ঢাকা, বুধবার 19 July 2017, ৪ শ্রাবণ ১৪২8, ২৪ শাওয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

ফরহাদ মজহারের জবানবন্দীর সাথে তদন্ত তথ্যের গরমিলের কথা বলছে পুলিশ

স্টাফ রিপোর্টার : কবি, প্রাবন্ধিক ও রাজনৈতিক ভাষ্যকার ফরহাদ মজহারের দেয়া জবানবন্দীর সঙ্গে তদন্তে পাওয়া তথ্যের গরমিল ও বৈসাদৃশ্য রয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। পুলিশ আরও বলছে, মিথ্যা তথ্য দিয়ে থাকলে ফরহাদ মজহারের বিরুদ্ধে কীভাবে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া যায়, সেটি ভেবে দেখা হচ্ছে।

গতকাল মঙ্গলবার দুপুরের দিকে ফরহাদ মজহারকে মিন্টো রোডের গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কার্যালয়ে নেয়া হয়। সেখানে তাঁকে দ্বিতীয় দফা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। সেখানেই সাংবাদিকদের এসব কথা জানান পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) যুগ্ম কমিশনার আব্দুল বাতেন।

ডিবি কর্মকর্তা আব্দুল বাতেন আরও বলেন, ফরহাদ মজহার আদালতে ও পুলিশের কাছে যে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিয়েছেন, তার সঙ্গে পুলিশি তদন্তে পাওয়া তথ্যের যথেষ্ট বৈসাদৃশ্য বা গরমিল রয়েছে। এসব নিয়েই ফরহাদ মজহারকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘আমাদের হাতে যে তথ্য এসেছে, তাতে মনে হচ্ছে তিনি অপহৃত হননি। ১৬৪ ধারার জবানবন্দী এবং সেই সঙ্গে উনার কার্যকলাপ ও আমাদের কাছে থাকা তথ্যের মধ্যে কোনো মিল নাই। এই বিষয়টি উনার মাধ্যমে যাচাই করা হবে। “তিনি যদি সত্যিকার অর্থে অপহৃত হয়ে থাকেন, তাহলে একমাত্র সাক্ষী তিনি নিজেই এবং যারা অপহরণ করেছে তারা। এই পর্যন্ত তদন্তে আমাদের মনে হয়েছে, তিনি অপহৃত হননি।”

এবিষয়ে পুলিশের পরবর্তী করণীয় জানতে চাইলে বাতেন বলেন, কেউ মিথ্যা তথ্য দিলে, মিথ্যা অভিযোগে মামলা করলে পেনাল কোডের (দন্ডবিধি) ২১১ ধারায় তার বিরুদ্ধে মামলা করার বিধান রয়েছে। “সব প্রক্রিয়া যাচাই করে দেখে আইনগতভাবে কীভাবে ব্যবস্থা নেয়া যায় তা দেখা হবে।’ 

ফরহাদ মজহার কোথায় ছিলেন, কীভাবে উদ্ধার হলেন, এ নিয়ে এখন পর্যন্ত ধূম্রজাল চলছে। সর্বশেষ চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া থেকে এক নারীকে ঢাকায় এনে জবানবন্দী নেয়ার ব্যবস্থা করে পুলিশ। জবানবন্দীতে ওই নারী বলেছেন, তাঁর জন্য ‘টাকা সংগ্রহ’ করতে ওই দিন ফরহাদ মজহার বাসা থেকে বেরিয়েছিলেন।

তবে এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ফরহাদ মজহারের স্ত্রী ফরিদা আখতার। তাঁর অভিযোগ, অপহরণের ঘটনাটিকে ধামাচাপা দেয়ার জন্য এটা করা হতে পারে।

গতকাল সকাল সাড়ে ১০টার দিকে কবি ও লেখক ফরহাদকে শ্যামলীর হক গার্ডেনের বাসা থেকে মিন্টো রোডে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে জবানবন্দী ও তদন্তে পাওয়া তথ্য-উপাত্তের মধ্যে ‘গরমিলের’ বিষয়ে প্রায় আড়াই ঘণ্টা ধরে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ। গত ৩ জুলাই সকালে নিখোঁজ হওয়ার ১৮ ঘণ্টা পর নাটকীয়ভাবে যশোরে বাস থেকে ফরহাদ মজহারকে উদ্ধার করে র‌্যাব-পুলিশ। পরদিন সকালে ডিবি কার্যালয়ে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ঢাকার আদালতে নেয়া হয়। সেখানে জবানবন্দীতে তিনি বলেন, তাকে অপহরণ করে খুলনায় নেয়া হয়েছিল। অপহরণকারীরা তার কাছ থেকে ৩৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করেছিল।

এই অন্তর্ধান নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে শুরু করে সব মহলে আলোচনার মধ্যে ‘তদন্তের সূত্র ধরে’ গত ১০ জুলাই ঢাকার আদালতে অর্চনা রানি নামে এক নারীকে নিয়ে আসে পুলিশ। নিজেকে ফরহাদ মজহারের শিষ্য দাবি করে এই নারী জবানবন্দীতে বলেন, সেদিন ফরহাদ মজহার তার জন্য অর্থ জোগাড় করতেই বেরিয়েছিলেন এবং ১৫ হাজার টাকাও পাঠিয়েছিলেন।

১৩ জুলাই পুলিশ মহা পরিদর্শক এ কে এম শহীদুল হক এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, তদন্তে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে তাদের মনে হয়েছে, ফরহাদ মজহার স্বেচ্ছায় খুলনা গিয়েছিলেন, অপহরণের কোনো ঘটনা ঘটেনি।

ঘটনার দিন কয়েকবারের টেলিফোন কথোপকথনের এক পর্যায়ে ফরহাদ মজহার তার স্ত্রী ফরিদা আখতারকে ‘অপহরণের কথা বলতে মানা করেন’ বলেও দাবি করেন আইজিপি।

বারডেম হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পর কয়েকদিন আগে ফরহাদকে তার বাসায় নেয়া হয়।গতকাল জিজ্ঞাসাবাদের পর দুপুর ১টার দিকে ডিবি কার্যালয় থেকে বের হয়ে আসেন তিনি।

ঢাকা মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার (মিডিয়া) মাসুদুর রহমান জানান , ফরহাদ মজহারের বক্তব্য ও তদন্তে পাওয়া তথ্যের গরমিল থাকায় বিষয়গুলো স্পষ্ট করার জন্য তাকে ডিবি কার্যালয়ে এনে জিজ্ঞাসাবদ করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদের সময় কথপোকথনের রেকর্ড, খুলনায় নিউ মার্কেটের সিসিটিভির ফুটেজ ও অর্চনাকে বিকাশের মাধ্যমে টাকা পাঠানো এসব বিষয়ে গোয়েন্দারা তাকে প্রশ্ন করেন।

ফরহাদ মজহারের স্ত্রী ফরিদা আখতার উপস্থিত গনমাধ্যমকে বলেন, ‘তদন্তের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডিবি পুলিশ আমাদেরকে তাদের কার্যালয়ে যেতে বলেছিল। আমি ও ফরহাদ মজহার সকাল ১১টায় ডিবি কার্যালয়ে ঢুকি। তারা আমাদের সঙ্গে কথা বলে নানা বিষয়ে জানতে চান। আমরা যা জানি তাদেরকে বলেছি। পরে একটার দিকে আমরা ডিবি কার্যালয় থেকে বেরিয়ে আসি।’

৩ জুলাই ভোর রাতে মোহাম্মদপুর লিংক রোডের হক গার্ডেনের নিজ বাসা থেকে বের হন ফরহাদ মজহার। এরপর ভোর ৫টা ২৯ মিনিটে তিনি স্ত্রীকে ফোন করে জানান, ‘ফরিদা, ওরা আমাকে নিয়ে যাচ্ছে। ওরা আমাকে মেরে ফেলবে।’ পরে তার স্ত্রী আদাবর থানায় অভিযোগ করেন। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ওইদিন রাতে র‌্যাব-৬ সহ যশোর নওয়াপাড়া থেকে ফরহাদ মজহারকে উদ্ধার করে পুলিশ। পরে তাকে আদাবর থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পুলিশের সহকারী কমিশনার (এসি) হাফিজ আল ফারুকের নেতৃত্বে তাকে যশোর থেকে ঢাকায় আনা হয়। এরপর ফরহাদ মজহারকে নিয়ে যাওয়া হয় মিন্টো রোডের গোয়েন্দা কার্যালয়ে। সেখানে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে জবানবন্দী দেয়ার জন্য আদালতে পাঠানো হয়। জবানবন্দী দেয়ার পর তিনি নিজ জিম্মায় যাওয়ার আবেদন করলে শুনানি শেষে তার এই আবেদন মঞ্জুর করেন আদালত।

জবানবন্দিতে অনড় ফরহাদ মজহার

শীর্ষনিউজ জানায়, আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে অনড় রয়েছেন কবি, কলামিস্ট ও সমাজ চিন্তক ফরহাদ মজহার।

গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কার্যালয়ে জিজ্ঞাসাবাদে তিনি বলেছেন, সেদিন অপহরণ করে আমাকে খুলনায় নেওয়া হয়েছিল।

এদিকে ফরহাদ মজহার নিজেই খুলনায় গিয়েছিলেন বলে দাবি করে আসা পুলিশও তাদের বক্তব্য থেকে সরেনি। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

ডিএমপির উপকমিশনার (গণমাধ্যম) মাসুদুর রহমান সাংবাদিকদের জানান, নিরুদ্দেশ হওয়ার ঘটনায় জবানবন্দি ও পুলিশের তদন্তে পাওয়া তথ্য-উপাত্তের মধ্যে 'গরমিলের' বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাদের ডাকা হয়েছিল। 

এর আগে গত ৩ জুলাই ঢাকা থেকে নিখোঁজ হওয়ার পর যশোরে উদ্ধার হন ফরহাদ মজহার। এর পর ডিবি কার্যালয় হয়ে আদালতে অপহরণের বিষয়ে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়ে কয়েকদিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি। সেখান থেকে গত ১২ জুলাই শ্যামলী রিং রোডের বাড়ি হক গার্ডেনে ফেরেন ফরহাদ মজহার।

উদ্ধারের পর ঢাকার আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে ফরহাদ মজহার জানিয়েছিলেন, তাকে তিনজন ব্যক্তি অপহরণ করে মাইক্রোবাসে তুলে চোখ বেঁধে খুলনায় নিয়ে ছিল। 

তবে তার বক্তব্যে সন্দেহ প্রকাশ করে পুলিশের পক্ষ থেকে কয়েকটি স্থানের সিসি ক্যামেরার ভিডিওচিত্র এবং অর্চনা রানি নামে এক নারীর কথা বলা হলে এ নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয়।

এর মধ্যেই মঙ্গলবার সকালে বাড়ি থেকে কবি ও কলামনিস্ট ফরহাদ মজহারকে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের কার্যালয়ে নেওয়া হয়। এ সময় তার সঙ্গে যান স্ত্রী ফরিদা আখতারও।

ফরহাদ মজহার এবং অপহরণের মামলাটির বাদী ফরিদাকে জিজ্ঞাসাবাদের পর দুপুর সোয়া ১টার দিকে তারা দুজন ডিবি কার্যালয় থেকে বেড়িয়ে যান।

এরপর ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার আব্দুল বাতেন গণমাধ্যমকে বলেন, ফরহাদ মজহার আদালতে যে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছিলেন, জিজ্ঞাসাবাদেও একই কথা বলেছেন। তার কাছ থেকে নতুন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

“ফরহাদ মজহারকে খুলনার ভিডিও ফুটেজ দেখানো হয়েছে। আদালতে দেওয়া জবানবন্দির সাথে তদন্তে মিল পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানানো হয়েছে। কিন্তু তারা আদালতে যে জবানবন্দি দিয়েছিলেন, সেখান থেকে একচুলও নড়ছেন না।”

মামলার তদন্ত সংস্থা ডিবির এই কর্মকর্তা বলেন, “তারা (ফরহাদ-ফরিদা) আমাদের বলেছেন, আপনাদের তদন্ত আপনারা করেন, আমরা আমাদেরটা দেখব।”

একটি সূত্রে জানা গেছে, গোয়েন্দা পুলিশের সদস্যরা তাদের দুজনের সঙ্গে সাড়ে ১২টা থেকে সোয়া ১টা পর্যন্ত কথা বলেছেন।

এ সময় “তারা (ডিবি) বলেছেন, ‘ঘটনাটি অপহরণের কিছু নয়’। জবাবে ফরহাদ মজহার বলেছেন, ‘আপনাদের তদন্তে অন্য কিছু বের হলে হবে সে অনুযায়ী আপনারা কাজ করেন। কিন্তু আমাদের বক্তব্য যেটা সেটা আদালতেই দেওয়া হয়েছে।”

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ