ঢাকা, বুধবার 12 July 2017, ২৮ আষাঢ় ১৪২8, ১৭ শাওয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

ভয়ংকর ১২ রোগ হতে পারে মশার কামড়ে

তোফাজ্জল হোসেন কামাল : গত সোমবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে এক প্রতিবাদ সমাবেশে নেতারা চিকুনগুনিয়া রোগ প্রতিরোধে ঢাকার দুই সিটি মেয়র ও স্বাস্থ্য অধিদফতরের ব্যর্থতার কঠোর সমালোচনা করে বলেন, চিকুনগুনিয়া মহামারীরূপে আবির্ভূত হলেও তা মোকাবিলায় দুই সিটি মেয়র ও স্বাস্থ্য অধিদফতর নিশ্চুপ। গণবিস্ফোরণের মধ্যদিয়ে নগরবাসীই তাদের হুঁশ ফিরিয়ে আনবে। মশা-পানিবদ্ধতা নিরসন ও পুনর্বাসন ছাড়া হকার উচ্ছেদের প্রতিবাদে সিপিবি পল্টন শাখার বিক্ষোভ সমাবেশে ক্ষুব্ধ নেতারা বলেন, গোটা ঢাকা চিকুনগুনিয়া নিয়ে আতঙ্কগ্রস্ত হলেও লুটপাট-দুর্নীতিতে নিমগ্ন দুই মেয়রের কোনো হুঁশই নেই।

সিপিবির এই সমাবেশের ক্ষোভে উপচে পড়া জ্বালাময়ী বক্তব্যে যখন জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনের সড়কসহ আশপাশের এলাকাকে বিদীর্ণ করে চলেছে, লোকজনের কান ঝালাপালা হচ্ছে, ঠিক সে সময় ঢাকা দক্ষিণ সিটির মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন দেশের বাইরে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ডিএসসিসি মেয়র সিঙ্গাপুরে অবস্থান করছেন। আগামী রোববার-সোমবার তাঁর অফিস করার কথা রয়েছে। অপরদিকে, উত্তরের মেয়র আনিসুল হক ছিলেন দেশেই। 

এটা একটি দলের বাদ-প্রতিবাদের অংশ। এই দলটি ছাড়াও প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দল, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন সমুহের পক্ষ থেকেও ঢাকার চিকুনগুনিয়া রোধে ব্যর্থতার দায় দু‘সিটি কর্পোরেশনসহ স্বাস্থ বিভাগকে দেয়া হচ্ছে। স্বাস্থ বিশেষজ্ঞরাও একই কথা বলছেন। 

গণস্বাস্থ্যের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, স্বাস্থ্য অধিদফতরের জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) এবং সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার (সিডিসি) কাজ হলো, নতুন রোগ নিয়ে গবেষণা এবং সচেতনতামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া যে কোনো ব্যাধি নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা পালন করা। কিন্তু সরকারের এই দুটি বিভাগ কার্যক্রম শুরু করতে দেরি করেছে। একই সঙ্গে সিটি করপোরেশন মশক নিধন কর্মসূচি যথাযথভাবে পালন করেনি। সবচেয়ে বড় কথা, চিকুনগুনিয়া নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্য বিভাগ ও স্থানীয় সরকার বিভাগের মধ্যে কোনো সমন্বয় নেই। তাই চিকুনগুনিয়া পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।

চিকুনগুনিয়ার প্রকোপ

দেশজুড়ে চিকুনগুনিয়া পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। শুরুতে রাজধানীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন চিকুনগুনিয়া ভাইরাস বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়েছে। জুন মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে গ্রামেও চিকুনগুনিয়া বিস্তারের খবর এসেছে। এর পরই মূলত চিকুনগুনিয়া নিয়ে সারাদেশে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। উদ্বিগ্ন সরকার একের পর এক পদক্ষেপ গ্রহণ করেও ভয়াবহ হয়ে ওঠা এই ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না। তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা চিকুনগুনিয়া পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার জন্য স্বাস্থ্য বিভাগের দেরিতে কাজ শুরু করাকেই দায়ী করেছেন। তাদের মতে, আগে থেকে পরিকল্পনা করে সে অনুযায়ী কাজ করলে চিকুনগুনিয়ার বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হতো।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (সিডিসি) অধ্যাপক ডা. সানিয়া তাহমিনা বলেন, ‘চিকুনগুনিয়া নিয়ন্ত্রণের জন্য মশার বংশবিস্তার রোধ করতে হবে। আর মশক নিধন কার্যক্রম চালাবে সিটি করপোরেশন। কারণ সরকার মশক নিধন কর্মসূচির জন্য সিটি করপোরেশনকে কোটি কোটি টাকার বরাদ্দ দেয়। স্বাস্থ্য বিভাগের কাজ সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি আক্রান্তদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা। আমরা সেই কাজ করছি।’

তবে দেরিতে সচেতনতামূলক কার্যক্রম শুরুর বিষয়ে কোনো মন্তব্য না করে তিনি বলেন, এ বছর আগেভাগে বৃষ্টি শুরুর কারণে তারা ডেঙ্গু বিস্তারের আশঙ্কা করেছিলেন। মার্চের শেষ সপ্তাহ থেকে মানুষ জ্বরে আক্রান্ত হচ্ছেন- এমন বার্তা তাদের কাছে ছিল। তবে সেটি চিকুনগুনিয়া কি-না তা জানতে পারেননি। চিকুনগুনিয়া বিস্তারের খবর পাওয়ার পরপরই মে মাস থেকে সচেতনতা কার্যক্রম শুরু করা হয়। বর্তমানে তা জোরালোভাবে চালানো হচ্ছে।

এদিকে রাজধানীসহ সারাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে চিকুনগুনিয়া আক্রান্তের খবর এলেও সরকারি হিসাব অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত এই ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় আড়াই হাজার দেখানো হয়েছে। বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে রোগী সংখ্যার এ তথ্য পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন আইইডিসিআর পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদি সেব্রিনা। তিনি বলেন, 'চিকুনগুনিয়া বিষয়ে আইইডিসিআর একটি জরিপ করছে। সেটা শিগগিরই শেষ হবে। কতসংখ্যক মানুষ চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে, ওই জরিপ শেষে তা চূড়ান্তভাবে জানা যাবে।'

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এখন পর্যন্ত চিকুনগুনিয়াকে বিপজ্জনক রোগ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। তার পরও সরকার এ বিষয়ে সচেতন রয়েছে। 'স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা অধিদপ্তরের পক্ষে চিকুনগুনিয়ার বাহক মশা নিধন করা সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে সিটি করপোরেশনের কার্যক্রম ও জনগণের সচেতনতাই রোগ প্রতিরোধে মূল ভূমিকা রাখতে পারে। তাদের কাজ সাধারণ মানুষকে সতর্ক করা আর আক্রান্ত হলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা করা। এ বিষয়ে পর্যাপ্ত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

চিকুনগুনিয়ার জীবাণু এবং এর বাহক এডিস মশা দুটিই বাংলাদেশে বর্তমান থাকায় নতুন করে বন্দর দিয়ে এটি ছড়িয়ে পড়ার কোনো আশঙ্কা নেই। এ রোগ নিয়ে ডব্লিউএইচও থেকেও জরুরি অবস্থা জারি হয়নি।

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. শরীফুল হাসান বলেন, বর্তমানে জিকা ভাইরাস, ইভোলা এবং মার্স করোনারি সিনড্রোমের জন্য তারা বিমানবন্দরে সংশ্লিষ্ট দেশের যাত্রীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন। জিকা ভাইরাসে আক্রান্ত ২৭টি দেশের নাগরিকদের ওপর সতর্কতা জারি করেছিল ডব্লিউএইচও। জরুরি অবস্থা শিথিল করা হলেও জনসচেতনতা তৈরির জন্য তারা এখনও ২৭টি দেশের মধ্যে সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার নাগরিক এবং সেখান থেকে আসা বাংলাদেশিদের পরীক্ষা করেন। মার্স ভাইরাসের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের ওপর সতর্কতা জারি করা আছে। বিশেষ করে হজের সময় সৌদি আরব ফেরত হজযাত্রীদের পরীক্ষা করে প্রবেশ করানো হয়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, সাধারণত কোনো রোগ একাধিক দেশে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লে ডব্লিউএইচও জরুরি অবস্থা জারি করে। তবে চিকুনগুনিয়ার ক্ষেত্রে এমনটা নেই। তিনি বলেন, এ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপসহ পৃথিবীর ৬০টি দেশে এ রোগের সংক্রমণ ঘটেছে। কোনো দেশে একবার চিকুনগুনিয়া হলে সে দেশে ৬ থেকে ১০ বছর এ রোগ দেখা যায় না। বাংলাদেশে এ রোগের জীবাণু বহনকারী মশা এবং জীবাণু উভয়ই থাকায় বন্দরগুলোতে এ নিয়ে সতর্কতার কিছু নেই।

জিকা ভাইরাস নিয়ে গত বছর ডব্লিউএইচও বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত জরুরি অবস্থা জারির পর বাংলাদেশের সব নৌ, স্থল ও বিমানবন্দরে এ ব্যাপারে ব্যাপক নজরদারি ব্যবস্থা নেওয়া হয়। জিকা ভাইরাসের ক্ষেত্রে বিমানবন্দরে থাকা থারমাল স্ক্যানার মেশিন দিয়ে সংশ্লিষ্ট দেশের নাগরিকদের পার করানো হয়। কারও জ্বর ধরা পড়লে তাদের রেজিস্ট্রেশন করে রাখাসহ একটি স্বাস্থ কার্ড প্রদান করা হয়। পরে তাকে স্বাস্থ্য পরীক্ষাকেন্দ্রে পাঠিয়ে সে অনুযায়ী পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে পৃথক করা হয়।

মশার কামড়ে ভয়ংকর ১২ রোগ 

অনেকেরই ধারণা মশার কামড়ে শুধু ডেঙ্গু বা ম্যালেরিয়া হয়। সাম্প্রতিক সময়ে অবশ্য চিকুনগুনিয়া দেশ কাঁপাচ্ছে। তবে ছোট্ট এই প্রাণীটি যে আরো কতো ভয়ংকর রোগের কারণ হতে পারে তা হয়তো অনেকেই জানেন না। মশার কামড়ে সৃষ্টি হয় ১২ ধরনের ভয়ংকর রোগ। অ্যামেরিকান মসকিউটো কন্ট্রোল এসোসিয়েশনের ( এ এম সি এ ) এক তথ্যে দেখা যায় যে, মশার কারনে প্রতিবছর সারাবিশ্বে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে ১০ লাখের অধিক মানুষ মারা যায়। শুধু মানুষই নয়, মশার কামড়ে কুকুর, ঘোড়া আক্রান্ত হয়ে প্যারালাইজডসহ মৃত্যু বরনও করে থাকে। এক সময়ে এ দেশে মশার কামড়ে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মানুষ মারা যেত। এখন আর সে অবস্থা না থাকলেও দেশের পার্বত্য জেলাগুলোতে এখনও ম্যালেরিয়ার প্রাদুর্ভাব রয়েছে, যা ওই অঞ্চলের মানুষকে পীড়িত করে। 

জিকা

সাম্প্রতিককালে মশাবাহিত ভয়ংকর রোগগুলোর মধ্যে জিকা অন্যতম। জিকা ভাইরাস যে রোগ সৃষ্টি করে তার নাম জিকা জ্বর। এর উপসর্গগুলো হলো জ্বর, মাথাব্যথা, অবসাদগ্রস্ততা, অস্থিসন্ধিতে ব্যথা, পেশীতে ব্যথা, শরীরে লালচে দাগ বা ফুসকুড়ি ইত্যাদি। এই ভাইরাসের কারণে মারাত্মক জটিলতা হয় গর্ভস্থ শিশুর, ছোট আকৃতির মাথা নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। এই রোগের প্রাদুর্ভাব আমাদের দেশে তুলনামূলক কম।

ওয়েস্ট নাইল ভাইরাস

এটি মশাবাহিত একটি ভয়ংকর রোগ। এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি স্নায়ুবিকভাবে দুর্বল হয়ে পুঙ্গ হয়ে যেতে পারে। এই রোগের ভীতিকর দিকটি হলো, এটি কোনো প্রকার উপসর্গ ছাড়াই দেখা দেয়। ফলে আক্রান্ত ব্যক্তি বুঝতেই পারে না যে তিনি ওয়েস্ট নাইল ভাইরাসে আক্রান্ত। এই রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।

ডেঙ্গু

সাধারণত উষ্ণমন্ডলীয় দেশে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেশি দেখা যায়। জিকা বা চিকনগুনিয়ার মতো স্ত্রী এডিস মশার মাধ্যমে এই রোগ ছড়ায়। উচ্চমাত্রায় জ্বর, তীব্র মাথাব্যথা (মাথার সামনের অংশে), চোখের পেছনে ব্যথা, মাংসপেশীতে ও হাড়ের সংযোগস্থলে ব্যথা, র‌্যাশ, বমি বমি ভাব, বিতৃষ্ণাবোধ ইত্যাদি এই রোগের উপসর্গ। ডেঙ্গু জ্বর প্রাণঘাতী হতে পারে।

ওয়েস্টার্ন ইকুয়িন এনসেফালাইটিস

কিউলেক্স মশার কামড়ে এই রোগ হয়। জ্বর, মাথাব্যথা, বমি বমি ভাব ইত্যাদি এই রোগের উপসর্গ। সাধারণত বয়স্ক লোকেরা এই রোগে বেশি আক্রান্ত হয়। পৃথিবীর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে বেশি এই রোগী দেখা যায়। তবে সংখ্যার বিচারে তা একেবারেই নগণ্য। ১৯৬৪ সাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত এই রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা মাত্র ৭০০ জন।

চিকুনগুনিয়া

আফ্রিকা মহাদেশে এই রোগ বেশি হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আফ্রিকার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এই রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দক্ষিণ এশিয়ায়ও বেড়ে চলেছে। ডেঙ্গু ও জিকার ভাইরাস বহনকারী মশা এই রোগের কারণ। উপসর্গও ডেঙ্গুর মতো। তবে এই রোগে আক্রান্ত রোগী হাড়ের সংযোগস্থলে তীব্র ব্যথা অনুভব করে। রোগটির কোনো প্রতিষেধক নেই।

ইয়োলো ফিভার

এর লক্ষণগুলো জন্ডিসের মতো। এই রোগ হলে সারা শরীর হলুদ রঙের হয়ে যায় এবং তীব্র জ্বর ও বমি বমি ভাব থাকে। আফ্রিকান দেশগুলোতে এই রোগ বেশি হয়ে থাকে।

লিমফেটিক ফাইলেরিয়াসিস

মশাবাহিত রোগের মধ্যে লিমফেটিক ফাইলেরিয়াসিস কম পরিচিত হলেও এটি খুব ভয়ংকর। রোগটি ফাইলেরিয়া ধরনের একটি মারাত্মক ইনফেকশন, যার প্রভাবে মানুষের পা স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক গুণ ফুলে ভারী হয়ে ওঠে। আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকা এবং প্রশান্ত মহাসাগরের পশ্চিম তীরবর্তী অঞ্চলে এই রোগের প্রাদূর্ভাব বেশি দেখা যায়।

জাপানি এনসেফালাইটিস

এ রোগ ছড়ানোর জন্য দায়ী কিউলেক্স মশা বাড়ির চারপাশের জলাভূমি ও স্থির পানি কিংবা কৃষি জমিতে জন্ম নেয়। মানবদেহে সংক্রমণের পর রোগটি কেন্দ্রীয় নার্ভ সিস্টেমে প্রবেশ করে। এছাড়া জ্বর, মাথা ব্যাথা ও বমি বমি ভাব হয়। এশিয়া এবং পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে এই রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি দেখা যায়।

সেন্ট লুইস এনসেফালাইটিস

কিউলেক্স মশাবাহিত একটি ভয়ংকর রোগ এটি। যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমের রাজ্যগুলোতে এই রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি দেখা যায়। উপসর্গ হিসেবে জ্বর, মাথা ব্যাথা ও বমি বমি ভাব ইত্যাদি হয়ে থাকে। তবে এর তীব্রতা বাড়লে আক্রান্ত ব্যক্তি কয়েকদিনের জন্য সম্পূর্ণ অচেতন হয়ে যেতে পারে। শিশুদের তুলনায় বয়স্করা এই রোগের ঝুঁকিতে বেশি থাকে। রোগটির কোনো প্রতিষেধক আবিষ্কার হয়নি।

লা ক্রস এনসেফালাইটিস

যে সমস্ত মশা গাছের কোটরে জন্ম নেয় তাদের কাছে থেকে এই রোগ ছড়ানোর সম্ভাবনা বেশি। বয়স্করা এই রোগে আক্রান্ত হবার সম্ভবনা থাকলেও ১৬ বছরের নিচের বাচ্চাদের জন্য এই রোগ অত্যন্ত ভয়ংকর। আটলান্টিক মহাসগরের দক্ষিণ পাড়ের দেশগুলোতে এই রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি দেখা যায়। এই রোগের উপসর্গ হিসেবে আক্রান্ত ব্যক্তির জ্বর ও বমি বমি ভাব হয়। তবে দীর্ঘ মেয়াদে এই রোগে ভুগলে আক্রান্ত ব্যক্তি শারীরিকভাবে বিকলঙ্গ হয়ে যাবার সম্ভাবনা থাকে।

 ইস্টার্ন ইকুয়িন এনসেফালাইটিস

যুক্তরাষ্ট্রের মশাবাহিত রোগের মধ্যে ইস্টার্ন ইকুয়িন এনসেফালাইটিস অন্যতম। আমেরিকার ফ্লোরিডা, জর্জিয়া এবং নিউ জার্সিতে এই প্রাদুর্ভাব বেশি দেখা যায়। এই রোগে আক্রান্ত এক-তৃতীয়াংশ লোক মারা যায় এবং যারা রোগ আক্রান্ত হওয়ার পর বেঁচে যায় তাদের মস্তিস্কে সমস্যা দেখা দেয়। এই রোগের কোনো প্রতিষেধক নেই।

ভেনিজুয়েলা ইকুয়িন এনসেফালাইটিস

উপসর্গ এবং ফলাফলের দিক দিয়ে এটি ইস্টার্ন ইকুয়িন এনসেফালাইটিস গোত্রের রোগ। তবে এই রোগ গর্ভবতী মায়েদের ক্ষেত্রে বেশি ক্ষতিকর। কারণ এর ফলে অকালে গর্ভপাত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। দক্ষিণ এবং মধ্য আমেরিকায় এই রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি দেখা যায়।

মশা মারার টাকা কোথায় যায়

২০১৬-১৭ অর্থবছরে (জুলাই ২০১৬ থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত) মশক নিধন বাবদ ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন ব্যয় করেছে ৩৪ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। গত পাঁচ বছরে রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশন ও অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশন ব্যয় করেছে ১১৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা। চলতি অর্থবছরের বাজেটেও নতুন করে আরও কিছু ওষুধ কেনার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হয়েছে। তার পরও রাজধানীতে মশার উপদ্রব কমেনি। মশক নিধন কার্যক্রমও মানুষের চোখে পড়ে না। মশার ওষুধ কেনা ও এর সঠিক ব্যবহার নিয়ে কয়েক দশক ধরে চলছে শুভঙ্করের ফাঁকি। অনেকেরই প্রশ্ন, মশক নিধনের টাকা যায় কোথায়।

ওষুধে যখন ভেজাল

অভিযোগ রয়েছে, মশার ওষুধ কেনায় সম্পৃক্ত সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা ঠিকাদারের সঙ্গে যোগসাজশে মানহীন ওষুধ নিয়ে থাকেন। তবে ২০১১ সালের ২০ আগস্ট বিষয়টি হাতেনাতে ধরা পড়ে। ঠিকাদার মিজানুর রহমান খান ৩ কোটি ৪৫ লাখ টাকায় ৫০০ ড্রাম এডাল্টিসাইড ওষুধ সরবরাহ করেন। এক পর্যায়ে এ ওষুধ ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করে দেখা যায়, ড্রামগুলোতে কোনো ওষুধই নেই।

বর্তমান দুই সিটি করপোরেশনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) দরপত্রের মাধ্যমে ওষুধ সংগ্রহ করে। এ ওষুধ খামারবাড়ির প্লান্টেশন উইং, গাজীপুরের এগ্রিকালচার রিসার্চ ইনস্টিটিউট ও মহাখালীর আইইডিসিআর থেকে পরীক্ষা করা হয়। তিনটি পরীক্ষা রিপোর্টে ওষুধের মান ঠিক থাকলে ডিএনসিসি ওষুধ নেয়। ডিএনসিসির স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. ইমদাদুল ইসলাম বলেন, 'এত পরীক্ষা পর আর কোনো ভেজাল থাকার কথা না।'

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) আগে দরপত্রের মাধ্যমে ওষুধ কিনলেও গত কয়েক বছর ধরে বাজারমূল্যের চেয়ে তুলনামূলক বেশি দামে নৌবাহিনীর ডকইয়ার্ডের কাছ থেকে ওষুধ সংগ্রহ করছে। এসব ওষুধও তিনটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে পরীক্ষা করে নেওয়া হয়। তবে এই পরীক্ষা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। কারণ পরীক্ষার সময় সিটি করপোরেশনের কোনো প্রতিনিধি থাকেন না। এমনকি মাঠপর্যায়ে ব্যবহারের সময় কখনও কখনও নমুনা সংগ্রহ করেও মান যাচাই করা হয় না।

দুই সিটি করপোরেশনেরই দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলেন, 'এডাল্টিসাইড ওষুধে পানি মেশানোর কোনো সুযোগ নেই। কারণ এতে ধোঁয়া হয় না। একজন ফগারম্যানকে প্রতিদিন ৩০ মিলিলিটার লার্ভিসাইড ওষুধ দেওয়া হয়, যার দাম ৪৫ টাকা। প্রতি ৬ মিলিলিটার ওষুধে ১০ লিটার পানি মিশিয়ে সেটা ব্যবহার করতে হয়। এই ওষুধ বাইরে বিক্রি করতে গেলে কেউ কেনে না। ৩০ টাকার ওষুধ বড়জোর ১০ টাকায় বিক্রি করা সম্ভব। ১০ টাকার জন্য কোনো ফগারম্যান হয়তো এমন করবেন না।'

প্রয়োজন প্রতিদিন, ছিটানো হয় মাসে দু'দিন 

নগরবাসীর অভিযোগ, সপ্তাহে দু'দিন মশার ওষুধ স্প্রে করার কথা। অথচ কখনও কখনও এক মাসেও ফগারম্যানদের দেখা পাওয়া যায় না। সম্প্রতি এ নিয়ে ডিএনসিসির কাউন্সিলররা মেয়রের কাছে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এক পর্যায়ে মেয়র ফগারম্যানদের পরিচালনা ও মশার ওষুধ স্প্রে করার দায়িত্ব কাউন্সিলরদের হাতে ছেড়ে দেন। নগরবাসীর আরও অভিযোগ, স্প্রে করা ওষুধ থেকে কেবলই কেরোসিনের গন্ধ আসে। এ প্রসঙ্গে ডিএসসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রি. জে. শেখ সালাহউদ্দিন ও ডিএনসিসির স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. ইমদাদুল ইসলাম বলেন, 'এডাল্টিসাইড ওষুধে ৯৯ দশমিক ৪ শতাংশই থাকে কেরোসিন। আর দশমিক ৬ শতাংশ থাকে ওষুধ। তাই কেরোসিনের গন্ধ পাওয়া অমূলক নয়।'

কাজে ফাঁকি দেয় ফগারম্যানরা 

ওষুধ ছিটানোর দায়িত্ব পালনকারী একজন ফগারম্যান প্রতিদিন মাত্র ৮০ টাকা মজুরি পান। মশা নিয়ন্ত্রণ রাখতে মজুরি বাড়ানো ছাড়াও প্রতিটি ওয়ার্ডে ২০ থেকে ৫০টি ফগার মেশিন ও ২৫ থেকে ৬০ জন ফগারম্যান থাকা প্রয়োজন। বর্তমানে প্রতিটি ওয়ার্ডে ফগারম্যান রয়েছে পাঁচজন করে। তারা ১০ দিনে দু'বার স্প্রে করতে পারে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ