ঢাকা, সোমবার 10 July 2017, ২৬ আষাঢ় ১৪২8, ১৫ শাওয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

বন্যা প্লাবিত বিভিন্নস্থানে পানিবন্দী লাখ লাখ মানুষের সীমাহীন দুর্গতি

বগুড়ায় বন্যায় পানিমগ্ন ঘরবাড়ি -সংগ্রাম

 

সংগ্রাম ডেস্ক : বিভিন্ন জেলা উপজেলায় বন্যার পানি বেড়েই চলেছে। প্লাবিত হচ্ছে নতুন নতুন এলাকা। পানিবন্দী হয়ে পড়ছে লাখ লাখ মানুষ। ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে ছুটছে দুর্গতরা। আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানির তীব্র সঙ্কট দেখা দিয়েছে। এদিকে বিভিন্ন নদনদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটছে। সাথে সাথে বাড়ছে দুর্গতদের দুর্ভোগ।

বগুড়া অফিস : ভারত থেকে আসা পাহাড়ী ঢলে বগুড়ার তিনটি উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় প্রতিনিয়ত নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। ফলে দুর্গত এলাকার মানুষের মাঝে আতংক বিরাজ করছে। ইতোমধ্যেই সারিয়াকান্দি, সোনাতলা ও ধুনট উপজেলার প্রায় এক লাখ মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। বাড়িঘর ছেড়ে লোকজন বাঁধে আশ্রয় নিয়েছে। একসাথে বিপুল সংখ্যক মানুষ বাঁধে আশ্রয় নেওয়ায় দুর্গত এলাকায় শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ খাবার পানির সংকট দেখা দিয়েছে। সারিয়াকান্দি ছাড়া অন্য দুটি উপজেলায় ত্রাণ তৎপরতা শুরু না হওয়ায় খেয়ে-না খেয়ে দিন কাটছে দুর্গত মানুষের। বন্যার পানি প্রবেশ করায় কমপক্ষে ৬৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠদান সাময়িক বন্ধ রাখা হয়েছে।

জানা গেছে, গত ২৪ ঘন্টায় যমুনা নদীর সারিয়াকান্দি পয়েন্টে ৫ সেন্টিমিটার পানি বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে বিপদসীমার ২৫ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিস সূত্রে জানা গেছে, নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ায় উপজেলার ৭টি ইউনিয়নের ৫০টি গ্রামের ১০ হাজার পরিবারের অর্ধ লাখ মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। বন্যায় তলিয়ে যাওয়ায় উপজেলার ৫১টি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ৬টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পাঠদান বন্ধ রাখা হয়েছে। উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিস সূত্রে জানা গেছে, বন্যায় উপজেলার সাড়ে তিন হাজার হেক্টর জমির পাট, আউশ, বীজতলা ও শাকসবজির ক্ষেত তলিয়ে গেছে। বন্যার কারণে যমুনা তীর সংরক্ষণ প্রকল্পের বয়রাকান্দি পয়েন্টে তীব্র ভাঙন দেখা দিয়েছে। প্রকল্প এলাকায় ভাঙন দেখা দেওয়ায় বয়রাকান্দি, ধলিরকান্দি ও বড়ইকান্দি গ্রামের লোকজন আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে। যমুনার ভাঙনে ইতিমধ্যে বয়রাকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও একটি এবতেদায়ী মাদ্রাসা নদী গর্ভে বিলীন হয়েছে। উল্লেখ্য, ২৬৩ কোটি টাকা ব্যয়ে রৌহাদহ থেকে কর্ণিবাড়ি পর্যন্ত ৬ কিলোমিটার যমুনার তীর সংরক্ষণ কাজ চলমান রয়েছে। উপজেলা কৃষি অফিসার শাহাদুজ্জামান জানান, উপজেলায় পাট, ধান, সবজী ও বীজতলাসহ ৩ হাজার ৩শ ৪০ হেক্টর জমির ফসল বন্যার পানিতে আক্রান্ত হয়েছে। তার মধ্যে ২ হাজার ৩০ হেক্টর জমির পাট, ১ হাজার ২শ ৫০ হেক্টর জমির আউশ ধান, ৩৫ হেক্টর জমির সবজি এবং ২৫ হেক্টর জমির বীজতলা বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। 

সারিয়াকান্দি উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা সারওয়ার আলম জানান, বন্যাকবলিত ১ হাজার পরিবারকে ২০ কেজি করে চাল বিতরণ করা হয়েছে। বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় পর্যাপ্ত ত্রাণ মজুদ আছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড বগুড়ার নির্বাহী প্রকৌশলী রুহুল আমীন জানান, বয়রাকান্দি পয়েন্টে নদীতীর জেগে উঠলে জিও ব্যাগ ডাম্পিং শুরু করা হবে। 

ধুনট উপজেলা যমুনা নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের অভ্যন্তরে ২ হাজার পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। উজান থেকে নেমে আসা পানিতে যমুনা নদীর তীর উপচে বাঁধের পূর্বতীরের গ্রাম গুলো প্লাবিত হয়েছে। বাঁধের পূর্ব তীরের পুকুরিয়া, ভূতবাড়ী, কৈয়াগাড়ী, ভান্ডারবাড়ী, বানিয়াজান, শিমুলবাড়ী, রাধানগর, মাধবডাঙ্গা, শহরাবাড়ী ও বৈশাখী চরের প্রায় ২ হাজার পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। পানিবন্দী এলাকার মানুষ যমুনা নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে আশ্রয় নিচ্ছে। ভান্ডারবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বেলাল হোসেন শ্যামল বলেন, ভান্ডারবাড়ী ইউনিয়নে যমুনা নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের অভ্যন্তরের গ্রামগুলোর মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। অধিকাংশ মানুষ বাঁধে আশ্রয় নিচ্ছে। এসব মানুষের জন্য বিশুদ্ধ খাবার পানি, স্বাস্থ্য সম্মত টয়লেট ও ত্রাণ সহায়তা প্রয়োজন। 

সোনাতলায় যমুনায় পানি বৃদ্ধি হওয়ায় পাট ও বীজতলাসহ এ পর্যন্ত ৫৩৫ হেক্টর জমির বিভিন্ন ফসল পানিতে ডুবে গেছে। উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা জিল্লুর রহমান জানান, ওয়াপদা বাঁধের পূর্ব পাশে তেকানী চুকাই নগর ও পাকুল্যা ইউনিয়নের ১২টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠদান স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান জানান, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানদের দেয়া তথ্যানুযায়ী পাকুল্যা ইউনিয়নে ১,১৫৭ পরিবার, তেকানী চুকাই নগর ইউনিয়নে ১,২৩৪ পরিবার ও মধুপুর ইউনিয়নের ৮০ পরিবারের মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। তিনি আরও জানান, জেলা প্রশাসক জিআর-এর ২০ মেঃ টন চাল বরাদ্দ দিয়েছেন। বিতরণ করার মতো পরিবেশ সৃষ্টি হলে বিতরণ করা হবে। 

বগুড়া জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা শাহারুল ইসলাম মোহাম্মদ আবু হেনা জানান, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত সারিয়াকান্দি উপজেলায় ত্রাণ হিসেবে নগদ এক লাখ টাকা রোববার বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।

গাইবান্ধা সংবাদদাতা : ফুলছড়ি উপজেলার উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। এতে করে উপজেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি ক্রমেই অবনতির দিকে যাচ্ছে। গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, গত শনিবার বিকেল ৫টা পর্যন্ত পূর্ববর্তী ২৪ ঘন্টায় ফুলছড়ি তিস্তামুখঘাট পয়েন্টে ব্রহ্মপুত্র নদের পানি ৮ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ১৪ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় ঝুঁকির মধ্যে থাকা ব্রহ্মপুত্র বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ এলাকায় বসবাসরত মানুষেরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে। সংস্কারের উদ্যোগ না নেওয়ায় ব্রহ্মপুত্র-যমুনার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ৪০টি পয়েন্ট অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। পানির চাপ বাড়লেই বাঁধের ওই অংশগুলো ভেঙে যাওয়ার আশংকা করা হচ্ছে। গত এক দশকে এ বাঁধটির ব্যাপক ক্ষতি হলেও এর সংস্কার বা মেরামত কাজ কোনটাই করা হয়নি। ফলে যেকোন সময় বাঁধের দুর্বল অংশগুলোতে পানির চাপ পড়লেই ভেঙ্গে যেতে পারে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, ব্রহ্মপুত্র বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের সুন্দরগঞ্জ হতে ফুলছড়ি হয়ে সাঘাটার জুমারবাড়ি পর্যন্ত গাইবান্ধা অংশে ৭৮ কি.মি. বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ রয়েছে।

 সাঘাটা উপজেলায় গত ৩ দিনে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ী ঢলে যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে বন্যায় রূপ নিয়েছে। উপজেলায় বন্যার পানিতে বিভিন্ন রাস্তাঘাট ও বসতবাড়ি নিমজ্জিত হয়ে পড়েছে। প্রতিদিন বন্যা কবলিত হয়ে পড়েছে নতুন নতুন অঞ্চল। তলিয়ে যাচ্ছে হাজার হাজার একর ফসলি জমি। 

 জানা গেছে, উপজেলার সাঘাটা ইউনিয়নের বাঁশহাটা, গোবিন্দী, হাসিলকান্দী, হাটবাড়ী, জুমারবাড়ী ইউনিয়নের ব্যাঙ্গারপাড়া, থৈকরেরপাড়া, পূর্ব-আমদিরপাড়া, কাঠুর, চান্দপাড়া, পূর্ব বসন্তেরপাড়া, নলছিয়া, পূর্ব জুমারবাড়ী, হলদিয়া ইউনিয়নের দিঘলকান্দী, পাতিলবাড়ী, গাড়ামারা সিপি, চরহলদিয়া সহ ২০টি গ্রামের প্রায় ১০ হাজার পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে এবং খেয়াঘাট থেকে ব্যাঙ্গারপাড়া সড়ক ভেঙ্গে চলাচলে অযোগ্য হয়ে পড়েছে এবং রাস্তা দিয়ে কোন প্রকার যানবাহন চলাচল করতে পারছে না।

 পায়ে হেঁটেই এসব গ্রামের মানুষ চলাচল করছে। এছাড়াও পাটক্ষেত ও ফসলের জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। কিছু বাড়ির আঙ্গিনায় পানি উঠেছে। ফলে তাদেরকে সাংসারিক কাজ করতে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। বন্যা কবলিত অনেক পরিবারই তাদের গরু, ছাগল, হাঁস-মরগিসহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে বিভিন্ন উঁচু রাস্তায় আশ্রয় নিয়েছে। এ ব্যাপারে কথা হলে সাঘাটা ইউপি চেয়ারম্যান মোশারফ হোসেন সুইট জানান, রাস্তাঘাট ও ফসলের জমি পানিতে তলিয়ে গেছে এবং জন সাধারণ কোন কাজ কর্ম করতে পারছে না।

 এভাবে বন্যার পানি বৃদ্ধি পেলে গোটা এলাকার বসতবাড়ি ও রাস্তাঘাট পানিতে নিমজ্জিত হয়ে পড়বে। এ ব্যাপারে সরকারীভাবে পদক্ষেপ গ্রহণ করার সার্বিক চেষ্টা করব। এছাড়াও বন্যা কবলিত এলাকায় নৌ ডাকাতির ঘটনা বৃদ্ধি পাওয়ায় মাইকিং করে রাত জেগে পাহারা দিচ্ছেন সাঘাটা ইউপি চেয়ারম্যান মোশারফ হোসেন সুইট। 

 এদিকে শনিবার গাইবান্ধা জেলা প্রশাসক গৌতম চন্দ্র পাল মোটরসাইকেল যোগে সাঘাটার জুমারবাড়ি থেকে সুন্দরগঞ্জ পর্যন্ত ৭৮ কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ সরেজমিন পরিদর্শন করেছেন। এসময় তার সাথে ছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক শফিকুল ইসলাম, গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মাহাবুর রহমান, পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী চন্দ্র শেখর, ফুলছড়ি উপজেলা চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান, ফুলছড়ি উপজেলা নির্বাহী অফিসার মুহাম্মদ আবদুল হালিম টলষ্টয়, সাঘাটা উপজেলা নির্বাহী অফিসার উজ্জল কুমার ঘোষ, ভরতখালী ইউপি চেয়ারম্যান শামছুল আজাদ শীতল, গজারিয়া ইউপি চেয়ারম্যান শামছুল আলম, উদাখালী ইউপি চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন, উড়িয়া ইউপি চেয়ারম্যান মহাতাব উদ্দিন প্রমুখ।

জামালপুর সংবাদদাতা : কয়েক দিনের অবিরাম বর্ষণ ও প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ী ঢলে নদী ও ব্রক্ষ্মপুত্র নদের পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। গত দুই দিনে যমুনা নদীর পানি বাহাদুরাবাদ ঘাট পয়েন্টে বিপদ সীমার ৩৫ সে.মি. উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। 

জামালপুর জেলার সার্বিক বন্যার পরিস্থিতি আরও অবনতি ঘটেছে। জেলার দেওয়ানগঞ্জ, ইসলামপুর, মেলান্দহ.মাদারগঞ্জ ও সরিষাবাড়ী এলাকায় নতুন করে প্লাবিত হয়ে লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্ধি হয়ে পড়েছে। এদিকে স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসাসহ বেশ কিছু শিক্ষা পতিষ্ঠান জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। 

বন্যাকবলিত এলাকার মানুষ উচু বাঁধে কিংবা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আশ্রয় নিচ্ছে। বন্যা কবলিত এলাকায়র মনুষসহ গ্রহপালিত গোবাদি পশু গরু, ছাগল, হাঁস মুরগি নিয়ে মানুষ পানি বন্দি হয়ে পড়েছে। মানুষের খাদ্যের পাশাপাশি গো খাদ্যের চরম সংকট দেখা দিয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ