ঢাকা, বুধবার 19 July 2017, ৪ শ্রাবণ ১৪২8, ২৪ শাওয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

রূপসী ঝর্ণার রূপ টানছে পর্যটকদের

মিরসরাই (চট্টগ্রাম) সংবাদদাতা : প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য্যের আরেক নাম বড় কমলদহ রূপসী ঝর্ণা। আঁকাবাঁকা গ্রামীণ সবুজ শ্যামল মেঠো পথ পার হয়ে পাহাড়ের পাদদেশে গেলেই শোনা যাবে ঝর্ণার পানি গড়িয়ে পড়ার অপরূপ নুপুরধ্বনি। দুই পাশে সুউচ্চ পাহাড়। সাঁ সাঁ শব্দে উঁচু পাহাড় থেকে অবিরাম শীতল পানি গড়িয়ে যাচ্ছে ছড়া দিয়ে। রূপসী র্ঝণা প্রথম দেখেই তার রূপে পাগল হবে যে কেউ। মেঘের মতো উড়ে আসা শুভ্র এ পানি আলতো করে ছুঁয়ে দেখলেই এর শীতল পরশ মুহূর্তে ক্লান্তি ভুলিয়ে দেবে। টলটলে শান্ত পানির চুপচাপ বয়ে চলার ধরনই বলে দেবে এর উৎস অবশ্যই বিশাল কিছু থেকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই পর্যটকেরা আবিষ্কার করবেন লাল আর নীল রঙের ফড়িঙের মিছিল! যত দূর পর্যন্ত ঝিরিপথ গেছে তত দূর পর্যন্ত তাদের মনমাতানো ঝিঁঝি পোকার গুঞ্জন শোনা যায়। চলার পথে শোনা যায় হরিণের ডাক। অচেনা পাখিদের ডাক, ঘাসের কার্পেট বিছানো উপত্যকার সাথে। রূপসী ঝর্ণার পানিতে গোসল করার লোভ সামলানো কারো পক্ষেই সম্ভব নয়। বছরের পর বছর ঝর্ণার পানি গড়িয়ে যাচ্ছে এই ছড়া বয়ে। কয়েক বছর পূর্বে রূপসী ঝর্ণা নামে আবিস্কার হলো এটি। মিরসরাই উপজেলার সর্ব দক্ষিণে বড় দারোগারহাটের উত্তরে পাহাড়ের কোল অবস্থিত এক দৃষ্টিনন্দন, অনিন্দ্যসুন্দর এক জলপ্রপাত। মিরসরাইয়ের অন্যান্য ঝর্ণাগুলোর চেয়ে এই ঝর্ণায় যাওয়া অনেকটাই সহজ। সৌন্দর্য্যে কোনো অংশেই খৈয়াছড়া, নাপিত্তাচড়া ঝর্ণার চেয়ে কম না। এই ঝর্ণার যাওয়ার পথে দৃষ্টিনন্দন ছড়া, দুপাশের দণ্ডায়মান পাহাড়, সবুজ প্রকৃতি, গুহার মত ঢালু ছড়া, তিনটি ভিন্ন ভিন্ন অপরূপ ঝর্ণা রূপসীর সৌন্দর্য্যকে অন্যান্য ঝর্ণা থেকে আলাদা করেছে। এই ঝর্ণার নাম শুনে প্রতিদিন ছুটে আসছে শতশত ভ্রমণ পাগল মানুষ। কমলদহ এলাকা থেকে প্রথমবারের মত রূপসীতে ছুটে আসেন রিয়াজ, সবুজ, আরিফ ও মোমিনুল। তারা আক্ষেপ করে বলেন আমাদের বাড়ির পাশে এত সুন্দর ঝর্ণা। আগে কেন এলাম না। প্রথমবার এসে এতো ভালো লাগছে যা বুঝাতে পারবোনা। কথা হয় রূপসীতে ঘুরতে আসা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান, প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থী কারিমুল ইসলাম ও একেএম শাহ নেওয়াজের সাথে। তারা বলেন, আমরা ফেইসবুকে দেখে এখানে ছুটে এসেছি। এসে অনেক ভালো লাগছে। দেশের অনেক ঝর্ণায় গিয়েছি। কিন্তু চমৎকার ঝর্ণা কোথাও দেখিনি। এক কথায় রূপসী ঝর্ণার রূপ আমাদের পাগল কওে দিয়েছে। মিরসরাইয়ের অন্যতম স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘সোনালী স্বপ্ন’র সভাপতি মঈনুল হোসেন টিপু বলেন, এবারের ঈদে আমরা রূপসী ঝর্ণায় ঘুরতে গিয়েছিলাম। মিরসরাই’র অনেকগুলো পাহাড়ি ঝর্ণা রয়েছে অন্যগুলোর চেয়ে সৌন্দর্য্যাের দিকে থেকে কোনো অংশে কম নয়। অন্য ঝর্ণাগুলোতে যেতে অনেক পথ পাড়ি দিতে হয় এখানে মহাসড়ক থেকে মাত্র দেড় কিলোমিটার পথ পাড়ি দিলেই ঝর্ণার দেখে মেলে। রূপসী ছড়ার তিনটি ধাপ রয়েছে। বড় কমলদহ ঝর্ণা, ছাগলকান্দা ও পাথরভাঙ্গা ঝর্ণা। এলাকার বাসিন্দা ও যুবনেতা আশরাফুল কামাল মিঠু জানান, এখানে প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে লোকজন ঘুরতে আসেন। পর্যটকদের জন্য ঝর্ণায় যাওয়ার রাস্তায় রেল লাইনের পুর্বপাশে মাটির কাজ করা হচ্ছে। এছাড়া অন্য পর্যটন স্পট গুলোর মত এখানে চুরি ছিনতাইয়ের কোনো ভয় নেই। নির্ভয়ে মনখুলে ঝর্ণায় ঘুরতে পারবেন লোকজন। জানা গেছে, মিরসরাইয়ের বড় দারোগারহাট বাজারের সামান্য উত্তরের ব্রিকফিল্ড সড়ক ধরে পূর্ব দিকে আধা কিলোমিটার পথ পাড়ি দিলেই রেললাইন। রেললাইন পেরুলেই মেঠো পথ, দুপাশে সবুজ ফসলি মাঠ, সামনে পাহাড়ের বিশালতা। আর সেই মেঠো পথ ধরে একটু হাঁটলেই পাহাড়ের পাদদেশ। বাঁ দিকে ৫০ গজ হাঁটলেই বিশাল ছড়া। যেটি রূপসীর প্রবেশপথ। রূপসীর প্রথম ধাপটা বড় একটি ঝর্ণার মত। অনেকটা খাড়া তবে ঢালু। বর্ষায় পুরো ঝর্ণা বেয়ে পানি পড়ে। শুষ্ক মৌসুমে শুধু দক্ষিণ দিকটায়। অনেকেই শেষে কওে দেয়। মনে করে রূপসী শুধু এটাই। অথচ এটি রূপসীর বাইরের রূপ। ভেতরের রূপ আরো বেশি সুন্দর। রূপসীর ধাপের ঝর্ণাটা বেয়ে উপরে উঠলে খোলা একটা জায়গা। তারপর একটা বড় পাথর। এই পাথরের মাঝ দিয়ে অনবরত পানি ঝরছে। দশ ফুটের খাড়া পাথরটি বেয়ে উঠতে পারলেই এবার অন্যরকম এক সৌন্দর্য। বিশাল ছড়া, তবে বেশ আঁকাবাঁকা। ঠিক বয়ে চলা কোনো নদীর মত। ছড়া দিয়ে হাঁটার সময় চোখে পড়বে হরেক রকম পাহাড়ি বৃক্ষ, ফুল, ফল, লতা। ছড়ার বুক ছিড়ে হাঁটতে হাঁটতে মনে হবে যেন কোনো গুহার মধ্য দিয়ে হেঁটে হেঁটে রহস্যভেদ করা হচ্ছে। আর ছড়ার মধ্য দিয়ে স্বচ্ছ পানির বয়ে চলার কল কল ধ্বনি, মুগ্ধ করবে শুধুই। ছড়ার কোথাও অসমান নেই। পথ আটকানোর মত বড় পাথর নেই। পা মছকে দেয়ার জন্য শ্যাওলা নেই। কাঁদা নেই-বালি নেই। সুন্দর সমান এক ছড়া। যেতে যেতে দেখা যেতে পারে বানরের দল। বন্যমোরগের ছুটাছুটি। ছড়া ধরে হাঁটতে হাঁটতে পাওয়া যাবে দুটি পথ। এক পথের ছড়া বড়, আরেক পথের ছোট। বড় ছড়া ধরে একটু এগুলোই রূপসীর মূল ঝর্ণা। অনেক দূর থেকেও কানে ভেসে আসে ঝর্ণার অবিরাম পানি পড়ার সুমধুর ধ্বনি। ৫০ ফুট উঁচু পাথর বেয়ে পড়ছে জল, অনবরত, শত বছর ধরে। ওহ! রূপসী। কি অনিন্দ্যসুন্দর তোমার রূপ। তব্দা হয়ে যাওয়ার মত সৌন্দর্য। অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকার মত জৌলুস। পানির প্রবাহে কি গতিময়তা। পাথর বেয়ে পড়া স্বচ্ছ জলরাশি। তুমিই তো সত্যিকারের রূপসী। সৃষ্টিকর্তা নিজ হাতে গড়েছেন এই ঝর্ণা, প্রকৃতি, সৌন্দর্য। এই রূপসীকে যে একবার দেখবে সে বারবার দেখতে চাইবে। প্রেমে পড়বে, ক্লান্তি দূর করবে। তাই চলে আসুন রূপসী দর্শনে। ভ্রমণ প্রিয় দশর্নাথীরা সাথে হালকা খাবার এবং পানি সাথে নিয়ে যেতে পারেন। কারণ যাওয়া, আসা এবং ঝর্ণা উপভোগ সব মিলিয়ে অন্তত ঘন্টা তিনেক সময় ত লাগবেই। আশেপাশে খাবার দোকান নাই বললেই চলে। যারা প্রথম বারের মত যাবেন তারা স্থানীয় পরিচিত কাউকে গাইড হিসেবে আপনার সাথে নিয়ে যেতে পারবেন পথ দেখানোর জন্য। রূপসী ঝর্ণায় যাবেন কিভাবে? দেশের বিভিন্ন স্থান হতে যে কোনো বাসযোগে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বড়দারোগাহাট বাজাওে নামবেন। এরপর সিএনজি অটোরিক্সাযোগে বাজারের উত্তর পাশের ব্রিকফিল্ড সড়ক দিয়ে পাহাড়ের পাদদেশ পর্যন্ত যাবে। এরপর পায়ে হেঁটে ঝর্ণায় যাওয়া যাবেন। অথবা যে কোনো বাস থেকে ব্রিকফিল্ড সড়কের মাথায় নেমে অটোরিক্সা ছাড়া আধা কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে যেতে পারবেন।
থাকা ও খাওয়াঃ বড়দারোগাহাট, বড়কমলদহ ও কমলদহ বাজারে খাওয়ার হোটেল রয়েছে। আরো ভালো হোটেলে খাওয়ার জন্য সীতাকুন্ড উপজেলা সদরে বিভিন্ন রেষ্টুরেন্ট রয়েছে। দূর-দূরান্ত থেকে আসা পর্যটকরা থাকা ও খাওয়ার জন্য যেতে পারেন ঝর্ণা এলাকা থেকে গাড়ি যোগে মাত্র ৪০ মিনিটের পথ চট্টগ্রাম শহরের প্রবেশ মুখে একেখান ও অলংকারে কুটুম্ববাড়ি রেস্তোরায়। থাকার জন্য একেখানে মায়ামী রিসোর্ট ও অলংকারে রোজ ভিও হোটেল রয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ