ঢাকা, বুধবার 19 July 2017, ৪ শ্রাবণ ১৪২8, ২৪ শাওয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

সরকারের ‘নীল-নকশা’ বাস্তবায়নেই নির্বাচন কমিশন রোডম্যাপ করেছে

গতকাল মঙ্গলবার দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সাংবাদিক সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর -সংগ্রাম

স্টাফ রিপোর্টার : আওয়ামী লীগকে আবারো ক্ষমতায় নেয়ার জন্যই ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে নির্বাচন কমিশন (ইসি) রোডম্যাপ ঘোষণা করেছে বলে অভিযোগ করেছে বিএনপি। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে দলের নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে নির্বাচন কমিশনের রোডম্যাপ ঘোষণার দুইদিন পর আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এই অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য রোডম্যাপ ঘোষণা করেছে। এই রোডম্যাপ জাতির আশা আকাংখাকে উপেক্ষা করেছে। পুরনো কায়দায় আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় যাওয়ার নীলনকশা বাস্তবায়নের যাত্রা শুরু করেছে। সাংবাদিক সম্মেলনে মির্জা ফখরুল ছাড়াও বিএনপির স্থায়ী কমিটির একাধিক সদস্য বক্তব্য রাখেন।

সাংবাদিক সম্মেলনে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা জয়নাল আবেদীন (ভিপি জয়নাল), জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল, কেন্দ্রীয় নেতা সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স, শহীদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানী প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

নির্বাচন কমিশন ঘোষিত রোডম্যাপ সরকারের নির্দেশেই হয়েছে মন্তব্য করে মির্জা ফখরুল বলেন, এই রোডম্যাপে জাতির আশা-আকাংখাকে উপেক্ষা করে পুরনো কায়দায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় যাওয়ার নীল নকশার বাস্তবায়নে তাদের যাত্রা প্রক্রিয়া শুরু করলো বলে আমাদের কাছে মনে হয়েছে। এতে জাতি চরমভাবে হতাশ ও ক্ষুব্ধ হয়েছে। আমরা স্পষ্টভাবে বলতে চাই, এই রোডম্যাপটা তৈরিই করা হয়েছে সরকার যেভাবে নির্বাচন করতে চায়, তাকে সাহায্য করার জন্য। সুতরাং আমরা মনে করি, এখনকার বাস্তবতায় সকল দলের সঙ্গে আলোচনা করে এই সমস্যার সমাধান করতে হবে। নির্বাচন কমিশনের প্রতি আহবান রেখে মির্জা ফখরুল বলেন, আমাদের প্রত্যাশা থাকবে, নির্বাচন কমিশন সত্যিকার অর্থে বাস্তবতাকে উপলব্ধি করে তারা সকল রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে আলোচনা করে একটা নিরপেক্ষ গ্রহণযোগ্য নির্বাচন যেন অনুষ্ঠান করা যায় তার জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।

সরকারের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, সরকারের কাছে আবারো বলছি যে, একটি সহায়ক সরকার গঠন করার মধ্যদিয়ে এবং একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনের পরিচালনায় সমস্ত রাজনৈতিক দলের সাথে প্রয়োজনে আলোচনা করে একটা জায়গায় আসা, এটা পথ বের করা, যে পথের মধ্যদিয়ে আমরা সত্যিকার অর্থেই সুষ্ঠু নির্বাচনের মধ্যদিয়ে জনগণের প্রত্যাশিত একটি সরকার গঠন করতে পারবো।যা বাংলাদেশকে শুধু রাজনৈতিক সংকটকে নিরসন করবে না, বাংলাদেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে। আলোচনায় বসুন। এভাবে একতরফা, একগুয়েমি অবস্থানে থেকে দেশের ক্ষতি হচ্ছে, মানুষের ক্ষতি হচ্ছে, গণতন্ত্র ধ্বংস হচ্ছে। সেখান থেকে বেরিয়ে এসে জনগণের কাতারে এসে দাঁড়ান, জনগণের চাহিদা পুরণ করুন। নির্বাচন কমিশনের সংলাপে বিএনপি যাবে কিনা প্রশ্ন করা হলে ফখরুল বলেন, যখন সংলাপ হবে তখন আমরা সিদ্ধান্ত নেবো।

নির্বাচনের কোনো পরিবেশ নেই অভিযোগ করে মির্জা ফখরুল বলেন, প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রীয় সুযোগ ব্যবহার করে তিনি সারা দেশে ঘুরে নির্বাচন প্রচারণা চালাচ্ছেন। এই রোডম্যাপটা কেনো? নির্বাচন করানোর জন্য। নির্বাচন করবে কারা, রাজনৈতিক দলগুলো তো। সেই রাজনৈতিক দলগুলো তো কাজ করতে পারছেন না, সভা-সমাবেশ করতে পারে না, ঘরোয়া মিটিং করতে পারে না। আমাদের কথা বাদ দিলাম, এই যে রব সাহেব(আসম আবদুর রব) তার বাসায় বরণ্যে কয়েকজন ব্যক্তিকে ডাকলেন, সেখানে পুলিশ বাঁধা দিলো। এটা কোন গণতন্ত্র, কোন নির্বাচন? কে নির্বাচন করবে?

নির্বাচন কমিশনের রোডম্যাপ সব দলের সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে পারেনি- মন্তব্য করে মির্জা ফখরুল বলেন, নির্বাচন কমিশন লেভেল প্লেয়িং ফ্লিড তৈরি করবার জন্য রোডম্যাপ দিতে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছে এবং এটা প্রমাণিত হয়েছে সেই ইচ্ছাও তাদেরও নেই। তিনি(সিইসি) জনগণকে আরো হতাশ করেছেন এই কথা বলে, বর্তমান সরকারের অধীনে নিরপেক্ষ নির্বাচন করা সম্ভব। তার এই বক্তব্য সরকারের প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী ও সরকারি দলের নেতৃবৃন্দের বক্তব্যের প্রতিফলনই ঘটেছে।

তিনি অভিযোগ করে বলেন, বিরোধী দলগুলোকে স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে দেয় না। সভা-সমাবেশ ও ঘরোয়া সভা করতে বাঁধা দেয়। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে মিথ্যা মামলা, গ্রেফতার, গুম, খুন, হত্যা এখন নিত্য দিনের ঘটনা। এই পরিস্থিতিতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার যখন বলেন, এসব দেখার দায়িত্ব তাদের নেই। তখন সহজেই বুঝা যায়, এই নির্বাচন কমিশন আরেকটি রকীব মার্কা নির্বাচন কমিশনে পরিণত হতে চলেছে। সুতরাং এই ধারণা স্পষ্ট হয়েছে যে, এ নির্বাচন কমিশন সকলের কাছে কোনো গ্রহণযোগ্য, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের যোগ্য নয়। দেশে বর্তমানে ‘রাজনৈতিক ও মানবাধিকার চরমভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে’ মন্তব্য করে এক্ষেত্রে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের ‘সম্পূর্ণ নিরব’ বলে মন্তব্য করেন বিএনপি মহাসচিব।

সিইসি সরকারের প্রতিনিধিত্ব করছেন জানিয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, প্রধান নির্বাচন কমিশনার যখন বলেন, নির্বাচনের পরিবেশ দেখার দায়িত্ব তাদের নেই তখন সহজেই বোঝা যায় এই নির্বাচন কমিশন আরেকটি রকিব মার্কা নির্বাচন কমিশনে পরিণত হতে চলেছে। সুতরাং এ ধারণা স্পষ্ট হয়েছে যে এই নির্বাচন কমিশন সবার কাছে কোনো গ্রহণযোগ্য, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের যোগ্য নয়। বিএনপির পক্ষ থেকে নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের একটি প্রস্তাব শিগগিরই পেশ করা হবে বলেও তিনি জানান। দেশের সবাই বিশ্বাস করে এই সরকারের অধীনে কোনো সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয় দাবি করে বিএনপির মহাসচিব বলেন, বর্তমান সরকার কোনো নির্বাচিত সরকার নয়। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নজিরবিহীন নির্বাচনী তামাশা করে ক্ষমতায় এসেছে। তথাকথিত গঠিত সংসদে কোনো বিরোধীদল নেই। তাদের নৈতিক ভিত্তি নেই; তাই ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য নির্বাচন কমিশনকে দিয়ে আরেকটি নির্বাচন করতে চায়।

বর্তমান সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয় দাবি করে মির্জা ফখরুল বলেন, আজ এটা সবাই বিশ্বাস করে এই সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। বর্তমান সরকার কোনো নির্বাচিত সরকার নয়। এ সরকারের কোনো নৈতিক বৈধতা নেই। আজকে তারা অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে একটি একতরফা নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য এই অনুগত নির্বাচন কমিশনকে ব্যবহার করে সেই লক্ষ্যেই তারা এগিয়ে চলেছে। তিনি বলেন, বর্তমান রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি হয়েছে, তা উপেক্ষা করে শুধুমাত্র নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনের রোডম্যাপ সমস্যার করতে পারবে না, উপরন্তু আরো ঘণীভুত করবে। আমরা নির্বাচন চাই, আমরা একটা সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চাই। সেই কারণে আমরা একটি সহায়ক সরকারের কথা বলেছি। যে সহায়ক সরকারের অধীনে একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনের পরিচালনায় সকল কাছে গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, আমাদের কথা হচ্ছে, সহায়ক সরকারের ব্যাপারে সমঝোতার করার আগে রোডম্যাপ দিয়ে অগ্রসর হয়ে যাওয়াটা এর মধ্যে আমরা মনে করছি এখানে একটা ষড়যন্ত্র আছে। সরকারের যে নীল নকশা, তার দিকে নির্বাচন কমিশন অগ্রসর হচ্ছে বলে আমরা মনে করি। রোডম্যাপ ঘোষণার দিন থেকে সব দলের সমান সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে বলেও দাবি করেন তিনি।

সাবেক এ মন্ত্রী বলেন, সরকার যা ইচ্ছা তাই করবেন, নির্বাচন কমিশন কিছু করবেন না- এটা হতে পারে না। আমরা (বিরোধী দল) তফসিল ঘোষণার পরে প্রচারণা শুরু করতে পারবো- এর থেকে নির্বাচনে বড় অসমতল ভুমি আর হতে পারে না। যদি সমান সুযোগ সৃষ্টি করতে হয়, যেদিন রোডম্যাপ ঘোষণা হয়েছে, সেদিন থেকেই সব দলের সমান অধিকার থাকতে হবে। 

সংবিধানে বাইরে সমঝোতার কোনো সুযোগ নেই- আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য বানিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদের বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ বলেন, বিষয়টা হলো রাজনৈতিক ইস্যু, এটা সাংবিধানিক কোনো ইস্যু নয়। এখানে সংবিধানের কথা বলে কোনো লাভ নেই। সংবিধান মানুষের জন্য, সংবিধানের জন্য মানুষ নয়। সংবিধান জনসাধারণের স্বার্থের ঊর্ধ্বে থাকতে পারে না। তিনি বলেন, অতীতে যতো সমঝোতা আমরা দেখেছি, যেমন ১৯৯১ সালে যে নির্বাচনটা হলো। সেই নির্বাচনে কী লেখা ছিলো যে, একজন প্রধান বিচারপতি তার অফিস থেকে, তিনি তার পদে থেকে উপরাষ্ট্রপতি হবেন। তারপরে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হবেন- এটা কী লেখা ছিলো? সুতরাং পুরো বিষয়টা একটা পলিটিক্যাল ক্রাসিস। এটাকে রাজণৈতিকভাবে একটা সমাধানে আসতে হবে। তারপরে প্রশ্ন উঠবে যে, সংবিধান কতটুকু থাকবে, কতটুকু থাকবে না, সংবিধান সংশোধন করতে হবে কি হবে না। এটা একটি রাজনৈতিক সমঝোতার ওপর নির্ভর করবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ