ঢাকা, শনিবার 15 July 2017, ৩১ আষাঢ় ১৪২8, ২০ শাওয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

রাজধানীতে চিকনগুনিয়া মহামারি বললেন বিশেষজ্ঞরা ॥ দায় এড়ালেন মেয়র

এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ তথা চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধে ডিএনসিসি কর্তৃক গৃহীত ব্যবস্থা বিষয়ে গতকাল শুক্রবার স্থানীয় একটি হোটেলে সাংবাদিক সম্মেলন করেন ঢাকা উত্তরের মেয়র আনিসুল হক -সংগ্রাম

 

স্টাফ রিপোর্টার : রাজধানী ঢাকায় চিকুনগুনিয়া মহামারি আকারে রূপ নিয়েছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। গতকাল শুক্রবার সকালে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ তথা চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধে ডিএনসিসি কর্তৃক গৃহীত ব্যবস্থা বিষয়ক এক সাংবাদিক সম্মেলনে বিশেষজ্ঞরা মন্তব্য করেন। 

আর একই অনুষ্ঠানে ডিএনসিসি মেয়র আনিসুল হক এডিস মশাবাহিত এ ভয়ংকর জ্বরের প্রকোপের দায় এড়িয়ে সাফাই বক্তব্যে বলেন, যেখানে পাঁচদিন পর পর মশা নিধনের ওষুধ প্রয়োগের কথা, সেখানে আমরা তিন দিন পর পর প্রয়োগ করছি। চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে কাজ করা হচ্ছে। সুতরাং চিকুনগুনিয়ার দায়ভার কোনোভাবে ডিএনসিসির নয়।

ডিএনসিসির আমন্ত্রণে সাংবাদিক সম্মেলনে তিনজন বিশেষজ্ঞ উপস্থিত ছিলেন। তারা হলেন অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান (এপিডেমিওলজিস্ট), ডা. তৈহিদ উদ্দীন (এন্টোমলজিস্ট) ও ডা. মুনজুর এ চৌধুরী (এন্টোমলজিস্ট)। মেয়র আনিসুল হকের সভাপতিত্বে গুলশান সেন্টার পয়েন্টে উক্ত অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে ডিএনসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মেসবাহুল ইসলাম, প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এসএমএম সালেহ ভূঁইয়া, প্রধান বর্জ্য কর্মকর্তা কমডোর আবদুর রাজ্জাক প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, মহামারি হচ্ছে একটি রোগের যে অবস্থান থাকে, সেটি তার অবস্থান থেকে নির্ধারিত সময়ে নির্দিষ্ট একটি স্থানে অনেক বেশি ছড়িয়ে পড়ে। সে মোতাবেক বর্তমান সময়ে চিকুনগুনিয়াকে মহামারি বলা যায়। এটি আমার ব্যক্তিগত মত। এটিকে মহামারি ঘোষণা করার অথরিটি রয়েছে।

জবাবে মেয়র আনিসুল হক বলেন, মহামারি হোক আর যাই হোক, এজন্য ডিএনসিসি দায়ী না। এডিস মশার মাধ্যমে চিকুনগুনিয়া রোগ ছড়ায়। এডিস মশা সিটি করপোরেশনের ড্রেন কিংবা ময়লার ডাস্টবিনে জন্মায় না। এ মশা জন্মায় বাসাবাড়িতে, পরিষ্কার পানিতে, নির্মাণ সামগ্রীতে, এসি, ফুলের টব, ক্যান, পরিত্যক্ত টায়ার ও ডাবের খোসায়। আমরা বাসাবাড়িতে গিয়ে ওষুধ দিতে পারি না।

মেয়র বলেন, আমরা আগাম পূর্বাভাস পাইনি। তাছাড়া এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে কোনো জাতীয় নির্দেশিকা আজ পর্যন্ত প্রস্তুত করা হয়নি। এটা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় তৈরি করে। যে কারণে প্রথমে এ রোগের নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। অনেকেই মনে করেন এ জন্য ডিএনসিসি দায়ী।

এডিস মশার ফলে ডেঙ্গু জ্বর দেখা দিতে পারে আশঙ্কা করে ডা. মুনজুর এ চৌধুরী বলেন, এডিস মশা যেহেতু চিকুনগুনিয়া ও ডেঙ্গুর বাহক, সেহেতু দুই রোগ এক সঙ্গেও দেখা দিতে পারে। তখন পরিস্থিতি আরো নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। এডিস মশা যদি কাউকে কামড় দেয় তাহলে তার চিকুনগুনিয়া হবে। আবার চিকুনগুনিয়া আক্রান্ত কোনও রোগীকে মশা কামড়ালে তার মধ্যেও এ ভাইরাস ছড়িয়ে যাবে। সেটি যদি আবার কোনও সুস্থ মানুষকে কামড়ায় তাহলে তারও চিকুনগুনিয়া হবে।

ডা. তৈহিদ উদ্দীন বলেন, এডিস মশার মাধ্যমে জিকার ভাইরাসও ছড়ায়। সুতরাং সবাইকে সচেতন হতে হবে। যদি কোনও ব্যক্তি এ রোগে আক্রান্ত হন, তাহলে তাকে মশারির ভেতর রাখতে হবে। না হয় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।

সাংবাদিক সম্মেলনে মেয়র আনিসুল হক বলেন, মেয়র হিসেবে আমি আক্রান্তদের জন্য দুঃখ প্রকাশ করছি, সমবেদনা জানাচ্ছি। আমাদের কাজ আগের চেয়ে দশ গুণ বেড়েছে। ক্যান্টনমেন্ট, বসুন্ধরা ও উত্তরার কিছু কিছু এলাকা আমাদের বাইরে। সব জায়গায় আমরা হাত দিতে পারি না।

ডিএনসিসি মেয়র বলেন, এডিস মশা নিয়ন্ত্রণের জন্য সারা পৃথিবীতেই জনগণের সম্পৃক্ততা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। নাগরিকরা অনেকেই চিকুনগুনিয়া সম্পর্কে জানেন, কিন্তু এ ব্যাপারে যথাযথ সচেতনতামূলক ব্যবস্থা নেন না। আমরা আগে মশা মারার ওষুধ নগর ভবন থেকে জুনে প্রেরণ করতাম। কিন্তু এখন সরাসরি ওয়ার্ড কাউন্সিলর কার্যালয়ে পৌঁছে দেয়া হচ্ছে। এক এক স্থানে একাধিকবার স্প্রে করা হচ্ছে। সিটি করপোরেশন আর কী করবে?

আনিসুল হক আত্মপক্ষ সমর্থন করে আরো বলেন, যেখানে পাঁচ দিন পর পর মশা নিধনের ওষুধ প্রয়োগের কথা, সেখানে আমরা তিন দিন পর পর প্রয়োগ করছি। চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে কাজ করা হচ্ছে। সুতরাং চিকুনগুনিয়ার দায়ভার কোনোভাবে ডিএনসিসির নয়।

তিনি বলেন, মশা নিধনে ডিএনসিসির ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বরাদ্দ ২৩ কোটি টাকা। তবে বর্তমানে যেভাবে মশা নিধনে ওষুধ প্রয়োগ করা হচ্ছে, তাতে এই বরাদ্দ বৃদ্ধি পেয়ে ৩০ কোটি টাকায় পৌঁছাবে। শুধু সিটি করপোরেশনের পক্ষে চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়, এজন্য সবাইকে সচেতন হতে হবে।

মেয়র জানান, বর্তমানে মশা নিধনের জন্য ডিএনসিসির হস্তচালিত মেশিনের সংখ্যা ৩৮৭টি, ফগার মেশিন ২৫৫টি, হুইল ব্যারো মেশিন ১০টি এবং একটি ভ্যাহিক্যাল মাউন্টেড ফগার।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ