ঢাকা, সোমবার 10 July 2017, ২৬ আষাঢ় ১৪২8, ১৫ শাওয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

জাতিসংঘ দলিলে কাশ্মীর আলাদা রাষ্ট্র

চৌধুরী জাফর সাদেক : নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, জাতিসংঘের বেশ কয়েকটি দলিলে কাশ্মীরকে পুরোপুরি আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। জাতিসংঘের ‘ডিপার্টমেন্ট অফ ইকোনোমিক এন্ড সোস্যাল এ্যাফেয়ার্স (ডিইএসএ)’ জম্মু ও কাশ্মীরকে চিহ্নিত করেছে একটি কান্ট্রি হিসেবে। ‘এ্যাডভান্সড সার্চ ফর দি সিভিল সোসাইটি অরগানাইজেশন’ সেকশনে জম্মু ও কাশ্মীরকে ঢোকানো হয়েছে ‘কান্ট্রি/জিও গ্রাফিক্যাল এরিয়া’ সেকশনে। ফলে এমন একটি ধারণাই পাকাপোক্ত হয়, জাতিসংঘ জম্মু ও কাশ্মীরকে একটি আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচনা করে আসছে। তবে জাতিসংঘে ‘সেপারেট কান্ট্রি’ হিসেবে প্রদর্শন করলেই কাশ্মীরের বর্তমান অবস্থানের পরিবর্তন ঘটে যাবে না। তবে কাশ্মীরের এই চরিত্র কোনো না কোনোভাবে স্মরণ করিয়ে দেয়, কাশ্মীরের ইতিহাস যখন এটি ছিল সত্যিকার অর্থে একটি সার্বভৌম স্বাধীন রাষ্ট্র।
চীনা রেকর্ডেও কাশ্মীরকে প্রায় একইভাবে তুলে ধরা হয়েছে। এর বাইরে অনেক ঐতিহাসিক সত্য রয়েছে যা প্রমাণ করে কাশ্মীর সুপ্রাচীনকাল থেকেই একটি আলাদা স্বাধীন সর্বভৌম দেশ ছিল। জাতিসংঘ কাশ্মীরকে আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে উপস্থাপন করে একটি ঐতিহাসিক সত্যকেই তুলে ধরলো মাত্র।
অধিকৃত কাশ্মীরের জনগণের দুঃখের শেষ নেই। ভাতের দখল থেকে আজাদীর এই দীর্ঘ সংগ্রাম ক্ষণকালের জন্য উপশম হয়েছিল ভারত কর্তৃক গণভোট অনুষ্ঠানের মিথ্যা প্রতিশ্রুতির পর। ১৯৪৮ সালের ২১ এপ্রিল জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ অধিকৃত কাশ্মীরে গণভোট অনুষ্ঠানের প্রস্তাব পাস হওয়ার পর সংগ্রামরত কাশ্মীরেও জনগণের মধ্যে আশার আলো সৃষ্টি হয়েছিল। পরবর্তীকালে ভারত নিরাপত্তা পরিষদে প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি থেকে সরে গেলে কাশ্মীরী জনগণের দীর্ঘ সংগ্রামের পালা শুরু হয়। তারপর থেকেই কাশ্মীর দখলে রাখার জন্য জনগণের উপর পশুশক্তির দমননীতি শুরু করে ভারত।
কাশ্মীরী জনগণের দীর্ঘ সংগ্রামের এখন ৫ম প্রজন্ম চলছে। কাশ্মীর সমস্যা একটা রাজনৈতিক সমস্যা যা রাজনৈতিকভাবেই সমাধান করতে হবে। এ ক্ষেত্রে দ্বিমতের কোনো অবকাশ নেই। ভারত সরকারের পাশবিক অত্যাচার অধিকৃত কাশ্মীরের জনগণকে ভারত সরকার থেকে বিমুখ ও বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে। গত বছর জুলাই মাসে ভারতের অত্যাচারী পশুশক্তির হাতে গেরিলা নেতা বোরহান ওয়ানীর মৃত্যুর পর কাশ্মীরী জনগণের হতাশা ও ক্ষোভ জঙ্গি আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। রোবহান ওয়ানীর মৃত্যুর পর তার জানাযায় বিপুল লোকের অংশগ্রহণ এবং বিশাল মিছিলের পর থেকে দানা বাঁধা জঙ্গি আন্দোলনের পর ভারতীয় পাশবিক বাহিনীর হাতে শতাধিক লোক প্রাণ হারিয়েছে। কাশ্মীরী জনগণের প্রশ্ন বোরহান ওয়ানীর জানাযায় অংশগ্রহণকারী এই শেষ মিছিলে নিরস্ত্র মানুষের ওপর ভারতীয় বাহিনী কেন গুলী চালালো? জানাযা মিছিলে অংশগ্রহণকারী নিরস্ত্র জনগণের কারও হাতে একটি লাঠি, আগ্নেয়াস্ত্র বা গ্রেনেড কোনোটাই ছিল না যে, ঐ মিছিল ভারতীয় বাহিনীর নিরাপত্তায় হুমকি সৃষ্টি করেছিল এমনটি নয়। মিছিল থেকে কেউ ঢিলও ছোঁড়েনি। বোরহান ওয়ানীর জানাযার ঐ মিছিলে দুই লাখের অধিক লোক অংশগ্রহণ করে এবং কমপক্ষে ৪০ জায়গায় তার জানাযা অনুষ্ঠিত হয়েছে। শান্তিপূর্ণ ও নিরস্ত্র ধর্মীয় মিছিলে আক্রমণ থেকে বোঝা যায় ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর কোনো জবাবদিহিতা নেই এবং ভারতীয় বাহিনীর এই অমানবিক আচরণ মানবাধিকারেরও চরম লংঘনের এক নজীরবিহীন উদাহরণ।
পশুশক্তি ব্যবহার করে কাশ্মীরবাসীর মনে ভয় ও আতঙ্ক সৃষ্টি, দমন, কৌশল চরমভাবেব্যর্থ হয়েছে। সর্বদলীয় হুররিয়াত কনফারেন্সের চেয়ারম্যান সৈয়দ আলী গিলানী বলেন, চলতি গণজাগরণ ভারত সরকার ও তার তল্পীবাহকদের একটি শক্তিশালী ও কঠিন বার্তা পৌঁছে দিয়েছে যে, কোনো প্রকার দমননীতি ও কৌশলই কাশ্মীরীদের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের আকাক্সক্ষা স্তিমিত করতে পারবে না।
বৃটিশ পার্লামেন্টের সদস্য ডেভিড নুতাল এর পেশ করা কাশ্মীর সংক্রান্ত প্রস্তাব পার্লামেন্টে কাশ্মীরে বর্তমানে চলমান দমন নীতি ও মানবাধিকার লংঘনের বিষয় তীব্র সমালোচনা করা হয় এবং জাতিসংঘ প্রস্তাব অনুযায়ী গণভোট অনুষ্ঠানের মাধ্যমে কাশ্মীর সমস্যার রাজনৈতিক সমাধানের দাবি জানানো হয়। সুইজারল্যান্ডের ডাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের বার্ষিক সম্মেলনে যোগদানকালে পাকিস্তানের সাবেক সেনা প্রধান জেনারেল রাহিল শরীফ সম্মেলনের সাইড লাইনে বলেন, কাশ্মীর সমস্যা ভারত ও বিভক্তির এজেন্ডার অপূর্ণ উপসংহার। কাশ্মীরের পরিস্থিতি তখনই স্বাভাবিক হবে যখন অপূর্ণ এজেন্ডার পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন হবে। ভারত সরকার কাশ্মীরীদের লাগামহীন ক্ষোভ প্রশমিত করার জন্য প্রাক্তন পররাষ্ট্রমন্ত্রী যশোবন্ত সিং-এর নেতৃত্বে ৫ সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি কাশ্মীর পাঠালে ঐ কমিটি কাশ্মীরের নেতৃবৃন্দ ও সর্বস্তরের জনগণের সাথে মতবিনিময় করে।
যশোবন্তু সিং-এর নেতৃত্বে পাঠানো কমিটি সর্বশেষ পরিস্থিতি অবলোকন করে মোদি সরকারের কাশ্মীর নীতির সমালোচনা করে মোদি সরকারের কাশ্মীর নীতি পুনর্বিন্যাস সংশোধন ও কৌশল পরিবর্তনের পরামর্শ দেন।
কাশ্মীরের ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ও কাশ্মীর সমস্যা সমাধানের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে কাশ্মীরের ব্যবসায়ী সম্প্রদায় ব্যবসায় লাভ ক্ষতির হিসাব না করে মানুষের ক্ষয়ক্ষতি ও অবনতিশীল পরিস্থিতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। ব্যবসায়ী সম্প্রদায় সমস্যার রাজনৈতিক সমাধান ও অগ্নিগর্ভ অবস্থা ও নিরাপত্তাবাহিনীর দমননীতির অবসান চান।
বিক্ষুব্ধ জনতাকে দমন করার জন্য পেলেট বোমা ব্যবহার এখন সবচেয়ে নিন্দনীয় বিষয়। চকলেট বোমায় জনতাকে দমন করার ফলে বহু লোক অন্ধ হয়ে গেছে এমনকি ৪ বছরের শিশুও পেলেট বোমা থেকে  রক্ষা পায়নি। শ্রীনগরস্থ মহারাজ হরিসিং হাসপাতালের ট্রমা সার্জন বলেন, ২০১০ সাল থেকে পেলেট বোমা ব্যবহার হয়ে আসছে, পেলেট বোমার প্রধান শিকার পেটে আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে বহু লোক আজও আরোগ্য লাভ করতে পারেনি, ২০১৬ সালের ৮ জুলাই থেকে বহু লোক পেলেট বোমার আঘাতে আক্রান্ত হয়ে বুকে, ঘাড়ে, চোখে এবং মাথায় আঘাতপ্রাপ্ত বহু রোগী আমি চিকিৎসা করেছি। কাশ্মীরবাসী উল্লেখ করেন, শুধু কাশ্মীরেই এই মারাত্মক বোমা ব্যবহার হয়ে আসছে। কাশ্মীরের বাইরে ভারতের আর কোথাও চরম নাজুক পরিস্থিতিতেও এমনকি উস্কানির মুখে পেলেট বোমা ব্যবহারের নজির নেই। হরিয়ানা রাজ্যে জাট আন্দোলন কাবেরী নদীর পানির ভাগাভাগি নিয়ে কর্নাটক রাজ্যে গড়ে উঠা তীব্র আন্দোলন, গুজরাটের প্যাটেল আন্দোলন যার ফলে গুজরাটের বহু রাষ্ট্রীয় সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অর্থাৎ ভারতের কোথাও এই জঘন্য পেলেট বোমা ব্যবহার হতে দেখা যায়নি। শুধুমাত্র কাশ্মীরে পেলেট বোমা ব্যবহারের ফলে সরকার তথা পেলেট বোমা ব্যবহারকারী নিরাপত্তা বাহিনীর প্রতি ক্ষোভ ও তীব্র ঘৃণা ধূমায়িত হয়েছে।
রাত্রিকালীন হামলা, সার্চ অপারেশনের ফলে বাড়িঘর, বাড়ির জানালা ও গৃহসামগ্রীর ব্যাপক ক্ষতি হয়ে থাকে। সার্চ অপারেশনের নামে ইলেক্ট্রনিক যন্ত্রপাতি ধ্বংস করা হয়। সার্চ অপারেশনের ফলাফল শূন্য হলেও এই পদ্ধতি অব্যাহত আছে। পেলেট বোমা নিক্ষেপকারী ও সার্চ অপারেশন পরিচালনাকারী নিরাপত্তা বাহিনীর ব্যাখ্যা হলো বিক্ষোভকারীরা নিরাপত্তা বাহিনীর প্রতি ইটপাথর ছোঁড়ার প্রতিবাদে প্রতিশোধ হিসেবে নিরাপত্তা বাহিনী পেলেট বোমা ব্যবহার ও রাত্রিকালীন সার্চ অপারেশন চালিয়ে থাকে। ক্ষুব্ধ জনতাকে শাস্তি দিতে গিয়ে বাস্তবে সম্পদ ক্ষয় ছাড়া আর কিছুই নয়।
এ সংক্রান্ত কমিটি নিরাপত্তা বাহিনী কর্তৃক সার্চ অপারেশনের নামে ইলেকট্রিক ট্রান্সফরমার ধ্বংস, কাটার উপযুক্ত ফসল আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ফেলার সমালোচনা করেছে। অসমাপ্ত এক হিসাবে জানা গেছে, নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে প্রায় ২ শতাধিক ইলেকট্রিক ট্রান্সফরামার ধ্বংস হয়েছে। এর কারণ হিসেবে তারা বলতে চায়, গ্রামবাসী ক্ষোভে দুঃখে নিরাপত্তা বাহিনীর দিকে ইটপাটকেল ছোঁড়ার প্রতিবাদ ও প্রতিশোধস্বরূপ নিরাপত্তা বাহিনী এইসব হিংসাত্মক কর্মকা- করে থাকে।
কাশ্মীর ধীরে ধীরে নৈরাজ্যের দিকে চলে যাচ্ছে এবং হুররিয়াত নেতাদের অভিমত, এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণেরও বাইরে। রাজপথ যুবক সম্প্রদায় নিয়ন্ত্রণ করে এবং তাদের আহ্বানেই স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদ বিক্ষোভ সংঘটিত হয়। এই অবস্থা চলতে থাকলে নিরাপত্তা বাহিনী বর্তমানে ক্ষীণ নিয়ন্ত্রণটুকুও হারিয়ে ফেলবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত কাশ্মীরী জনগণের প্রতি ভারত সরকারের বর্তমান নির্যাতন-নিপীড়ন চলতে থাকলে ভারতকে একদিন কাশ্মীর হারাতে হবে। কাশ্মীরের বর্তমান অগ্নিগর্ভ ও নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি আমলে নিয়ে যতো শিগ্র রাজনৈতিক সমাধানে আসা যায় ততোই মঙ্গল। অন্যথা জাতিসংঘ চিহ্নিত রাষ্ট্র একদিন বাস্তবায়িত হবেই। কাশ্মীর ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ দাবি একদিন উবে যাবেই।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ