ঢাকা, সোমবার 17 July 2017, ২ শ্রাবণ ১৪২8, ২২ শাওয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

ভারত থেকে গরুগোশত আমদানি?

ইসমাঈল হোসেন দিনাজী : 'শ্রেষ্ঠ ফুড প্রোডাক্ট' নামে নাকি একটি কোম্পানি ভারত থেকে বিফ মানে গরুগোশত আমদানি করবে বলে ইন্টারনেটে খবর বেরিয়েছে। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার কর্তৃক গরুজবাই ও বেচাকেনার ওপর যে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল, সম্প্রতি দিল্লির সুপ্রিম কোর্ট তা তিনমাসের জন্য স্থগিত করেছে। ফলে দেশটিতে গরুজবাই ও এর বেচাকেনায় আপাত কোনও অসুবিধে নেই। তবে ভারতীয় কট্টরপন্থী ব্রাহ্মণ্যবাদীরা সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশ মান্য করবেন বলে মনে হয় না।
সুপ্রিমকোর্টের স্থগিতাদেশের পর বেচাকেনা করা গেলেও মুসলিমরা গরুজবাই করতে পারবেন কিনা তা নিশ্চিত করে বলা মুশকিল। এ নিষেধাজ্ঞা জারির আগেও এনিয়ে সমস্যা হয়েছে অনেক। দাঙ্গাহাঙ্গামাও হয়েছে এন্তার। গরুজবাই করে জীবন দিতে হয়েছে অনেক মুসলিমকে। তবে নব্বইয়ের দশকে কোলকাতা, লক্ষৌè, দিল্লিতে দোকানে দোকানে জবাইকৃত আস্ত গরু ঝুলিয়ে রাখতে দেখেছি। মুসলিম হোটেল ও রেস্তোরাঁতে প্রকাশ্যে বিফকারি সরবরাহ করা হতো। সেসময় একটা কাজে মাস কয়েক কোলকাতায় থাকতে হয় আমাকে। প্রায় রোজই গরুভুনো, গুরদা, ক্ষিরিগুরদা চালাতাম। ওমন সুস্বাদু বিফভুনো দেশে খেয়েছি বলে মনে হয় না।
যা হোক, সামনে কুরবানি। এবার দেখা যাবে উচ্চতর আদালতকে কতটা মর্যাদা দেয় ভারতের উগ্রবাদীরা। কিন্তু 'কয়লা যায় না ধুলে, খাসলত যায় না ম'লে।' উগ্রবাদীদের খাসলত চেঞ্জ হবে বলে মনে হয় না।
কেন্দ্রীয় সরকারের গরুকেনাবেচা ও জবাইবিষয়ক নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখা যে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে তা আগেই আঁচ করা গিয়েছিল। কেননা, গরু ভারতের বিরাট সম্পদ। এ সম্পদ শুধু মুসলিমদেরই রয়েছে এমন নয়। হিন্দু-খৃস্টানসহ অন্য জাতিগোষ্ঠীরও এ সম্পদ রয়েছে প্রচুর। তাছাড়া অনেক অমুসলিম ব্যবসায়ী গরুগোশত রফতানি করে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য করেন। এমতাবস্থায় গরুজবাই ও বেচাকেনা পুরোপুরি বন্ধ রাখা কেবল অসম্ভবই নয়, আত্মঘাতীও দেশটির অর্থনীতির জন্য।
আমাদের দেশে চাহিদার তুলনায় গরু কম। গরু কেবল গোশতের জন্যই পোষে না মানুষ। এর বহুমুখী ব্যবহার হয়। দুধ দেয় গরু। এ দুধ যেমন পুষ্টির চাহিদা পূরণ করে, তেমনই এর চামড়া আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে বড় অবদান রাখে। এছাড়া আমাদের কৃষি এখনও পুরোপুরি যান্ত্রিকীকরণ হয়নি। গ্রামে এখনও হালচাষে গরু-মোষ ব্যবহৃত হয়। গাড়িটানার কাজে লাগে গরু।
গরুর কিছু খামার দেশে হয়েছে। তবে এতে চাহিদাপূরণ হয় না। ফলে প্রোটিনের অন্যতম উৎস গোশতের বিরাট ঘাটতি আমাদের। তাই প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করে প্রতিবছর গরু-মোষ আনতে হয় বিদেশ থেকে। প্রতিবেশী দেশ ভারত আমাদের গবাদি পশুর প্রধান উৎস। এছাড়া নেপাল, ভুটান ও মায়ানমার থেকেও গরু আসে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রহস্যজনকভাবে ভারত থেকে গরু আসতে বিঘœ সৃষ্টি করা হয়েছে। অথচ এলসির মাধ্যমে ভারতীয় গরু আসলে দুদেশেরই লাভ। ভারতীয়রা যেমন গরুপালন করে ভালো অর্থ পেতে পারেন, তেমনই আমরাও সুলভ মূল্যে গরুগোশতের চাহিদামেটাতে সক্ষম হই।
উল্লেখ্য, ভারত থেকে সীমান্তপথে গরু আমদানি করতে গিয়ে বিপত্তিও কম ঘটেনি। গরু আনবার সময় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ-এর বুলেটে কয়েক বছরে বহু বাংলাদেশি রাখাল মারা গেছে। এই মৃত্যুর ধারাবাহিকতা এখনও অব্যাহত আছে। বৈধভাবে এলসির গরু আনতে গিয়েই কেবল মারা গেছে এমন নয়। অনেক সময় গরুচোরাচালানিও মারা পড়েছে বিএসএফ-এর বুলেটে। তাই গরু পারাপারের বিষয় নিয়ে দুই দেশের মধ্যে মাঝেমাঝে সম্পর্কের অবনতিও ঘটে যায়। তবে সংশ্লিষ্ট সীমান্তে যখন পশ্চিম বাংলার বাইরের বিএসএফ থাকে তখনই সমস্যা হয় বেশি। এর মূল কারণ ভাষাগত সমস্যা।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ভারত থেকে গরু আসা কমে যাওয়ায় গোশতের দাম আকাশছোঁয়া। তাই গরিব ও নিম্ন আয়ের মানুষ গরুগোশত খাওয়া প্রায় ভুলতে বসেছে। আমার ফেমিলির কথাই বলি। সপ্তাহে একদিন করে ভালোভাবে গোশত খেলে মাসে প্রায় ১০ কেজি লাগতোই। এরপর মেহমান থাকলেতো আরও বেশি লাগে। এখন ভালো গরুর গোশত প্রতি কেজি ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকা। খাশি ৮০০ থেকে ৯০০ করে।
এতো দামে গোশত কিনে খাওয়া কয়জনের পক্ষে সম্ভব? তাই বাধ্য হয়ে আমার ফেমিলিতে গরুগোশত প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। মাসে একবারও গরুগোশত আর হাঁড়িতে ওঠে না। এতে অবশ্য কিছু উপকারও হয়েছে। আমারসহ কয়েকজনের মেদবহুলতা বেশখানিকটা কমে গেছে। তাই গোশতের দাম বাড়াতে আমি আলহামদুলিল্লাহ পড়েছি। আর দেহের মেদ কমলে নাকি অনেক সমস্যা থেকে রেহাই মেলে। অবশ্য এটা চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের অভিমত।
ভাগ্য ভালো যে, পাকিস্তানি নামে এক জাতের সুলভ মূল্যে মুরগি পাওয়া যায়। এটাই প্রায় সপ্তাহে চালিয়ে দেয়া যায়। ২২০ থেকে ২৪০ টাকা কেজিতে এ মুরগি পাওয়া যায় ঢাকার বাজারে। প্রয়োজনে মহল্লাতেও পাওয়া যায়। পাকিস্তানিদের বিতাড়িত করেছি প্রায় সাড়ে চার দশক আগে। কিন্তু তাদের নামে সস্তা মুরগির নামকরণ কী করে হলো? আমি এর রহস্য জানি না আদৌ। উল্লেখ্য, বিয়েবাড়ি, পিকনিক পার্টিসহ অনেক অনুষ্ঠানে এই পাকমুরগির রোস্ট দিয়েই আমরা রসনাতৃপ্ত করি।
হ্যাঁ, ভারত থেকে হিমায়িত গরুগোশত আমদানির খবর দিয়ে আজকের লেখাটি শুরু করেছিলাম। আস্ত গরুতো আসতোই। সে গরুর গোশত দিয়ে আমরা প্রয়োজন মিটাতাম। এখন আমদানিকৃত হিমায়িত গরুগোশত পেলে অসুবিধে কোথায়? তাছাড়া আমদানি করা গোশতের দাম যা বলা হয়েছে তা বেশ সস্তাই মনে হয়েছে। বলা হয়, গোশতের আমদানিমূল্য পড়বে ২৫০ টাকা। অন্যান্য খরচ ধরে ৩০০ টাকায় বিক্রি করলেও আমদানিকারকদের ভালো মুনাফা হবে বলে বলা হয়েছে। যারা গরুগোশত খেতে পছন্দ করেন, তাদের জন্য খবরটা খুশিরই বটে।
তবে ভারত থেকে আমদানিকৃত ফ্রোজেন বিফ হালাল কিনা তা কিন্তু ভাবনার বিষয়। কে জবাই করেছে, কীভাবে জবাই করা হয়েছে, এসব নিশ্চিত হওয়া ব্যতীত এ গোশত মুসলিমরা খেতে পারেন না। এছাড়া ওই গোশত মরা গরুর কিংবা শূকরের কিনা তাও নিশ্চিত হতে হবে। ভারতীয়রা যে মুসলিমদের হারাম গেলানোর চেষ্টা করবেন না তাইবা কীভাবে বলবেন?
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাড়িবাড়ি গরুসহ  ছাগল, ভেড়া ও মোষপালনের পরামর্শ দিয়েছেন। এজন্য ব্যাংকগুলোকে ক্ষুদ্রঋণ প্রকল্পের আওতায় সহায়তারও প্রস্তাব দেন তিনি। এটা করলে গরিব জনগণ যেমন উপকৃত হবেন, তেমনই গোশতের চাহিদার অনেকটা পূরণ হয়ে যাবে। এতে আমদানির ওপর নির্ভরতাও হ্রাস পাবে।
উল্লেখ্য, মুসলিমরা সবকিছু খেতে পারেন না। হালাল-হারাম বাছ-বিচার করেই খেতে হয় তাদের। ভারত অনেক দেশে বিফ রফতানি করে ঠিক। যারা অমুসলিম তারা প্রায় সবই খেতে পারেন। কিন্তু যারা ইসলামের অনুসারী বা পবিত্র কালেমায় বিশ্বাসী তাদের খাওয়া-দাওয়া সবই ইবাদতের শামিল। শরিয়া মুতাবিক যেমন জবাই হতে হবে, তেমনই প্রাণিটিও হতে হবে হালাল। অন্যরা মৃত প্রাণির মাংস খেলেও মুসলিমরা তা পারেন না। মৃত মাছ মুসলিমরা খেতে পারেন। এটা হালাল। আর যেসব প্রাণি হালাল কিন্তু মৃত সেগুলোও মুসলিমদের জন্য হারাম বা নিষিদ্ধ। তাই শুধু ভারত থেকেই নয়, যেকোনও দেশ থেকে আমদানিকৃত পশু-পাখির গোশত হালাল তথা শরিয়া অনুসারে জবাই করা কিনা, তা নিশ্চিত হওয়া ছাড়া কোনওক্রমেই খাওয়া যাবে না। অতএব ভারত থেকে গরুর হিমায়িত গোশত আমদানি ও তা অপেক্ষাকৃত কম মূল্যে পাওয়া যাবে, এমন খবরে আমাদের উল্লসিত হবার কিছু নেই। উল্টো দুশ্চিন্তার কারণ থাকতে পারে। তাই সাবধান!

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ