ঢাকা, রোববার 16 July 2017, ১ শ্রাবণ ১৪২8, ২১ শাওয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

মান যাচাই ছাড়াই ৫ হাজার পেট্রোল  পাম্পে বিক্রি হচ্ছে জ্বালানি তেল

 

কামাল উদ্দিন সুমন : সাইনবোর্ড থেকে নিউমার্কেট যাতায়াতকারী যাত্রীবাহী টেম্পুর ভেতরই রুমালে মুখ ঢেকে আছে যাত্রী মেহদী হাসান। চোখ দিয়ে পানি ঝরছে। তার মতো অন্য যাত্রীদের একই অবস্থা। জিজ্ঞেস করতেই বলে উঠলেন, বসেন টের পাবেন। সবার চোখ জ্বালা করছে, মনে হচ্ছে কেউ চোখে মুখে মরিচ ছুঁড়ে দিয়েছে। পরক্ষণেই বুঝতে বাকি রইল না, ভেজাল অকটেনের কারণে এ অবস্থা। অতিরিক্ত সালফারযুক্ত হওয়ায় টেম্পু থেকে নির্গত ধোঁয়ায় চোখ জ্বালা করছে। ড্রাইভার ইব্রাহিম জানালো মাত্র পেট্রোলপাম্প থেকে অকটেন নিয়েছে সে। প্রায় সময়ই এরকম অবস্থার কারণে যাত্রীদের বকাঝকা শুনতে হয় তার। 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এভাবে মান যাচাই ছাড়াই সারা দেশের প্রায় ৫ হাজার পেট্রোলপাম্পে বিক্রি হচ্ছে জ্বালানি তেল। নিয়ম অনুযায়ী অকটেন, ডিজেল ও পেট্রোলের বিএসটিআই মান সনদ নেয়া বাধ্যতামুলক থাকলেও রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি তেল বিপণন প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) ও এর নিয়ন্ত্রণাধীন কোম্পানিগুলো তা নেয়নি। ফলে পেট্রোলপাম্পগুলোতে সরবরাহ করা মান যাচাই ছাড়া জ্বালানি তেল নিয়ে একদিকে গ্রাহক যেমন ঠকছে অন্যদিকে যানবাহন চলাচলে ঝুঁকি বাড়ছে। জ্বালানি তেলের সাথে ভেজাল মিশিয়ে সরবরাহ করার অভিযোগ রয়েছে দীর্ঘ দিনের। 

মাঝে মধ্যে অভিযান হয়, জরিমানা হয়। কিছুদিন যেতে না যেতে আবারো শুরু হয় বেচা কেনা। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার সংসদে বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেছেন, ‘বেসরকারি রিফাইনারিসমূহের অপরিশোধিত কনডেনসেট ও নিম্নমানের পণ্য খোলাবাজারে পাওয়ার ফলে দেশে ভেজাল জ্বালানি বিক্রির প্রবণতা তৈরি হয়। বিপিসির অনুসন্ধানে বিষয়টি দৃশ্যমান হলে ভেজাল জ্বালানি তেলের বিক্রয় বন্ধ ও মান নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। তিনটি ফিলিং স্টেশনের লাইসেন্স স্থায়ীভাবে বাতিল করা হয়। ১২টি ফিলিং স্টেশনের বিক্রয় কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়। ৩৫৮টি প্যাকড পয়েন্ট ডিলার ও ২২৪টি এজেন্ট এর লাইসেন্স বাতিল করা হয়। ১৫৫টি প্যাকড পয়েন্ট ও ২০৫টি এজেন্টের লাইসেন্স বাতিলের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘বেসরকারি মালিকানাধীন প্ল্যান্টে উৎপাদিত সকল পণ্য বিপিসি কর্তৃক ক্রয় ও মনিটরিং করা হচ্ছে। জেলা প্রশাসনের সহায়তায় দেশব্যাপী নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালিত হচ্ছে। বেসরকারি ৪টি রিফাইনারির অনুকূলে কনডেনসেট সরবরাহ স্থগিত রাখা হয়। বর্তমানে সকল বেসরকারি রিফাইনারির অনুকূলে কনডেনসেট সরবরাহ প্রদান করা হচ্ছে। 

এসব পদক্ষেপ গ্রহণ করায় এবং দেশব্যাপী নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনায় ভেজাল জ্বালানি বিক্রি বহুলাংশে হ্রাস পেয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, ‘বেসরকারি রিফাইনারিসমূহের অপরিশোধিত পণ্য হ্রাসকৃত মূল্যে ক্রয় করে আমদানিকৃত পণ্যের সাথে ব্লেন্ডিং করে মান উন্নীত করে বিপণন করা হচ্ছে। দেশে জ্বালানি নিরাপত্তার স্বার্থে গৃহীত এব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে বলে আশা করা যায়।’

এদিকে ভেজাল জ্বালানি বিক্রি নিয়ে বিপিসি এবং বিএসটিআই চিঠি চালাচালি করছে। গত বছরের ১১ নবেম্বর বিএসটিআইয়ের পক্ষ থেকে বিপিসির পরিচালকের (বিপণন) কাছে চিঠি দেয়া হয়। ওই চিঠিতে বলা হয়, মান যাচাই ছাড়া জ্বালানি তেল বিপণন ও সিএম লাইসেন্সবিহীন তা বাজারজাত করায় প্রচলিত আইনের ব্যত্যয় ঘটছে। এছাড়া যানবাহনে নিম্নমানের জ্বালানি ব্যবহারের ঝুঁকি থেকে যাচ্ছে। ওই চিঠিতে আরো বলা হয়, বিভিন্ন সময় সরকারি কাজে ব্যবহৃত ও বিএসটিআই কর্তৃক পেট্রোল পাম্প থেকে সংগৃহীত জ্বালানি তেলের নমুনা পরীক্ষা করে সঠিক মানের পাওয়া যায়নি।

এদিকে ফিলিং স্টেশনগুলোর বিরুদ্ধে মানহীন তেল সরবরাহের পাশাপাশি পরিমাণে কম দিয়েও ভোক্তাদের ঠকানোর অভিযোগ দীর্ঘ দিনের। ২০১৫-১৬ অর্থবছরের তথ্য অনুযায়ী, ১৫৩টি ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান পরিচালিত হয়েছে। এতে পরিমাণে কম দেয়ার অভিযোগে ৩৯৯টি পাম্পের বিরুদ্ধে মামলা করার পাশাপাশি ২৮ লাখ ২৪ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এছাড়া বিএসটিআইয়ের সার্ভিল্যান্স টিমের মাধ্যমে পেট্রোল পাম্পগুলো থেকে সংগৃহীত জ্বালানি তেল নিম্নমানের বলে প্রমাণ হওয়ায় ১৯৮৫ সালের বিএসটিআইয়ের অর্ডিন্যান্স ও সংশোধনী আইন, ২০০৩-এর ২৪ ধারা অনুযায়ী সম্প্রতি ১০ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা ও করা হয়েছে।

জ্বালানি মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত আন্ত:মন্ত্রণালয়ের এক বৈঠকে জ্বালানি তেলের সুষ্ঠু সরবরাহ নিশ্চিত করতে গঠিত কমিটি কর্তৃক কিছু সুপারিশ পেশ করা হয়। সুপারিশগুলো হচ্ছে, মেরিন বা বার্জ ডিলার নিয়োগে বিপিসির নীতিমালা অনুসরণ করা, ডিলারদের বিপণন কোম্পানি থেকে তেল উত্তোলনের হিসেব রাখা, তেল তোলার আগে কি পরিমাণ তেল ট্যাংকে মজুদ ছিল তার হিসেব রাখা, বার্জের ফ্লো মিটার বিএসটিআই এর মাধ্যমে চেক করা ইত্যাদি। এছাড়া বৈঠকে কনডেনসেটের দাম পুন: নির্ধারণ করা, এল পেটার্ন নির্ধারণ করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।

পরিবহন খাতের প্রধান সংগঠন বাস-ট্রাক মালিক সমিতির কয়েকজন নেতা বলেছেন, তারা যে ডিজেল ব্যবহার করেন, তার মান এতই খারাপ যে এই জ্বালানির কারণে ভালো মানের (ইউরো-৩ কিংবা ৪) ইঞ্জিনসমৃদ্ধ যানবাহন আনতে পারছেন না। তারা বলেন, দেশে সরবরাহ করা ডিজেলে সালফারের পরিমাণ প্রায় ২০০০ পিপিএম (পার্টস পার মিলিয়ন)। অথচ পাশের দেশ ভারতে ব্যবহৃত ডিজেলে সালফারের পরিমাণ সর্বোচ্চ ১০০ পিপিএম। অতিরিক্ত সালফারযুক্ত ডিজেল ব্যাপক বায়ুদূষণের কারণ। এছাড়া সালফারে যে পরিমাণ ‘সিটেন’ (ডিজেলের শুদ্ধতা পরিমাপক উপাদান) থাকার কথা, তাও থাকে না বলে পরিবহন মালিকদের অভিযোগ।

সূত্র বলছে, ভেজাল মেশানো ছাড়াও পেট্রোল-অকটেনের মান খারাপ। বিএসটিআইয়ের নির্ধারিত মানমাত্রা অনুযায়ী সেই জ্বালানিই অকটেন হিসেবে গণ্য হবে, যাতে অন্তত ৯৫ শতাংশ অকটেন অণুকণা থাকবে। আর পেট্রোলে অকটেন অণুকণা থাকতে হবে অন্তত ৮৫ শতাংশ। তবে দেশের বাজারে সরবরাহ করা অকটেনে ৯০ শতাংশের কম এবং পেট্রোলে ৮০ শতাংশের কম অকটেন অণুকণা রয়েছে। তরল বাণিজ্যিক জ্বালানি হিসেবে দেশে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় ডিজেল। বছরে প্রায় ৫৪ লাখ মেট্রিক টন জ্বালানি তেল ব্যবহৃত হয়, এর অর্ধেকই ডিজেল। ডিজেল আবার সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় পরিবহন খাতে।

বিপিসির একজন কর্মকর্তা বলেন, ডিজেলে বিএসটিআইয়ের অনুমোদিত সালফারের মাত্রা ৫০০ পিপিএম। তবে এই মানের ডিজেল সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। কারণ, কুয়েত থেকে যে ডিজেল আমদানি করা হয়, তাতে সালফারের মাত্রা ২০০০ পিপিএমের বেশি। দেশেও সামান্য কিছু ডিজেল তৈরি হয়। তাতেও সালফার থাকে বিএসটিআইয়ের মানমাত্রার তুলনায় বেশিই। তিনি বলেন, উচ্চ মাত্রার সালফারযুক্ত এসব ডিজেলের সঙ্গে অন্যান্য দেশ থেকে আমদানি করা স্বল্প মাত্রার সালফারযুক্ত ডিজেল মিশিয়ে সরবরাহ করা হয়। তাতে ডিজেলে সালফারের মাত্রা ৮০০ পিপিএমের বেশি থাকে না বলে তিনি দাবি করেন। আর ডিজেলে বিএসটিআইয়ের অনুমোদিত সিটেনের মাত্রা হচ্ছে কমপক্ষে ৪৫। কিন্ত দেশে সরবরাহ করা ডিজেলে এর চেয়ে সিটেন কম থাকে বলে স্বীকার করেন বিপিসির চেয়ারম্যান।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ