ঢাকা, সোমবার 10 July 2017, ২৬ আষাঢ় ১৪২8, ১৫ শাওয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

হিন্দু ধর্মে গোমাংশ ভক্ষণের বিধি-বিধান

-মুহাম্মদ আব্দুস সালাম প্রধান
এমএম (ডাবল) বিএসএস (সম্মান), এমএমএস রাষ্ট্রবিজ্ঞান, এলএলবি (ঢাবি)
বর্তমান এই আধুনিক বিশ্বে সকল ধর্ম মতের মানুষ নিজেদের ধর্মের সাথে আচরণগত ও জ্ঞানগত সম্পর্ক চুকিয়ে ফেলেছে। বর্তমান বিশ্বের ধর্ম পালনকারী বা ধর্মালম্বী হওয়ার দাবীদার, এবং ধর্মীয় নেতাসহ অধিকাংশ মানুষ তাদের মূল ধর্ম শাস্ত্রের সাথেও সম্পর্ক ছেদ করেছে। বাংলাদেশে জন্মগ্রহণের সুবাদে একজন মুসলমান পরিবারের সন্তান বা মুসলমান হিসাবে প্রতিবেশী হিন্দুদের সাথে একসাথে বড় হয়েছি। তারা অনেকেই আমার ছোটবেলার খেলার সাথী এবং আমার নিজ সমাজের অংশ। ছোটবেলা থেকেই জেনেছি যে, হিন্দু সনাতন ধর্মাবলম্বীরা গরুর মাংস ভক্ষণ করে না। কিন্তু বড় হয়ে জানতে পেরেছি যে, হিন্দু ধর্মের নি¤œ বর্ণের মানুষ যেমন- মুচি, মুচার, (ঋষি) মেথর, পাটনী সম্প্রদায়ের মানুষ গরুর মাংস ভক্ষণ করে। আমার নিজ এলাকার (ঋষি) মুচার পল্লীর মানুষদের দেখেছি যে, তারা মৃত গরুর চামড়া ছিলে নেয়। মুচি সম্প্রদায়ের লোকদেরকে দেখেছি তারা মৃত গরুর গোশত কেটে নিয়ে যায়। শুনেছি তারা মৃত গরুর গোশত রান্না করে ভক্ষন করে। বাংলাদেশের অতি সুপরিচিত উপজাতি সাঁওতাল সম্প্রদায় যারা এখনও খ্রীষ্টান ধর্ম গ্রহণ করেনি তারা দুর্গাপূজা করে। উপজাতীয় সাঁওতালরা গরুসহ একপাটি দাঁত বিশিষ্ট, দুই পাটী র্দাত বিশিষ্ট, নখর যুক্ত এবং খুরযুক্ত সকল হিংস্র ও অহিংস্র প্রাণী শিকার করে এবং তার গোশত ভক্ষণ করে। বাংলাদেশের আরেকটি সুপ্রসিদ্ধ উপজাতি ওঁড়াও সম্প্রদায়ের লোকজন নিজেদেরেকে হিন্দু ধর্মের চর্তুবর্ণের অন্যতম ক্ষত্রীয় সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত হওযার দাবী করে। তারাও গরুসহ সকল হিংস্র, অহিংস্র ক্ষুরযুক্ত, নখরযুক্ত, প্রাণী ও পাখির গোশত বা মাংস ভক্ষণ করে। তাদের ধর্র্মীয় বিশ্বাসে এটাও আছে যে, তাদের দেবতার লিখিত একটি বাণী গাছের শুকনা পাতায় লেখা ছিল। ঐ পাতাটি একটি গরু খেয়ে ফেলে। সেই হিসাবে গরু একটি অপরাধী প্রাণী। প্রতি বৎসর ওঁড়াও সম্প্রদায়ের মানুষ বিভিন্ন এলাকায় একটি গরুকে পর্যাপ্ত পরিমাণ খাদ্য খাওয়ায়ে একটি নির্দিষ্ট দিনে পিটিয়ে হত্যা করে এবং ঐ হত্যাকৃত গরুটির মাংস রান্না করে খেয়ে গো-মাংস খাওয়ার উৎসব পালন করে। ঐ উৎসবটি তাদের ধর্মীয় কর্তব্য হিসাবে তারা পালন করে আসছে। যাহোক ছোট বেলায় নি¤œ শ্রেণীতে পড়ার সময় বাংলা এবং ইংরেজী পরীক্ষার খাতায় গরুর রচনা লিখেছি। আমাদের গোয়াল ঘরেও অনেক গরু ছিল এখানো আছে। গোয়াল ঘরের গাভী, বলদ, বাছুর এড়ে সকল গরুর সাথে এক ধরনের একটি মমত্ববোধ সৃষ্টি হয়। বিশেষত: আমার মধ্যে এ ধরনের মমত্ববোধ অত্যন্ত প্রবল। যা এখানো আছে। ছোট বেলায় বাড়ীর কোন গরু বিক্রি হলে বা জবেহ করা হলে আমি নীরবে কেঁদেছি। বিক্রিত বা জবেহকৃত গরুটির শোক সামলাতে অনেক সময় লেগেছে।
বর্তমান সময়ে সারা ভারত জুড়ে গো-মাংস খাওয়া এবং না খাওয়ার বির্তক প্রসঙ্গে:
বাংলাদেশে জন্ম গ্রহণকারী একজন মুসলমান হিসাবে বা মুসলমান ঘড়ের সন্তান হিসাবে ছোটবেলা থেকেই পবিত্র ঈদ-উল-আযহার সময় বাংলাদেশে অনেক গরু কোরবানী বা জবেহ হতে দেখেছি। বৎসরের অন্যান্য সময়েও আমাদের দেশে গরু জবেহ করা হয়। আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষ গরুর গোশত ভক্ষনে অভ্যস্ত। বাংলােেশর বাহিরেও সমগ্র আমেরিকা মহাদেশ, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া প্রভৃতি দেশে দৈনন্দিন প্রচুর পরিমাণ গরু জবেহ করা হয়। বিশেষত: শীত প্রধান দেশ সমূহে গরুর মাংস একটি জরুরী খাদ্য হিসাবে বিবেচিত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে দৈনন্দিন লক্ষাধিক গরু যান্ত্রিক উপায়ে জবেহ করে সমগ্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সরবরাহ করা হয় মর্মে জানতে পেরেছি। সমগ্র ভারতবর্ষ ব্যতিরেকে সারা দুনিয়ার এহুদী, খ্রীস্টান, ইসলাম ধর্মের অনুসারীগণ এবং ধর্মহীন অনেক জাতী, উপজাতি অবাধে গো-মাংস ভক্ষণ করে। ভারতবর্ষ ছাড়া গরুর গোশত খাওয়া নিয়ে কোন রাষ্ট্রে কোন বৈরীভাব বা ধর্মীয় ভাবাবেগ সৃষ্টি হয়েছে, এমন কোন তথ্য পাওয়া যায় নাই।
গরুর মাংস ভক্ষন কি প্রকৃতপক্ষে হিন্দু ধর্ম মতে অপরাধ? : পৃথিবীতে অল্প কিছু ধর্মের অনুসারী আছে যারা কোন ধরনের মাংস বা আমিষ জাতীয় খাবার খায় না। তারা নিরামিষ ভোজী। তারা জীব হত্যা মহাপাপ মনে করে। শাক সবজী, দুধ, মাখন, প্রভৃতি খাবার খেয়ে তারা জীবন অতিবাহিত করে। ভারতের জৈন ধর্মালম্বীরা এই শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। জৈনরা নিরামিষ ভোজী হলেও তারা গরুকে দেবতা হিসাবে মনে করে না বা তারা গরু পুঁজারীও নয়। ইসলাম, খ্রীষ্টান ধর্ম এবং ইহুদী ধর্মে গরু কোরবানী বা জবেহ ধর্মীয় ভাবেই বৈধ। সেই হিসাবে গরুর গোশত খাওয়াও বৈধ। ইসলাম ধর্ম ও ইহুদী ধর্মে শুকুরের মাংস খাওয়া ধর্মীয়ভাবে হারাম বা অবৈধ ঘোষনা করা হয়েছে। কিন্তু খ্রীষ্টান ও হিন্দু ধর্মে শুকুরের মাংস ভক্ষন বৈধ। বর্তমানে ভারতে বিজিপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর সারা ভারত জুড়ে এক শ্রেণীর উগ্র হিন্দু ধর্মালম্বী গো-রক্ষা নামধারীর উত্থান ঘটেছে। তারা তাদের ধর্মের কোনরূপ শাস্ত্রীয় উদ্ধৃতি ছাড়াই গরু বা গাভীকে গো-মাতা বা গো-দেবতা হিসাবে প্রচার চালাচ্ছে। তার অংশ হিসাবে গো-মাতা বা গরু বিক্রয় বা জবেহ করা বা বলী দেওয়া এবং গরুর মাংস ভক্ষন করাকে হত্যাযোগ্য অপরাধ হিসাবে নিজেরাই আইন প্রনয়ন করে সেই আইনে অসংখ্য মানুষকে নিপীড়ন, জুলুম, অত্যাচার হয়রানী করছে। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানসহ সমগ্র বিশ্বের মানবাধিকার সংগঠন এর কর্তা ব্যক্তিরা এবং ইসলাম, হিন্দু ধর্ম, খ্রীস্টান ধর্ম এবং অন্যান্য ধর্মের ধর্মবেত্তারা এই নরপশুদের বর্বর আচরণের তেমন কোন প্রতিবাদ বা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে ব্যর্থ হচ্ছে। বর্তমানে ভারতে মানুষের জীবনের চেয়ে গরুর জীবনের মূল্য অনেক বেশি বলে ধরা হচ্ছে। ইসলাম ধর্মে শূকরের মাংস খাওয়া নিষিদ্ধ। উপমাহাদেশে ভারত ও পাকিস্তান দুইটি মুসলিম সংখ্যা গরিষ্ট রাষ্ট্র। এই দুই রাষ্ট্রের এবং ভারতের মুসলমানরা শূকরের মাংস খাওয়ার নিষেধাজ্ঞা নিজেদের মধ্যে সীমাবাদ্ধ রেছেন। ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান এই ৩টি রাষ্ট্রে সুদূর অতীতকাল থেকে বিশাল একটি জনগোষ্ঠী শুকুরের মাংস ভক্ষণ করে শূকরের মাংস ভক্ষনে মুসলমানরা কোনদিনই ইসলাম ধর্মের অনুসারীদের বাহিরের কোনো মানুষকে কোনদিনই বাধা সৃষ্টি করেন নাই। ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান এর সামগ্রিক জনগোষ্ঠির বিশাল একটি অংশ মুসলমান এবং খ্রীস্টান। তাদের ধর্ম তাদেরকে গরুর মাংস ভক্ষনের অনুমতি দিয়েছে। তারা সুদুর অতীতকাল থেকে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটানের জনগণ গরু পালন করছেন। গরুর দুধ, গোশত, খাদ্য হিসাবে ব্যবহার করছেন। গরুর চামড়া দ্বারা জুতাসহ নানাবিধ সাংসারিক প্রয়োজনীয় সামগ্রী উৎপাদনে ব্যবহার এবং বাজারজাত করছেন। এক্ষেত্রে অতীতে উপমহাদেশের কোথাও কোন ধর্মেয় মানুষকে বাধা সৃষ্টি করা হয় নাই। আমার জানামতে ভারতের কেরালা রাজ্যের সংখ্যা গরিষ্ট হিন্দু জনগোষ্ঠী দীর্ঘকাল যাবৎ গরুর মাংস খাদ্য হিসাবে ভক্ষন করেন। সেখানে কোনদিনই গরুর মাংস ভক্ষণ ধর্মীয় অপরাধ হিসাবে বিবেচিত হয় নাই। বর্তমান বিজেপি সরকার ভারতে ক্ষমতায় আসার পর উগ্র, ধর্মান্ধ এবং হিন্দু শাস্ত্রে জ্ঞানহীন এবং শ্রেণীর বর্বর নরপশু গোরক্ষা কমিটির লেবাস ধারণ করে গরুকে দেবতা এবং গাভীকে গো-মাতা বানিয়ে ইচ্ছামত প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে ভারত জুড়ে গোমাংস খাওয়ার অভিযোগ তুলে তারা ভারতের বিভিন্ন স্থানে নিরীহ মুসলমানদের উপর একাধিক বর্বর হামলা করেছে। ইতিপূর্বে আখলাকুর নামের এক মুসলমানকে তার বাড়ীতে গরুর মাংস রান্না করা হয়েছে মর্মে অভিযোগ তুলে পিটিয়ে হত্যা করেছে এবং তাকে হত্যা করা বৈধ হয়েছে মর্মে ভারতের একজন প্রভাবশালী বিেিজপি নেতা সাফাই গেয়েছেন। পরবর্তীকালে মৃত আখলাকুর রহমানের বাড়ী হইতে উদ্ধারকৃত গোশত কিসের গোশত ছিল তা পরীক্ষার জন্য ফরেনসিক বিভাগে পাঠানো হয়। ফরেনসিক রিপোর্টে দেখা যায় যে, ঐ গোশত ছাগলের গোশত ছিল। কয়েকদিন পূর্বে ভারতের ঝারখন্ড রাজ্যে জনৈক আলিমুদ্দিন তাহার গাড়ীতে করে কিছু গোশত ক্রয় করে বাড়ীতে ফেরার পথে গো-রক্ষা কমিটির নর পশুদের দ্বারা আক্রান্ত হন। উক্ত নর পশুরা তার গাড়ীটি ভাংচুর করে জ্বালিয়ে দেয় এবং আলিমুদ্দিনকে পুড়িয়ে মারে। উক্ত হত্যার নেতৃত্ব দেন স্থানীয় বিজেপি নেতা নিত্যানন্দ মাহাতো। বর্তমানে ভারতীয় পুলিশ তাহাকে গ্রেফতার করেছে বলে জানা গেছে। এহেন হতাকান্ডের নিন্দা জানানোর ভাষা আমাদের নেই। আখলাকুরকে হত্যার পর এক বিজেপি নেতা সদম্ভে প্রশ্ন রেখেছেন যে, সৌদি আরবে শুকর জবেহ করা হলে তারকি সহ্য করা হত? যদি কোন অসমুসলিম সৌদি আরবে কোন অমুসলিম শূকর হত্যা করে খায় তাতে ইসলাম ধর্মের অনুসারীগণ বাধা দিবে এমন কোন বিধান ইসলাম ধর্মে আছে বলে আমার জানা নাই।
হিন্দু ধর্মে গো-মাংস খাওয়া বা না খাওয়ার বিধান : সনাতন (হিন্দু) ধর্মের সুপ্রাচীন এবং শ্রদ্ধার সাথে অনুসরনীয় বিশ্বস্ত ধর্মগ্রস্থ বিষ্ণু পুরান। বিষ্ণু পুরানের ষোড়শ অধ্যায় বা ১৬তম অধ্যায়ে কোন হিন্দু ব্যক্তির মৃত্যুর পরে তার বংশধর গণ কর্তৃক শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠানের জন্য একটি খাদ্য তালিকা দেয়া আছে। কোন খাদ্য দ্বারা শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠানে আগত ব্রাক্ষণ বা অতিথিদের আপ্যায়ন করা হলে মৃত ব্যক্তিগণের আত্মা পরিতৃপ্ত থাকেন তার একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা বিষ্ণু পুরানের ১৬তম অধ্যায়। শ্রাদ্ধের খাদ্য তালিকার মুল সংস্কৃতি শ্লোক ও অনুবাদসহ উল্লেখ করা হলো।
ষোড়শ: অধ্যয়
হবিষ্য-মৎস্য-মাংসৈ¯ত্ত শশস্য শকুনস্য চ।
শৌকরচ্ছাগলৈরৈণৈরৌবৈর্গবয়েন চ।। ১
ঔরভ্রগব্যৈশ্চ তথা মাসবৃদ্ধ্যা পিতামহাঃ।
প্রয়াঅন্তি তৃপ্তিং মাংসৈ¯ত্ত নিত্যং বাধ্রীণসামিষৈঃ।।২
খড়গমাংসমতীবাত্র কালশাকং তথা মধু।
শস্তানি কর্ম্মণ্যত্যন্ত-তৃপ্তিদানি নরেশ্বর।। ৩
ষোড়শ অধ্যায়
[শ্রাদ্ধে মধু-মাংসাদি দানফল এবং ক্লীবাদি দ্বারা শ্রাদ্ধ দর্শন দোষ বর্ণন]।
ঔর্বব্ বলিলেন,-শ্রাদ্ধের দিনে ব্রাক্ষণদিগকে হবিষ্য করাইলে পিতৃগণ একমাস পর্য্যন্ত পরিতৃপ্ত থাকেন, মৎস্য প্রদানে দুইমাস, শশকমাংস প্রদানে তিন মাস, পক্ষিমাংস প্রদানে চারি মাস, শূকরমাংস প্রদানে পাঁচ মাস ছাগ-মাংস প্রদানে ছয় মাস’ ত্রণ (মৃগবিশেষ) মাংস দিলে সাত মাস, রুরুমৃগমাংস প্রদান করিলে আট মাস, গবয়মাংস প্রদানে নয় মাস, মেষমাংস প্রদানে দশ মাস, গোমাংস প্রদান করিলে এগার মাস পর্য্যন্ত পিতৃগণ পরিতৃপ্ত থাকেন। পরন্ত
যদি বাধ্রীণস* মাংস দেওয়া যায়, তাহা হইলে পিতৃলোক চিরদিন তৃপ্ত থাকেন। হে রাজন! গন্ডারের মাংস, কৃষ্ণ শাক ও মধু –এই সমূদায় দ্রব্য শ্রাদ্ধকর্ম্মে অত্যন্ত প্রশন্ত ও অত্যন্ত তৃপ্তিদায়ক।
পৃষ্ঠা নং-২২৯-২৩০
শ্রী মহর্ষি বেদব্যাস প্রনীত বিষ্ণু পুরান।
আচার্য্য পঞ্চানন তর্করতœ সম্পাদিত প্রকাশক নবভারত পাবলিকার্স ৭২ মহাত্মা গান্ধী, রোড কলিকাতা ভারত। প্রকাশ কাল ১৩৯০ বাংলা।
সনাতন হিন্দু ধর্মের বিধি বিধান বা ফিকাহ শাস্ত্র হিসাবে বিবেচিত গ্রন্থ মনুসংহিতার পঞ্চতম অধ্যায়ে ভক্ষ ও অভক্ষ মাংস বা মাংস ভক্ষনের বিধি বিধান বর্ণনা করা আছে।
শ্লোক নং-।।১৭।। এব এবং।। ১৮।। বাংলা অনুবাদসহ মুল সংস্কৃত শ্লোক উদ্বৃত করা গেল।
ন ভক্ষয়েদেকচরানজ্ঞাতাংশ্চ মৃগদ্বিজান॥
ভক্ষ্যেদ্বপি সমুদিষ্টান সর্বান, পঞ্চনখাংস্তথা।। ১৭।।
অনুবাদ একচর প্রার্ণী (যেমন, সাপ, পেঁচা প্রভৃতি), এবং অজানা মৃগ (অর্থাৎ পশু) ও পাখী ভক্ষণ করবে না॥ আবার সামান্য ও বিশেষ রূপে নিষেধ না থাকায়, পঞ্চনখ প্রাণীও (যাদের পাঁচটি করে নখ আছে, যেমন, বানর, শৃগাল, প্রভৃতিও) ভক্ষণ করবে না।।১৭।।।
শ্বাবিধং শল্যকং গোধাং খড়গকুর্মশশাংস্তা।
ভক্ষ্যান্ পঞ্চনখেদ্বাহুরনষংশৈচকতোদতঃ।। ১৮।।
অনুবাদ : পঞ্চনখ প্রাণীদের মধ্যে শ্বাবিধ (শজারু), শল্যক, গোধা অর্থাঃ গোসাপ, গন্ডার, কুর্ম (কচ্ছপ), শশক (খরগোস)-এই ছয়টি ভোজন করা যায়। একতোদৎ অর্থাৎ এক পাটী দাঁত বিশিষ্ট পশুদের মধ্যে উট ছাড়া অন্যান্য প্রাণীর (যথা, গরু, মেষ, ছাগল, হরিণ) মাংস ভোজ্যরূপে গ্রহণ করা যায়।।। ১৮।।
শ্রাদ্ধের জন্য নিবেদিত মাংস যদি শ্রাদ্ধ কারী স্বয়ং ভক্ষন না করেন তার কি পরিমান পাপ হয় বা মৃত্যুর পর তার কি শাস্তি হয় তার বর্ণনা পঞ্চম অধ্যায়ের।। ৩৫।। তম শ্লোকে বলা আছে। সংস্কৃত মুল শ্লোকটি বাংলা অর্থসহ উদ্ধৃত করা গেল।
নিযুক্ত¯ত্ত যথান্যায়ং যো মাংসং নাত্তি মানবঃ।
স প্রেত্য পশুতাং যাতি সম্ভবানেকবিংশতিম॥।৩৫।।
অনুবাদ : যে মানুষ শ্রাদ্ধে দেবলোক ও পিতৃলোকে যথাবিধি মাংস নিবেদন করে ঐ মাংস ভোজন না করে, সে মৃত্যুর পর একুশ জন্ম পশুযোনি প্রাপ্ত হয়। (সম্ভব শব্দেৃর অর্থ জন্ম)।। ৩৫।।
অর্থাৎ যদি কোন ব্যক্তি গোমাংশ দ্বারা তাহার মৃত পিতৃ পুরুষের শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠান করেন আর স্বয়ং গোমাংশ ভক্ষণ না করেন সে মৃত্যুর পর অন্তত কুড়ি বার পশুযোনীসহ জন্ম গ্রহণ করবে। অর্থাৎ পশু হিসাবে জন্ম গ্রহণ করবে।
সনাতন হিন্দু ধর্মের অত্যন্ত বিশস্ত ২টি মূল ধর্মগ্রন্থ’ থেকে আমি একথা প্রমাণ করতে পেরেছি যে, সনাতন ধর্মমতে গো বলীদান এবং গো-মাংস ভক্ষণ ধর্মীয়ভাবে স্বীকৃত। শুধু স্বীকৃতই নয় বরং পরলোকগত পিতৃ পুরুষের আত্মার মুক্তি কামনার জন্য শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠানে হিন্দু ধর্মের সর্বাপেক্ষা উচ্চ বর্ণের অধিকারী এবং ধর্মীয় গুরু ব্রাক্ষনগণকে গো মাংস দ্বারা আপ্যায়ন করালে ১১ মাস যাবৎ মৃত ব্যক্তির আত্মা পরিতৃপ্ত থাকে।
উল্লেখ্য যে, একথাও সত্য যে, কোন ব্যক্তি রাগ বা ক্রোধের বশবর্তী হয়ে ধর্মীয় কারণ বা প্রয়োজন ছাড়া গোহত্যা হিন্দু ধর্মে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। যদি কোন ব্যক্তি উক্তরূপ কার্য করে তার প্রাশ্চয়িত্বের বিধান মনুসংহীতায় নির্দ্ধারণ করা আছে। মনুসংহীতায় গো হত্যার বদলে কোনভাবেই কোন মানুষ হত্যার বিধান নাই। মনুসংহিতার একাদশ অধ্যায়ের ১০৯-১১৬ নং শ্লোকে অন্যায়ভাবে গো-হত্যার প্রাশ্চয়িত্ব বা শাস্তির বিধান বর্ণনা করা আছে। মূল সংস্কৃত শ্লোক ১০৯-১১৬ বাংলা অর্থসহ উদ্ধৃত করা হল ঃ
উপপাতকসংযুক্তো গোঘেœা মাসং যবান্ পিবেৎ।
কৃতবাপো বসেদগোষ্ঠে চর্মণা তেন সংবৃতঃ।। ১০৯।।
চতুতর্থকালমশ্বীদায়ক্ষারলবণং মিতম।
গোমূত্রেণ চরেৎ ম্লানং দ্বৌ মাসৌ নিয়তেন্দ্রিয়ঃ।। ১১০।।
দিবানুগচ্ছেদ্গাস্তা¯ত্ত তিষ্ঠান্নর্দ্ধং রজৎ পিবেৎ”।
শুশ্রুষিত্বা নমস্কৃত্য রাত্রৌ বীরাসনং বসেতৎ।। ১১১।।
তিষ্ঠন্তী যষবুতিষ্ট ও ব্রজন্তী স্বপ্য ব্রজেৎ।
আসাীনাসু তথাসীনো নিয়তো বীতমৎসরঃ।। ১১২।।
আতুরামভিশস্তাং বা চৌরব্যাঘ্রাদিভির্ভয়ৈঃ।
পতিতাং পঙ্কমগ্রাং বা সর্বোপায়ের্বিমোচয়েৎ।।১১৩।।
উষ্ণে বষৃতি শীতে বা মারুতে বাতি বা ভৃশম।
ন কুর্বীতাতœনস্ত্রাণং গোরকৃত্বা তু শক্তিচ।। ১১৪।।
আতমনো যদি বান্যেষাং গৃহে ক্ষেতেহথবা খলে।
ভক্ষয়ন্তীং ন কথয়েৎ গৃহে ক্ষেতেহধবা খলে।
ভক্ষয়ন্তীং ন কথয়েৎ বিবসন্তঞ্চৈব বৎসকম্।। ১১৫।।
অনেনন বিধনা যস্তু গোঘেœা গামনুগচ্ছতি।
স গোহত্যাকৃতং পাপং ত্রিভির্মাসৈর্ব্যপোহিতি।। ১১৬।।
মনুসংহিতা
অনুবাদ: গোহত্যা করে যে লোক উপপাতকগ্রস্ত হয়, সে একমাস যবমন্ড বা যবের ছাতু আহার করবে এবং কৃতবাপ অর্থাৎ মুন্ডিত মস্তক ও ছিন্নশ্মশ্রু হয়ে গোরুর চামড়ার দ্বারা আচ্ছাদিতদেহে গোরুর গোষ্ঠে বাস করবে।।। ১০৯।।
চতুর্থকালে অর্থাৎ একদিন বাদ দিয়ে দ্বিতীয় দিনের সায়ংকালে অকৃত্রিম সৈন্ধবাদি-লবণ-যুক্ত পরিমিত অন্ন ভোজন করবে। দুই মাস কাল সংযতেন্দ্রি হয়ে (প্রাতঃ মধ্য্হা এবং সায়াহ এই তিন বার] গোমূত্রে ম্লান করবে।। ১১০।।
যে গোষ্ঠে বাস করবে দিবাভাগে সেখানকার গোরুগুলি যখন বিচরণ করতে যাবে তখন সেগুলির পিছনে পিছনে যাবে, দাড়িয়ে থেকে তাদের খুরোত্থিত ধুলি পান করবে। রাত্রি হলে তাদের সেবা করে এবং নমস্কার করে বীরাসন হয়ে থাকবে।
[যে সব গোরুর নিকট বাস করতে হবে সেগুলি যখন চরতে যাবে তাদের পশ্চাৎ পশ্চাৎ যাবে। এখানে “তাঃ’’ এই “তদ্’’ শব্দের দ্বারা যাদের [যে গরুগুলিরঃ বাসস্থানে প্রায়শ্চিত্তকারী বাস করবে সেই গোরুগুলিকেই বোঝান হয়েছে। কাজেই সেগুলি ছাড়া অন্য যে সব গরু যেতে থাকবে তাদের অনুমগমন করতে হবে না। সেই গোরুগুলির দ্বারা যে “রজঃ’’=ধুলি উত্থাপিত হয়ে উপরে উঠবে তা যেতে যেতে পান করিবে। এইভাবে একই স্থানে ঐ গরুগুলির সাথে সারাদিন বেড়িয়ে আবার তাদেরই সাথে গোষ্ঠে ফিরে আসবে। “শুশ্রƒষিত্বা’’= সেবা করে; গা চুলকিয়ে দেওয়া, শরীরের কৃমিকীটাদি টেনে, ধুলো ঝেড়ে দিয়ে ইত্যাদি প্রকারে সেবা করে। “নমস্কৃত্য”= জানু এবং মস্তক নত করে প্রণাম করে “বীরাসনঃ বসেৎ” = গৃহভিত্তি কিংবা শয্যা প্রভৃতি অবলম্বন না করে যে উপু হয়ে বসে থাকা তাই বীরাসন। ]।। ১১।।
সেই গোরুগুলি দাঁড়িয়ে থাকলে নিজেও দাঁড়িয়ে থাকবে’ তারা চলতে থাকলে নিজেও চলতে থাকবে এবং তারা বসলে নিজেও বসবে-সংযতচিত্ত এবং লোভাদিশুন্য হয়ে এই সব কাজ করবে।।। ১১২।।
কোন একটি গোরু যদি ব্যাধিগ্রস্ত কিংবা চৌরব্যাঘ্র্যাদির দ্বারা আক্রান্ত হয়ে কাতর হয়, কিংবা পড়ে যা অথবা পাকে পুতে যায় তা হলে তাকে সর্বশক্তি প্রয়োগ করে, এমনকি নিজ প্রাণ দিয়ে রক্ষা করবে।।। ১১৩।।
গ্রীষ্মে [ সুর্য প্রচন্ড উত্তাপ দিতে থাকলে ] বর্ষায় (বর্ষতি = বৃষ্টি পড়তে থাকলে ] কিংবা শীতে অবা প্রবলভাবে ঝড় বইতে থাকলে নিজের শক্তি অনুসারে গোরুকে রক্ষা না করে নিজেকে রক্ষা করবে না বা কোথাও আশ্রয় নেবে না।। ১১৪।।।
নিজের অথবা অন্যের বাড়ীতে, ক্ষেতে কিংবা খামারে যদি ঐ গোরু শস্যাদি ভক্ষণ করে কিংবা তার বাছুর যদি তার দুধ পান করতে থাকে তাহলে ঐ গোরুটিকে বাধা দেবে না এবং গৃহস্বামীকে ডেকে ঐসব ব্যাপার বলে দেবে না।। ১১৫।।
গোহত্যাকারী ব্যক্তি এই রকম নিয়মে তিন মাস গোরুর সেবা করতে থাকলে সে গোহত্যা জনিত পাপ থেকে মুক্ত হয়।।। ১১৬।।
উল্লেখিত উদ্ধৃত অংশে অন্যায়ভাবে গো-হত্যাকারীকেও হত্যার কোন বিধান উল্লেখ নাই এবং উক্ত প্রায়শ্চিত্তে যে অপরাধ করেছে। সে নিজেই করবে। তা করাতে বাধ্য করার জন্য কাউকে কোন ক্ষমতা অর্পণ করা হয় নাই।
মুনসংহিতা, সম্পাদনা ও অনুবাদ
ডা. মানাবেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় শাস্ত্রী
শ্রী বলরাম প্রকাশনা ১০১-বি
স্বামী বিবেকান্দ রোড
 কলকতা-৭০০০০০৬
প্রকাশকাল ১৪১২।
হিন্দু শাস্ত্রের পবিত্র হিসেবে বিবেচিত গ্রন্থই গরুকে গো-মাতা বা গো- দেবতা হিসাবে উপস্থাপন বা উল্লেখ করা হয় নাই। বরং হিন্দু ধর্মে আদিধর্ম গ্রন্থ বেদ-এর বিভিন্ন প্রার্থনার স্লোকে পূর্বেকার মনিঋষিগণ  গরুকে সম্পদ হিসাবে প্রার্থনা করিয়াছেন। সম্প্রতি প্রতিবেশী ভারতে দেখা যাচ্ছে যে, হিন্দু শাস্ত্রের সহিত সম্পর্কহীন কিছু গন্ড মুর্খ সাধু এবং আরএসএস ও বিজেপি নেতা পরিচয় দানকারী ব্যক্তি গরু এবং গাভীকে তাহাদের গোমাতা দেবী বা গো-দেবতা হিসাবে জোরপূর্বক প্রতিষ্ঠিত করার অপতৎপরতায় লিপ্ত আছেন। সম্প্রতি ভারত থেকে একটি ভিডিও ক্লিপ ইউ.টিউপে ভাইরাল হয়। তাতে দেখা যায় যে, কয়েকজন হিন্দু ব্যক্তি নিজেদের ধর্মের প্রতি অনুরাগ প্রকাশ করতে গিয়ে প্রস্রারত গরুর পিছনে পানির খাওয়ার গ্লাস ধরে গোমুত্র সংগ্রহ করে অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে পান করছেন এবং কয়েকটি গরুকে বর কনের মত সুন্দরভাবে সুসজ্জিত করে কতিপয় গেরুয়া পোশাকধারী সাধু প্রনাম জানাচ্ছেন। সৃষ্টির সেরাজীব মানুষের এহেন ঘৃণিত রুচি ও অধঃপতন দেখে অনেক দুঃখ হয়। সমগ্র ভারত বর্ষে হাজার হাজার বছর ধরে গরু, গাভী, খাদ্য, যান বাহন, হালচাষ এর সহায়ক পশু হিসাবে ব্যবহার হয়েছে। ভারতের অনেক এলাকায় অনেক গরু পালনকারী নিরীহ জনগণ প্রতি বৎসর গরু পালন করে বিক্রয় ক্রয় করে কোটি কোটি রোজগার করে পরিবার পরিজন প্রতিপালন করেছেন। বর্তমানে জানা যাচ্ছে যে, ভারতে গরু বিক্রয় এবং গরু জবেহ অনেক স্থানে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সবচেয়ে পরিতাপের বিষয় হলো এই যে, কোন কোন রাজ্যের হাইকোর্ট গোমাংস ভক্ষণ ও বিক্রয় নিষিদ্ধের বিষয়ে রায় দিয়াছেন। এদের সম্পর্কে আল্লাহ্ তায়ালা পবিত্র ও কোরআনে পাকে ঘোষণা করেছেন যে, এই সমস্ত লোকজন পশুতুল্য কিংবা পশুর চেয়ে নিকৃষ্ট !।
গরু বা গভীকে গো-মাতা দেবী বা গো-দেবতা সাব্যস্ত করার জন্য বিষ্ণু পুরান জালিয়াতি : ভারতীয় আইনে বা হিন্দু ধর্মের বিধানে গো-মাংস ভক্ষন ক্রয় বিক্রয় বৈধ। এ বিষয়ে আমি বাংলাদেশ ভারতের সমস্ত হিন্দু ধর্ম শাস্ত্রবিদ ও আইনজ্ঞদের প্রতি চ্যালেঞ্জ ঘোষণা করছি। তারা গরু এবং গাভীকে দেব দেবী এবং গরুর মাংস ভক্ষণ নিষিদ্ধতা প্রমাণ করুক। আইন ও ধর্মে নিষিদ্ধ না থাকা সত্ত্বেও গো-হত্যার মিথ্যা অভিযোগে ভারত বর্ষের এক শ্রেণীর ধর্মান্ধ, নরপশু ইতিমধ্যে অনেক নীরিহ মুসলমানের জীবন সংহার করেছে। ভবিষ্যতে আরো কত নিরীহ মানুষের প্রাণ এরা কেড়ে নেবে তার পরিসংখ্যান এই মুহুর্তে করা সম্ভব নয়। এই সমস্ত গোরক্ষাকারী নামধারীদের পৃষ্ঠপোষক হিসাবে ভারতবর্ষের কলিকাতা থেকে জালিয়াতী পূর্ণভাবে একটি বিষ্ণু পুরান প্রকাশ করা হয়েছে। শেষ নবী মুহাম্মদ (সাঃ) এর আগমনের পূর্বে এহুদী এবং খ্রীষ্টানরা যেভাবে তাওরাত ও ইঞ্জিলগ্রন্থ’ কাটছাঁট বা রদবদল করেছেন এবং নিজেদের স্বার্থে উক্ত কাটছাঁট করা ধর্মগ্রন্থ ব্যবহার করেছেন। তারই আদলে বাংলা ১৪১০ সালে মুদ্রিত বৃহৎ সচিত্র বিষ্ণু পুরান এর একটি কপি সম্প্রতি আমি সংগ্রহ করি। যা কবিতা আকারে শ্রী বেনী মাধব শীল, ডক্টর অব ধর্ম, বেনারস কর্তৃক পরিমার্জিত ও পরিবর্দ্ধিত উল্লেখ্যে প্রকাশ করা হয়েছে। উক্ত বিষ্ণু পুরান এর তৃতীয় খন্ডে শ্রাদ্ধবিধি অধ্যায়ে শ্রাদ্ধীয় মাংস নিরূপণ অধ্যায়টি নিম্নরূপ:
ষোড়শ অধ্যায়
শ্রাদ্ধীয় মাংস নিরূপণ।
ঔর্বব কহেন শুন শুন ওহে নরপতি।
শ্রীবিষ্ণপুরাণ কথা মধুর ভারতী।।
যেইরূপ মাংস আর মাংসের দ্বারায়।
পিতৃগণ মনে মনে মহাতৃপ্তি পায়।।
সেই কথা তব পাশে করিব কীর্ত্তন।
অবহিতে মন দিয়া গুনহ রাজন।।
শশক শকুল ছাগ অরণ্য-শূকর।
রুরুমৃগ ও হরিণ ওহে নরবর।।
বা ধ্রীনস মেষ আর গন্ডার গবয়।
পিতৃগণ-প্রীতিপ্রদ এই সব হয়।।
কাল শাক মধু যদি করহ অর্পণ।
তাহে মহাতুষ্ট হন যাত পিতৃগণ।।
গয়াতীর্থে গিয়া যেই অতি ভক্তি ভরে।
পিতৃগণ উদ্দেশেতে পি-দান করে।।
তাহার উপরে তুষ্ট হয় পিতৃগণ।
নিশ্চয় সফল তার মানব জনম।।
নীবার শ্যামক ধান্য যব আদি করি।
শ্রাদ্ধেতে প্রশস্ত হয় জানিবে বিচারি।।
পৃষ্ঠা নং-১৭৩
ঊদ্ধৃত অংশে মাংসের তালিকা থেকে গো-মাংসকে বাদ দেয়া হয়েছে। জানিনা ভবিষ্যতে এই আহলে গরু বা গরু ভক্তদের জন্য হিন্দু ধর্মীয় নতুন প-িতগণ আরো কি কি ধরনের শাস্ত্র সংশোধনের বা পরিমার্জনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। উদ্ধৃত অংশে কান মাংসের দ্বারা পরলোকগত পিতৃগণ কতদিন সন্তষ্ট থাকেন।
তার বর্ণনাও বাদ দেওয়া হয়েছে। অতি পরিমার্জিত অবস্থায় বইটি প্রকাশিত হয়েছে। মনে হচ্ছে এই নূতন ধর্মবেত্তা, সংকলক ও সম্পাদনকারী পরিমার্জনের বিশেষ গুরু দায়িত্ব পালন করিয়া তাহার সর্বপ্রকার পাপ মোচনের পথ প্রশস্ত করিয়াছেন।
পরিশিষ্ট :
পরিশেষে আমি বাংলাদেশ ভারত তথা সারা বিশ্বের বিবেকবান ধর্মপ্রাণ এবং মানব দরদী মানবতাবাদী ব্যক্তিবর্গ এবং ধর্ম গুরু, ধর্মবেত্তা সকলের নিকট আবেদন জানাচ্ছি যে, আসুন এই জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিক্ষার চরম উৎকর্ষের যুগে সৃষ্টির সেরা জীব মানব জাতিকে গরুর মতো একটি প্রাণীর গোশত খাওয়ার অপরাধে কাল্পনিক মিথ্যা ধর্মীয় ভাবাবেগ উস্কে দিয়ে যেভাবে হত্যা, জুলুম হয়রানী করা হচ্ছে তার বিরুদ্ধে সোচ্চার হই এবং ঐসব পশুদের বিরুদ্ধে সম্মিলিতভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলি।
সম্প্রতি ইসলাম ধর্মের নাম ব্যবহার করে তথাকথিত আইএস যেভাবে মধ্যপ্রাচ্যসহ সারাবিশ্বে অসংখ্য নিরাপরাধ মানুষের মু-চ্ছেদ করেছে। তাদেরকে ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী সম্মিলিত ঐকমত্যের ভিত্তিতে অনেকটা প্রতিরোধ করতে সমর্থ হয়েছে। অচিরেই তাদের অস্তিত্বের পরিসমাপ্তি হবে বলে আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি। একইভাবে এসব উগ্র গরু প্রেমিক নামধারীকে প্রতিরোধ করতে হবে এবং এই প্রতিরোধের মাধ্যমে সৃষ্টির সেরা জীব মানুষের মান মর্যাদা সংরক্ষন করতে হবে। সারা দুনিয়ার বিবেকবান মানুষকে এ ব্যপারে অগ্রনী ভুমি রাখার জন্য বিশেষতঃ ভারত সরকার এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সক্রিয় ভূমিকা প্রত্যাশা করছি। বিশ্বের বিবেকবান মানুষ আশা করে যে, তাদের এই প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটবে।
-লেখক: আইনজীবী, ধর্ম গবেষক ও মানবাধিকার কর্মী

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ