ঢাকা, রোববার 16 July 2017, ১ শ্রাবণ ১৪২8, ২১ শাওয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সড়ক বাতি আর  পানিবদ্ধতায় নাকাল ঢাকা উত্তর সিটি

তোফাজ্জল হোসেন কামাল : স্মার্ট বাসযোগ্য নগরী গড়ার চেষ্টায় ব্রত ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) অনেকটাই বেহাল অবস্থায় নানা সমস্যায়। সংস্থাটির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সড়ক বাতি ও পানিবদ্ধতাসহ বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা সমাধানে গলদ রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে মশার উৎপাতে চিকুনগুনিয়া-ডেঙ্গুসহ নানা রোগব্যাধী জন্ম নেয়ায় ডিএনসিসির নাগরিক সেবাকে বিতর্কিত করে তোলায় সংখ্যার দিক দিয়ে সমস্যার সংখ্যা বেড়ে তা গোদের ওপর বিষপোড়ায় পরিণত হয়েছে।

জানা গেছে, ডিএনসিসির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ আটঘাট বেঁধে সার্বিক কার্যক্রম চালালেও ল্যান্ডফিল বিপত্তিতে তাদের মূল লক্ষ্য ভেস্তে যাচ্ছে। অদক্ষ লোক দিয়ে আমিনবাজার ল্যান্ডফিলে বর্জ্য শোধন ব্যবস্থা পরিচালনা করায় বর্তমানে এটি আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। ফলে বর্জ্য পচে আশপাশের ব্যক্তি মালিকানাধীন ফসলি ও পতিত জমি মারিয়ে তুরাগ নদীর পানিকে দূষিত করছে। মারাত্মক হুমকির মুখে এলাকার পরিবেশ। ভেতরের অবস্থা খারাপ হওয়ায় আবর্জনাবাহী ট্রাকগুলো ল্যান্ডফিলে যেতে চায় না। বাহিরেই ময়লা ফেলে চলে আসে তারা। এতে ব্যক্তি মালিকানার অন্তত ২০ বিঘার বেশি জমি ডিএনসিসির বর্জ্যে ভরাট হয়ে গেছে। আশপাশের ফসলি জমিতে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। তীব্র দুর্গন্ধ থাকায় জমিতে চাষাবাদ করতে যেতেও পারেন না কৃষকরা। আর সাধারণ মানুষ প্রতিবাদ করলেও আমলে নিচ্ছেন না ডিএনসিসির কর্তারা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সমস্যাগুলো দূর করতে না পারলে পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি ল্যান্ডফিলের সম্ভাবনাগুলো কাজে লাগানোর সুযোগ নষ্ট হবে। এতে করে এটিকে পরিত্যক্ত বর্জ্য ভাগাড় ঘোষণা করা ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প থাকবে না। খুব দ্রুত সঠিক উদ্যোগ নিয়ে সমস্যাগুলো দূর করতে পারলে জাপানের মতো ল্যান্ডফিলের বহুমুখী ব্যবহার করে বিদুৎ, গ্যাস, জ্বালানি সম্পদ আহরণ করা সম্ভব হবে। তবে এ নিয়ে চোখে পড়ার মতো ডিএনসিসির কোনো তৎপরতা নেই বললেই চলে।

জানতে চাইলে আমিন বাজার ল্যান্ডফিলের ভয়াবহ অবস্থার কথা স্বীকার করে ডিএনসিসির মেয়র আনিসুল হক বলেন, 'এটি যেভাবে তৈরি করা হয়েছিল, আমি মেয়র হয়ে আসার পর সেভাবে পাইনি। এখানে একটি বিশৃঙ্খল অবস্থার তৈরি হয়েছে। যে কারণে পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এটিকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে গত এক বছরে ডিএনসিসির সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের বিভিন্ন দেশের ল্যান্ডফিল ও প্ল্যান্ট পরিদর্শনে পাঠিয়েছি। ল্যান্ডফিলটিকে একটি গোছালো অবস্থায় নিয়ে আসার জন্য কাজ শুরু করেছি।' আশাপাশের জমি কিছুটা দখল হয়ে যাচ্ছে স্বীকার করে তিনি  বলেন, 'ব্যক্তি মালিকানা জমিতে যেসব বর্জ্য চলে যাচ্ছে এগুলো ড্রেসিংয়ের ব্যবস্থা করা হবে। আর জমি বাড়াতে সরকারের কাছে আবেদন করা হয়েছে। আমাদের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই এটিকে একটি স্বস্তিদায়ক অবস্থায় রেখে যেতে চাই।'

এদিকে, দীর্ঘদিন ধরে এলইডি লাইট লাগিয়ে ডিএনসিসি এলাকার অন্ধকার দূর করার কথা বলা হলেও তা শুরুই করতে পারছে না সংস্থাটি। আর সড়কে থাকা সোডিয়াম আলোর বাতিগুলোর অবস্থাও নাজুক। দীর্ঘদিন ধরে কোনো তদারকি করা হয় না। ফলে রাতের বেলায় বেশিরভাগ রাস্তাঘাট ও অলিগলি অন্ধকারে ডুবে থাকে। এতে করে নানা ধরনের অপরাধ বৃদ্ধি পেয়েছে বলে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ। ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনাও।

অভিযোগে প্রকাশ , তেজগাঁও, ফার্মগেট, বিজয় সরণি, মহাখালী, মোহাম্মদপুর, মিরপুরসহ বেশকিছু এলাকার সড়কবাতি দীর্ঘদিন ধরে অকেজো থাকলেও কোনো ব্যবস্থাই গ্রহণ করছে না কর্তৃপক্ষ। তেজগাঁও সিগন্যাল থেকে বিজয় সরণি মোড় পর্যন্ত শতাধিক সড়কবাতি থাকলেও রাতের বেলায় গোটা এলাকা থাকে অন্ধকারাচ্ছন্ন। বিজয় সরণি মোড় থেকে ফ্লাইওভার পর্যন্ত মোট ৩৮টি সড়কবাতি রয়েছে। যার একটিও জ্বলে না। ফ্লাইওভারে মাঝখানে একাধারে অন্তত ৪০টি বাতি অকেজো। এই রাস্তার ১১০টি বাতির মধ্যে ৭৮টিই জ্বলে না। এই পথ দিয়ে নিয়মিত যাতায়াতকারীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সব দিক দিয়েই উন্নত হচ্ছে দেশ। কিন্তু রাতের বেলায় এই রাস্তা দিয়ে না গেলে উন্নয়নের নমুনা বোঝা যায় না! রাতের বেলায় একা একা পথ চললে অন্ধকারের মধ্যে ভয় লাগে। 

এলাকাবাসীর অভিযোগ, দীর্ঘদিন এলাকাটি অন্ধকারে থাকলেও সড়কবাতিগুলো মেরামতে সিটি করপোরেশন কোনো পদক্ষেপই নিচ্ছে না। এছাড়া আশপাশের অলি-গলির অধিকাশং বাতিই অচল বলে জানান তারা।

শাহীন কলেজের সামনে থেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় হয়ে বিজয় সরণি পর্যন্ত বাতিগুলো আলো দিলেও এরপর থেকে ফার্মগেট হয়ে কারওয়ান বাজার মোড় পর্যন্ত সড়কের বাতিগুলোও ঠিকমতো জ্বলছে না। বেশিরভাগ বাতি বিকল থাকায় পথচারীদের ঝাপসা আলোতে চলাচল করতে হয়। শ্যামলী, মিরপুর, মোহাম্মদপুর, শেওড়া ও মহাখালীসহ বিভিন্ন এলাকায় একই চিত্র দেখা গেছে।

সড়কবাতি সম্পর্কে ডিএনসিসি মেয়র বলেন, 'এলইডি লাইট লাগানো হলে রাস্তার অন্ধকার দূর হবে। এলইডি লাইট নিয়ে অনেক কথা রয়েছে। আমাদের হাতে টাকাও আছে। কিন্তু পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য কিছুটা সময় নিচ্ছি। যাতে নগরবাসীর চোখে কোনো সমস্যা না হয়।'

অপরদিকে পানিবদ্ধতা যেন ডিএনসিসির গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। চলতি বছর বর্ষাকাল শুরু হওয়ার আগে থেকেই শুরু হয়েছে বৃষ্টিপাত। আর সাম্প্রতিকালের ২০-৩০ মিনিটের মাঝারি বর্ষণেই ডিএনসিসি এলাকার গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও অলি-গলি পানিতে তলিয়ে যায়। কোথাও হাঁটুপানি ছাড়িয়ে কোমরপানি পর্যন্ত পানিজট সৃষ্টি হয়। এতে সিটি করপোরেশনের ওপর চরম ক্ষুব্ধ নগরবাসী।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সামান্য বৃষ্টি হলেই তলিয়ে যায় কারওয়ান বাজার, মিরপুর, কালশী, শ্যামলী ও মোহাম্মদপুরের বেড়িবাঁধসংলগ্ন এলাকা বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা থেকে নতুন বাজার, খিলক্ষেতসহ ডিএনসিসির বেশিরভাগ এলাকার সড়ক ও অলি-গলি। 

মোহাম্মদপুর এলাকার বাসিন্দারা জানান, বৃষ্টি হলেই সড়কে হাঁটুপানি জমে যায়। মেইন রোডের মাত্র চার-পাঁচ গজ রাস্তাও রিকশা দিয়ে পার হতে হয়। বৃষ্টির সময় রিকশা চালকরাও দূরের যাত্রী পারিবহন করেন না। কাছাকাছি ক্ষেপ দিয়েই ভালো উপার্জন করেন তারা। কাজীপাড়া এলাকার রিকশাচালক হেমায়েত হোসেন জানান, বৃষ্টি হলে অফিসগামী মানুষ পানিতে কাপড় ভিজাতে চান না। পানিতেও মারাত্মক ময়লা থাকে। তাই রিকশা নিয়ে বিভিন্ন গলিতে বসে থাকি। মানুষকে পানি পার করে দিই। এতে কম সময়ে বেশি টাকা পাওয়া যায়।

মগবাজার-মৌচাক ,মধুবাগসহ তৎসন্নিহিত এলাকার অবস্থাও অনুরুপ। একটু বৃষ্টি হলেই মগবাজার ওয়্যারলেছ মোড় থেকে রেলগেট পর্যন্ত এলাকা পানিতে ডুবে যায়। ওই সড়কের একটু পথ পাড়ি দিতেই এলাকাবাসীকে নানা সমস্যায় পড়তে হয়। রিকশা, জানে পারাপারে গুণতে হয় বাড়তি পয়সা।

এ বিষয়ে মেয়র আনিসুল হক বলেন, ‘খাল দখলমুক্ত করা না গেলে পানিবদ্ধতা দূর হবে না। ঢাকার বেশিরভাগ খাল বেদখল হয়ে গেছে। বিভিন্ন হাউজিং কোম্পানি খাল ভরাট করে সরু পাইপ লাগিয়ে দিয়েছে। কিছু কিছু খালে অসংখ্য বহুতল ভবন উঠে গেছে। খালগুলো দখলমুক্ত করতে এরই মধ্যে ঢাকা ওয়াসা ও ঢাকা জেলা প্রশাসনের সঙ্গে একাধিকবার আলোচনা হয়েছে। এ পর্যন্ত খালের উপরে থাকা চার শতাধিক ভবন ভেঙে দিয়েছি। জলাবদ্ধতা নিরসনের কাজ ঢাকা ওয়াসার আর বেশিরভাগ খালের মালিক জেলা প্রশাসন। তাই একক প্রচেষ্টায় সিটি করপোরেশন চাইলেই পানিবদ্ধতা দূর করতে পারবে না।’

ডিএনসিসি সূত্র জানায়, পানিবদ্ধতা নিরসনের জন্য গত দুই বছরে ৪৬৮ কিলোমিটার ড্রেনের উন্নয়ন কাজ করেছে সংস্থাটি। যার মধ্যে ২০১৬-১৭ অর্থবছরেই ৩০০ কিলোমিটার ড্রেন সংস্কার করে তারা। তবে এসব সংস্কার আর অর্থ ব্যয় নগরবাসীর কোনো কাজেই আসছে না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ