ঢাকা, রোববার 24 September 2017, ০৯ আশ্বিন ১৪২8, ০৩ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধ করবে কে?

অনলাইন ডেস্ক: চিকুনগুনিয়া বাহিত এডিস মশারাজধানী ঢাকায় চিকুনগুনিয়ার প্রাদুর্ভাবের জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে দুই সিটি করপোরেশনকে দায়ী করা হচ্ছে। এদিকে, মন্ত্রণালয়ের অভিযোগ প্রতিবারই অস্বীকার করেছেন দুই মেয়রই। সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব প্রাপ্ত কর্মকর্তা বলছেন, চিকুনগুনিয়ার জীবাণুবাহী এডিস মশা ঘরের ভেতরে জন্মায়, সিটি করপোরেশন কারও ঘরের ভেতরে গিয়ে মশা মারতে পারে না বলে জানিয়েছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আনিসুল হক। আর ভুক্তভোগীরা বলছেন, সরকারের দু’টি প্রতিষ্ঠান পরস্পর দোষারোপ না করে যার-যার কাজ করলেই ঢাকাবাসীকে এমন ভোগান্তিতে পড়তে হতো না।

উত্তরা ৩ নম্বর সেক্টরের বাসিন্দা জেসমিন পাপড়ি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘যখন চিকুনগুনিয়ার নাম শুনেছিলাম, তখন সেই নাম নিয়ে মজা করেছিলাম, তাই বলে এমন অসহ্য ব্যথা দিয়ে বোঝাতে হবে চিকুনগুনিয়া কী জিনিস, তা অনুমানও করতে পারিনি।’ তিনি বলেন, ‘কার্যত গত কয়েকদিন অজ্ঞান ছিলাম। গায়ে র‌্যাশ, শরীরের প্রতি গিঁটে গিঁটে ব্যথা আর দাঁতের গোড়ায় গোড়ায় ঘায়ের মতো হয়েছে। শত্রুকে যেন এই জ্বর না দেন সৃষ্টিকর্তা বলেন পাপড়ি। পাপড়ি বলেন, তার এলাকায় সিটি করপোরেশনের মশক নিধন কর্মসূচি তার চোখে পড়েনি।’

এদিকে, একই অভিযোগ মগবাজার ডাক্তারগলির বাসিন্দা সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. বেলায়েত হোসেনেরও। তিনি চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হন গত জুন মাসের মাঝামাঝি। নিজের জ্বর কমার পর তার স্ত্রী ও ছোট ছেলে আক্রান্ত হন। তবে জ্বর কমে গেলেও শরীরের ব্যথা থেকে এখনও রেহাই পাননি তিনি। 

ছয়তলা বিশিষ্ট ওই ভবনের ১৮টি পরিবার বসবাস করছে। প্রতিটি পরিবারের এক বা একাধিক সদস্য চিকুনগুনিয়াতে আক্রান্ত হয়েছেন। বেলায়েত হোসেন বলেন, ‘এই এলাকায় কবে সিটি করপোরেশন মশা মেরেছে,  তা স্মরণ করতে পারছি না।’

গত ১১ জানুয়ারি বিশ্বসংখ্যা দিবসে চিকুনগুনিয়া ছড়িয়ে পড়ার জন্য মশা নিধনে সিটি করপোরেশনের ‘ব্যর্থতাকে’ দায়ী করেছেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী। প্রতিমন্ত্রীর এমন বক্তব্য নিয়ে মেয়র আনিসুল হকের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মন্ত্রী সিনিয়র মানুষ। তিনি বলতেই পারেন। আজ আবার কেউ কেউ একে মহামারি বলছেন। মহামারি হোক আর যা-ই হোক, এজন্য ডিএনসিসি দায়ী নয়। এডিস মশার মাধ্যমে চিকুনগুনিয়া রোগ ছড়ায়। এডিস মশা সিটি করপোরেশনের ড্রেন কিংবা ময়লার ডাস্টবিনে জন্মায় না। এ মশা জন্মায় বাসাবাড়িতে, পরিষ্কার পানিতে, নির্মাণ সামগ্রীতে, এসি, ফুলের টব, ক্যান, পরিত্যক্ত টায়ার ও ডাবের খোসায়। আমরা বাসাবাড়িতে গিয়ে ওষুধ দিতে পারি না।’

আনিসুল হক বলেন, ‘আমরা পূর্বাভাস পাইনি। এছাড়া এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে কোনও জাতীয় নির্দেশিকা আজ পর্যন্ত প্রস্তুত করা হয়নি। এটা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় তৈরি করে। যে কারণে প্রথমে এ রোগের নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। অনেকেই মনে করেন এ জন্য ডিএনসিসি দায়ী।’

একই প্রশ্ন ছিল ঢাকা দক্ষিণের মেয়র সাঈদ খোকনের কাছে। গতকাল ১৪ জুলাই ডিএসসিসির মশা নিধন কার্যক্রম সরে জমিন পরিদর্শনকালে মেয়র বলেন, ‘মন্ত্রী যেকোনও মন্তব্য করতে পারেন। আতঙ্কিত হবেন না। রোগ আসতেই পারে। এই সংকট মোকাবিলা একসঙ্গে করা সম্ভব।’ তিনি আরও বলেন, ‘চিকুনগুনিয়া শুধু বাংলাদেশে নয়, ভারত, পাকিস্তান ও নেপালেও ছড়িয়েছে।’

মশা নিধনের বিষয়ে নিজেদের সিদ্ধান্তে অটল রয়েছে মন্ত্রণালয়। শনিবার (১৫ জুলাই) স্বাস্থ্যমন্ত্রী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সিটি করপোরেশন আন্তরিক হলে চিকুনগুনিয়ার এভাবে ছড়িয়ে পড়তো না।’

জানতে চাইলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন অনুষদের ডিন অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ বলেন, ‘দায়িত্ব তো কাউকে না কাউকে নিতেই হবে। চিকুনগুনিয়ার প্রাদুর্ভাব মহামারিতে রূপ নিয়েছে, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। যার যার দায়িত্ব, সে তা পালন করলেই আজ এ অবস্থা হতো না।’

মেয়র আনিসুল হকের বক্তব্যের সমালোচনা করে ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ বলেন, ‘সিটি করপোরেশনকে কেউ বলেনি ঘরে ঘরে গিয়ে মশা মারতে। তাদের নিয়মিত যে মশক নিধন কর্মসূচি রয়েছে, সেটা পালন করলে আজ মানুষের এ ভোগান্তি হতো না। চিকুনগুনিয়ার আফটার ইফেক্টে মানুষ ভুগছে বেশি, নষ্ট হচ্ছে কর্মঘণ্টা। সিটি করপোরেশন যদি অন্যান্য মশা মারার কাজটাও ঠিকমতো করতো, তাহলেও বাইরের মশার সঙ্গে ঘরেরও মারা পড়তো। এজন্য আলাদা কিছু করার দরকার নেই। সিটি করপোরেশনের যে কোনও দায়িত্ব নেই, তা তো হয় না। তারা ঘরের-বাইরে ডোবা, নালা, বৃষ্টির পানিতে জন্মানো মশা ধ্বংস করুক। তাহলেই সেসব মশার সঙ্গে এডিস মশাও মারা যাবে।’

ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ আরও বলেন, ‘চিকিৎসক জীবনে এত জ্বরের রোগী খুব কমই দেখেছি। চিকুনগুনিয়ার কোনও প্রতিষেধক না থাকায় এই রোগটিকে প্রতিরোধ করতে হলে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এখনও যদি চিকুনগুনিয়া রোধ না করা যায়, তাহলে ভবিষ্যতে পুরো দেশে এটি ছড়িয়ে পরতে পারে।’

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, ‘যেকোনও রোগের একটি নির্দিষ্ট অবস্থান রয়েছে। আর সেই নির্দিষ্ট অবস্থান থেকে যদি কোনও রোগ নির্ধারিত সময়ে অনেক বেশি ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে তাকে মহামারি বলা হয়। তবে চিকুনগুণিয়াকে মহামারি বলা হবে কিনা, তা নির্ণয়ের  জন্য নির্ধারিত কর্তৃপক্ষ রয়েছে।’

স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক ডা. সানিয়া তহমিনা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত আমাদের হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা ১২ থেকে ১৩ জন। আমরা মানুষকে সচেতন করতে চাচ্ছি, সিটি করপোরেশন এখন সচেতন হয়েছে, যদি মশা নিধন কর্মসূচি বাড়ায় তাহলে পরিস্থিতিকে এখনও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।’

প্রসঙ্গত, স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর)-এর মোবাইল ফোনভিত্তিক এক জরিপ থেকে সম্ভাব্য ৪ হাজার ৭৭৫ জন রোগীর মধ্যে থেকে তারা ৩৫৭ জনের চিকুনগুনিয়া হয়েছে মর্মে নিশ্চিত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন ইনস্টিটিউটটির পরিচালক অধ্যাপক মীরজাদী সেব্রিনা। এ‌দিকে, প্রতিষ্ঠানটি গত তিনমাসে ৬৪৩জনের লালা ও রক্তের নমুনা পরীক্ষার মাধ্যমে ৫১৩ জন চিকুনগুনিয়াতে আক্রান্ত বলে জানায়।-বাংলা ট্রিবিউন

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ