ রিপোর্টার : সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা অবসরে গেছেন। অবসরে যাওয়ার প্রাক্কালে বিদায়ী বক্তৃতায় তিনি বলেছেন, আমার সুদীর্ঘ বিচারক জীবনে কখনোই জেনে-বুঝে বা অবহেলা করে বা অমনোযোগী হয়ে কোনো ভুল বিচার বা অন্যায় বিচার করিনি। অবহেলা করে ভুল বিচার করা আল্লাহ ক্ষমা করবেন না। পক্ষাশ্রিত হয়ে বা কোনও কারণে বা কারও দ্বারা প্রভাবান্বিত হয়ে বিচার করা মহাপাপ।

 দেশের নি¤œ ও সর্বোচ্চ আদালতে প্রথম নারী বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানার অবসর যাওয়ার পূর্বে তার শেষ কর্মদিবসে এটর্নি জেনারেল কার্যালয় ও সুপ্রিম কোর্ট বার এসোসিয়েশনের দেয়া সংবর্ধনার জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। গতকাল বৃহস্পতিবার শেষ কর্মদিবসে আপিল বিভাগের এক নম্বর কক্ষের এজলাসে উপস্থিত বিচারপতিসহ আইনজীবীদের উদ্দেশে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় এজলাস কক্ষে জ্যেষ্ঠ আইনজীবীসহ শত শত আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন।

বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা তার বক্তব্যে বলেন, প্রায় ৪২ বছরের বিচারিক জীবন আমার শেষ হল আজ। বিচার করা কঠিন কাজ ও বিচারকের সীমাবদ্ধ জীবন থেকে মুক্ত হওয়ার আগ্রহ ছিলো আমার। আজকের এ ক্ষণটিতে আমার কষ্ট হচ্ছে এই বিচার অঙ্গন থেকে বিদায় নিতে আপনাদের ছেড়ে যেতে।

তিনি বলেন, আল্লাহ আমাকে বিচারক বানিয়েছেন, এদেশের প্রথম নারী বিচারক আমি। তবে আমার বিচারক হওয়ার পেছনে আমার মরহুম আব্বার ইচ্ছা ও আম্মার প্রেরণা বড় ভূমিকা রেখেছে।

১৯৭২ সালে আইনজীবী পেশার প্রথমদিন কোর্টের অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, বোধহয় আমার মনের কোণায় ইচ্ছেটা উঁকি দিয়েছিলো- আমি কি জজ হতে পারি না? কিন্তু জানলাম জজ হতে পারি না। কারণ ওই সময় বাংলাদেশের নারীরা জজ হতে পারতো না। আমি ওকালতি করার বছর দেড়েক পরে ওই বিধান সরকার তুলে দেয়।

বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা বলেন, ১৯৭৫ সালের শেষের দিকে দেশের প্রথম নারী বিচারক হয়ে খুলনার জজশিপে মুন্সেফ হিসেবে যোগদান করি। ওই সময়ে খবরের কাগজে এটি বেশ গুরুত্বের সঙ্গে ছাপা হয়েছিলো। প্রতিক্রিয়া দুরকমেরই হয়েছিলো। কেউ স্বাগত আবার অনেকে নাক সিঁটকেছিলেন-নারী আবার বিচারক হতে পারে নাকি-নারী আবার কি বিচার করবে? কর্মক্ষেত্রে আমি এই দুরকমের আচরণ পেয়েছিলাম। প্রথম নারী বিচারক হিসেবে ব্যর্থ হয়ে যাইনি। আল্লাহর কাছে তাই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। প্রথম নারী বিচারক হিসেবে আমি ব্যর্থ হলে হয়তো আজ বাংলাদেশের প্রায় ৪০০ নারী বিচারক হতো না।

নিজের বিচারকাজ নিয়ে বিদায়ী বক্তৃতায় দেশের প্রথম এই নারী বিচারপতি বলেন, আমি আত্মতৃপ্তি নিয়ে বিচারঙ্গন থেকে বিদায় নিচ্ছি। আমি আমার সুদীর্ঘ বিচারক জীবনে কখনই জেনেবুঝে বা অবহেলা করে বা অমনযোগী হয়ে কোন ভুল বিচার বা অন্যায় বিচার করিনি। আমার অনেক বিচারই হয়তো ভুল হয়ে গেছে, আপিলে গিয়ে হয়তো সংশোধিত হয়েছে। কিন্তু সে ভুল বিচার আমি জেনেবুঝে বা অমনোযোগী হয়ে করিনি। জেনে বুঝে অবিচার করা বা অমনোযোগী হয়ে বা অবহেলা করে ভুল বিচার করা আল্লাহ ক্ষমা করবেন না। পক্ষাশ্রিত হয়ে বা কোনও কারণে বা কারও দ্বারা প্রভাবানিন্বত হয়ে বিচার করা মহাপাপ। আমার আত্মতৃপ্তি আমি জেনে বুঝে বা অবহেলা করে বা অমনোযোগী হয়ে বা পক্ষাশ্রিত বা প্রভাবানিবত হয়ে ভুল বিচার, অন্যায় বিচার করিনি কখনোই।

এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা তার প্রজ্ঞা, মেধা ও সততা দিয়ে বিচার বিভাগকে সমৃদ্ধ করেছেন। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় তার প্রচেষ্টা অব্যাহত ছিলো। সুপ্রিম কোর্ট বার এসোসিয়েশনের সভাপতি এডভোকেট জয়নুল আবেদিন বলেন, বিচার কাজে দক্ষ, সৎ ও ন্যায়পরায়ণ বিচারক হিসেবে তিনি সুনাম অর্জন করেছেন। বিচারবিভাগে তার অবদান দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। বক্তরা সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানার ৪২ বছরের বর্ণাঢ্য বিচারিক জীবনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন ।

প্রসঙ্গত বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা অবসরে যাচ্ছেন আজ শুক্রবার। এ দিন তার ৬৭ বছর পূর্ণ হবে। এ কারণে গতকাল বৃহস্পতিবার ছিলো তার শেষ কর্মদিবস। 

জীবন বৃত্তান্ত

বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা দেশের ইতিহাসে আপিল বিভাগের প্রথম নারী বিচারপতি। একই সঙ্গে হাইকোর্টেরও তিনি ছিলেন প্রথম নারী বিচারপতি। আর দেশের প্রথম নারী বিজারকও তিনি। 

১৯৫০ সালের ৮ জুলাই মৌলভীবাজারের চৌধুরী আবুল কাশেম মঈনুদ্দীন ও বেগম রশীদা সুলতানা দীন দম্পতির ঘরে জন্মগ্রহণ করেন নাজমুন আরা সুলতানা। তারা তিন বোন ও দুই ভাই। ভাইবোনের সঙ্গে শৈশব-কৈশোরের সময়টা কেটেছে ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে।

ময়মনসিংহের বিদ্যাময়ী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৬৫ সালে এসএসসি, ১৯৬৭ সালে মুমিনুন্নেসা উইমেন্স কলেজ থেকে এইচএসসি এবং আনন্দ মোহন কলেজ থেকে ১৯৬৯ সালে বিএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন। মাত্র ১১ বছর বয়সে বাবাকে হারান তিনি। বাবার ইচ্ছা ছিল তার সন্তানদের কেউ একজন আইনজীবী হবে। বাবার স্বপ্নপূরণে বিএসসি পাসের পর তিনি মোমেনশাহী ল’ কলেজে ভর্তি হন।

মা রশীদা সুলতানার উৎসাহে প্রতিকূলতা জয় করে ১৯৭২ সালে এলএলবি পাস করেন তিনি। ১৯৭২ সালের জুলাইয়ে ময়মনসিংহ জেলা আদালতে আইনজীবী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। স্বাধীনতার পর দেশে নারীদের বিচারক হওয়ার বিধান ছিল না। ১৯৭৪ সালে এ নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হয়। নাজমুন আরা সুলতানা বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ১৯৭৫ সালের ২০ ডিসেম্বর মুনসেফ হন।

নিম্ন আদালতে দেশের প্রথম নারী বিচারক হিসেবে নাজমুন আরা সুলতানা খুলনা, নারায়ণগঞ্জ ও টাঙ্গাইলে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮২ সালে সাবজজ হন। কয়েক দফা পদোন্নতির পর ১৯৯১ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় জেলা ও দায়রা জজ হন। কোনো নারীর জেলা জজ হওয়ার ঘটনা সেটাই ছিল প্রথম।

২০০০ সালের ২৮ মে তিনি হাইকোর্টে অতিরিক্ত বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান। এর দুই বছর পর স্থায়ী হন হাইকোর্টে। ২০১১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি আপিল বিভাগের প্রথম নারী বিচারপতি হিসেবে শপথ নেন তিনি। তিনি বাংলাদেশ মহিলা জজ এসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি।

উচ্চ আদালতে বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা ফতোয়া অবৈধ, সেনানিবাসে খালেদা জিয়ার বাড়ি অবৈধ ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলসহ অনেক উল্লেখযোগ্য রায় দিয়েছেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ