ঢাকা, রোববার 16 July 2017, ১ শ্রাবণ ১৪২8, ২১ শাওয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

এক ব্যক্তির শাসন অবসানে সকল রাজনৈতিক দলের জাতীয় ঐক্য চাই ---ব্যারিস্টার মওদুদ

স্টাফ রিপোর্টার : বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ বলেছেন, দেশে এক ব্যক্তির শাসন অবসান করতে এক দফার ভিত্তিতে সকল রাজনৈতিক দলের জাতীয় ঐক্য চায় বিএনপি। তিনি বলেন, গত ১০ মাসে বিচারবহির্ভূত হত্যাকা- হয়েছে ১১৮টি, ক্রসফায়ারে মৃত্যু হয়েছে ১৩৭ জনের, গুমের শিকার হয়েছে ৮৪ জন, ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৬৯৭ জন নারী ও শিশু। এর প্রত্যেকটি অপকর্মেল পেছনে সরকারদলীয় লোকজন জড়িত। একই আলোচনায় অংশ নিয়ে নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, এই আওয়ামী লীগের কাছে মুক্তিযুদ্ধের কোনো মূল্যবোধ নেই।

গতকাল শনিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক আলোচনা সভায় অংশ নিয়ে তারা এসব মন্তব্য করেন। আদর্শ নাগরিক আন্দোলনের উদ্যোগে দেশে অব্যাহত ‘গুম-খুন-অপহরণ: শংকিত নাগরিক সমাজ, শীর্ষক এই আলোচনা সভা হয়।

ব্যারিস্টার মওদুদ বলেন, আমিই সব কিছু করব, আই অ্যাম দি স্টেট এই কর্তৃত্ববাদের আমরা অবসান চাই। এই কর্তৃত্ববাদ আমরা নির্মূল করে দিতে চাই। সেটা করার একমাত্র উপায় হলো জনগণের মাধ্যমে একটি সরকার প্রতিষ্ঠা করা। আমি বলব, এই কারণে একটা ন্যূনতম কর্মসূচির ওপর ভিত্তি করে একটা জাতীয় ঐক্য সৃষ্টি করতে হবে। এর মূল্য লক্ষ্য হবে দেশে আমরা গণতন্ত্রকে ফিরিয়ে আনতে চাই, মানুষের অধিকার, ভোটের অধিকার ফিরিয়ে আনতে চাই। আমরা একটা সুষ্ঠু অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচন চাই। এজন্য প্রয়োজন একদফা। এখানে পাঁচ দফা দশ দফার তো দরকার নাই।

গত বৃহস্পতিবার রাতে উত্তরার বাসায় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডি সভাপতি আ স ম আবদুর রবের বাসায় ঘরোয়া অনুষ্ঠানে পুলিশের বাগড়া দেয়ার ঘটনায় ক্ষোভ ও নিন্দা জানিয়ে মওদুদ আহমেদ বলেন, আ স ম আবদুর রবের বাসায় বাংলাদেশের স্বনামধন্য অনেক নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। সেখানে তারা যা- খুশি আলোচনা করতে পারেন, এটাতে আইনগত তো কোনো বাধা নাই। সেখানে পুলিশ যাবে কেনো? আমি তীব্র ভাষায় এর নিন্দা জানাই। এটার একমাত্র কারণ রাজনৈতিক নেতৃত্বে মাইন্ডসেট যে আমিই সব কিছু করব।

গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে জাতীয় ঐক্য সৃষ্টির আহ্বান জানিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য বলেন, আমরা যারা রাজনৈতিক দলের সাথে জড়িত, সমস্ত গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলোকে ঐক্যবদ্ধভাবে এক দফার ভিত্তিতে আগামী নির্বাচন যাতে সুষ্ঠু ও অবাধ হয় সেদিকে এগিয়ে যেতে হবে। সেটার একমাত্র পথ হবে জনগণকে সম্পৃক্ত করা, জনগণকে উদ্বুদ্ধ করা, জনগণকে নিয়ে আন্দোলনের মাধ্যমে সেটা আদায় করা। আমরা সমঝোতার কথা সবাই বলে এসেছি। আপনারা বলছেন যে, তারা তো ক্ষমতাচ্যুত হতে চাইবেন না, তারা দুর্নীতির মাধ্যমে এতো সম্পদের সম্ভার তৈরি করেছেন, সেই সম্ভার হারিয়ে ফেলতে পারে- এই ভয়ে তারা ক্ষমতা ছাড়তে চাইবে না। সেজন্য তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে জাতীয় ঐক্য সৃষ্টি করতে হবে। আমাদের অনেকের ক্ষোভ-দুঃখ-বেদনা, অনেক অভিযোগ ও অনেক রকমের দ্বিমত থাকতে পারে কিন্তু একটা বিষয়ে আমরা আসুন একমত হই- দেশে গণতন্ত্রের চর্চা ফিরিয়ে আনব।

মওদুদ বলেন, আমরা জাতীয় ঐক্য সৃষ্টি করতে পারলে তারপরে আমরা নিজেরা জাতির কাছে চুক্তিবদ্ধ হই। সেই চুক্তি হবে, আমরা বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক চর্চাকে আরো কীভাবে সুরক্ষিত করতে পারি, কীভাবে আমরা প্রতিষ্ঠানগুলা- নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতিদমন কমিশিন, কর্মকমিশনসহ যেসব প্রতিষ্ঠান আছে এবং সংসদ কীভাবে শক্তিশালী করতে পারি এবং সেসবের উপরে আমরা দীর্ঘ আলোচনা করে জনগণের সঙ্গে একটা চুক্তিপত্র সম্পন্ন করতে পারি।

মওদুদ আহমেদ বলেন, গণতন্ত্রকে সুসংহত করার জন্য জাতীয় সংসদকে কার্যকর ও শক্তিশালী করতে হবে। আমার নিজের অনেক পরামর্শ আছে। যেমন প্রেসিডেন্টের ব্যাপারে-এটা আমার মত, দলের মত নয়, সেটা দলের মত হতেও পারে ভবিষ্যতে। আমি মনে করি যে, রাষ্ট্রপতি এবং স্পিকার একবার নির্বাচিত হয়ে যাওয়ার পর তারা তাদের নিজের দল থেকে পদত্যাগ করবেন। তারা নিজেরা এক একটি প্রতিষ্ঠান, তাদেরকে নিরপেক্ষ থাকতে হবে। যিনি রাষ্ট্রপ্রধান ও যিনি স্পিকার সংসদের প্রধান তারা যদি দলীয় হয়ে যান, তাহলে তো সেখানে অনেক কিছু অচল হয়ে যাবে, আইনের শাসন তখন রক্ষা করা সম্ভবপর হবে না।

নির্বাচন কমিশন প্রসঙ্গে মওদুদ আহমেদ বলেন, এই নির্বাচন কমিশনকে আমরা কখনোই মনে করি না, এটি একটি নিরপেক্ষ কমিশন। এই কমিশন দুইটি কারণে অগ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছে। সরকারি দলের প্রধানমন্ত্রীসহ অন্যান্য মন্ত্রী ভোট চেয়ে বেড়াচ্ছেন, নৌকায় ভোট দেন। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড কোথায় তাহলে? এই কমিশনের দায়িত্বটা কি? ওরা করুক, আমাদের কোনো আপত্তি নাই। কিন্তু আমাদেরকে করতে দিন, আমাদের সব দলকে করতে দিন। আমাদের ভোট চাওয়ার অধিকার দিন, সভা-সমাবেশ করতে দিন। নির্বাচন কমিশন সম্পূর্ণভাবে এক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছে। কমিশন সত্যিকার অর্থে নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান থাকতো তাহলে এই কমিশন সরকারকে চিঠি লিখে বলতো যে, হয় আপনারা এই প্রচারণা বন্ধ করুন, নইলে বিরোধী দলকে জনসভা করার ব্যবস্থা গ্রহণ করুন। তাহলে বুঝতাম যে নির্বাচন কমিশন সত্যিকার অর্থে নিরপেক্ষ। এখন থেকে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করতে হবে।

নির্বাচন কমিশনের সংলাপে বিএনপি অংশ নেবে জানিয়ে তিনি বলেন, এই নির্বাচন কমিশনকে আমরা কখনোই মনে করি না, এটি একটি নিরপেক্ষ কমিশন। তারপরও বলেছি, আমরা আলোচনায় যাবো, আলোচনায় গিয়ে আমরা বক্তব্য রাখবো। নির্বাচন কমিশনকে অবহিত না করে নির্বাচন কমিশনের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বদলীর ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন সাবেক এই আইনমন্ত্রী।

মওদুদ আরও অভিযোগ করেন, কমিশনকে না জানিয়ে কর্মকর্তাদের বদলী করা এটাই প্রমাণ করে এই কমিশন ভঙ্গুর ও সরকারের তল্পিবাহক ছাড়া আর কিছুই না। সরকার যদি তল্পিবাহক মনে না করতো তাহলে তারা এভাবে কমিশনের কর্মকর্তাদের সরাতেন না।

আলোচনায় অংশ নিয়ে নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমদুর রহমান মান্না বলেন, আওয়ামী লীগ কী তা বুঝতে বেশি সময় লাগেনি। নৌকায় লীগে তো আমিও ছিলাম। কবে ড. কামাল নৌকা থেকে নেমেছেন, সেই নৌকায় আমিও চড়েছি। বেকুব না হলে করে এরকম। ড. কামালকে বুঝতে কত সময় লেগেছে জানি না কিন্তু আমার বুঝতে অতো সময় লাগেনি।

আওয়ামী লীগের সমালোচনা করে মান্না বলেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা আওয়ামী লীগ বলে। আওয়ামী লীগের কাছে মুক্তিযুদ্ধের কোনো ম্ল্যূবোধ নেই। আমার কাছে মাঝে মাঝে মনে হয়, আওয়ামী লীগের কোনো মূল্যবোধই নেই।

রাজনীতি কারা নিয়ন্ত্রণ করছে প্রশ্ন করে নাগরিক ঐক্যের প্রধান বলেন, এখন রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করছে তারাই, যারা লুট করতে পারে, মিথ্যা কথা বলতে পারে মুখে-চোখে, আপনার সাথে প্রতারণা করতে পারে। মানুষের সমস্ত রকম কল্যাণ শান্তি ছিনিয়ে নিতে পারে, তারাই এখন দেশের কল্যাণ করার কথা বলছে।

নিজের ওপর নির্যাতন ও ২২ মাসের কারাবাসের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে মান্না বলেন, গুম হওয়া একটি পরিবারের কষ্টটি কি তা বলে বোঝানো যাবে না। আমি ২২ মাস জেল খেটে যতটা না কষ্ট পেয়েছি তার থেকে অনেকগুণ বেশি কষ্ট পেয়েছি আমি নিখোঁজ থাকা অবস্থায় আমার পরিবারের কষ্টের কথা শুনে। আমি ২২ ঘণ্টা নিখোঁজ ছিলাম, তখন আমার পরিবার প্রতিটি মিনিট আমার জন্য অপেক্ষা করেছে এই বুঝি মৃত্যুর খবর শুনছি। মৃত্যুর সংবাদের অপেক্ষায় প্রহর গোনা যে কত কষ্টের হতে পারে তা কোনও ভাষায় বোঝানো সম্ভব নয়।

আ স ম রবের উত্তরার বাসায় অনুষ্ঠানের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, আ স ম আবদুর রবের বাসায় আমরা কয়েকজন নিরীহ মানুষ গেলাম। আমি নিরীহ না, আমি দেশদ্রোহী, সেনা বিদ্রোহে উস্কানি দিয়েছি। সুব্রত চৌধুরী, মাহী নিরীহ মানুষ। আমাদের মিটিং করতে দেয়নি বাসার মধ্যে। রব ভাই বললেন যে, আমার বাসায় দাওয়াত করেছি, উনাদেরকে চা খাওয়াব। উনার স্ত্রী বললেন, এতোগুলো বড় বড় মানুষ এসেছেন, উনাদের ডিনার খাওয়াব। রান্না-বান্না করতেও তো সময় লাগবে। কিন্তু পুলিশ বললো এখনই যান। না খেয়ে যাবো আমরা? শেষ পর্যন্ত রেগে গিয়ে রব ভাই বললেন, সারা রাত থাকবো, যা পারেন করেন। সেহেরী খেয়ে যাবেন। এসময় সরকার পরিবর্তনে সকলকে রাস্তায় নামার জন্য প্রস্তুতি নেয়ার আহ্বান জানান ডাকসু‘র সাবেক ভিপি মান্না।

গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী বলেন, আজকের রাষ্ট্রের যেমন জনগণ চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত, আমাদের রাষ্ট্রও চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত। সরকার বলে যে উন্নয়নের জোয়ার। এমন জোয়ার যে সামান্য একটু বৃষ্টি হলে ঢাকা ও চট্টগ্রাম শহর পানির জোয়ারে ভাসছে। এই উন্নয়নের জোয়ার কোথায় আমাদের নিয়ে যাবে কোনো সীমা-পরিসীমা নেই, দিকনির্দেশনা নেই। বলা হচ্ছে নৌকায় ভরসা। সেই ভরসাও তো রাখা যাচ্ছে না।

আ স ম রবের বাসায় অনুষ্ঠানে পুলিশের বাগড়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কত বড় নির্বাচিত সহসভাপতি ছিলেন। ওখানে আমরা একটু চা খেতে গেছি, সেখানে গিয়ে পুলিশ হামলা করেছে। দেশে কী মাশার্ল ল’ হয়েছে? দেশে কী সামরিক আইন জারি করেছেন না কী? ঘরেও বসতে দেবেন না, মাঠেও বসতে দেবেন না। মিছিল করতে দেবেন না, সভা-সমাবেশ করতে দেবেন না। মানুষের দুঃখ-কষ্ট নিয়ে রাজপথে নামতে দেবেন না, ব্যানার কেড়ে নেবেন, লাঠিপেঠা করবেন। রামপালের নামে আমাদের সুন্দরবন ধ্বংস করবেন, সেখানে কথা বলতে গেলে হামলা করবেন। কোন রাজনীতিতে আমরা পৌঁছে গেলাম?

বিকল্পধারা‘র যুগ্ম-মহাসচিব মাহী বি চৌধুরী বলেন, আমাদেরকে হাইস্টিক পলিটিক্স বাদ দিতে হবে। আওয়ামী লীগ ভোটারবিহীন প্রহসনের নির্বাচনে ক্ষমতায় এসে বসছে। তারা মনে করে যেকোনো মূল্যে ক্ষমতায় টিকে থাকতে হবে, বিএনপি মনে করে যেকোনো মূল্যে যাইতে হবে। রাজনীতি যদি ক্ষমতায় যাওয়া অথবা আসা, ক্ষমতায় টিকে থাকা আমাদের অস্তিত্বের সাথে সম্পর্কিত হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত সুস্থ রাজনীতি বাংলাদেশে কোনোদিন সম্ভব হবে না। তাই এই হাইস্টিক পলিটিক্স বন্ধ করতে হবে।

সংগঠনের সভাপতি মুহাম্মদ মাহমুদুল হাসানের সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় অন্যদের মধ্যে স্বাধীনতা ফোরামের আবু নাসের মুহাম্মদ রহমাতুল্লাহ, নাগরিক ফোরামের আবদুল্লাহহিল মাসুদ, ন্যাপ মহাসচিব গোলাম মোস্তফা ভুঁইয়া, এনডিপির মঞ্জুর হোসেন ঈসা, ইসলামী পেশাজীবী পরিষদের রেজাউল করিম চৌধুরী, স্বাধীনতা অধিকার আন্দোলনের কাজী মনিরুজ্জামান মুনির প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ