ঢাকা, শনিবার 15 July 2017, ৩১ আষাঢ় ১৪২8, ২০ শাওয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

অর্থ পাচারে বিনিয়োগ হারিয়ে বিধ্বস্ত অর্থনীতি!

আবু সাঈদ : দেশ থেকে দেশের বাইরে অবৈধভাবে অর্থসম্পদ চলে যাওয়াকেই অর্থনীতির ভাষায় অর্থ পাচার বা পুঁজি পাচার বলা হয়। একটা দেশের সমৃদ্ধ অর্থনীতি ধ্বংশের অন্যতম কৌশল এটা। নিজের দেশে অর্জিত সম্পদ লুট করে তা বিদেশে পাঠিয়ে সেখানে পুঁজি গড়ে তোলে কিছু অসাধু দুর্নীতিবাজ গোষ্ঠী।
অর্থ পাচার প্রসঙ্গে বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত বেদনাদায়ক ও প্রশ্নবিদ্ধ! যতই দিন যাচ্ছে বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচারের পরিমাণ ক্রমাগত বাড়ছে। বাংলাদেশ তৃতীয় বিশ্বের একটি উন্নয়নশীল রাষ্ট্র। এদেশ থেকে অর্থ পাচার সত্যিই সম্ভাবনার সকল দ্বার বন্ধ করে দেয়। দেশের অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য যেখানে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক দাতব্য সংস্থা ও ধনী রাষ্ট্রের দ্বারস্থ হতে হয়তখন এই দেশের অর্জিত সম্পদ লুট করে বিদেশে পাচার করা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নকে হুমকির মুখে ফেলে। অথচ বাংলাদেশে বারবার এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়ে আসছে। আর বিগত কয়েক বছর ধরে দেশ থেকে অর্থ পাচারের পরিমাণ ধারণাতীত হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু, অর্থ পাচারের মূল কারণ কি?
অর্থনীতিবিদদের মতে, ‘সরকারের ভ্রান্ত নীতির কারনেই অর্থনীতির অনেক খাতে ধস নেমেছে। যে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রায় স্থবির, যেখানে বিনিয়োগ অত্যন্ত মন্থর, সেখানেই টাকাওয়ালাদের উদ্বৃত্ত অর্থ বিদেশে পাচার করা হয়। যেখানে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, অন্যদিকে ভৌত অবকাঠামো অনিশ্চিত বা অপ্রতুল ভৌত অবকাঠামো। সেখানেও বেশি অর্থ পাচার হয়।’
আর বাংলাদেশের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা। রাষ্ট্রীয়ভাবে অর্থনৈতিক উন্নয়নে নাই কার্যকরী পদক্ষেপ। এই সুযোগের ব্যবহার করছে দেশের অসাধু আর দুর্নীতিবাজ গোষ্ঠী। গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচারে জড়িতদের বেশির ভাগই হলো, চোরাকারবারি ও দেশ থেকে বিদেশে পুঁজি পাচারকারী ব্যবসায়ী, গার্মেন্টস মালিক, শিল্পপতি, দুর্নীতিবাজ আমলা ও পুঁজি লুটেরা রাজনীতিবিদেরা।
আর এদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থের একটা বড় অংশ চলে যায় সুইডেন, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর কিংবা আমাদের সীমান্ত প্রতিবেশী বন্ধুরাষ্ট্র খ্যাত ভারতে!
সবচেয়ে বড় কথা হলো, বিভিন্ন গবেষণা আর পরিসংখ্যানে বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণ দেখলে চোখ কপালে উঠার মতো অবস্থা! ২০১০ সালে দেশেরই একজন গবেষকের প্রকাশিত গবেষণাগ্রন্থ ‘A Profile of Bank Loan Default in the Private sector in Bangladesh’ এ উপস্থাপিত ১২৫টি ঋণখেলাপি প্রতিষ্টানের উপর পরিচালিত জরিপের সংগৃহিত তথ্যে দেখা যায় ঐসব প্রতিষ্টানের মালিকরা তাদের ব্যাংকঋণের বড়সড় অংশ বিদেশে পাচার করে দেয়।
গত ১০ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ভিত্তিক গবেষনা প্রতিষ্টান ‘গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি (জিএফআই)’ ২০০৫ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত সময়কালে উন্নয়নশীল রাষ্ট্রসমূহ থেকে অর্থ পাচারের তথ্য প্রকাশ করে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী উল্লিখিত সময়ে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৯১১ কোটি মার্কিন ডলার পাচার হয়েছে শুধু ২০১৪ সালেই। যা টাকার অঙ্কে প্রায় ৭২ হাজার ৮৭২ কোটি টাকা।
সম্প্রতি দেশের একটা প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে, ২০০৫ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণ ৪ হাজার ৪৬১ কোটি ৫৩ হাজার মার্কিন ডলার। টাকার অঙ্কে যা প্রায় ৩ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা। যা ২০১৬-১৭ অর্থবছরের বাজেটের চেয়েও বেশি।
কিন্তু, জিএফআইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে
২০০৫ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে ৭ হাজার ৫৮৫ কোটি ডলার বা ৬ লাখ ৬ হাজার ৮৬৮ কোটি টাকা। যা দিয়ে দেশের দুইটি বাজেট তৈরী সম্ভব।
উক্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী,
২০১৪ সালে অর্থ পাচারের পরিমাণ ৭০০ কোটি ৭০ লাখ ডলার বা ৫৬ হাজার ৫৬ লাখ কোটি টাকা।
২০১১ সালে ৫৯২ কোটি ১০ লাখ ডলার,
২০১০ সালে ৫৪০ কোটি ৯০ লাখ ডলার,
২০০৯ সালে ৬১২ কোটি ৭০ লাখ ডলার,
২০০৮ সালে ৬৪৪ কোটি ৩০ লাখ ডলার,
২০০৭ সালে ৪০৯ কোটি ৮০ লাখ ডলার,
২০০৬ সালে ৩৩৭ কোটি ৮০ লাখ ডলার,
২০০৫ সালে ৪২৬ কোটি ২০ লাখ ডলার এবং
২০০৪ সালে পাচার হয় ৩৩৪ কোটি ৭০ লাখ ডলার।
গত দুই অর্থবছরে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশী এ্যাকাউন্ট বেড়েছে দ্বিগুণ! সেখান থেকেও অর্থ পাচার হয়। আবার মালয়েশিয়ায় ‘মাই সেকেন্ড হোম’ কর্মসূচীতে গত ১৩ বছরে অর্থ পাঠিয়েছেন ৩ হাজার ৬১ বাংলাদেশী!
অব্যাহত এই অর্থ পাচার দেশের অর্থনীতিকে ধ্বংশের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। দেশীয় অর্থনীতি হয়ে পড়ছে অচল এবং বিদেশী ঋণনির্ভর। যা দেশের অর্থনীতি ধ্বংশে মারাত্মক ব্যাধির ভূমিকা রাখছে। অর্থ পাচার সম্পর্কে জানতে চাইলে দেশের শীর্ষ অর্থনীতিবিদরা সাংবাদিকদের সামনে হতাশা এবং ক্ষোভ নিয়ে তাদের মতামত প্রকাশ করেন।
পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (ডিইজি) সদস্য শামসুল আলম বলেন, দেশের বাইরে টাকা চলে যাচ্ছে এটা ভালো সংবাদ নয়। পাচার হওয়া টাকার হিসাব নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। তবে টাকা পাচার হচ্ছে এটা অস্বীকার করার সুযোগ নাই। যারা বিদেশে টাকা নিয়ে যাচ্ছে তারা হয়তো ভাবছেন দেশে বিনিয়োগের যথেষ্ট সুযোগ নাই। আবার নিরাপত্তাও কারন হতে পারে। তবে কারন যাই হোক, বিষয়টি হালকাভাবে না নিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের খতিয়ে দেখা উচিত। কেননা ৮ শতাংশ জিডিপি অর্জনে এদেশে বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান জিয়া রহমান অর্থ পাচারের জন্য প্রশাসনিক ঢিলেমি ও অস্বচ্ছতাকে দায়ী করেন। তিনি বলেন, হুন্ডি ছাড়া অর্থ পাচারের অন্যান্য মাধ্যমগুলো প্রত্যক্ষভাবেই হয়। তাই পাচার রোধে এসব ক্ষেত্রে জবাবদীহিতা ও স্বচ্ছতা বৃদ্ধি করতে হবে।
তবে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, বিশেষ সময়ে অর্থ পাচার বৃদ্ধি পায়। নির্বাচনের প্রাক্কালে, দেশের ভিতর অনিশ্চয়তা ও অস্থিতিশীলতা থাকলে এবং দেশে বিনিয়োগের যথেষ্ট সুযোগ না থাকলে তখনো অর্থপাচার বাড়ে। ঘটনাক্রমে এই কারণগুলোই এখন বাংলাদেশে বিদ্যমান।
কিন্তু পাচার হওয়া অর্থের ফেরত আনা বা যারা এই নিকৃষ্ট অপরাধের সাথে জড়িত তাদের ব্যাপারে নেয়া হয়না কোনো আইনি ও শাস্তমূলক ব্যবস্থা। দেখা যায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা বিভিন্ন পর্যায়ের সরকারি আমলা ও রাজনীতিবিদ। অনেকেই আবার ক্ষমতার অপব্যবহার করে এই কাজগুলো করেন। তাই তাদের ব্যপারে সরকারের ভূমিকা নীরব।
সদ্য পাচার হওয়া বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ সহ অন্যান্য পাচারের বিষয়ে জানতে চাইলে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত সাংবাদিকদের বলেন, অর্থ পাচার যেটা হয় সেটা বেআইনি। তা রুদ্ধ করার সুযোগ নাই। তবে পাচারের সুযোগ কমানো যেতে পারে। এর অর্থ দেশে যাতে কালো টাকা না হয় সেই ব্যবস্থা নেয়া হবে। এবং অর্থ পাচারের ব্যপারে আইনি সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। সামনের মাসের মধ্যেই সিদ্ধান্ত আসবে। তবে একই সাথে অর্থমন্ত্রীর অন্য মন্তব্যেও আমরা অবাক হয়ে যাই। তিনি বলেন,২০ শতাংশ জরিমানা দিয়ে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দুই বছর ধরে আছে।
এর মানে কি সরকারীভাবে তারা কালো টাকার উৎপাদনে সহযোগিতা করে থাকেন? প্রশ্ন থেকে যায়।
দেশের সংকটময় পরিস্থিতিতে যেন অর্থ পাচারের মতো ভয়াবহ ব্যাধিটি অর্থনীতিকে আবার আক্রমণ না করে তার জন্য সরকারের জুরালো ভূমিকা একান্ত জরুরী। দেশের বিধ্বস্থ অর্থনীতিকে রক্ষা করার জন্য অর্থ পাচারকারীদের কোনো কিছুর বিনিময়েও সুযোগ না দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে এবং জিএফআইয়ের প্রতিবেদনের উপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে অর্থনৈতিক অবকাঠামো উন্নয়নে এগিয়ে আসতে হবে। সমৃদ্ধ অর্থনীতি গড়তে বন্ধ করতে হবে অর্থ পাচারের ব্যাধি!
অনার্স ২য় বর্ষ, সুামগঞ্জ সরকারি কলেজ, সুনামগঞ্জ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ