ঢাকা, রোববার 16 July 2017, ১ শ্রাবণ ১৪২8, ২১ শাওয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

সোয়া ১ কোটি হিন্দু  গো-মহিষের মাংস খায়

 

সংগ্রাম ডেস্ক : গো-রক্ষার নামে সমানে চলেছে গণপিটুনি ও হত্যাকান্ড৷ কিন্তু কেন এসব ঘটনা বন্ধ করতে পারছে না সরকার? প্রধানমন্ত্রী মোদীর কাছে এ প্রশ্ন ভারতের সুশিল সমাজের৷ ওদিকে গবাদি পশুর ব্যবসার ওপর নিষেধাজ্ঞা স্থগিত রেখেছে শীর্ষ আদালত। নতুন বার্তা।

গো-রক্ষকদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী মোদী এ পর্যন্ত মাত্র কয়েকটি শব্দই খরচ করেছেন। গোমাংস বা গো-ব্যবসায়ীদের উপর হামলা মেনে নেয়া যায় না। তবে প্রধানমন্ত্রীর কাছে শুধু এ কথাই শুনতে চাওয়া হয়নি। জানতে চাওয়া হয়েছে কেন এ ধরনের ঘটনা ঘটছে? অন্য সম্প্রদায়ের মানুষের উপর এই ধরনের হিংসা বন্ধ করতে তাঁর সরকার কী পদক্ষেপ নিয়েছে?

এক এনজিও-র জনমত সমীক্ষায় দেখা গেছে, ৯৭ শতাংশ গণপিটুনি এবং হত্যাকা-ের ঘটনা ঘটেছে মোদী ক্ষমতায় আসার পর। গোটা ভারতে কয়েক সপ্তাহের ঘটনার দিকে তাকালেই ছবিটা দিনের আলোর মতো ফুটে উঠবে। উত্তর প্রদেশ, হরিয়ানা, রাজস্থান, মহারাষ্ট্র, ঝাড়খ-ে গোরক্ষার নামে চলেছে একের পর এক হামলা এবং মানুষ খুন। বিরোধীদের অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রী গো-রক্ষকদের বিরুদ্ধে কথা বললেও তাঁর সরকার প্রকারান্তরে গো-রক্ষক বাহিনীকেই প্রশ্রয় দিচ্ছে। গত মাসে হরিয়ানার বল্লভগড়ের কাছে ট্রেনে জুনেইদ খান নামে ১৫ বছরের এক মুসলিম কিশোরকে হত্যা করা হয়। একদল দুষ্কৃতি গোমাংস খাওয়া এবং গোহত্যা নিয়ে তর্কের জেরে জুনেইদকে ছুরি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে। ধর্মীয় বিদ্বেষ থেকেই এই হত্যা বলে সন্দেহ। পুলিশ অবশ্য পরে হত্যাকারীকে মহারাষ্ট্র থেকে গ্রেপ্তার করে। কিন্তু এখানেই শেষ নয়। গত সপ্তাহেই দিল্লিতে লরিতে করে গরু নিয়ে যাওয়ার সময় সাতজন শ্রমিক গোরক্ষকদের হাতে গণপিটুনির শিকার হয়৷ কয়েকজনের আঘাত গুরুতর।

গত ২৯শে জুন ঝাড়খ-ের রাঁচির কাছে আলিমুদ্দিন আনসারি নামে একজন গরু ব্যবসায়ী গণপিটুনিতে প্রাণ হারান। ঐ মাসেই এক ডেয়ারি মালিকের উপর শ-খানেক লোক চড়াও হয়। মারধর করে এবং তাঁর ঘরে আগুন লাগিয়ে দেয়। কারণ? তাঁর ঘরের কাছে পড়েছিল একটা মরা গরু। পশ্চিমবঙ্গের উত্তর দিনাজপুরে গত ২৪শে জুন তিনজন নির্মাণ শ্রমিককে পিটিয়ে খুন করা হয়। অভিযোগ তাঁরা নাকি গরু চুরি করে পাচার করছিল। এপ্রিল মাসে আসামে আবু হানিফা এবং রিজাউদ্দিন আলি গণপিটুনিতে মারা যায়। সন্দেহ, তাঁরাও নাকি গরু চুরি ও পাচারের সঙ্গে জড়িত ছিল। পুলিশ অবশ্য অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে খুনের মামলা দায়ের করে।

একই ধরনের ঘটনা ঘটে রাজস্থানের আলওয়ারে। ৫৫ বছর বয়সি পেহলু খানকে গরু পাচারকারী সন্দেহে এমনভাবে মারধর করা হয় যে, দু'দিন পর হাসপাতালে মারা যায় সে। হিন্দু মৌলবাদী সংগঠন হত্যাকারীকে বাহাবা দিয়েছে বলে শোনা গেছে। মোদীর রাজ্য গুজরাটের উনা শহরের দিকে যাওয়ার রাস্তার পাশে এক দলিত পরিবারকে মরা গরুর চামড়া ছাড়াতে দেখে সেই ছবি কেউ পোস্ট করলে তা ভাইরাল হয়। গো-রক্ষকদের দল সেখানে পৌঁছে তাঁদের বেধড়ক পিটায়। তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় দলিত সমাজে।

২০১৭ সালের প্রথম ছ'মাসে গোরক্ষকদের হাতে প্রাণ হারায় ২২ জন। এই ঘটনা ক্রমশই বেড়ে চলেছে। থামার লক্ষণ নেই। দেশের সুশীল সমাজ অভিযোগের আঙুল তুলেছে মোদীর গৈরিক সরকারের দিকে। বলেছে, গো-রক্ষার নামে হামলার পিছনে সরকারি প্রশ্রয় রয়েছে। অথচ সুপ্রিম কোর্ট হালে জবাইয়ের জন্য গরু-মোষ কেনাবেচা নিষিদ্ধ করার সরকারি নির্দেশের উপর স্থগিতাদেশ দিয়েছেন। দ্বিতীয়ত মোদী সরকারকে এটা বুঝতে হবে যে, গো-মাংস ও চামড়ার ব্যবসা মুসলিম ও দলিত সম্প্রদায়ের পেশা বা জীবিকা। সেটা বন্ধ করা অযৌক্তিক। এর অভিঘাত দেশের অর্থনীতির উপরও পড়বে। এই নিয়ে মুক্তমনা বুদ্ধিজীবীরা আওয়াজ তুললে সনাতন সংস্থা, বজরং দল, রাম সেনা, দুর্গা বাহিনী, হিন্দু জনজাগৃতি সমিতির মতো হিন্দু মৌলবাদী সংগঠনগুলি তাঁদের হত্যার হুমকি দেয়।

এটাকে একটু ভিন্ন দৃষ্টিতে বিচার করলেন ইন্ডিয়ান ইন্সিটিটিউট অফ সোশ্যাল স্টাডিজের অধ্যাপক বুদ্ধদেব ঘোষ। ডয়চে ভেলে তিনি বললেন, “সন্দেহ নেই যে এর পিছনে সরকারের প্রশ্রয় আছে। তবে এ কথা ঠিক অনেক জায়গায় গরু জবাই করা হয় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে। তাই সেটার সংস্কার দরকার। কিন্তু মাংস খেতে দেবো না, বিক্রি করতে পারবে না- এটা কেমন কথা?”

 বুদ্ধিজীবীদের প্রতিবাদ প্রসঙ্গে অধ্যাপক ঘোষ মনে করেন, বুদ্ধিজীবীদের অবস্থানও এক্ষেত্রে আলাদা। যেমন কুসংস্কার বা কুপ্রথা নিয়ে যখন কেউ কথা বলছেন, সেটা তিনি কুপ্রথা হিসেবেই বলছেন। সেটা গীতা বা মনুসংহিতায় লেখা আছে কিনা সেটা বড় কথা নয়। কিন্তু “মুসলিম বুদ্ধিজীবীদের মতে, কোরানে লেখা থাকলে সেটা কুপ্রথা বা কুসংস্কার হবে না৷ বরং না থাকলেই সেটা কুপ্রথা৷ এটাও ঠিক নয়। তাই প্রকাশ্যে এই নিয়ে বিতর্ক বা যুক্তিবাদী ব্যাখ্যা দেয়া হোক। ধর্মের সঙ্গে সবকিছু জড়িয়ে ফেললে চলে না।” ডয়চে ভেলেকে তাঁর মনের কথা এভাবেই জানালেন অধ্যাপক বুদ্ধদেব ঘোষ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ