ঢাকা, বৃহস্পতিবার 13 July 2017, ২৯ আষাঢ় ১৪২8, ১৮ শাওয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

সিটি কর্পোরেশনের শত শত মশক নিধন কর্মী ডুমুরের ফুল

তোফাজ্জল হোসেন কামাল : ছোট্ট প্রাণী ‘মশা’ এর কাছে কাবু অস্বস্তিকর রাজধানী ঢাকাবাসী। জীবনযাত্রায় যন্ত্রণা সৃষ্টি করছে মশককূল। এখন তাদের নিয়ন্ত্রণেও বেসামাল অবস্থা। দিন দিন বেড়েই চলছে মশার উৎপাত। বাসাবাড়ি, অফিস-আদালত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কর্মস্থল সর্বত্রই দাপিয়ে বেড়াচ্ছে মশা। রাতে তো বটেই দিনের বেলায়ও চলছে মশার অসহ্য অত্যাচার। মশারি টানিয়ে, কয়েল জ্বালিয়ে, ইলেকট্রিক ব্যাট কিংবা মশানাশক ওষুধ স্প্রে করেও রক্ষা মিলছে না।

অথচ মশা নিধনে বছর বছর বরাদ্দ বাড়াচ্ছে ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি ও ডিএনসিসি)। অভিযোগে প্রকাশ, বরাদ্দ বাড়লেও মশার যন্ত্রণা থেকে রেহাই মিলছে না নগরবাসীর। তাদের মতে, বরাদ্দ বাড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মশার উপদ্রব। 

জানা গেছে, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার পুকুর-ডোবা, নালা-নর্দমার কচুরিপানা ও ময়লা পরিষ্কার না করায় সেগুলো মশা উৎপাদনের খামার হিসেবে বিরাজ করছে। মশা নিধনের দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের। তবে অভিযোগ রয়েছে, ওষুধ স্প্রে করার জন্য প্রতি ওয়ার্ডে ৬ জন করে কর্মী থাকলেও তারা ডুমুরের ফুল। 

বর্ষা মৌসুমকে মশকের বংশ বৃদ্ধির কাল ধরেই মশকযন্ত্রণা নিবারনের যাবতীয় উদ্যেগ নেয় ঢাকার দুটি সিটি কর্পোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। কিন্তু এবার বর্ষা আসার আগেই মশকূলের ওড়াওড়িটা বাড়াবাড়ির পর্যায়ে চলে গেলেও দায়িত্ব অবহেলায় সে দিকে নেক নজর দেয়া হয়নি বলেই রাতের বেলায় তাদের উৎপাত-এমন জানাশোনা চিরাচরিত হলেও এখন সেই জানাশোনারও ব্যতয় ঘটিয়ে দিনরাতের উৎপাতে ভূগতে শুরু করেছে গোটা রাজধানীবাসী। মশার উৎপাত ঠেকাতে ক্র্যাশ প্রোগ্রামও করা হয়েছিল। কিন্তু সেটা কাজে এসেছে বলে বর্তমানের অবস্থায় মনে না হবারই কারন। দিনরাত সমানতালে মশার যাতনায় অনেকটাই কাহিল নগরবাসীর জন্য সুখবর নেই। কারন তিনটি প্রতিষ্ঠানই যৌথভাবে কাজ করেও রাজধানীর মশা নিধন করতে পারছে না। ফলে মশার উৎপাত থেকে নিস্তারও নেই। মশার কামড়ে চিকুনগুনিয়া, ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়াসহ নানা রোগ হচ্ছে।

নগরবাসীর অভিযোগ, মশক নিধন কার্যক্রম নিয়মিত পরিচালনা করা হয় না। নিয়মিত পরিষ্কার করা হয় না নগরের লেক ও ডোবা-নালাগুলো। এর ফলে মশার উপদ্রবে অতিষ্ঠ রাজধানীর প্রায় সব এলাকার মানুষ।

নগরীর বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, জানুয়ারি মাস থেকে মশার উপদ্রব বেড়েছে। কিন্তু এই উপদ্রবের সামনে সংশ্লিষ্টদের তৎপরতা ছিল কোন কোন ক্ষেত্রে লোক দেখানো। বাসাবাড়ি, কর্মস্থল, চলতি পথেও মশা থেকে নিস্তার মিলছে না। মশা নিধন না করায় ভুক্তভোগীরা সংশ্লিষ্ট তিন সংস্থার ওপর চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তবে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলো বলছে পর্যাপ্ত জনবল, যন্ত্রপাতি না থাকায় মশা নির্মূলে সঠিকভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারছে না।

জানা গেছে, রাজধানীর মশা নিধনের দায়িত্ব রয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি), ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি) এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের ঢাকা মশক নিবারণী দফতর। কিন্তু এই তিন প্রতিষ্ঠান মিলেও নগরবাসীকে মশার হাত থেকে রক্ষা করতে পারছে না। এ তিনটি সেবা দানকারি প্রতিষ্ঠান প্রতিবছর মশক নিয়ন্ত্রণ খাতে কয়েক কোটি টাকা বরাদ্দ রাখছে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের মশক নিবারণী দফতর বরাদ্দ না রাখলেও লোকবল দেয়াসহ এ বিষয়ে দুই ডিসিসিকে সহায়তা করে আসছে। এত বিপুল পরিমাণ এ বরাদ্দ ব্যয় হলেও মশার অত্যাচার থেকে নিস্তার না পাওয়ায় নগরবাসীর ক্ষোভ বাড়ছে। 

তবে দুই ডিসিসি’র একটি সূত্রে জানা গেছে, প্রতি অর্থ বছরের বাজেটে যে টাকা বরাদ্দ রাখা হচ্ছে তার অধিকাংশই সংশ্লিষ্ট বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তা কর্মচারিদের পকেটে যাচ্ছে। ফলে কর্তৃপক্ষ মাঝে মধ্যে লোক দেখানো মশন নিধন কার্যক্রম পরিচালনা করলেও তাতে মশা নিধন হচ্ছে না। 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দুই সিটি কর্পোরেশন ও ঢাকা মশক নিবারণী দফতরের সাত শতাধিক মশক নিধন শ্রমিক কাজ করছে। এতে প্রতিটি ওয়ার্ডে অন্তত ৭ জন করে শ্রমিক কাজ করার কথা রয়েছে। এসব শ্রমিকরা সকালে নালা-নর্দমায় ওষুধ ছিটাবে এবং বিকালে ¯েপ্রর মাধ্যেমে মশা প্রবণ এলাকাসহ প্রায় সব এলাকায় ঘুরে ঘুরে উড়ন্ত মশা নিধন করবে। কিন্তু মশক নিধন শ্রমিকরা সঠিকভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করছেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। সপ্তাহে এক বা দুদিন নামকাওয়াস্তে ওষুধ ছিটাচ্ছে তারা। বরাদ্দ ওষুধ সংঘবদ্ধ চক্র বিক্রি করে দেয় বলেও অভিযোগ উঠেছে। ফলে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ বড় অংকের অর্থ বরাদ্দ করেও সুফল পাচ্ছে না নগরবাসী। 

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ৮ নং ওয়ার্ড ছাড়া প্রথম ১৩টিতে ৩১২ একর জলাধার রয়েছে। এগুলো কচুরিপানা ও আবর্জনায় ভর্তি। একই চিত্র ১৪, ২২, ২৩, ২৪, ২৫, ২৬, ২৭, ২৮, ২৯, ৫৫, ৫৬, ৫৭ ওয়ার্ডের ৩২ একর জলাধারের। এছাড়াও ৭, ৩৯, ৪০, ৪১, ৪৪, ৪৫, ৪৬, ৪৭, ৪৮, ৪৯, ৫০, ৫১, ৫২, ৫৩ ও ৫৪ নম্বর ওয়ার্ডের ১৪৪ বিঘা ৯ কাঠা জলাশয় দীর্ঘদিন ধরে পরিষ্কার করা হয় না। 

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ডিএসসিসির মশক নিধন বিভাগে ¯েপ্রম্যান রয়েছে ১৮৩ জন, ক্রু ম্যান রয়েছে ১৫১, সুপারভাইজার রয়েছে ১০ জন। ফগার মেশিন রয়েছে ৩৮৭টি, হস্তচালিত মেশিন রয়েছে ৪৩৮টি, হুইল ব্যারো মেশিন রয়েছে ৩৬টি, ইউএলভি মেশিন রয়েছে ২টি, পাওয়ার স্পেয়ার রয়েছে ৫টি এবং ন্যাপসেক পাওয়ার রয়েছে ১টি। এর মধ্যে ৭১টি ফগার মেশিন, ৫৯টি হস্তচালিত মেশিন, ৮টি হুইল ব্যারো, ২টি ইউএলভি, ৫টি পাওয়ার স্পেয়ার ও ১টি ন্যাপসেক পাওয়ার মেশিন নষ্ট।

অন্যদিকে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের পাঁচটি অঞ্চলে জলাধার রয়েছে ১ হাজার ৮৭৫ বিঘা। এর মধ্যে অন্যতম এলাকা হচ্ছে বছিলা, গাবতলী, মিরপুর, কুড়িল, গুলশান ও উত্তরা। এছাড়াও অন্যান্য এলাকায় বেশ কিছু জলাধার রয়েছে। আর ডিএনসিসির ৩০৯ জন মশক নিধন কর্মী রয়েছে। এর মধ্যে ¯েপ্রম্যান রয়েছে ১২০ জন এবং ক্রু ম্যান রয়েছে ১৮৯ জন। সুপারভাইজার রয়েছে ৮ জন। এছাড়াও ফগার মেশিন রয়েছে ২১৭টি, হস্তচালিত মেশিন রয়েছে ২৮৭টি এবং হুইল ব্যারো মেশিন রয়েছে ১টি।

জানা গেছে, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় জলাশয় রয়েছে প্রায় এক হাজার বিঘা। এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণে রয়েছে ৪৮৭ বিঘা। এসব জলাশয়ে কচুরিপনা ও আবর্জনা জমে আছে। এগুলো নিয়মিত পরিষ্কার করা হয় না। ফলে শীত মৌসুম এলে জলাশয়ের আবদ্ধ পানি দুর্গন্ধময় হয়ে মশার প্রধান প্রজনন স্থলে পরিণত হয়।

মশার প্রকার

মশা প্রধানত তিন প্রকার; অ্যালোফিলিস, কিউলেক্স ও স্টেগোমিয়া। মশাকে সম্মান করে ‘মিয়া’ যোগ করে স্টেগোমিয়া বলা হয় না। এটা তার নামের অংশ। প্রথম প্রকার মশা ম্যালেরিয়া, দ্বিতীয় প্রকার মশা গোদ বা ফাইলেরিয়া রোগের জীবাণুবাহক। আর এডিস মশা ডেঙ্গু রোগ ছড়ায়। বিশেষ করে ২০০০ সাল থেকে এই ব্যাধিটি বাংলাদেশে আতঙ্কের একটা বড় কারণ। ডেঙ্গুর ব্যাপারে সতর্ক হয়ে এডিস মশার প্রজননস্থল প্রতিরোধে কিছুটা সজাগ হলেও সে তুলনায় অন্যান্য মশার বংশবৃদ্ধির ব্যাপারে সচেতনতা খুবই কম দুই সিটি কর্পোরেশনের। এ কারণেই মশার প্রজননস্থলের অভাব নেই এই রাজধানীতে, অভিযোগ নগরবিদদের।

ডেঙ্গু রোগ ২০০০ সালের দিকে আতঙ্ক সৃষ্টির পর কয়েক বছর এটা ছিল কম। সম্প্রতি আবার অনেকে আক্রান্ত হচ্ছেন এডিস মশাঘটিত এই জ্বরে। সেই ২০০০ সালে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের অন্যতম দায়িত্বশীল ও পেশাজীবী আন্দোলনের একজন নেতা ইব্রাহিম মিয়ার মৃত্যু ঘটেছিল। এরপর ডেঙ্গুতে প্রাণ হারিয়েছেন ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের একমাত্র ছেলে।এই দুটি মৃত্যু উল্লেখযোগ্য হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মানুষ মারা যাওয়ার ঘটনা ঘটছেই।

মশা মারার টাকা কোথায় যায়

২০১৬-১৭ অর্থবছরে (জুলাই ২০১৬ থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত) মশক নিধন বাবদ ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন ব্যয় করেছে ৩৪ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। গত পাঁচ বছরে রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশন ও অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশন ব্যয় করেছে ১১৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা। চলতি অর্থবছরের বাজেটেও নতুন করে আরও কিছু ওষুধ কেনার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হয়েছে। তার পরও রাজধানীতে মশার উপদ্রব কমেনি। মশক নিধন কার্যক্রমও মানুষের চোখে পড়ে না। মশার ওষুধ কেনা ও এর সঠিক ব্যবহার নিয়ে কয়েক দশক ধরে চলছে শুভঙ্করের ফাঁকি। অনেকেরই প্রশ্ন, মশক নিধনের টাকা যায় কোথায়।

চিকুনগুনিয়ার প্রকোপ

দেশজুড়ে চিকুনগুনিয়া পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। শুরুতে রাজধানীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন চিকুনগুনিয়া ভাইরাস বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়েছে। জুন মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে গ্রামেও চিকুনগুনিয়া বিস্তারের খবর এসেছে। এর পরই মূলত চিকুনগুনিয়া নিয়ে সারাদেশে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। উদ্বিগ্ন সরকার একের পর এক পদক্ষেপ গ্রহণ করেও ভয়াবহ হয়ে ওঠা এই ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না। তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা চিকুনগুনিয়া পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার জন্য স্বাস্থ্য বিভাগের দেরিতে কাজ শুরু করাকেই দায়ী করেছেন। তাদের মতে, আগে থেকে পরিকল্পনা করে সে অনুযায়ী কাজ করলে চিকুনগুনিয়ার বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হতো।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (সিডিসি) অধ্যাপক ডা. সানিয়া তাহমিনা বলেন, 'চিকুনগুনিয়া নিয়ন্ত্রণের জন্য মশার বংশবিস্তার রোধ করতে হবে। আর মশক নিধন কার্যক্রম চালাবে সিটি করপোরেশন। কারণ সরকার মশক নিধন কর্মসূচির জন্য সিটি করপোরেশনকে কোটি কোটি টাকার বরাদ্দ দেয়। স্বাস্থ্য বিভাগের কাজ সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি আক্রান্তদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা। আমরা সেই কাজ করছি।'

তবে দেরিতে সচেতনতামূলক কার্যক্রম শুরুর বিষয়ে কোনো মন্তব্য না করে তিনি বলেন, এ বছর আগেভাগে বৃষ্টি শুরুর কারণে তারা ডেঙ্গু বিস্তারের আশঙ্কা করেছিলেন। মার্চের শেষ সপ্তাহ থেকে মানুষ জ্বরে আক্রান্ত হচ্ছেন- এমন বার্তা তাদের কাছে ছিল। তবে সেটি চিকুনগুনিয়া কি-না তা জানতে পারেননি। চিকুনগুনিয়া বিস্তারের খবর পাওয়ার পরপরই মে মাস থেকে সচেতনতা কার্যক্রম শুরু করা হয়। বর্তমানে তা জোরালোভাবে চালানো হচ্ছে।

এদিকে রাজধানীসহ সারাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে চিকুনগুনিয়া আক্রান্তের খবর এলেও সরকারি হিসাব অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত এই ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় আড়াই হাজার দেখানো হয়েছে। বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে রোগী সংখ্যার এ তথ্য পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন আইইডিসিআর পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদি সেব্রিনা। তিনি বলেন, 'চিকুনগুনিয়া বিষয়ে আইইডিসিআর একটি জরিপ করছে। সেটা শিগগিরই শেষ হবে। কতসংখ্যক মানুষ চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে, ওই জরিপ শেষে তা চূড়ান্তভাবে জানা যাবে।'

ফায়দা নিচ্ছে কয়েল ব্যবসায়ীরা

রাজধানীতে সন্ধ্যা নামার আগেই মশার কামড় থেকে বাঁচতে কেউ আশ্রয় নিচ্ছে মশারির ভেতর, কেউ জ্বালাচ্ছে মশার কয়েল। তবুও রেহাই মিলছে না। ভবনের নিচতলা-দোতলা, টিনশেড ঘর কিংবা বস্তি এলাকায় মশার উৎপাত সবচেয়ে বেশি। মশার কামড়ে মশাবাহিত নানা রোগেও আক্রান্ত হচ্ছে অনেকেই। এ কারণে মশার উপদ্রবে নগরবাসীর অবলম্বন এখন মশার কয়েল। এ সুযোগে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী অনুমোদনহীন বিষাক্ত মশার কয়েল উৎপাদন ও বাজারজাত করছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসটিআইর অনুমোদন নিয়ে মাত্র ৪৯টি প্রতিষ্ঠান বৈধভাবে মশার কয়েল উত্পাদন করলেও ভেজাল মশার কয়েল উত্পাদন করছে অর্ধশতাধিক প্রতিষ্ঠান। আর এসব প্রতিষ্ঠানের বিষাক্ত মশার কয়েল ব্যবহার করে চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছে সাধারণ মানুষ। 

ভেজাল কয়েলে বাজার সয়লাব 

মশার উপদ্রব বেড়ে যাওয়ায় বেড়েছে মশার কয়েলের ব্যবহার। কিন্তু সাধারণ ক্রেতারা সহজে এবং কম দামের যে ভেজাল মশার কয়েল ব্যবহার করছে তাতে চরম স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। ঘরে মশার কয়েল জ্বালালে এমনিতেই কার্বন মনো-অক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে যায়। আর তা যদি হয় ভেজাল মশার কয়েল তাহলে এর মাত্রা এত বেশি হয়, যা মানুষের শরীরের জন্য চরম ক্ষতিকর। ভেজাল মশার কয়েলে রয়েছে মাত্রাতিরিক্ত ‘অ্যাক্টিভ ইনগ্রেডিয়েন্ট’। যার বিষাক্ত ধোঁয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মাতৃগর্ভে থাকা শিশু থেকে শুরু করে ছোট-বড় সবাই। 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) মশা তাড়ানোর কয়েলে শূন্য দশমিক ১ থেকে শূন্য দশমিক ৩ মাত্রার ‘অ্যাক্টিভ ইনগ্রেডিয়েন্ট’ নামক কীটনাশক ব্যবহার নির্ধারণ করেছে। এই মাত্রার কীটনাশক ব্যবহার হলে মশা পালিয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু চীন-থাইল্যান্ড থেকে আমদানি করা ও বাংলাদেশে প্রস্তুত কিছু উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ক্রেতা আকৃষ্ট করতে অতিমাত্রার কীটনাশক ব্যবহার করছে। এতে মশাসহ বিভিন্ন পোকামাকড়, তেলাপোকা এমনকি টিকটিকিও মারা যাচ্ছে। একটি মশার কয়েলের ধোঁয়ায় থাকা রাসায়নিক ১৩৭টি সিগারেটে থাকা নিকোটিনের চেয়েও ক্ষতিকর। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের এমন মত উপেক্ষা করে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় উৎপাদন ও বিভিন্ন এলাকার দোকানপাটে প্রকাশ্যেই বিক্রি হচ্ছে অনুমোদনহীন ও মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর মশার কয়েল। 

বিএসটিআই সূত্রে জানা গেছে, এ মুহূর্তে বাজারে ৪৯টি কোম্পানির ৬০ ধরনের মশার কয়েলের অনুমতি রয়েছে। কিন্তু বাজারের চিত্র ভিন্ন। এই অনুমতির তালিকার বাইরে বাজারে রয়েছে আরও অন্তত অর্ধশত মশার কয়েলের ব্র্যান্ড। এসব কয়েলের গায়ে ঢাকা, ভৈরব কিংবা চট্টগ্রাম লেখা থাকলেও পূর্ণাঙ্গ কোনো ঠিকানা নেই। 

জীবন কেড়ে নিচ্ছে মশার কয়েল 

কয়েলের আগুন থেকে গুরুতর দগ্ধ এমনকি প্রাণহানির ঘটনাও ঘটছে। ২০১৪ সালের ১৮ জুন মশার কয়েল থেকে আগুনে দগ্ধ হয়ে গাজীপুর সদর উপজেলার ডেগেরচালা এলাকায় ১৮ মাস বয়সী শিশুসহ স্বামী-স্ত্রী মারা যায়। চলতি বছরের ৪ এপ্রিল রাজশাহীতে মশার কয়েল থেকে লাগা আগুনে বাবলু (৪৫) নামে এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়। গত বছরের ১৯ আগস্ট মশার কয়েলের আগুনে রাজধানীর দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের গেন্ডারিয়া এলাকায় একই পরিবারের চারজন দগ্ধ হয়। এর মধ্যে রহিমা বেগম নামে একজনের মৃত্যু হয়।

বিশেষজ্ঞদের অভিমত

ঢাকা শিশু হাসপাতালের কিডনি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ হানিফ ভেজাল মশার কয়েলের ক্ষতিকর দিকগুলো সম্পর্কে জানান, ভেজাল মশার কয়েলে কত ধরনের কেমিক্যাল ব্যবহার করা হয় আমরা তা জানি না। কিন্তু যত কেমিক্যাল ব্যবহার করা হয় এর সবই মানবস্বাস্থ্যের জন্য ভয়াবহ ক্যানসারের ঝুঁকি বহন করে। বিশেষ করে গর্ভে থাকা শিশুরা এই ঝুঁকি নিয়ে জন্ম নেয়। গর্ভাবস্থায় যেসব মা মশার কয়েল ব্যবহার করেন তাদের শিশুরা ভবিষ্যতে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে বড় হয়। আমাদের এখানে অনুমোদন ছাড়া কারখানা চালানো যায়। এটা চলতে পারে না। কয়েলে যেসব কেমিক্যাল ব্যবহার করা হয় তার অনেকই কখনও ধ্বংস হয় না। ছাই পানিতে মেশে। সেটা আবারও আমাদের শরীরে আসার সম্ভাবনা থাকে। 

এ বিষয়ে এসিআই লিমিটেডের নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ আলমগীর বলেন, কয়েলের কাজ মশা তাড়ানো, মশা মেরে ফেলা নয়। অথচ বাজারে এখন এমন কয়েলও পাওয়া যাচ্ছে যাতে মশাই নয়, তেলাপোকা, টিকটিকিও মরে যাচ্ছে। এটা মানবস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ। দেশে কয়েল প্রস্তুত ও বাজারজাতকরণে বিদ্যমান নীতিমালা ও আইনকে পাশ কাটিয়ে এসব কয়েল বাজারে থাকছে কীভাবে?

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ