ঢাকা, শনিবার 15 July 2017, ৩১ আষাঢ় ১৪২8, ২০ শাওয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

এন্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার

একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বরাত দিয়ে পত্রিকান্তরে প্রকাশ, মহানগরী ঢাকার দুবছরের কম বয়সী শিশুদের বছরে গড়ে ১০ বারের বেশি এন্টিবায়োটিক কোর্স দেয়া হয়। কিন্তু আমেরিকার একই বয়সী শিশুদের এন্টিবায়োটিক কোর্স প্রয়োগ করা হয় ০.৯ থেকে ১.৭ বার মাত্র। তার মানে হচ্ছে, আমরা এই ড্রাগের অপব্যবহার করি প্রচুর। মুড়ি-মুড়কি যেমন শিশুদের খেতে দেয়া হয়, প্রায় সেরকমভাবে ওষুধও দেয়া হয় তাদের। কিন্তু ওষুধ যে মুড়ি-মুড়কি নয়, তা আমাদের অনেক মা-বাবারই জানা নেই। উল্লেখ্য, ওষুধ কেবল ওষুধ নয়, বিষও। নিয়মমাফিক ও পরিমাণমতো ওষুধ প্রয়োগ না করলে উপকারের চাইতে অপকারই বেশি হয় একথা আমরা যেন মানতেই চাই না। এমন আত্মঘাতী প্রবণতা থেকে আমাদের অবশ্যই বিরত থাকতে হবে। শুধু শিশুদেরই নয়, বড়দের বেলায়ও একই ঘটনা ঘটে। আমাদের বড়রাও অনেকে যখন-তখন ওষুধের দোকান থেকে ওষুধ কিনে খেয়ে ফেলেন, যা দীর্ঘমেয়াদি কোনও মারাত্মক স্বাস্থ্যসমস্যার কারণ ঘটাতে পারে।
১৯২৮ সালে প্রায় দৈবক্রমে পেনিসিলিয়াম ছত্রাক থেকে সর্বপ্রথম 'পেনিসিলিন' আবিষ্কার করেন আলেকজান্ডার ফ্লেমিং নামে একজন বিজ্ঞানী। এটি হলো প্রথম জীবাণু নাশক ড্রাগ বা এন্টিবায়োটিক। এরই ধারাবাহিকতায় অনেক বিজ্ঞানী প্রাকৃতিক উৎস থেকে এন্টিবায়োটিকের অনুসন্ধান শুরু করেন। এর ফলে ১৯৪০ এবং ১৯৫০ এর দশকের পর আবিষ্কার হয় স্ট্রেপ্টোমাইসিন, ক্লোরামফেনিকল, পলিমিক্সিন, এরিথ্রোমাইসিন, সেফালোস্পরিন, ভ্যানকোমাইসিনসহ আরও বহু এন্টিবায়োটিক। এরপর ১৯৭০ -এর দশকে আবিষ্কৃত হয় কারবাপেনেম গ্রুপের এন্টিবায়োটিকসমূহ। এরপর ধীরেধীরে এন্টিবায়োটিক আবিষ্কারের হার কমতে থাকে। উল্লেখ্য, ১৯৮৭ সালে ড্যাপ্টোমাইসিন ছিল শেষ আবিষ্কৃত এন্টিবায়োটিক। এরপর প্রায় তিনদশক সময়কাল অতিবাহিত হতে চলেছে। বিজ্ঞানীরা নতুন এন্টিবায়োটিক আবিষ্কারের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। পুরনোগুলোর উন্নত সংস্করণ এসেছে নিশ্চয়ই। তবে নতুন এবং আল্ট্রা একটিভ এন্টিবায়োটিকের খুব আশাব্যঞ্জক খবর নেই বলা চলে। তাই কিছুটা উদ্বেগে রয়েছেন বিজ্ঞানীরা। এমতাবস্থায় বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা এন্টিবায়োটিকের ব্যবহার বিধিবদ্ধকরণের দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করে দিয়েছে। এতে চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ব্যতীত ফার্মেসি থেকে এন্টিবায়োটিক বিক্রি নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। এমনকি চিকিৎসাক্ষেত্রেও এন্টিবায়োটিক যথাসাধ্য কম ব্যবহারের নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা দুর্ভাগ্যজনকভাবে উপেক্ষিত। অনেক ফার্মেসি থেকে দেদার ওষুধ বিক্রি হয় প্রেসক্রিপশন ছাড়াই। চিকিৎসকদের স্বাক্ষরিত প্রেসক্রিপশনেও প্রয়োজনের অতিরিক্ত ওষুধের নাম থাকে বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। এর কারণ হচ্ছে, একশ্রেণির চিকিৎসক নাকি ওষুধবিক্রির ওপর কোম্পানির কাছ থেকে কমিশন পান।পরিস্থিতি যদি এমনই হয়, তাহলে আমরা কোথায় অবস্থান করছি, তা ভাবা যায়?
উদ্বেগের কারণ হচ্ছে, একদিকে কার্যকর নতুন এন্টিবায়োটিক আবিষ্কারের সুখবর নেই। অন্যদিকে আবিষ্কৃত এন্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ও মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে কার্যকারিতা হারিয়ে যাচ্ছে ভয়ঙ্করভাবে। আমাদের দেশের নামিদামি হাসপাতালের আইসিইউতে রাখা রোগীদের দামি এন্টিবায়োটিক প্রয়োগ করে সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। এর অন্যতম কারণ নাকি এন্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স। এমন হচ্ছে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন রোগীদের ২৫ শতাংশের ক্ষেত্রে বলে বিশেষজ্ঞরা জানান। এজন্য দায়ী এন্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ও অপরিকল্পিত ব্যবহার। ফলে ওষুধপ্রতিরোধী জীবাণুর সংক্রমণ মারাত্মকভাবে বাড়ছে। অনেক এন্টিবায়োটিকের নিম্নমানও এজন্য দায়ী বলে জানা গেছে।
খুব দ্রুত নতুন এন্টিবায়োটিক আবিষ্কার না হলে আবার কি আমাদের এন্টিবায়োটিক-পূর্বযুগে ফিরে যেতে হবে? আমরা এমন হতাশ হতে চাই না। তবে এন্টিবায়োটিকসহ সবধরনের ওষুধব্যবহারে সতর্কতা অবলম্বন যেমন অনিবার্য হয়ে পড়েছে, ঠিক তেমনই বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার বিধিবদ্ধ নির্দেশনা অনুসারে ওষুধের বিপণন ও ব্যবহার নিশ্চিত করণসহ যারা এর ব্যতিক্রম করবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থাও নিতে হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ