ঢাকা, শনিবার 15 July 2017, ৩১ আষাঢ় ১৪২8, ২০ শাওয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

ঘুষ-দুর্নীতির টাকা পাচারের হিড়িক পড়েছে!

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল : একসময় সুইস ব্যাংকে টাকা রাখার গল্প শুনতাম। বিভিন্ন দেশের বড় ব্যবসায়ীরা নিজের দেশে নিরাপত্তার অভাব বোধ করে সুইস ব্যাংকে টাকা রাখেন। ওখানে টাকা রাখার ক্ষেত্রে সোর্স উল্লেখ করতে হয় না। সেই টাকা সাদা, না কালো তাও জানতে চাওয়া হয় না। আবার যিনি টাকা রাখেন, তার ব্যাপারেও গোপনীয়তা রক্ষা করা হয়। ফলে বিভিন্ন দেশের ব্যবসায়ীরা সুইস ব্যাংকে অর্থ রেখে নিশ্চিন্ত থাকছেন। গত কয়েক বছরে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের অর্থ রাখার প্রবণতা বেড়েছে। এবার সুইস ব্যাংকে অর্থপাচারে সব রেকর্ড ভঙ্গ করেছে বাংলাদেশ। গত এক বছরে সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে পাচার হয়েছে পাঁচ হাজার ৫৬০ কোটি টাকা। আগের বছরের চেয়ে গত বছর ৯৩৩ কোটি ৩৩ লাখ টাকা বেশি পাচার হয়েছে। পাচারের এই হারও যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে ভারতকেও ছাড়িয়ে যাবে বাংলাদেশ। বিষয়টি সত্যিই সরকারকে লজ্জায় ফেলেছে। আমরাও এ দেশের অতিক্ষুদ্র একজন নাগরিক হিসেবে লজ্জাবোধ করছি। দেশে বিনিয়োগ নেই, অথচ বিদেশে টাকা পাচারের হিড়িক পড়েছে!
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই অর্থ কারা পাচার করেছে? এই অর্থ কি কালো টাকা! তা না হলে সুইস ব্যাংকে কেন রাখা হবে? বৈধ আয়ের টাকা তো দেশের ব্যাংকেই রাখা যায়! দেশের বড় ব্যবসায়ীরা রাখছেন না! অনেকে বলছেন, গার্মেন্ট ব্যবসায়ীদের একটি অংশ। এরা বিদেশে  তৈরি পোশাক রপ্তানি করে যে টাকা আয় করেন, তার একটা বড় অংশ সুইস ব্যাংকে জমা রাখছেন। কেউ কেউ বলছেন, রাজনীতিবিদরা অবৈধ পথে বিপুল পরিমাণ টাকা আয় করেছেন। দেশে রাখলে নানা ঝামেলা। দুদকের ভয়। তাই সেই টাকা সুইস ব্যাংকে জমা রেখেছেন তারা।
সুইস ব্যংকের টাকা নিয়ে বিরোধী দল তথা বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সরকারি দল লুটপাট করে সেই টাকা পাচার করেছে। সরকারি দল বলছে, তাদের নেতাদের কারো টাকা সুইস ব্যংকে নেই। তাহলে এসব টাকার মালিক কারা। এর সমাধান দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। সংসদে তিনি বলেছেন, সুইস ব্যংকে বাংলাদেশীদের অবৈধ কোনো টাকা নেই। এসব অর্থ নাকি ব্যবসায়ীদের। তারা লেনদেনের জন্য এসব টাকা সেখানে রেখেছেন। অর্থমন্ত্রীর কথায় সত্যতা থাকতে পারে। তবে সেটি কতটা সত্য সেটি নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। প্রতিবছরই সুইস ব্যংকে টাকার পরিমাণ বাড়ছে। বিভিন্ন মহল থেকে বলা হচ্ছে, দেশের টাকা পাচার হচ্ছে। এই টাকা পাচারের সাথে রাজনীতিবিদরাই জড়িত।
আমাদের দেশ ভারত ইতিমধ্যেই সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে চুক্তি সই করেছে। ফলে ভারত থেকে টাকা পাচারের প্রবণতা কমেছে। বাংলাদেশ সরকারও ভারতের মতো সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে চুক্তি করতে পারে। তা না হলে টাকা পাচার রোধ করা যাবে না। এ ব্যাপারেও কি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেই হস্তক্ষেপ করতে হবে!
টাকা পাচার নিয়ে যখন দেশের সর্বত্র আলোচনা হচ্ছে তখন দুর্নীতি তথা অবৈধ সম্পদ অর্জনের বিষয়টিও আলোচনায় উঠে আসে। একজন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার মা-বাবা কিংবা স্ত্রী-সন্তান বুকে হাত দিয়ে বলেন তো, আপনারা কি কখনো পরিবারের ‘সেই কর্মকর্তা’কে প্রশ্ন করেছেন, তার টাকার উৎস কী? তার বেতন যদি ৪০ হাজার টাকা হয়, তাহলে তিনি মাসে ৫০-৬০ হাজার টাকা খরচ করেন কিভাবে? প্রতি বেলায় মাছ-মাংস, হালুয়া-রুটি খান কিভাবে? সৎ পথে থাকলে তো ঋণের বোঝা বাড়ার কথা! সেটা কি বেড়েছে? নাকি ব্যাংক ব্যালান্সের পরিমাণ বেড়েছে? একসময় বলা হতো, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন এতই কম যে ঘুষ ছাড়া তাদের সংসার চলে না। যাদের ‘উপরি’ নেই তারা কায়ক্লেশে জীবন যাপন করেন। সরকারি চাকরিতে বেতন যা-ই হোক, উপরি কত সেটাই ছিল প্রধান বিবেচ্য। সরকারি চাকরিজীবী পাত্রের কাছে কনে বিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রেও অভিভাবক জানতে চাইতেন, বেতনের সঙ্গে উপরি আছে তো? এখনো কোনো কোনো অভিভাবক হয়তো এ ধরনের ‘বিব্রতকর’ প্রশ্ন করে থাকেন। তবে এখন এটা বলা যাবে না যে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন কম। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন স্ট্রাকচার অনেকটাই পাল্টে গেছে। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সরকারি বেতন স্কেল নির্ধারণ করা হয়েছে। এখন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন দিয়েই সংসার পরিচালনা সম্ভব। উপরি না হলেও একটি মধ্যবিত্ত পরিবার মোটামুটিভাবে চলতে পারে। এখন হয়তো কনের বাবা আর জানতে চান না, পাত্রের বেতনের সঙ্গে উপরি আছে কি না! তার পরও ঘুষ-দুর্নীতি কি কমেছে?
এ প্রশ্নের উত্তরে সবাই একবাক্যে বলবেন, না, কমেনি বরং বেড়েছে। আগে রয়েসয়ে গোপনে ঘুষ নিতেন কর্মকর্তারা। এখন প্রকাশ্যেই ঘুষ গ্রহণ করেন। পুলিশ বিভাগের ঘুষ-দুর্নীতি তো সর্বজনবিদিত। একসময় মামা-চাচার জোরে চাকরি হতো। এখন ঘুষ ছাড়া চাকরি হয় না। টাকার কাছে মামা-চাচার তদবির ঠুঁটো জগন্নাথ! আর মেধাবীদের কাছে চাকরি এখনো সোনার হরিণ! আরেকটি বিষয় এখানে উল্লেখ করা দরকার বলে মনে করি।
অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, ‘লোভী স্ত্রী’দের কারণে স্বামীরা ঘুষ-দুর্নীতিতে ঝুঁকে পড়েন। তারা সারাক্ষণ খাই খাই করেন। এটা চাই, ওটা চাই। চাওয়ার কোনো শেষ নেই। তাদের চাই ব্যাংক ব্যালান্স। তাদের চাই দামি ফ্ল্যাট। নতুন গাড়ি। তারা টাকার জন্য স্বামীকে প্রতিনিয়ত চাপে রাখেন। টাকা পেলেই তারা খুশি। না দিতে পারলেই সংসারে অশান্তি! কিন্তু সেই টাকা কিভাবে এলো? বৈধ না অবৈধ; তা কোনো দিন কেউ জানতেও চান না।
কেউ সৎ থাকার চেষ্টা করলেও পরিবারের সদস্যদের চাওয়া-পাওয়া মেটাতে অসৎ পথ বেছে নিতে হয়। পরিবারের সদস্যরা যদি ঘুষ-দুর্নীতির ব্যাপারে আপত্তি তুলতেন, তাহলে চাকরিজীবী লোকটি হয়তো নিজের লোভ সংবরণ করতেন। পরিবার থেকে প্রতিবাদ না হলে কর্মকর্তাদের ঘুষ-দুর্নীতি বন্ধ করা সত্যিই কঠিন। মা-বাবা কিংবা স্ত্রী যদি বলেন, তারা অবৈধ উপার্জনের অর্থ ঘরে ঢুকতে দেবেন না, তাহলে পরিবারের অবৈধ উপার্জনের লোকটি বেতের মতো সোজা হয়ে যেতেন। দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থ উপার্জন একটি সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। সবাই যেন টাকার পেছনে ছুটছে। যেভাবেই হোক টাকা উপার্জন করতে হবে। সর্বত্র অবৈধ আয়-উপার্জনের প্রতিযোগিতা চলছে। এর রাশ টানতে না পারলে সমাজে আরো বেশি অস্থিরতা তৈরি হবে। সৎ থাকার মানসিকতা তৈরি করতে হলে পরিবার থেকেই প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। কেউ অসৎ পথে উপার্জন করলে তাকে বর্জন করতে হবে।
দুর্নীতি আমাদের দেশের মানুষের মজ্জাগত। ঘুষ না নেওয়াটাই যেন অপরাধ! এখনো পুলিশ বিভাগসহ সরকারি বেশ কিছু বিভাগ আছে, যেখানে ঘুষ না খেলে চাকরি থাকে না। নিম্ন পর্যায় থেকে সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত ঘুষের টাকা ভাগাভাগি হয়। টাকার ভাগ না দিলে জবাবদিহি তো করতেই হয়। চাকরিও ছাড়তে বাধ্য করা হয়। এ ধরনের বেশ কিছু ঘটনার কথা আমরা জানি। সততার সঙ্গে চাকরি করতে গিয়ে অনেকেই ঘুষখোর কর্মকর্তাদের রোষানলে পড়েছেন।
ঘুষখোর কর্মকর্তারা সৎ কর্মকর্তাদের বাটে ফেলতে নানা অপকৌশলের আশ্রয় নেন। নানা রকম কুৎসা রটান। নানা কথা বলেও বিরক্ত করেন। ব্যঙ্গ করে বলেন, সুযোগের অভাবে নীতিমান। তবে আমরা বিশ্বাস করি, এখনো অনেক নীতিমান এবং সৎ কর্মকর্তা আছেন, যারা বেতনের বাইরে টাকা কামানোর কথা চিন্তাও করেন না। তারা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ যে অসৎ পথে আয় করে সেই পয়সা দিয়ে সন্তানের দুধ কিনবেন না। মা-বাবা কিংবা স্ত্রী-সন্তানের মুখে অন্ন দেবেন না।
আবার জেলা প্রশাসনের পুকুরচুরির গল্পও আমরা জানি। যারা জানেন না, তাদের জন্য বলি। জেলা প্রশাসন একটি পুকুর কাটার জন্য অর্থ বরাদ্দ চাইল। যথারীতি টাকা বরাদ্দ হলো। তারপর সেই টাকা কর্মকর্তারা ভাগ-বাটোয়ারা করে নিলেন। কয়েক মাস পর জেলা প্রশাসন পুকুর ভরাটের জন্য অর্থ বরাদ্দ চাইল। সেই অর্থও বরাদ্দ হলো এবং কর্মকর্তারা পুরো অর্থই ভাগ-বাটোয়ারা করে নিলেন। পুকুর কাটা হলে তো ভরাট করা হবে! কাজেই পুরো অর্থই লোপাট। সেই থেকেই পুকুরচুরির গল্প। 
এখন হয় সাগরচুরি। বড় বড় প্রকল্পের টাকা পুরোটাই হাপিশ করে দেওয়া হয়। এমপিদের নামে কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। সেই টাকা কোথায় যায়, কী উন্নয়নে ব্যয় হয় তা কেউ জানে না। কাউকে এর জন্য জবাবদিহিও করতে হয় না। সরকারি অর্থ তছরুপের ক্ষেত্রে আমলা-রাজনীতিবিদ ভাই ভাই, সবাই মিলে লুটে খাই! শুধু যে সরকারি কর্মকর্তারাই ঘুষ খান তা নয়, মন্ত্রী-এমপি সাহেবরাও ঘুষ-দুর্নীতিতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত। এলাকার উন্নয়নকাজ করাতেও তারা ঘুষ দাবি করেন। কেউ কেউ বলেন, এলাকার উন্নয়ন হলে আমার কী লাভ? আমাকে ভোট একটা বেশি দেবে? আজকাল উন্নয়ন দেখে কেউ ভোট দেয় না। তার মানে নিজের এলাকার উন্নয়নকাজের জন্যও এমপি সাহেবের ভাগটা চাই! আর কর্মকর্তারা তো ভাগ না পেলে অর্থ ছাড়ই করেন না। তাইতো সংসদ হবার আগে হলফ নামায় লক্ষ টাকা থাকলেও ৫ বছর পর সেটি শত কোটি টাকাতে পরিণত হয়। এই অবৈধ অর্থই পরে পাচার হয়ে যায় বিদেশে। যার কিছুটা যায় সুইস ব্যংকে।
ই-মেইল: jafar224cu@gmail.com

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ