ঢাকা, বুধবার 12 July 2017, ২৮ আষাঢ় ১৪২8, ১৭ শাওয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

বন্যার অবনতি অব্যাহত

নীলফামারীতে বন্যায় প্লাবিত বাড়িঘর -সংগ্রাম

সংগ্রাম ডেস্ক : বিভিন্ন স্থানে বন্যার অবনতি অব্যাহত রয়েছে। নদ-নদীর পানি বিপদ সীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানি বৃদ্ধির ফলে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। ফলে হাজার হাজার পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়ছে। অনেকেই ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটছে। বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠদান বন্ধ রয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়েছে। পানিবন্দী মানুষেরা চরম দুর্ভোগে পতিত হয়েছে। ত্রাণ সাহায্যের অভাব ও অপ্রতুলতা দুর্ভোগ বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশুদ্ধ পানি ও শুকনো খাবারের ব্যবস্থা না থাকায় দুর্গতরা নানা সমস্যা ও রোগ-ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে। বন্যার অবনতির পাশাপাশি নদী ভাঙ্গন তীব্র আকার ধারণ করেছে। বহু ঘরবাড়ি, শিক্ষা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ফসলী জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। তছনছ হয়ে গেছে সাজানো গোছানো সোনার সংসার।

নীলফামারী সংবাদদাতা : উজানের ভারি বর্ষণ আর পাহাড়ী ঢলে নীলফামারীতে তিস্তা নদীর পানি এখনও বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। মঙ্গলবার সকাল ৯টা থেকে তিস্তা নদীর পানি ডালিয়া তিস্তা ব্যারেজ পয়েন্ট বিপদসীমার ১৪ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। এতে করে নদীর তীরবর্তী নীলফামারী দু’টি উপজেলার অন্তত ২৫টি গ্রামের ১০ সহস্রাধিক মানুষ বন্যা কবলিত হয়ে পড়েছে। 

পানি উন্নয়ন বোর্ড নীলফামারীর ডালিয়া ডিভিশনের বন্যাপূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ সূত্র জানায়, উজানের ঢল ও ভারি বর্ষণে তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে সোমবার সকাল ৬টায় তিস্তা সেচ প্রকল্পের ডালিয়া ব্যারাজ পয়েন্ট বিপদসীমার ৩২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। মঙ্গলবার সকালে পানি কমে বিপদসীমার ১৪ সেন্টিমিটার এবং বিকেলে ১০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বইয়ে চলেছে নদীর পানি।

দু’দিন ধরে নদীর পানি বৃদ্ধির ফলে জেলার ডিমলা উপজেলার পূর্বছাতনাই, খগাখড়িবাড়ি, টেপাখড়িবাড়ি, খালিশাচাপানী, ঝুনাগাছচাপানী, গয়াবাড়ি ও জলঢাকা উপজেলার, গোলমুণ্ডা, ডাউয়াবাড়ি, শৌলমারী ও কৈমারী ইউনিয়নের নদী তীরবর্তী ২৫ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এসব গ্রামের ১০ সহস্রাধিক মানুষ বন্যাকবলিত হয়ে অন্তত পাঁচ সহস্রাধিক মানুষ পানিবন্দী রয়েছেন বলে জানান স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা।

ডিমলা উপজেলার খালিশা চাপানী ইউনিয়নের ছোটখাতা গ্রামের নজরুল ইসলাম ইসলাম (৪০) বলেন, নদীর পানি বৃদ্ধির ফলে ছোটখাতা গ্রামের ছয় শতাধিক বাড়িতে পানি প্রবেশ করেছে। পানিবন্দী এসব পরিবার চুলা জ্বালাতে না পেরে দু’দিন ধরে শুকনা খাবার খেয়ে দিন কাটাচ্ছে।

একই ইউনিয়নের পশ্চিম বাইশপুকুর গ্রামের সমসের আলী বলেন, পূর্ব বাবইশপুকুর ও পশ্চিম বাইশপুর গ্রামের প্রায় এক হাজার পরিবার তিস্তার বন্যায় পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। বানের পানির ঢলে ওই গ্রামে স্বেচ্ছাশ্রমে নির্মিত বাঁধটি হুমকির মধ্যে পড়েছে।

ডিমলা উপজেলার খালিশা চাপানী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আতাউর রহমান বলেন, নদীর পানি বৃদ্ধির ফলে ইউনিয়নের পশ্চিম বাইশপুকুর, পূর্ব বাইশপুকুর, সতিঘাট, সুপুরটারী গ্রামের বসতবাড়িতে পানি প্রবেশ করেছে। এসব গ্রামের বাড়িঘরে পানি থাকায় দু’দিন ধরে চুলা জ্বালাতে পারছে না পরিবারগুলো। ফলে তারা না খেয়ে দিন কাটাছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড নীলফামারীর ডালিয়া ডিভিশনের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী হাফিজুল হক বলেন, তিস্তার পানি বৃদ্ধির কারণে ব্যারাজের ৪৪টি জলকপাট খুলে রেখে পানি নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। আরো পানি বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানান তিনি।

তিনি বলেন, বন্যার পূর্বাভাস থাকায় নদীরতীরবর্তী এলাকার জনপ্রতিনিধিদের সতর্ক করা হয়েছে। তাঁরা এলাকার মানুষকে সতর্ক করছেন নদীর পানি বৃদ্ধির সাথে সাথে নিরাপদ স্থানে সড়ে যেতে।

রাজারহাট (কুড়িগ্রাম) সংবাদদাতা : উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ী ঢল ও প্রবল বৃষ্টিতে কুড়িগ্রামের রাজারহাটে তিস্তা ও ধরলা নদীর পানি অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সেই সাথে প্রবল স্্েরাতে গত ২৪ঘন্টায় তীব্র ভাঙ্গনে উপজেলার বিদ্যানন্দ ইউনিয়নের তৈয়বখা এলাকায় প্রায় ৩শত ঘর-বাড়ি, শতাধিক গাছপালা ও ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলিন হয়ে গেছে। অনেক পানি বন্দী ও বাস্তুহারা পরিবার বাঁধে এবং অন্যের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। এ ছাড়া ঘরে পানি উঠায় অনেকে মাচাং করে পরিবার-পরিজন নিয়ে জীবন-যাপন করছে। এদিকে কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ড ভাঙ্গন ঠেকাতে পাইলিংয়ের কাজ শুরু করেছে। 

বাস্তুহারা পরিবার ও এলাকাবাসীরা জানান, তিস্তা ও ধরলা নদীর পানি হু হু করে বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত ২৪ ঘন্টায় তিস্তা ও ধরলা নদীর সব ক’টি চরাঞ্চল ডুবে গেছে। ফলে ইরি-বোরো বীজতলা ও শতাধিক পুকুর ডুবে গিয়ে অর্ধকোটি টাকার মাছ ভেসে গেছে। এছাড়া চরের শত শত মানুষ, গবাদী পশু-পাখি পানিবন্দী হয়ে পড়ে। ডুবে যাওয়া চরের মানুষজন মানবেতর জীবন-যাপন করছে। চর তৈয়ব খাঁ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চর বিদ্যানন্দ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ছিনাই কিং আবুল হোসেন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে পানি উঠায় বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ১১ জুলাই দুপুরে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ রফিকুল ইসলাম ও উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মোঃ আবুল হাসেম বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শনের সময় বিদ্যানন্দ ইউনিয়নের ৮৬টি পরিবার ও ঘড়িয়ালডাঙ্গা ইউনিয়নের ২১ পরিবারের মাঝে ৩০ কেজি করে চাল এবং ১৫টি পরিবারের মাঝে নগদ ২হাজার টাকা করে ত্রান বিতরন করেন। 

এ ব্যাপারে বিদ্যানন্দ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মোঃ তাইজুল ইসলাম জানান, গত কয়েকদিন ধরে তৈয়বখাঁ গ্রামে ভাঙ্গন শুরু হয়েছে। ফলে এলাকার মানুষ ভাঙ্গন আতংকে দিন কাটাচ্ছে। ঘড়িয়ালডাঙ্গা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান রবীন্দ্রনাথ কর্মকার জানান, উজান থেকে পানি আসায় আকস্মিকভাবে বন্যার সৃষ্টি হয়েছে। কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী শফিকুল ইসলাম জানান, ১১জুলাই দুপুর ১২টায় তিস্তা নদীর কাউনিয়া পয়েন্ট ২৯.০৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস বিপদসীমার নীচে ও কুড়িগ্রাম ধরলা পয়েন্টে ১৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস বিপদসীমার উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে।

জামালপুর সংবাদদাতা : গত ক’দিনে অবিরাম বর্ষণ এবং প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে নেমে আসার পাহাড়ী ঢলে যমুনা নদী ও ব্রক্ষ্মপুত্র নদের পানি বৃদ্ধি অব্যাহত ও অপরিবর্তিত রয়েছে। জামালপুরের বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। গত ২৪ ঘন্টায় যমুনার পানি বাহাদুরাবাদ ঘাট পন্টে ১সে: মি: বৃদ্ধি পেয়ে বিপদ সীমার ৩৭ সে: মি: উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে করে জামালপুর জেলার সার্বিক বন্যার পরিস্থিতি আরো অবনতি ঘটেছে। জেলার দেওয়ানগঞ্জ, ইসলামপুর মেলান্দহ, মাদারগঞ্জ ও সরিষাবাড়ি উপজেলায় নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়ে প্রায় লক্ষাধিক মানুষ পানি বন্ধি হয়ে পড়েছে।

এদিকে জামালপুর সারা জেলায় বন্যার পানিতে জলমগ্ন হয়ে পড়ায় ৯০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ৬টি মাদ্রাসা এবং ২টি কলেজসহ সর্ব মোট ১১৩টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। বন্যা কবলিত এলাকার মানুষ উচু বাঁধে কিংবা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আশ্রয় নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করে আসছে। মানুষের খাদ্যে ও বিশুদ্ধ পানির পাশাপাশি গো খাদ্যের চরম সংকট দেখা দিয়েছে। 

এদিকে গত ১০ জুলাই বন্যা কবলিত ৬টি উপজেলার জন্য ৬০মেট্রিক টন চাল এবং ৬০হাজার টাকা জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে বরাদ্ব দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক রাসেল সাবরিন।

বগুড়া অফিস : ভারত তিস্তা ব্যারেজের সবগুলো গেইট খুলে দেয়ায় বগুড়ায় যমুনা নদীর পানি লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। গত ২৪ ঘন্টায় ২৬ সেন্টিমিটার পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের ওয়াটার রিডার আবু জাফর জানান, বুধবার সন্ধ্যা ৬টায় যমুনা নদীর পানি সারিয়াকান্দি পয়েন্টে বিপদসীমার ৫০ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। প্রতিনিয়ত পানি হু হু করে বাড়ছে। পানি বৃদ্ধির সাথে সাথে নদী ভাঙ্গন শুরু হয়েছে। বুধবার সকাল আনুমানিক সাড়ে ৯টার দিকে সারিয়াকান্দি উপজেলার হাটশেরপুর ইউনিয়নের করমজা ও চকরতিনাথ গ্রামের শতাধিক ঘরবাড়ি নদীতে বিলীন হয়েছে। দ্রুত পানি বৃদ্ধির সাথে নদী ভাঙ্গন শুরু হওয়ায় নদী তীরবর্তী এলাকার মানুষের মাঝে নতুন করে আতংক বিরাজ করছে।

এদিকে, যমুনায় পানি বৃদ্ধির সাথে সাথে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। শুধুমাত্র সারিয়াকান্দি উপজেলায় নতুন করে আরও ৬টি ইউনিয়নে পানি প্রবেশ করেছে। এই উপজেলার মোট ৯টি ইউনিয়নের এক হাজার ৪’শ পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। সরকারি হিসেবে এই উপজেলার অর্ধলক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। তবে, স্থানীয় হিসেবে এই পরিমাণ ৭০ হাজারের অধিক বলে জানাগেছে। সারিয়াকান্দি উপজেলা পরিষদের তথ্যমতে, এযাবত বন্যার্তদের জন্য জিআরের ১০০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৫০ মেট্রিক টন বিতরণ করা হয়েছে। 

বগুড়া জেলা ত্রাণ কর্মকর্তা শাহারুল ইসলাম মো: আবু হেনা জানান, বন্যাকবলিত এলাকায় নগদ ৪ লাখ টাকা (জিআর ক্যাশ), ২৫০ মে:টন জি আর চাল বরাদ্দ হয়েছে। এরমধ্যে সারিয়াকান্দি উপজেলায় ১ লাখ টাকা, ১শ মে: টন চাল, সোনাতলা উপজেলায় ২০ মে: টন বিতরণ করা হয়েছে। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে ১৪ ইউনিয়নের ৭৫ গ্রামের ১৩ হাজার ২২২ পরিবার। সারিয়াকান্দি আশ্রয়প্রকল্পে আশ্রয় নিয়েছে ৭৬৫ পরিবার। বাঁধের উপর ৩ হাজার ৩৫৫ পরিবার ও বিভিন্ন বিদ্যালয়ে আশ্রয় নিয়েছে।

জেলা শিক্ষা অফিসার গোপাল চন্দ্র জানান, বন্যায় পানি প্রবেশ করায় ৮২ টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠ দান বন্ধ হয়ে গেছে। সারিয়াকান্দি উপজেলায় ৫৮ টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, সোনাতলায় ১২ টি ও ধুনটে ৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠদান বন্ধ রয়েছে। এছাড়া ৫টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও ২ মাদ্রাসায় পানি উঠায় বন্ধ ঘোষনা করা হয়েছে বলে শিক্ষা অফিস সুত্রে জানা গেছে।

বগুড়া জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রকৌশলী আনোয়ারুজ্জামান জানান, বাঁধে আশ্রিতদের জন্য সুপেয় পানির ব্যবস্থা করেছে। ২৩টি হস্তচালিত নলকূপ ও ৫০টি ল্যাট্রিন স্থাপন করা হয়েছে। বন্যা কবলিতদের জন্য প্রয়োজনে আরো ব্যবস্থা করা হবে। 

বগুড়া জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক প্রতুল চন্দ্র জানান, পাট, ধান, সবজী ও বীজতলাসহ ৩ হাজার ৮শ ৭৭ হেক্টর জমির ফসল বন্যার পানিতে ক্ষতি হয়েছে। গোটা জেলায় ১৩৬৭ হেক্টর জমির আউশ, ২৪৪০ হেক্টর জমির পাট, ৩০ হেক্টর বীজতলা, ৪০ হেক্টর সবজির ক্ষেত তলিয়ে গেছে। এছাড়া ৮৫ টি পুকুর বন্যার পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। 

বগুড়া জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা গোপাল চন্দ্র জানান, সোনাতলা, সারিয়কান্দি ও ধুনট উপজেলার ৫টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ও দুটি মাদরাসায় বন্যার পানি উঠেছে।

বগুড়া জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার হোসেন আলী জানান, সোনাতলা, সারিয়াকান্দি ও ধুনট উপজেলার ৭৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পানি উঠেছে। ১২টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা উপস্থিত থাকলেও শিক্ষার্থীরা আসছেনা। যেসব বিদ্যালয়ে বন্যার কারনে পড়ালেখা বিঘিœত হবে সে সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বন্যার পানি চলে যাবার পর অতিরিক্ত ক্লাস নিয়ে তা পুরণ করা হবে। 

কৃষি অফিসের তথ্যমতে, সারিয়াকান্দি, সোনাতলা ও ধুনট উপজেলায় বিভিন্ন ফসলি জমি পানির নিচে ডুবে যাওয়ায় ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে ২০ হাজারের অধিক কৃষক পরিবার। বন্যার পানির নিচে ডুবে গেছে রোপা আমন, আউশ, বীজতলা, পাট, মরিচ এবং শাকসবজির ৪ হাজার ৫১৫ হেক্টর জমি। কৃষি অফিসের মতে পানি দীর্ঘ সময় ধরে অবস্থান করলে ডুবে যাওয়া জমির ফসল সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যেতে পারে। 

অন্যদিকে, বাঁধে আশ্রয় নেয়া হাজার হাজার নারীপুরুষ ও শিশু মানবেতর জীবন যাপন করছে। টানা বৃষ্টির কারণে ভিজে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন দামী জিনিষপত্র। শুকনা জ্বালানি, বিশুদ্ধপানির সংকট এসব এলাকায় তীব্র আকার ধারণ করেছে। এখন পর্যন্ত সরকারিভাবে যে ত্রাণ দেয়া হয়েছে তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। চরাঞ্চলের অনেকের কাছে এখনো ত্রাণ পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। বেসরকারি উদ্যোগেও তেমন কোন ত্রাণ তৎপরতা দেখা যাচ্ছেনা। ফলে চরম মানবিক সংকটে পড়েছে দূর্গত মানুষ।

গাইবান্ধা সংবাদদাতা : গাইবান্ধার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি সোমবার আরও অবনতি হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের দেয়া তথ্য অনুযায়ি গত ২৪ ঘন্টায় ব্রহ্মপুত্রের পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ১৭ সে. মি. উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এদিকে জেলা শহরের মাঝখান দিয়ে প্রবাহিত ঘাঘট নদীর পানি বিপদসীমার মাত্র ১ সে.মি. নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে বিপদসীমা অতিক্রম করলে জেলা শহরের পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোতে ইতোমধ্যে বন্যার পানি প্রবেশ করতে শুরু করেছে। এছাড়া তিস্তা, যমুনা ও করতোয়া নদীর পানি এখনও বিপদসীমার নিচে রয়েছে। 

অপরদিকে বন্যা পরিস্থিতি অবনতি হওয়ায় জেলার সুন্দরগঞ্জ, সদর, ফুলছড়ি ও সাঘাটা উপজেলার নতুন নতুন এলাকা প¬াবিত হয়েছে। ৪ উপজেলার প্রায় ৫০ হাজার পরিবার এখন পানিবন্দী। ওইসব এলাকার নিম্ন ও চরাঞ্চলের রাস্তা-ঘাট, ফসলী জমি পানিমগ্ন হয়ে পড়েছে। 

ইতোমধ্যে ফুলছড়ি উপজেলার ৩টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধসহ চরাঞ্চল বেষ্টিত ৫১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আশপাশে বন্যার পানি উঠায় পাঠদান বিঘিœত হচ্ছে। এছাড়া নতুন করে এরেন্ডাবাড়ি ইউনিয়নের ১৩০টি পরিবার নদী ভাঙনের শিকার হয়েছে। ভাঙনের সম্মুখিন হয়ে পড়েছে আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। 

এরেন্ডাবাড়ি ইউপি চেয়ারম্যান আজিজুর রহমান জানান, কয়েকদিনের ভাঙনে এরেন্ডাবাড়ি ইউনিয়নের জিগাবাড়ি, পশ্চিম জিগাবাড়ি, হরিচন্ডি, পাগলারচর এলাকায় নদী ভাঙনের কারণে ১৩০টি পরিবার বাস্তুহারা হয়েছে। হুমকির মূখে রয়েছে জিগাবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, জিগাবাড়ি উচ্চ বিদ্যালয়, এরেন্ডাবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদ ও জিগাবাড়ি কমিউনিটি ক্লিনিক। তিনি বলেন, নদী ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে এখনও সরকারি কোন ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করা হয় নাই। 

ফুলছড়ি উপজেলা শিক্ষা অফিসার হেমায়েত আলী শাহ জানান, ব্রহ্মপুত্র নদ বেষ্টিত ৪৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আশপাশে বন্যার পানি প্রবেশ করায় এসব বিদ্যালয়ে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। এছাড়া বিদ্যালয়ে কক্ষে পানি উঠায় ঝানঝাইড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, গলনা কমিউনিটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও কটকগাছা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সুত্রে জানা গেছে, সংশি¬ষ্ট দপ্তরের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা সাঘাটার জুমারবাড়ি থেকে সুন্দরগঞ্জের তারাপুর পর্যন্ত ব্রহ্মপুত্র ও ঘাঘট নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের বেশকিছু এলাকাকে ঝুঁকিপূর্ণ বলে চিহ্নিত করেছেন। চিহ্নিত এলাকাগুলোর মধ্যে উলে¬খযোগ্য, হচ্ছে সাঘাটার বসন্তের পাড়া, গোবিন্দী, ফুলছড়ির রতনপুর, সিংড়িয়া, কাতলামারি, সদর উপজেলার কামারজানি, কাজলঢোপ, সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ছয়ঘড়িয়া, সাদুল্যাপুর উপজেলার কামারপাড়া। 

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মাহবুবর রহমান বলেন, বাঁধের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে প্রয়োজন অনুযায়ি অস্থায়ী প্রতিরক্ষামূলক কাজ করা হবে। 

জেলা প্রশাসক গৌতম চন্দ্র পাল জানান, চরাঞ্চলসহ বিভিন্ন নিচু এলাকার মানুষ এখনও আশ্রয় কেন্দ্রে আসার মত পরিস্থিতিতে পড়েননি। তবে আশ্রয় কেন্দ্রগুলোও তৈরি রাখা হয়েছে। প্রশাসনের হাতে পর্যাপ্ত ত্রাণ সামগ্রী রয়েছে। সুতরাং কোথাও কোন সমস্যা হবে না। তিনি বলেন, ফুলছড়ি ও সাঘাটার বন্যা নিয়ন্ত্রন বাঁধের কাছাকাছি পানি চলে আসায় সেই এলাকায় বসবাসকারি পরিবারগুলোর তালিকা প্রস্তুত করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। 

এ পর্যন্ত জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জরুরীভাবে ১শ’ ২৫ মে. টন চাল ও ১০ লাখ টাকা ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। 

এদিকে তিস্তা, করতোয়া এবং ঘাঘট নদীর পানি অপরিবর্তিত রয়েছে। জেলার সাঘাটা, ফুলছড়ি, সুন্দরগঞ্জ ও সদর উপজেলার পানিবন্দী প্রায় লক্ষাধিক মানুষের মধ্যে দুর্ভোগ দেখা দিচ্ছে।

এছাড়া জেলার ৭৮ কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ২৫টি ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্ট পানি উন্নয়ন বোর্ড জরুরীভাবে বালুর বস্তা ফেলে রক্ষার চেষ্টা করছে।

বন্যা কবলিত এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠাগুলোতে পাঠদান বন্ধ রয়েছে। পানিবন্দীতার কারণে অনেক পরিবার তাদের সহায়সম্পদ নিয়ে নিরাপদ আশ্রয় নিয়েছে। চরাঞ্চলে শুকণো খুড়ি ও গো-খাদ্য সমস্যা দেখা দিয়েছি।

মাদারীপুর সংবাদদাতা : টানা দিনভর প্রবল বর্ষণও আড়িয়াল খাঁ নদীতে অব্যাহত পানি বৃদ্ধিতে মাদারীপুরের নিম্নাঞ্চল এলাকায় প্লাবিত হয়েছে। পাশাপাশি প্রবল বর্ষণে মাদারীপুর পৌর এলাকার অনেক নিচু এলাকা প্লাবিত হয়েছে। সুষ্ঠু ড্রেনেজ ব্যবস্থা যথাযথভাবে গড়ে না ওঠায় পৌরসভার অনেক এলাকায় পানি নিস্কাশন না হওয়ায় পানিবদ্ধাতার সৃষ্টি হয়েছে। 

সম্প্রতি আড়িয়াল খা নদীর পানি ক্রমাগতভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় মাদারীপুর সদর উপজেলার মহিষেচর ছিলারচর চরনাচনা কালিকাপুর মাদ্রা শ্রীনদী ধুরাইল এলাকায় নদীর পানি প্রবেশ করে এসব এলাকা প্লাবিত হয়েছে। নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় মাদারীপুর শহর রক্ষা বাধ ও লঞ্চঘাট এলাকা এখন হুমকির মুখে পড়েছে।মাদারীপুর ১নং পুলিশ ফাড়ী, মাদারীপুর জেলা জজ কোর্টের সাবেক বিশেষ পিপি এডভোকেট আহসানুল হক খান ও সাংবাদিক আলী আকবর খোকার বাসভবনসহ আশেপাশের অনেক বাড়ি দোকানপাট এখন নদী ভাঙ্গনের হুমকির মুখে। এছাড়া প্রবল বর্ষণের কারনে শহরের থানতলী, পানিছত্র, খাগদী পাগদী, পুরানবাজার চরমুগরিয়া সহ বিভিন্ন এলাকায় পানিবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে।

এদিকে মাদারীপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহকারী প্রকৌশলী নজরুল ইসলাম নদীর পানি বৃদ্ধির কথা স্বীকার করে বলেন, গত ১২ ঘন্টায় আড়িয়াল খাঁ নদীর পানির কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে। অপরদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো: মনিরুজ্জামান বলেন, মাদারীপুর শহর রক্ষা বাধ এলাকায় ইতিমধ্যে যে ফাটল সৃষ্টি হয়েছিলো তা মেরামত করা হয়েছে। শহর রক্ষা বাধ যাতে কোন ক্ষতির সম্মুখীন না হয় সেজন্য প্রয়োজনীয় স্লাব মজুদ রয়েছে । প্রয়োজনে সেগুলো ফেলা হবে। 

প্রবল বর্ষণে রাজৈর উপজেলার টেকেরহাট বন্দরের মিল্কভিটা সড়কের পাশে বৃষ্টিতে হাটু পানি হয়েছে। এতে ব্যবসারীরা বেশ দুর্ভোগে পড়েছে।

এদিকে মাদারীপুর পৌর এলাকা উন্নয়ন পরিষদের সভাপতি গোলাম আজম ইরাদ বলেন, বর্তমানে পৌর মেয়র পৌর এলাকায় সুষ্ঠু ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ দিয়ে যে উন্নয়ন কর্মকান্ড করছেন তা বর্ষা মৌসুমের পুর্বে করা উচিত ছিলো । কিন্তু বর্তমানে বর্ষা মওসুমে নির্মান কাজ অব্যাহত থাকলেও বর্ষার পানিতে তা ব্যাহত হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সঠিক পরিকল্পনা নেয়া প্রয়োজন। 

এ ব্যাপারে মাদারীপুর পৌর মেয়র খালিদ হোসেন ইয়াদ জানান, পানিবদ্ধতা নিরসনের জন্যে বেশ কিছু ড্রেন নির্মাণ করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে কিছু নির্মাণ হয়েছে বাকীগুলোও নির্মাণের চেষ্টা করা হবে। আশা করি, শীঘ্রই মাদারীপুর শহর পানিবদ্ধতা থেকে মুক্ত হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ