ঢাকা, শুক্রবার 7 July 2017, ২৩ আষাঢ় ১৪২8, ১২ শাওয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

যমুনার মূল প্রবাহ চৌহালীর প্রতিরক্ষা বাঁধে আঘাত করছে ॥ ভাঙন গভীরতা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৯ মিটারে

সেলিম রেজা, চৌহালী (সিরাজগঞ্জ) সংবাদদাতা : যমুনা নদীর প্রধান চ্যানেলটি সিরাজগঞ্জের চৌহালীতে সরাসরি প্রতিরক্ষা বাঁধে আঘাত করছে। এতে ঘূর্ণায়মান ¯্রােতে তলদেশের লোলা মাটি ক্ষয়ে নদীর ভাঙন গভীরতা ৭ মিটার থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৯ মিটারে। ফলে চৌহালী শহর রক্ষা বাঁধসহ এর উজান এবং ভাটিতে প্রায় ১২ কিলেমিটার এলাকাব্যাপী ভাঙন শুরু হয়েছে। এদিকে বর্তমানে যমুনা নদীর গতি-প্রকৃতি ও ভাঙনের বাস্তব অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে সার্বিক বিষয়ে করণীয় নির্ধারণের লক্ষ্যে বুয়েটের একাধিক বিশেষজ্ঞ, পাউবোর বিশেষজ্ঞ এবং বিদেশী বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি বিশেষ কারিগরী কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

 পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, টাঙ্গাগাইল পানি উন্নয়ন বিভাগের তত্ত্বাবধানে সিরাজগঞ্জের চৌহালী উপজেলা সদরের ৪ কিলোমিটার এবং টাঙ্গাগাইলের ৩ কিলোমিটার এলাকায় যমুনা নদীর ভাঙন রোধ কাজে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ১০৯ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়। এই টাকা দিয়ে ভাঙন রোধে যমুনা নদীর পূর্ব পাড়ের টাঙ্গাগাইল সদর উপজেলার সরাতৈল থেকে দক্ষিণে নাগরপুর উপজেলার পুকুরিয়া, শাহজানির খগেনের ঘাট, সিরাজগঞ্জে চৌহালী উপজেলার ঘোরজানের চেকির মোড়, আজিমুদ্দিন মোড়, খাসকাউলিয়া, জোতপাড়া পর্যন্ত ৭ কিলোমিটার ভাঙন রোধ প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণ শুরু করা হয় ২০১৫ সালের ২৪ নভেম্বর। ইতোমধ্যে নির্মাণ কাজের প্রায় ৯৫ ভাগ শেষ হয়েছে। চলতি বছরে ৬ বার ধ্বসে গেছে এ প্রতিরক্ষা বাঁধ। এ নিয়ে এলাকাবাসীর মধ্যে উদ্বেগ উৎকন্ঠা দেখা দিয়েছে।

 গুগল আর্থ ম্যাপে দেখা যায়, যমুনা ব্রীজের ভাটিতে নদী দুটি ধারায় প্রবাহিত হচ্ছে। যমুনা নদীতে বর্তমানে প্রবাহিত পানির ৮০ শতাংশ চৌহালী চ্যানেল দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। অবশিষ্ট পানি যমুনার পশ্চিম পাড় বেলকুচি-এনায়েতপুর চ্যানেল দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। চৌহালী চ্যানেলটি বর্তমানে একটি ধনুকের মতো আকৃতি ধারণ করেছে। ফলে যমুনার মূল প্রবাহ চৌহালী চ্যানেলের পূর্ব তীর ঘেঁষে সরাসরি প্রতিরক্ষা বাঁধে আঘাত করছে। ফলে পানির ঘূর্ণায়মান ¯্রােতে নদীর তলদেশের লোলা মাটি ক্ষয়ে ভাঙন গভীরতা ক্রমশই বাড়ছে। এতে চৌহালী প্রতিরক্ষা বাঁধসহ এর উজান এবং ভাটিতে প্রায় ১২ কিলোমিটার এলাকা ব্যাপী ভাঙন বা ধস দেখা দিয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, ২০১৫ সালের নভেম্বর মাসে প্রতিরক্ষা বাঁধের বালিভর্তি জিও ব্যাগ ডাম্পিং শুরু করা হয়, তখন যমুনার ভাঙন গভীরতা ছিল ৬ থেকে ৭ মিটার। বর্তমানে ভাঙন গভীরতা ১২ মিটার (৩৯ ফুট) বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৯ মিটারে। ফলে ডাম্পিং এলাকার বাইরে প্রায় ৩৯ ফুট দৈর্ঘ্যরে একটি খাড়া স্লোপের সৃষ্টি হয়েছে। সে কারণে ডাম্পিং ম্যাটেরিয়াল বালিভর্তি জিও ব্যাগ এবং সিসি ব্লক নদীর তলদেশে ধসে যাচ্ছে। মাটি পরীক্ষায় দেখা গেছে, চৌহালী অংশে যমুনার তীরের মাটি অত্যন্ত নরম। মাটির উপরিভাগ থেকে সামান্য নীচেই পলির স্তর রয়েছে। এই পলি মাটির ভারবহন ক্ষমতা একেবারেই কম। এ কারণেও সাম্প্রতিক সময়ে স্লোপ ধসের ঘটনা ঘটেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে পানি উন্নয়ন বোর্ডের দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানান, বিচিত্র নদী যমুনা। এর গতি-প্রকৃতি ভাঙন গভীরতা নির্নয় করা খুবই জটিল কাজ। ফলে এ নদীতে প্রতিরক্ষা কাজের ডিজাইন করতে হয় অনেক হিসাব নিকাশ করে। কিন্তু সিরাজগঞ্জের চৌহালীতে অত্যন্ত সাশ্রয়ী ডিজাইনে কাজ করতে গিয়ে এই ধসের ঘটনাগুলো ঘটছে। সিরাজগঞ্জসহ অন্যান্য জেলায় ভাঙন রোধ কাজে যেখানে প্রতি মিটারে ৬৫ থেকে ৭০ ঘন মিটার বালিভর্তি জিও ব্যাগ ব্যবহার কার হচ্ছে, সেখানে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ভাঙন প্রবণ চৌহালীতে প্রতি মিটারে ৩২ ঘনমিটার বালিভর্তি জিও ব্যাগ ব্যবহার করা হয়েছে। অর্থাৎ খরচ কমানোর জন্য ডিজাইনে ম্যাটেরিয়ালের পরিমান অর্ধেকে নামিয়ে আনা হয়েছে। যা কোন ভাবেই যুক্তিযুক্ত হয়নি। প্রতিরক্ষা বাঁধ ধসে যাওয়ার এটি একটি কারণ হতে পারে বলে তিনি জানিয়েছেন। এবিষয়ে টাঙ্গাগাইল পানি উন্নয়ন বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী শাহজাহান সিরাজ জানান, যমুনার মূল প্রবাহটি সরাসরি প্রতিরক্ষা বাঁধে আঘাত করছে। এতে পানির ঘূর্ণায়মান ¯্রােতে নদীর তলদেশের লোলামাটি ক্ষয়ে ভাঙন গভীরতা বাড়ছে। এতে প্রতিরক্ষা বাঁধের ম্যাটেরিয়াল বালিভর্তি জিও ব্যাগ ও সিসি ব্লক ধসে যাচ্ছে। বিষয়টি প্রধান প্রকৌশলী এবং পাউবোর মহাপরিচালককে অবহিত করা হয়েছে। এছাড়া নদীর বর্তমান অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে সার্বিক বিষয়ে করনীয় নির্ধারণের লক্ষ্যে বুয়েটের একাধিক বিশেষজ্ঞ, পাউবোর বিশেষজ্ঞ এবং বিদেশী বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি কারিগরি কমিটি গঠণ করা হয়েছে বলে তিনি জানান।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ