ঢাকা, সোমবার 17 July 2017, ২ শ্রাবণ ১৪২8, ২২ শাওয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

মানুষ কি পিছিয়ে পড়ছে?

বিজ্ঞান-প্রযুক্তির এ পর্যায়ে এসেও মানুষ কি আবার পিছিয়ে যাচ্ছে? এমন প্রশ্নের কারণ আছে। উন্নত-অনুন্নত নির্বিশেষে বিভিন্ন দেশে, বিভিন্ন সমাজে এখন বর্ণবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার যে উগ্র ও বিকৃত মানসিকতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে তাতো পিছিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিতই বহন করে। তবে এমন বাতাবরণের মধ্যেও যখন কোন কোন ব্যক্তিত্ব এবং কখনও কখনও আদালত সঙ্গত ও মানবিক বক্তব্য রাখেন তখন হতাশার ভূগোলে কিছুটা জায়গা দখল করে নেয় আশাবাদ। আমরা যে অঞ্চলে বসবাস করছি সেখানেও এখন মাঝে মাঝে বর্ণবাদ ও সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের উগ্র ঘটনা লক্ষ্য করা যায়। এটা বেশ অস্বস্তিকর বৈকি। তবে এর মধ্যেও ১১ জুলাই টাইমস অব ইন্ডিয়ার একটি খবরে বলা হয়, গবাদি পশুর মাংস কেনাবেচায় ভারতীয় কেন্দ্রীয় সরকার যে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে তা তিন মাসের জন্য স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত বহাল রেখেছে সুপ্রিম কোর্ট। মাদ্রাজ হাইকোর্টের রায়কে বহাল রেখে সুপ্রিম কোর্ট জানায়, এই নিষেধাজ্ঞা চালু করা হচ্ছেনা বলে জানিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারকে হলফনামা দিতে হবে। সুপ্রীম কোর্টের এই রায়ে অস্বস্তিতে পড়েছে নরেন্দ্র মোদির সরকার। তবে কিছুটা স্বস্তি পেলেন সংখ্যালঘু মুসলিম ও মাংস ব্যবসায়ীরা। লক্ষণীয় বিষয় হলো, নরেন্দ্র মোদির বিজেপি সরকারের আমলে গো-রক্ষা আন্দোলনের নামে ভারতে যে উগ্র সাম্প্রদায়িক আচরণ লক্ষ্য করা গেছে তা সাম্প্রতিককালের এক মন্দ উদাহরণ। গো-মাংস রাখা, বহন কিংবা খাওয়ার অভিযোগ তুলে সংখ্যালঘু মুসলমানদের ওপর শুধু হামলাই করা হয়নি হত্যাও করা হয়েছে। এমন কর্মকাণ্ডে ভারতের সাধারণ মানুষ এবং চিন্তাশীল ব্যক্তিত্বরা অস্বস্তির মধ্যে আছেন। বিষয়টি মোদি সরকার এবং তার সমর্থনপুষ্ট রাজনৈতিক মহল উপলব্ধি করলে দেশ ও জনগণের মঙ্গল হয়।
এদিকে ভারতের উত্তর-চব্বিশ পরগনা জেলার বাদুড়িয়া ও বশিরহাটের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন। তিনি বলেছেন, বাংলায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ঐতিহ্য রয়েছে। সেখানে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা উদ্বেগের বিষয়। কারোর প্ররোচনায় এ ধরনের ঘটনা ঘটলো কিনা তা খুঁজে দেখতে হবে। তিনি আরো বলেন, পশ্চিমবঙ্গের ঐতিহ্যই হলো এখানে হিন্দু ও মুসলিমরা মিলেমিশে বসবাস করেন। আমাদের ভেবে দেখতে হবে অশান্তির ঘটনা কেন ঘটলো? এসব ঘটনা কিভাবে আটকানো যায় তাও আমাদের ভাবতে হবে বলে জানিয়েছেন অমর্ত্য সেন।
বর্ণবাদ কিংবা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ঘটনা সভ্য সমাজে চলতে পারে না। মানুষ তো বর্ণবাদ কিংবা সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ চর্চার জন্য সমাজবদ্ধ হয়নি। তাই মানব সমাজে যখন অনাকাক্সিক্ষত এমন চেতনার উগ্রতা লক্ষ্য করা যায় তখন যারা নিজেদের মানুষ হিসেবে বিবেচনা করে থাকেন তাদের অবশ্যই এমন সংকট নিয়ে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে। এমন ভাবনার কথাই উল্লেখ করেছেন অমর্ত্য সেন। শুধু ভারতে নয়, উন্নত সভ্যতার দাবিদার যুক্তরাষ্ট্র এবং বৃটেনেও এখন বর্ণবাদ এবং সাম্প্রদায়িকতার উগ্রতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। পথে-ঘাটে যান-বাহনে এমনকি প্লেনেও মুসলিম এবং এশীয়দের হেনস্তা করা হচ্ছে। আক্রমণ করা হচ্ছে, এমনকি হত্যাও করা হচ্ছে। লন্ডনের বিভিন্ন এলাকায় তো মুসলিম ও এশীয়দের লক্ষ্য করে এসিডও ছোঁড়া হচ্ছে। এমন বাস্তবতায় প্রশ্ন জাগে, আমরা কি তাহলে আলো-ঝলমলে এই সভ্যতায় এক নতুন জাহেলিয়াতে প্রবেশ করছি? এমন মুর্খতাকে মেনে নেয়া যায় না। তাই তো চিন্তাশীল মানুষরা এখন বলছেন, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি চর্চায় আমরা এগিয়ে গেলেও মানুষ হিসেবে পিছিয়ে পড়েছি। সঠিক জীবনদর্শনের লালন ও চর্চার অভাবেই মানবজাতি এক গভীর সংকটে পতিত হয়েছে। এই সংকট নিয়ে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বিবেকবান সব মানুষেরই এখন ভাবনার প্রয়োজন রয়েছে, প্রয়োজন রয়েছে সঠিক দিকনির্দেশনারও।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ