ঢাকা, মঙ্গলবার 18 July 2017, ৩ শ্রাবণ ১৪২8, ২৩ শাওয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

নির্বাচনকালীন সরকার বিষয়ে অতীতের ভুল কাম্য নয়

জিবলু রহমান : [তিন]
বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন শক্তিশালীকরণ অংশে বলা হয়েছে-নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব সচিবালয় গঠন করতে হবে। সংবিধানের ৭৯ অনুচ্ছেদে জাতীয় সংসদের নিজস্ব সচিবালয় থাকবে বলে উল্লেখ আছে। এ সচিবালয়ের আর্থিক স্বাধীনতা থাকতে হবে। নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে, নতুনভাবে গঠিত নির্বাচন কমিশনকে এর নিজস্ব সচিবালয় ও মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সকল পর্যায়ের নির্বাচনী কর্মকর্তা অর্থাৎ রিটার্নিং অফিসার, সহকারী রিটার্নিং অফিসার, আপিল কর্তৃপক্ষ, প্রিজাইডিং অফিসার, সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার, পোলিং অফিসার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কর্মকর্তা, রেজিস্ট্রেশন অফিসার, সহকারী রেজিস্ট্রেশন অফিসার, রিভাইজিং অথরিটি, নির্বাচনকাজে নিয়োজিত বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে। নির্বাচন কমিশন সচিবালয় ও মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে রাজনৈতিক দলের প্রতি প্রকাশ্য আনুগত্য পোষণকারী কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করে অতিসত্বর প্রত্যাহার এবং প্রত্যাহারকৃত কর্মকর্তাদের যেকোনো ধরনের দায়িত্ব পালন থেকে বিরত রাখতে হবে। নির্বাচন কমিশন সচিবালয় ও তাদের মাঠপর্যায়ের যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারী বিগত ২০০৮ ও ২০১৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন পর্যায়ের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ও অন্যান্য নির্বাচনী বিধিবিধানের ব্যত্যয় ঘটিয়েছেন, তাঁদের তালিকা প্রণয়ন এবং তাঁদের নির্বাচনী কার্যক্রম থেকে বিরত রাখতে হবে। প্রেষণে নির্বাচনী দায়িত্বে নিয়োজিত প্রকাশ্য রাজনৈতিক মতাবলম্বী কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করে তাঁদের ভবিষ্যতে অন্য যেকোনো নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করা থেকে বিরত রাখতে হবে।
এই অংশে আরো বলা হয়েছে-সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশন তফসিল ঘোষণার সময় মাঠপর্যায়ে কর্মরত জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারদের প্রত্যাহার করে নতুন কর্মকর্তা পদায়নের ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। নতুন কর্মকর্তা পদায়নে বিগত পাঁচ বছর বিভিন্ন পদমর্যাদায় ওই জেলায় চাকরিরত ছিলেন এমন কর্মকর্তাদের একই জেলায় জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার পদে পদায়ন করা যাবে না। একইভাবে প্রত্যেক উপজেলা এবং থানায় কর্মরত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের প্রত্যাহার করে নতুন কর্মকর্তা নিয়োগের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তফসিল ঘোষণার প্রাক্কালে নির্বাচনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় যেমন-স্বরাষ্ট্র, অর্থ, তথ্য, জনপ্রশাসন, স্থানীয় সরকার, শিক্ষা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা, পররাষ্ট্র এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় সংবিধানের ১২৬ অনুচ্ছেদ ও গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২-এর ৫ অনুচ্ছেদ অনুসারে নির্বাচন কমিশনের চাহিদা অনুযায়ী কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বাধ্য থাকবে। তফসিল ঘোষণার তারিখ থেকে নির্বাচিত নতুন সরকার দায়িত্ব না নেওয়া পর্যন্ত এ ব্যবস্থা বলবৎ থাকবে।
খসড়া প্রস্তাবনায় আরো বলা হয়েছে, সবার মতামতের ভিত্তিতে নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ বা পুনর্বিন্যাস করতে হবে, প্রতিরক্ষা বাহিনীকে ম্যাজিস্টেরিয়াল ক্ষমতা দিয়ে নির্বাচনী এলাকায় টহলসহ ভোটকেন্দ্রে ও বিশেষ বিশেষ স্থানে মোতায়েনের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সব রাজনৈতিক নেতা ও কর্মী, যারা ভোটার হওয়ার যোগ্য, কিন্তু বিভিন্ন মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলায় কারান্তরীণ রয়েছেন, তাঁদের নাম ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে ভোটার তালিকা হালনাগাদকরণ নিশ্চিত করতে হবে। প্রত্যেক কেন্দ্রে ভোট গণনার সময় ওই কেন্দ্রের প্রত্যেক বুথে প্রার্থী কর্তৃক নিযুক্ত পোলিং এজেন্টকে অবশ্যই উপস্থিত রাখতে হবে। ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গণনা শুরু করতে হবে। মাঝখানে কোনো বিরতি দেওয়া যাবে না। তফসিল ঘোষণার পর থেকে নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক ফলাফল ঘোষণা পর্যন্ত নির্বাচনী আইন, আচরণবিধি ও অন্যান্য নির্বাচনী বিধিবিধান ভঙ্গের অভিযোগপত্র এবং নির্বাচনসংশ্লিষ্ট যেকোনো বিষয়ে দাখিলকৃত অভিযোগপত্র গ্রহণ ও লিখিত প্রাপ্তি স্বীকার এবং তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর প্রতিবিধান করতে হবে।
আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান প্রশ্নে আমাদের সংসদের সামনে বিবেচনাধীন কোনো বিষয় নেই। কিন্তু সেই শূন্যতা কিছুটা হলেও পূরণ করে রেখেছেন আমাদের সুপ্রিম কোর্ট। এই মুহূর্তে উচ্চ আদালতের দেওয়া তিনটি ফর্মুলা জাতির সামনে বিবেচনাধীন। ত্রয়োদশ সংশোধনী মামলায় আপিল বিভাগের রায় সূত্রে আমরা সর্বদলসম্মত রাজনীতিককে অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী করতে পারি। আবার ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রীর অধীনে সংসদে প্রতিনিধিত্বের অনুপাতে মন্ত্রী সংখ্যা (লটারিতে গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর ভাগ) বণ্টন কিংবা মেয়াদ শেষের এক বছর বিরোধী দলকে শাসন করতে দিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার করতে পারি। (সূত্র : দৈনিক প্রথম আলো ২০ আগষ্ট ২০১৫)
নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে দুটি ফর্মুলা দিয়েছিল হাইকোর্ট। দুটি ফর্মুলা ছাড়াও হাইকোর্ট আরও কিছু প্রস্তাব রেখেছে। হাইকোর্ট বলেছেন, একটি মুক্ত, ন্যায্য ও নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠান আয়োজন রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক দায়িত্ব। হোক সেটা সংসদের ৫ বছরের মেয়াদ পূরণ হওয়ার আগে বা পরে। অনেক সাংবিধানিক কার্যাবলীর মধ্যে, যেমনটি আমাদের সংবিধানের বিভিন্ন অনুচ্ছেদে লেখা আছে, জাতীয় নির্বাচন ব্যতীত কেউই গণতন্ত্র বা আইনের শাসন পরিচালনা ধারণ করতে পারে না। তাই, দেশের সব রাজনৈতিক দলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো, নির্বাচনের পূর্বে একটি নির্বাচন-বান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করা ও নির্বাচন শেষ হওয়া পর্যন্ত তা অব্যাহত রাখা এবং একইভাবে নির্বাচন কমিশনকে তাদের সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেয়া। এজন্য সকল রাজনৈতিক দলকে রাস্তায় আন্দোলন বা সহিংস রাজনৈতিক পন্থা অবলম্বন থেকে বিরত থাকতে হবে। নিজেদের পর্যবেক্ষণে হাইকোর্ট আরও বলেছেন, উপরের ফর্মুলাগুলো হয়তো বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর চর্চিত আক্রমণাত্মক রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে গণতন্ত্রের পথে অগ্রসর হওয়ার উপায়। (সূত্র : দৈনিক সংগ্রাম ১৬ আগষ্ট ২০১৫)
এই ফর্মুলা নিয়ে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ, সুশীল সমাজসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের মধ্যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল। তবে পদ্ধতি বা হাইকোর্টের এই ধরনের ফর্মুলা দেয়া না দেয়ার অধিকার নিয়ে বিতর্ক থাকলেও একটি কথা পরিষ্কার হয়েছে যে, কোনো ক্ষমতাসীন দলের অধীনে নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়। দুটি ফর্মুলাতেই ক্ষমতার ভারসাম্যের কথা হয়েছে। কোথাও সরকারকে নির্বাচনকালীন সময়ে পূর্ণ ক্ষমতা দেয়া হয়নি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, হাইকোর্টের এই মনোভাবকে সামনে রেখে একটা গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের ফর্মুলা বের করতে হবে। যে নির্বাচন হবে নিরপেক্ষ, সুষ্ঠু এবং ভয়ভীতিহীন। যেখানে নির্বিঘেœ ভোটাররা তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন। সে ক্ষেত্রে আবারো আলোচনায় আসছে ১৯৯৬ সালের পর টানা তিনটি নির্বাচনের বিষয়টি। যে নির্বাচনগুলো সবার কাছে গ্রহণযোগ্য পেয়েছে। যদিও ২০০৬ সালের সরকার ও নির্বাচন নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, হাইকোর্টের এই ফর্মুলার প্রমাণ করে দিচ্ছে, নির্বাচনকালীন সরকার হতে হবে নিরপেক্ষ, দলীয় প্রভাবমুক্ত।
নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকার নিয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে পাল্টাপাল্টি বিতর্ক থাকলেও সংবিধানেই এই বিতর্ক নিরসনের পথ খোলা রয়েছে। বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. এমাজউদ্দীন আহমদ বলেছেন, সংবিধানের ১২৩(৩)(খ) ধারা কার্যকর করা হলেই বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ‘নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের’ প্রধানমন্ত্রী হবেন। সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন হবে না কিংবা পৃথক তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনেরও প্রয়োজন নেই। তখন সংসদ ভেঙে যাবে, বর্তমান মন্ত্রিসভাও থাকবে না। নির্বাচনকালীন রুটিন কাজ করার জন্য প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন দলের কিছু নেতাকে নিয়ে সবার গ্রহণযোগ্য একটি ছোট মন্ত্রিসভা গঠন করবেন। নির্বাচন কমিশন নির্বাচন করবে। ওই সময়ে যেসব কর্মকর্তা নির্বাচনী কাজে সহায়তা করবেন তারাও স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ পাবেন।
সংবিধানের ১২৩(৩)(খ) ধারায় বলা হয়েছে ‘মেয়াদ-অবসান ব্যতীত অন্য কোন কারণে সংসদ ভাঙ্গিয়া যাইবার ক্ষেত্রে ভাঙ্গিয়া যাইবার পরবর্তী নব্বই দিনের মধ্যে’ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
তিনি এও বলেছেন, বিগত ২০১৪ সালের নির্বাচনের সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিরোধী দল বিএনপিকে যে প্রস্তাব দিয়েছিলেন প্রয়োজন হলে তা স্মরণ করতে পারেন। তখন প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলের হাতে স্বরাষ্ট্র ও জনপ্রশাসনের মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় ছেড়ে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন।
একই সঙ্গে ড. এমাজউদ্দীন বলেছেন, দেশে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য প্রধানমন্ত্রী গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে আলোচনায় বসতে পারেন। জাতীয় স্বার্থে, বিশেষ করে গণতন্ত্রের স্বার্থে প্রধানমন্ত্রী এ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারেন।
তিনি বলেন, আগামী নির্বাচন কতটুকু অর্থপূর্ণ হবে, জনগণের চিন্তাভাবনা ও ভোটাধিকার কতটুকু প্রতিফলিত হবে, তা প্রধানত নির্ভর করছে ক্ষমতাসীন দল এবং বিরোধী দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা প্রতিষ্ঠার ওপর। আশা করছি প্রধানমন্ত্রী এ ব্যাপারে বিচক্ষণতার পরিচয় দেবেন। সব দলের অংশগ্রহণে জাতিকে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দেবেন। এ মুহূর্তে বাংলাদেশের সচেতন জনগণ চায়-গণতান্ত্রিক পরিবেশ, আইনের শাসন এবং অধিকারের নিশ্চয়তা। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে এ ধরনের চিন্তা-ভাবনায় উদ্বুদ্ধ হয়েই জনগণ ত্যাগ স্বীকার করেছে। তাই আবারও বলব, জনগণের এই চিন্তা-ভাবনাকে ধারণ করতে জাতীয় নেতৃত্ব যেন ভুল না করেন।
ড. এমাজউদ্দীন বলেন, রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃস্থানীয় সদস্যদের যে আলোচনা হয়েছে তার ফলে হয়তো একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন গঠিত হয়ে যেতে পারে; কিন্তু বাংলাদেশে সুষ্ঠু, অবাধ এবং সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণের মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী নির্বাচন কমিশনে যথেষ্ট নয়, যদিও এটি অপরিহার্য। এর কয়েকটি কারণও রয়েছে-এক. নির্বাচন কমিশন যতই শক্তিশালী হোক, দেশের প্রায় নয় কোটি ভোটদাতা এবং প্রায় ৫০ কি ৬০ হাজার ভোটকেন্দ্র তদারক করার ক্ষমতা এককভাবে নির্বাচন কমিশনের নেই। কমিশনকে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সহায়তা গ্রহণ করতেই হবে। সহায়তা গ্রহণ করতে হবে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। প্রশাসনিক ব্যবস্থার যে গুণপনা অর্থাৎ নিরপেক্ষতা গণতান্ত্রিক সমাজে স্বীকৃত, গত সাড়ে তিন বছরে অনেকেই বলে থাকেন, তার এক বিরাট অংশ হারিয়ে গেছে। দলীয় ক্যাডারদের দ্বারা এসব ব্যবস্থার বৃহৎ এক অংশ নিরপেক্ষতা হারিয়েছে।
দুই. বাংলাদেশে নির্বাচন ভীষণভাবে প্রভাবিত হয় কালো টাকা এবং সন্ত্রাসের দ্বারা। যদি দুর্নীতি দমন কমিশন এবং মানবাধিকার কমিশন আরও শক্তিশালী হতো তাহলে কালো টাকা এবং সন্ত্রাসের প্রভাব কিছুটা হ্রাস পেত।
তিন. সাধারণ নির্বাচন পরিচালনার জন্য চাই নিরপেক্ষতার এক আবহ। নিরপেক্ষতার এ আবহ তৈরি করতে পারেন একমাত্র প্রধানমন্ত্রীই। যেভাবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কমিশন গঠনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন, প্রধানমন্ত্রীও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য দেশের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দলের সদস্যদের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনায় বসতে পারেন।
তিনি বলেন, গণতন্ত্রের পথ সব সময় অত্যন্ত বন্ধুর। তাই এ পথে চলতে চলতে মাঝে মধ্যেই সংকটের মুখোমুখি হতে হয়। এ সংকট নিরসনের পন্থা কিন্তু আলোচনা-পর্যালোচনা এবং এরই মাধ্যমে অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি কিছুটা সম্মান দেখানো। গণতন্ত্রের মানসপুত্র হিসেবে চিহ্নিত এ দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাজনীতিক হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী বলেছেন, ‘গণতন্ত্রের অর্থ হলো জনসমূহের মধ্যে ঐকমত্য, বন্ধুত্ব এবং সহযোগিতা প্রতিষ্ঠা। গণতন্ত্রে তোমাদের কিছু দিতে হবে এবং কিছু গ্রহণ করতে হবে।’
তিনি বলেন, পৃথিবীর অনেক উন্নত সংসদীয় সরকার ব্যবস্থার রাষ্ট্রকে আমরা অনুসরণ করতে পারি। যেমন-ভারত, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, জাপান, কানাডা প্রভৃতি। তারা যে মানসিকতা নিয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠান করে তা অনুকরণীয়। নির্বাচনকালীন সরকার তত্ত্বাবধায়ক সরকার হয়ে থাকে। দলীয় দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে যেতে পারি না বলেই আমরা এই দৃষ্টান্ত এখনই অনুসরণ করতে পারি না।
অধ্যাপক এমাজউদ্দীন বলেন, নির্বাচন কোনো তীব্র স্রোতস্বিনী নদী অতিক্রম করার মতো নয় যে, যারা হেরে গেলেন তারা স্রোতে ভেসে গেলেন, আর বিজয়ীরাই শুধু তীরে উঠলেন। নির্বাচন হলো পাহাড়ের চূড়ায় আরোহণের মতো কঠিন কাজ। পাহাড়ের চূড়ায় উঠে, সবদিকে চোখ রেখে, বিবেক পরিচ্ছন্ন রেখে, যাদের আমানত এই রাষ্ট্র-ক্ষমতা তাদের স্বার্থের দিকে লক্ষ্য রেখে, এর সদ্ব্যবহার করাই বিজয়ীদের কাজ। যাদের স্বার্থে এ ক্ষমতার প্রয়োগ ঘটছে তারাও পাহাড়ের নিচ থেকে সর্বক্ষণ তাকিয়ে থাকেন ক্ষমতা প্রয়োগকারীদের দিকে। দৃষ্টি রাখেন কখন, কীভাবে, কার জন্য, কোন প্রক্রিয়ায়, কতটুকু স্বচ্ছতা এবং পরিচ্ছন্নভাবে জনগণের এ ক্ষমতা ব্যবহৃত হচ্ছে। (সূত্র : দৈনিক সমকাল ৮ জুলাই ২০১৭)
বিশিষ্ট আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক বলেছেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুই জোটই তাদের নিজ অবস্থানে অনড়। বিএনপি জোটের দাবি, সহায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হবে। অন্যদিকে সরকারে থাকা আওয়ামী লীগ বলছে, সংবিধান অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন নির্বাচনকালীন সরকারই হবে সহায়ক সরকার। এতে নির্বাচনকালীন সরকার গঠন নিয়ে ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগের ও পরের অস্থিরতা ফের দেখা দিতে পারে বলেও জনমনে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। দেশ ও সমাজের বৃহৎ স্বার্থে এই অস্থিরতার দ্রুত অবসান ঘটাতে হবে।
২০১১ সালের ১১ মে দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্ট এক রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাসংবলিত সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করে দেন। তবে প্রয়োজনীয় বিধান সংশোধন করে উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের বাদ দিয়ে পরবর্তী দুটি নির্বাচন (দশম ও একাদশ) করা যাবে বলে ওই রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে বিচারপতিদের বাইরে রেখে বিলুপ্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আদলে অন্য কোনো রূপরেখা তৈরি করে নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করা সম্ভব দাবি করে শাহদীন মালিক বলেন, আমাদের ১০টি সাধারণ নির্বাচনের মধ্যে ছয়টি হয়েছে দলীয় সরকারের অধীনে। এর মধ্যে ১৯৭৩ ও ২০১৪ সালের নির্বাচন আওয়ামী লীগ সরকার, ১৯৭৯ ও ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন বিএনপি এবং ১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালের নির্বাচন হয়েছে এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টির অধীনে। নির্বাচনগুলোর ফল পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ক্ষমতাসীন দলগুলো অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সংসদীয় আসনে জয়ী হয়েছে। তাই বাস্তবতার নিরিখে নিঃসংকোচে বলা যায়, আগামী নির্বাচনও যদি দলীয় সরকারের অধীনে হয়, তাহলে ফল এখনও বলা সম্ভব। অন্যদিকে যে চারটি নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হয়েছিল, তা কিন্তু সম্পূর্ণ না হলেও প্রায় গ্রহণযোগ্য হয়েছিল। এ জন্য সুপ্রিম কোর্টের রায় অনুসারে বিলুপ্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা না গেলেও ভিন্ন রূপরেখা তৈরি করে তা কিন্তু পুনর্বহাল করা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজন দুই বৃহৎ জোটের ঐকমত্য।
ড. শাহদীন মালিক বলেন, দেশের স্বার্থে রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী যে কেউ এ উদ্যোগ নিতে পারেন। সংবিধানের ৪৮(৫) অনুচ্ছেদ অনুসারে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের বিষয়ে রাষ্ট্রপতিকে পরামর্শ দিতে পারেন। এর আলোকে রাষ্ট্রপতি অন্য দলগুলোর সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা দিতে পারেন। প্রয়োজনে এই রূপরেখা সংসদেও পাস করা যাবে।
শাহদীন মালিক বলেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে বহাল রেখেও সমঝোতার ভিত্তিতে নির্বাচনকালীন সরকার হতে পারে। অবশ্য অনেক দলের এতে পূর্ণ আস্থা স্থাপনে গররাজি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তা সত্ত্বেও নির্বাচনকালীন সরকার প্রশ্নে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পদে বেশিরভাগ দলের আস্থাভাজন ব্যক্তিদের নিয়ে নির্বাচনকালীন সরকার হতে পারে।
অনির্বাচিত ব্যক্তিদের নিয়ে নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করা হলে তা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের রায়ের পরিপন্থী হবে। তা ছাড়া সংবিধান অনুসারে মন্ত্রিসভার ১০ শতাংশের বেশিও টেকনোক্র্যাট কোটায় কাউকে মন্ত্রিত্ব পদে নিয়োগ দেওয়ার সুযোগ নেই। ফলে সংসদে কোনো ধরনের প্রতিনিধিত্ব না থাকায় বিএনপি মনোনীত ব্যক্তিদের কীভাবে নির্বাচনকালীন সরকারে অন্তর্ভুক্ত করা যাবে- এ প্রশ্নে উত্তরে শাহদীন মালিক বলেছেন, খুবই গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হবে এটি সহায়ক সরকার বা নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের জন্য। এ জন্য উভয় পক্ষের মধ্যে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে সমঝোতা করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী চাইলে নির্বাচনের আগে কিছু আসনে উপনির্বাচন দিয়ে বিএনপি মনোনীত ব্যক্তিদের নির্বাচিত হয়ে আসার সুযোগ দিতে পারেন অথবা টেকনোক্র্যাট কোটায় বিএনপি মনোনীতদের গুরুত্বপূর্ণ পদে মন্ত্রিসভায় স্থান দিয়েও এর সমাধান করতে পারেন।
শাহদীন মালিক আরও বলেন, সংবিধানকে উপেক্ষা করে কোনো সুষ্ঠু নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। তাই নির্বাচন প্রশ্নে সমঝোতা না হলে সংবিধান সংশোধন করতে হবে। কিন্তু আলাপ-আলোচনা না করে সংবিধান সংশোধন করেও কোনো সুফল আসবে না। আর এ জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর আলাপ-আলোচনা বা সংলাপ প্রয়োজন।
শাহদীন মালিক বলেন, এ সংকটের স্থায়ী সমাধানের জন্য নির্বাচন কমিশনের পাশাপাশি সবার কাছে গ্রহণযোগ্য ও নিরপেক্ষ বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে একটি সমঝোতা কমিশনও গঠন করা যেতে পারে। এই কমিশনের সদস্য সংখ্যা পাঁচ থেকে সাতজনের বেশি হবে না। এ ব্যাপারে সরকার একটি নীতি প্রণয়ন অথবা তিন থেকে ছয় মাসের কার্যকর একটি অস্থায়ী আইন করে সমঝোতা কমিশনের কার্যক্রমকে বৈধতা দিতে পারে। একইভাবে রাষ্ট্রপতিও রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করে এ ধরনের কমিশন গঠনের উদ্যোগ নিতে পারেন।
শাহদীন মালিক বলেন, আগামী নির্বাচনের জন্য এ বছরের মধ্যে অথবা সর্বোচ্চ ২০১৮ সালের মার্চের মধ্যে নির্বাচন কমিশনকে অবশ্যই ভোটার তালিকা চূড়ান্ত করতে হবে। সংসদীয় সীমানা যেখানে প্রয়োজন, পুনঃনির্ধারণ করতে হবে। এ প্রক্রিয়া যদি সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়, তাহলে প্রথম পরীক্ষায় নির্বাচন কমিশন উত্তীর্ণ হবে। পরের বিষয়গুলো রাজনৈতিক সমঝোতার বিষয়। তবে শেষ বিচারে অবশ্যই সরকার, রাজনৈতিক দল ও নির্বাচন কমিশনকে সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে হবে। এ ছাড়া সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং অন্য কমিশনারদের দৃঢ়তা ও কাউকে ছাড় না দেওয়ার মানসিকতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক সহযোগিতা ছাড়া শুধু নির্বাচন কমিশনের পক্ষে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্পন্ন করা অসম্ভব। (সূত্র : দৈনিক সমকাল ১১ জুলাই ২০১৭)
সেইকালে টাইটানিক জাহাজটি ছিল আভিজাত্যে ও নিরাপত্তায় অদ্বিতীয়। জাহাজের কাঠামো সে যুগের প্রযুক্তিতে তৈরি-জাহাজটির ষোলটি ভাগ ছিল এবং জরুরি অবস্থায় ষোলটি কম্পার্টমেন্টকে ওয়াটারপ্রুফ করে ফেলা যেত। যার অর্থ জাহাজের তলা ভেঙ্গে গেলেও কম্পার্টমেন্টগুলো ভেসে থাকবে সব যাত্রী নিয়ে, মানে জাহাজ ভেসে থাকবে। জাহাজের নির্মাণ স্থপতিরা এবং প্রকৌশলীরা গ্যারান্টি দিয়েছিলেন যে জাহাজটি কখনই ডুববে না। জাহাজ ভেসে থাকার গ্যারান্টি ছিল, জাহাজটিতে কিন্তু বিশটি লাইফবোটও ছিল! যদিও স্থপতিরা এবং প্রকৌশলীরা এতটাই নিশ্চিত ছিলেন যে জাহাজটি ডুববে না, তাহলে জাহাজে লাইফবোট রাখার প্রয়োজন কি ছিল?
তারমানে টাইটানিক নির্মাতাদের মাথায় ‘যদি ডুবে?’ চিন্তা ছিল-মুখে যতই গ্যারান্টি দেন। টাইটানিক কিন্তু পুরোটাই ডুবেছিল, ডুবেছিল বরফের চাইয়ের সাথে ধাক্কা লেগে। ধাক্কা লেগেছিল জাহাজের পাশের খোলে এবং পানির নিচের অংশের বরফে। সমুদ্রে ভাসমান বরফের দশ ভাগের এক ভাগ আপনি দেখতে পাবেন যা পানির উপরে থাকে এবং নয় ভাগ থাকে পানির নিচে যার আকৃতি পানির উপর থেকে দেখা যায় না। টাইটানিকের নাবিকরা বরফের চাই-টা দেখেছিলেন খুব কাছে পৌঁছে। যখন দেখেছিলেন সাথে সাথে জাহাজ ঘুরিয়েছিলেন। তাদের কোন ধারণা থাকার কথা নয় পানির নিচের নয় ভাগের আকৃতি ও চরিত্র সম্পর্কে। জাহাজ ঘোরালেও শেষ রক্ষা হয় নি। (সূত্র : দৈনিক আমাদের সময় ২৯ নভেম্বর ২০১৩)
একটি গণতান্ত্রিক দেশে নির্বাচন আয়োজনের সময় সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া হয় রাজনৈতিক দলসমূহ ও জনগণের আস্থার প্রতি। কে নির্বাচনে আসলো আর কে না আসলো তার পরোয়া নেই-এমনটা ভাবা হয় না। ‘প্রহসনের নির্বাচন’ কেবল একটি অগণতান্ত্রিক ও স্বৈরশাসনেরই প্রতিচ্ছবি হয়ে থাকে বলে মনে করা হয়ে থাকে। [সমাপ্ত]
Email: jiblu78.rahman@gmail.com

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ