ঢাকা, রোববার 16 July 2017, ১ শ্রাবণ ১৪২8, ২১ শাওয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

বিচারপতিদের বিরুদ্ধে সংসদ সদস্যদের বিষোদগার কার্যপ্রণালী বিধির চরম লঙ্ঘন

দেশের সর্বোচ্চ আদালত অর্থাৎ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় বহাল রাখার পর দেশের নির্বাহী বিভাগ ও পার্লামেন্ট অর্থাৎ জাতীয় সংসদ এবং বিচার বিভাগের মধ্যে যে মুখোমুখি অবস্থানের সৃষ্টি হয়েছে সেটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা এবং আইনের শাসনের জন্য বিরাট হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে শিক্ষিত সচেতন সমাজ আশঙ্কা প্রকাশ করছেন। উল্লেখ করা যেতে পারে যে, গত ৩রা জুন আপিল বিভাগ সংবিধান সম্পর্কে হাইকোর্ট বিভাগের একটি রায়কে বহাল রাখেন। হাইকোর্ট বিভাগ তাদের ঐ রায়ে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীকে অবৈধ ঘোষণা করেন। যে সব কারণে ষোড়শ সংশোধনীকে অবৈধ ঘোষণা করা হয় তার মধ্যে অন্যতম প্রধান কারণ এই যে, ষোড়শ সংশোধনী সংবিধানের ৯৪(৪) ধারার পরিপন্থী। ৯৪(৪) ধারায় বলা হয়েছে, “এই সংবিধানের বিধানাবলী-সাপেক্ষে প্রধান বিচারপতি এবং অন্যান্য বিচারক বিচারকার্য পালনের ক্ষেত্রে স্বাধীন থাকিবেন।” ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের ফলে দেশের উচ্চ আদালত এবং পার্লামেন্ট যে মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়েছে তার জন্য সুপ্রিম কোর্ট দায়ী নয়, দায়ী সরকারি দল। সুপ্রিম কোর্ট তার কাজ করেছে। তারা সংবিধান মোতাবেক যেটিকে ন্যায়বিচার মনে করেছে তারা সেটিই করেছে। এব্যাপারে সরকার যদি সংক্ষুব্ধ হয়ে থাকে তাহলে তাদের বক্তব্য রিভিউ পিটিশনে দেয়া যেত। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে বিচার প্রক্রিয়া এখনো সর্বশেষ পর্যায়ে সমাপ্ত হয়নি। এখনো একটি ধাপ বাকি আছে। আর সেটি হলো রিভিউ। পার্লামেন্টে মন্ত্রীসহ সরকারদলীয় এমপিরা বলেছেন যে, ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় বহাল রেখে সুপ্রিম কোর্ট বিশেষ করে তার প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা সংবিধান লঙ্ঘন করেছেন এবং সংবিধানের মৌলিক কাঠামো লঙ্ঘন করেছেন। যদি সত্যিই তাই হয় তাহলে তারা রিভিউ পিটিশনের শুনানির সময় তাদের বিজ্ঞ আইনজীবীদের দ্বারা ঐ সব ৫ সংবিধান পরিপন্থী কাজ এবং মৌলিক কাঠামো লঙ্ঘন চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখাতে পারতেন।
সেটি না করে তারা সেদিন অর্থাৎ ৯ জুলাই সংসদে সুপ্রিম কোর্ট, প্রধান বিচারপতি এবং অন্যান্য বিচারপতিকে যেভাবে তুলোধুনা করলেন সেটি তাৎক্ষণিক কোনো রাগ, ক্ষোভ বা উত্তেজনার ফসল নয়। আওয়ামী লীগ জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্যরা ঐদিন ভেবেচিন্তে ঠান্ডা মাথায় সংসদে গিয়েছিলেন সুপ্রিম কোর্টকে আক্রমণ করার জন্য এবং সেটি করে ছেড়েছে। তারা যে আক্রমণ করার প্রস্তুতি নিয়ে গিয়েছিলেন সেটিও তো এখন ওপেন সিক্রেট। যে দিন সংসদে এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয় তার দুই দিন আগে ক্ষমতাশীল দলের হোমরা চোমরারা তাদের এমপিদেরকে এব্যাপারে কথা বলার জন্য প্রস্তুত হয়ে আসার নির্দেশ দেন। সংসদে জাতীয় পার্টি নামে যে গৃহপালিত বিরোধী দল রয়েছে তাদেরকেও ঐ আলোচনায় অংশ গ্রহণ করার আহ্বান জানানো হয়। এমপিরা একবার যখন সুযোগ পেলেন তখন সেই সুযোগের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করলেন তারা। সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পাল্টা বক্তব্য দিয়ে তারা বলেন যে, “সুপ্রিম কোর্টের এই রায় অবৈধ এবং অসাংবিধানিক।” কেউ কেউ বলেন যে, এই রায় ১৯৭২ সালের সংবিধানের মূল স্পিরিটের পরিপন্থী। একজন প্রভাবশালী সদস্য এতদূরও বলেন যে, শত্রুর সাথে শত্রুর মতই ব্যবহার করতে হবে। প্রয়োজন হলে তাদেরকে দমন করতে হবে। তিনি হুঁশিয়ারী উচ্চারণ করে বলেন যে, বিচারপতিরা যদি মনে করেন যে ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করার পর তারা অভিশংসনের ঊধের্¦ চলে গেছেন তাহলে তারা মারাত্মক ভুল করছেন। তিনি বলেন, “এখনও সময় আছে বিচারপতিরা যেন তাদের ভুল বুঝতে পারেন এবং নিজেদেরকে সংশোধন করে নেন।” জাতীয় পার্টির একজন সিনিয়র নেতা আওয়ামী লীগকে খুশি করার জন্য এই রায়ের মধ্যে একটি বড় ধরনের ষড়যন্ত্র আবিষ্কার করেন এবং বিচারপতিরা সংসদের সার্বভৌমত্বে হস্তক্ষেপ করেছেন বলে অভিযোগ করেন। তারা বলেন যে, ১৯৭২ সালের মূল সংবিধান পুনঃপ্রতিষ্ঠা করাই ছিল ষোড়শ সংশোধনীর চূড়ান্ত লক্ষণ। সেই ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করে ’৭২ এর সংবিধান পুনঃপ্রতিষ্ঠার অগ্রযাত্রায় ব্যাঘাত সৃষ্টি করা হলো।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক সি আর আবরার বলেন, তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য যদি ’৭২ সালের সংবিধান পুনঃপ্রতিষ্ঠা হয় তাহলে তারা আর দেরি করছেন কেন? এটি তো অত্যন্ত সহজ কাজ। এই মর্মে একটি বিল এনে সংসদে সেটি পাস করলেই তো হয়ে যায়। এর জন্য প্রয়োজন সংসদে দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা। শাসক দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা তো শুধুমাত্র দুই তৃতীয়াংশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ষোড়শ সংশোধনী তারা পাস করেছিলেন ৩২৭ ভোটে। বিপক্ষে একটি ভোটও পড়েনি। তারা যদি ’৭২ এর সংবিধান পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য কোনো বিল উত্থাপন করেন তাহলে সেটিও বর্তমান একদলীয় সংসদে সর্ব সম্মতিক্রমে পাস হবে। তাহলে আর দেরি করছেন কেন? আসলে এগুলো তাদের কথার কথা।
॥দুই॥
গভীর পরিতাপের এবং নিন্দনীয় বিষয় হলো এই যে, তারা যদি তাদের সমালোচনা সংবিধান বা আইন কানুনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতেন তাহলেও না হয় একটি কথা ছিল। কিন্তু তারা আইন কানুনের ঊর্ধ্বে গিয়ে মহামান্য প্রধান বিচারপতি এবং এমিকাস কিউরির দুইজন সম্মানিত সদস্যকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করেন। যেহেতু রায়ে বলা হয়েছে যে, পাকিস্তানসহ অনেক দেশে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের বিচার করেন তাই প্রধান বিচারপতিকে সংসদে কঠোর ভাষায় আক্রমণ করা হয়। বলা হয় যে, প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহার আদর্শ নাকি পাকিস্তান। একজন এমিকাস কিউরি ড. কামাল হোসেনের কথা বলা হয়েছে যে, তার শ্বশুর পক্ষের লোকজন নাকি পাকিস্তানি। অপর এমিকাস কিউরি ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলামকে বলা হয়েছে যে, তারও নাকি আত্মীয়তার সূত্রে পাকিস্তানের সাথে যোগাযোগ রয়েছে। ড. কামাল হোসেনের কন্যা ব্যারিস্টার সারা হোসেন। তার স্বামী ডেভিড বার্গম্যান। একজন সিনিয়র মন্ত্রী বলেছেন যে ডেভিড বার্গম্যান নাকি একজন ইহুদি। এভাবে মাননীয় বিচারপতি এবং এমিকাস কিউরির সম্মানিত সদস্যগণকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করার কোনো অধিকার আইন তাদেরকে দেয়নি। জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি তাদেরকে সংসদের অধিবেশনে ব্যক্তিগত আক্রমণ থেকে বিরত থাকার জন্য বলেছে। কিন্তু অতীতে এবং বর্তমানে অসংখ্য বার দেখা গেছে যে, কোনো ব্যক্তি বা দল আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে কথা বললেই তার পিঠে পাকিস্তানের তকমা এঁটে দেয়া হয়।
সেদিন জাতীয় সংসদে সিনিয়র মন্ত্রী এবং সিনিয়র সদস্যসহ অনেক সদস্যই অভিযোগ করেছেন যে, ’৭২ সালের সংবিধানে তো বিচারপতিদের বিচার করার ক্ষমতা সংসদেরই ছিল। কিন্তু বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান নাকি এই ক্ষমতা জাতীয় সংসদের হাত থেকে কেড়ে নিয়ে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের হাতে ন্যাস্ত করেন। কিন্তু তারা একটি কথা হয় বেমালুম ভুলে গেছেন না হয় ইচ্ছে করে চেপে গেছেন যে, এই ক্ষমতা ১৯৭৫ সালের জানুয়ারি মাসে সংসদের হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে প্রেসিডেন্টের হাতে ন্যাস্ত করা হয়। তখন ক্ষমতায় ছিলেন আওয়ামী লীগ। ১৯৭৫ সালের জানুয়ারি মাসে ৪র্থ সংশোধনীর মাধ্যমে ক্ষমতার এই হস্তান্তর ঘটে। ৪র্থ সংশোধনীর পূর্বে বাংলাদেশের প্রধান মন্ত্রী ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ’৭৫ সালের জানুয়ারিতে ৪র্থ সংশোধনীর পর প্রেসিডেন্ট হন শেখ মুজিবুর রহমানই। উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের বিচার করার ক্ষমতা আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্যরাই প্রেসিডেন্টের হাতে অর্পণ করেন।
সেদিনের পার্লামেন্টারী আলোচনায় অনেক সংসদ সদস্য সরাসরি বলেছেন যে, ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরা নাকি সংবিধান লঙ্ঘন করেছেন। যদি তারা সংবিধান এবং জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি ভাল করে পড়ে থাকতেন তাহলে দেখতেন যে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরা সংবিধান লঙ্ঘন তো দূরের কথা, তারা বরং সংবিধানকে সমুন্নত করেছেন। সংবিধানের ৯৪(৪) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছেঃ-
“এই সংবিধানের বিধানাবলী সাপেক্ষে প্রধান বিচারপতি এবং অন্যান্য বিচারক বিচারকার্য পালনের ক্ষেত্রে স্বাধীন থাকিবেন।” বিশিষ্ট আইনজীবী এবং সংবিধান বিশেষজ্ঞ মাহমুদুল ইসলাম বলেন, “সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের আচরণ নির্বাহী বিভাগ অথবা সংসদ সদস্যগণ আলোচনা করতে পারবেন না।” সংবিধানের ৭৮(১) অনুচ্ছেদে যদিও সংসদ সদস্যগণকে সংসদের অধিবেশনে প্রদত্ত বক্তব্যে দায়মুক্তি দেয়া হয়েছে কিন্তু সংসদের কার্যপ্রণালী বিধির ৫৩, ৬৩ এবং ১৩৩ অনুচ্ছেদে তাদেরকে বিচারপতিদের বিরুদ্ধে বক্তব্য রাখা থেকে বিরত রাখা হয়েছে।
কার্যপ্রণালী বিধির ৫৩(ন)(অ) উপ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “রাষ্ট্রপতি বা সুপ্রিম কোর্টের জজদের আচরণ-সম্পর্কে কোন কটাক্ষপাত থাকিবে না;।”
কার্যপ্রণালী বিধির ৬৩(ঔ) উপ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি বা সুপ্রিম কোর্টের কোন বিচারকের আচরণ সম্পর্কে কোন কটাক্ষ থাকিবে না।”
কার্যপ্রণালী বিধির ১৩৩ অনুচ্ছেদের (৫) উপ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “রাষ্ট্রপতি বা সুপ্রিম কোর্টের কোনো বিচারকের প্রতি কোন কটাক্ষ থাকিতে পারিবে না।”
অনুরূপভাবে ড. কামাল হোসেন এবং ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলাম সম্পর্কে যেসব ব্যক্তিগত এবং মান হানিকর বক্তব্য দেয়া হয়েছে সেগুলোও সংসদ সদস্যরা করেছেন এখতিয়ার বহির্ভূতভাবে এবং এসব করে তারা সংসদ কার্যপ্রণালী বিধি চরমভাবে লঙ্ঘন করেছেন। অথচ, তারা ভুলে গেছেন যে, তারাই অর্থাৎ জাতীয় সংসদ সদস্যরাই সংসদ কার্যপ্রণালী বিধি প্রণয়ন করেছেন। নিজেদের তৈরি করা আইন তারা নিজেরাই ভেঙেছেন এবং জাতীয় সংসদের বক্তৃতায় সেই দায় সুপ্রিম কোর্টের মাননীয় বিচারপতিগণের ওপর চাপিয়েছেন। তারা উদোর পিন্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপানোর অপচেষ্টা করেছেন। কিন্তু তাদের ছোঁড়া তীর তাদের দিকেই ফিরে এসেছে। সারাদেশব্যাপী জাতীয় সংসদ সদস্যদের এহেন আচরণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। ইংরেজিতে এটিকেই বলা হয়, “বাউন্স ব্যাক করা”।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ