ঢাকা, রোববার 16 July 2017, ১ শ্রাবণ ১৪২8, ২১ শাওয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

মামলার জালে আটকে গেছে খেলাপি ঋণ আদায়

এইচ এম আকতার : রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে অব্যাহত লুটপাত আর খেলাপি ঋণের কারণে মূলধন ঘাটতি কোনভাবেই কাটিয়ে উঠতে পারছে না। এছাড়াও মামলার জালে আটকে গেছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ আদায়। একটি ব্যাংক ভালো না মন্দ, তা বোঝার অন্যতম নির্দেশক সম্পদের বিপরীতে আয় বা রিটার্ন অন এসেট (আরওএ)। নিট মুনাফা ব্যাংকের মোট সম্পদের কত শতাংশ তার ভিত্তিতে হিসাব করা হয় আরওএ। আরওএ ১ শতাংশের বেশি হলে ধরে নেয়া হয় ব্যাংকটি ভালো অবস্থায় আছে। কিন্তু বাংলাদেশে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সম্পদের বিপরীতে আয় তিন বছর ধরেই ঋণাত্মক।

ব্যাংকগুলো থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর গড় আরওএ ছিল ঋণাত্মক দশমিক ৬ শতাংশ। ২০১৫ সালে তা দাঁড়ায় ঋণাত্মক দশমিক শূন্য ৪ ও ২০১৬ সালে ঋণাত্মক দশমিক ২ শতাংশ। যদিও ২০১৩ সালে এ হার ছিল দশমিক ৬ শতাংশ।

হল-মার্কসহ ছোট-বড় নানা ঋণ জালিয়াতির ঘটনায় স্থিমিত হয়ে পড়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত সবচেয়ে বড় সোনালী ব্যাংকের কার্যক্রম। ব্যাংকটির আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৬ সালে সম্পদের বিপরীতে আয় ছিল দশমিক ১৪ শতাংশ। তার আগে ২০১৫ সালে এ হার ছিল দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ।

২০১৬ সালে সোনালী ব্যাংক ঋণের সুদ বাবদ আয় করেছে ৩ হাজার ১০১ কোটি টাকা। যদিও একই সময়ে ব্যাংকটি আমানতের সুদ বাবদ গ্রাহকদের ৪ হাজার ৭৩৫ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে। সে হিসাবে সোনালী ব্যাংক সুদ খাতে লোকসান দিয়েছে ১ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা। এর আগে ২০১৫ সালেও সুদ বাবদ ব্যাংকটি ১ হাজার ৪৩৬ কোটি টাকা লোকসানে ছিল। মূলত বড় অংকের ঋণ খেলাপি হয়ে যাওয়ায় ব্যাংকটি ঋণের বিপরীতে কোনো মুনাফাই করতে পারছে না। চলতি বছরের মার্চ শেষে সোনালী ব্যাংকের বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩২ হাজার ৪২৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপির খাতায় নাম লিখিয়েছে ১০ হাজার ৬২৮ কোটি টাকার ঋণ। ব্যাংকটির বিতরণকৃত ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ খেলাপি হয়ে যাওয়ায় আয়ের প্রধান খাত থেকে মুনাফার পথ বন্ধ হয়ে গেছে।

 সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ওবায়েদ উল্লাহ্ আল্ মাসুদ বলেন, সোনালী ব্যাংকের কাছে এ মুহূর্তে ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি আমানত রয়েছে। অথচ এর মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে মাত্র ৩২ হাজার কোটি টাকার ঋণ। বিতরণকৃত ঋণের মধ্যে সাড়ে ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি খেলাপি। অবলোপনকৃত ও মামলাভুক্ত ঋণসহ সোনালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা। খেলাপি ঋণের এ বোঝা নিয়ে সুদ বাবদ আয় করা অসম্ভব। এসব খেলাপি ঋণ আদায় করতে হলো দীর্ঘ আইনী প্রক্রিয়া মোকাবেলা করতে হচ্ছে। এতে লাভ তো হচ্ছে না উল্টো মামলা পরিচালনায় মোটা অংকের টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, বিগত সময়ে সোনালী ব্যাংকে সংঘটিত অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়টি সবার জানা। মূলত ধ্বংসস্তূপ থেকে সোনালী ব্যাংক ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। চলতি বছরের প্রথমার্ধে ব্যাংক ভালো পরিচালন মুনাফা করেছে। সরকারের কাছ থেকে প্রত্যাশিত মূলধনের জোগান পেলে দ্রতই ঘুরে দাঁড়াবে ব্যাংকটি।

নিট মুনাফা ও ঋণ বিতরণের দিক থেকে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের মধ্যে এ মুহূর্তে শীর্ষে রয়েছে জনতা ব্যাংক। ২০১৬ সালে ব্যাংকটির আরওএ ছিল দশমিক ৩৩ শতাংশ। যদিও ২০১৫ সালে এ হার ছিল দশমিক ৭০ শতাংশ।

জনতা ব্যাংকের আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৬ সালে ২৬০ কোটি টাকা নিট মুনাফায় ছিল ব্যাংকটি। যদিও ২০১৫ সালে নিট মুনাফা হয়েছিল ৪৬৮ কোটি টাকা। একটি ব্যাংকের মুনাফার প্রধান উৎস সম্পদ থেকে সুদ আয় হলেও গত বছর জনতা ব্যাংক এ খাত থেকে আয় করেছে মাত্র ৫৪ কোটি টাকা। এর আগে ২০১৫ সালে সুদ বাবদ ২৫০ কোটি টাকা লোকসানে ছিল ব্যাংকটি। ২০১৬ সালে জনতা ব্যাংকের বিতরণকৃত ঋণ থেকে সুদ আয় ছিল ৩ হাজার ১৮৮ কোটি টাকা। একই সময়ে ব্যাংকটি আমানতের সুদ বাবদ ৩ হাজার ১৩৪ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে। গত বছর জনতা ব্যাংকের প্রধান আয় ছিল বিনিয়োগ থেকে। এ খাত থেকে ২০১৬ সালে ব্যাংকটির আয় ছিল ১ হাজার ৬৭০ কোটি টাকা।

চলতি বছরের মার্চ শেষে জনতা ব্যাংকের বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৬ হাজার ৫৪৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৬ হাজার ৫০৯ কোটি টাকা খেলাপি হয়ে পড়েছে। ব্যাংকটির বিতরণকৃত ঋণের ১৭ দশমিক ৮১ শতাংশ বর্তমানে খেলাপি।

রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংক ২০১৬ সালে সুদ বাবদ আয় করেছে মাত্র ৮৩ কোটি টাকা। ব্যাংকটি বিতরণকৃত ঋণ থেকে ২ হাজার ১৪৫ কোটি টাকা সুদ আদায় করতে পারলেও একই সময়ে আমানতের সুদ বাবদ গ্রাহকদের পরিশোধ করেছে ২ হাজার ৬২ কোটি টাকা। চলতি বছরের মার্চ শেষে অগ্রণী ব্যাংকের বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৩ হাজার ৫৫৬ কোটি টাকা। একই সময়ে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬ হাজার ৮৫ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে, যা বিতরণকৃত ঋণের ২৫ দশমিক ৮৩ শতাংশ।

অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শামস-উল-ইসলাম বলেন, ব্যাংকের এসেট কোয়ালিটি বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। অতীতের কিছু দুর্ঘটনার কারণে ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেড়ে গেছে। খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনা ছাড়া ব্যাংকের সম্পদের বিপরীতে মুনাফা করা দুঃসাধ্য। তবে আশার কথা হচ্ছে, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে অগ্রণী ব্যাংক ঘুরে দাঁড়িয়েছে। জুন পর্যন্ত খেলাপি ঋণ থেকে ১ হাজার ২৬৮ কোটি টাকা আদায় হয়েছে। ফলে বছরের প্রথমার্ধে ৩০১ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু রিট মামলার কারণে খেলাপি ঋণ আদায় করা যাচ্ছে না। মামলার জালে আটকে গেছে খেলাপি ঋণ আদায়।

রূপালী ব্যাংকের আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংকটির গত বছর সম্পদের বিপরীতে আয় ছিল ঋণাত্মক দশমিক ১০ শতাংশ। তার আগের বছর এ আয় ছিল দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ।

২০১৬ সালে ঋণের সুদ বাবদ রূপালী ব্যাংক আয় করে ১ হাজার ৩৫৫ কোটি টাকা। একই সময়ে ব্যাংকটি আমানতের সুদ বাবদ গ্রাহকদের ১ হাজার ৫২৬ কোটি টাকা পরিশোধ করে। সে হিসাবে ২০১৬ সালে রূপালী ব্যাংক সম্পদের বিপরীতে আয় না করে উল্টো ১৭০ কোটি টাকা লোকসান দিয়েছে। এর আগের বছরও সুদ খাতে ১৭০ কোটি টাকা লোকসান দিয়েছিল ব্যাংকটি। চলতি বছরের মার্চ শেষে রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংকের বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৭ হাজার ৩৭২ কোটি টাকা। একই সময়ে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৪ হাজার ২৬৪ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। বর্তমানে ব্যাংকটির বিতরণকৃত ঋণের ২৪ দশমিক ৫৫ শতাংশ রয়েছে খেলাপির খাতায়।

রূপালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আতাউর রহমান প্রধান বলেন, এটি ঠিক, খেলাপি ঋণের কারণে সম্পদের বিপরীতে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর আয় খুবই কম। তবে অতীতের ভুলত্রুটি থেকে শিক্ষা নিয়ে রূপালী ব্যাংক ঘুরে দাঁড়িয়েছে। চলতি বছরের প্রথমার্ধে ব্যাংক প্রায় ২০০ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা করেছে।

তিনি বলেন, খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনা ছাড়া ব্যাংকের অ্যাসেট কোয়ালিটি বাড়ানো সম্ভব নয়। কিন্তু খেলাপি গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা আদায় করতে গিয়ে উচ্চ আদালতে রিটের কারণে ব্যাংক অসহায় হয়ে পড়ছে। খেলাপি ঋণ আদায় প্রক্রিয়ার প্রতি ধাপেই গ্রাহকরা ব্যাংকের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রিট করছেন। একই ঋণে একাধিক রিট থাকায় ঋণখেলাপিদের কিছুই করা যাচ্ছে না। রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে এর প্রতিকার হওয়া ছাড়া খেলাপি ঋণের লাগাম টেনে ধরা সম্ভব নয়।

সম্পদ থেকে কোনো আয় করতে পারছে না অনিয়ম-দুর্নীতি আর লুটপাটের শিকার বেসিক ব্যাংক। ২০১৬ সালে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকটির সম্পদের বিপরীতে আয় ছিল ঋণাত্মক ৭ দশমিক ৪৯ শতাংশ। তার আগের বছরও সম্পদের বিপরীতে আয় ঋণাত্মকই ছিল ব্যাংকটির। ২০১৫ সালে বেসিক ব্যাংকের সম্পদের বিপরীতে আয় ছিল ঋণাত্মক ১ দশমিক ৭২ শতাংশ।

 বেসিক ব্যাংকের আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৬ সালে ঋণের সুদ বাবদ গ্রাহকদের কাছ থেকে ব্যাংকটি আদায় করে ৮০৯ কোটি টাকা। একই সময়ে আমানতের সুদ বাবদ গ্রাহকদের পরিশোধ করে ৯১৫ কোটি টাকা। সে হিসাবে গত বছর সুদ খাতে বেসিক ব্যাংকের লোকসান ছিল ১০৫ কোটি টাকা। এর আগে ২০১৫ সালে এ খাতে ৩১৪ কোটি টাকার লোকসানে ছিল ব্যাংকটি। চলতি বছরের মার্চ শেষে বেসিক ব্যাংকের বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ৬৭৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপির খাতায় চলে গেছে ৭ হাজার ৩৭৩ কোটি টাকার ঋণ। ব্যাংকটির বিতরণকৃত ঋণের ৫৩ দশমিক ৯০ শতাংশই বর্তমানে খেলাপি।

এছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেড (বিডিবিএল) ২০১৬ সালে সুদ বাবদ আয় করে ২০০ কোটি টাকা। একই সময়ে আমানতকারীদের ১৭০ কোটি টাকা সুদ পরিশোধ করে ব্যাংকটি। সে হিসাবে সুদ থেকে ব্যাংকটির মূল আয় ৩০ কোটি টাকা। চলতি বছরের মার্চ শেষে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ ৫৮ দশমিক ৩৭ শতাংশ খেলাপি ঋণ রয়েছে বিডিবিএলের। এ সময় পর্যন্ত ব্যাংকটির বিতরণকৃত ১ হাজার ৪৬২ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে ৮৫৩ কোটি টাকাই খেলাপিতে পরিণত হয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ