ঢাকা, শুক্রবার 21 July 2017, ৬ শ্রাবণ ১৪২8, ২৬ শাওয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

৭০ বছরের চৌকাঠ পেরুলো ঐতিহ্যবাহী ‘বেগম’ পত্রিকা

 

স্টাফ রিপোর্টার : নারী জাগরণের মুখপত্র ‘বেগম’ পত্রিকা গতকাল বৃহস্পতিবার তার ঐতিহ্য ও গৌরবের ৭০ বছরের চৌকাঠ পেরুলো। ১৯৪৭ সালের ২০ জুলাই কলকাতায় পত্রিকাটির যাত্রা শুরু হয়েছিল। ভারত উপমহাদেশে মুসলিম নারী পরিচালিত কোনো পত্রিকা এতদিন টিকে থাকার ঘটনা বিরল। এই বিশেষ ক্ষণে বিশেষ কলেবরে প্রকাশিত হয় ‘বেগম’ পত্রিকার এবারের সংখ্যাটি।

১৯৬০ এবং ১৯৭০’র দশকে প্রতি সপ্তাহে বেগম পত্রিকার প্রচার সংখ্যা ছিল ২৫ হাজারের মতো। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ডাকযোগে এই পত্রিকা পৌঁছে যেত। কিন্তু বেগম পত্রিকার সে জৌলুস এখন আর নেই। সাপ্তাহিক পত্রিকাটি নানা টানাপোড়েনের মধ্যেও অব্যাহতভাবে ছাপা হচ্ছে, তবে বর্তমানে মাসে একবার বেরুচ্ছে। 

উপমহাদেশের প্রথম নারী বিষয়ক এ সাপ্তাহিক পত্রিকাটি ঘরের চার দেয়ালে আবদ্ধ থাকা নারীদের জাগিয়ে তুলেছিল। যোগ্যতা থাকার পরেও যারা তার প্রমাণ রাখতে ভয় পেতেন সেই নারীদের জুগিয়েছে সাহস। নারীসমাজের অগ্রগতিতে পত্রিকাটির ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সুফিয়া কামালের পর পত্রিকাটির দীর্ঘকালীন সম্পাদক হিসেবে নূরজাহান বেগম এ দেশের নারীসমাজের শিক্ষা, অগ্রগতি ও নারী আন্দোলনে অনন্য ভূমিকা রেখেছেন। পত্রিকাটির বর্তমান সম্পাদক ফ্লোরা নাসরীন খান বলেন, এই বিশেষ মুহূর্তে আমরা স্মরণ করছি বেগম-এর প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন, সম্পাদিকা নূরজাহান বেগম ও শিশু সংগঠক রোকনুজ্জামান খানকে। একই সাথে শুভাকাঙ্খী লেখিকা, বিজ্ঞাপনদাতা ও পাঠক সমাজকে আন্তরিক অভিনন্দন জানিয়েছেন তিনি।

বাংলাপিডিয়ার বর্ণনা অনুযায়ী, ‘বেগম’ বাংলার প্রথম সচিত্র মহিলা সাপ্তাহিক পত্রিকা। ১৯৪৭ সালের ২০ জুলাই কলকাতা থেকে এটি প্রকাশিত হয়। সাহিত্যক্ষেত্রে মেয়েদের এগিয়ে আনার লক্ষ্যে সাহিত্যচর্চার পৃথক ক্ষেত্র হিসেবে বেগমের আত্মপ্রকাশ ঘটে। ১৯৫০ সালে বেগম ঢাকায় স্থানান্তরিত হয়। পত্রিকাটির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন সম্পাদক মোহাম্মদ নাসিরউদ্দিন এবং প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদিকা ছিলেন বেগম সুফিয়া কামাল। পরে পত্রিকাটি সম্পাদনা করেছেন নূরজাহান বেগম, যিনি নাসিরউদ্দিনের একমাত্র কন্যা। বেগমের প্রথম সংখ্যা ছাপা হয়েছিল ৫০০ কপি এবং প্রতিকপির মূল্য ছিল চার আনা। প্রথম সংখ্যার প্রচ্ছদে নারী জাগরণের পথিকৃৎ বেগম রোকেয়ার ছবি ছাপা হয়েছিল। পত্রিকাটির একটি বিশেষ আকর্ষণ এর বার্ষিক ঈদসংখ্যা। প্রথম ঈদসংখ্যা প্রকাশিত হয় ১৯৪৮ সালে কলকাতা থেকে, দাম ছিল ২ টাকা।

বাংলাপিডিয়া আরো বলছে, পত্রিকাটির প্রথম দশকে যাঁরা লিখেছেন তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য রাজিয়া খাতুন, শামসুন্নাহার মাহমুদ, সেলিনা পন্নী, প্রতিভা গাঙ্গুলী প্রমুখ। গোড়ার দিকে মহিলাদের ছদ্মনামে অনেক পুরুষও বেগমে লিখতেন। ১৯৪৮ সালে বেগমে প্রথমবারের মতো লেখিকাদের ছবি ছাপা হয়। মেয়েরা, বিশেষত মহিলা লেখিকগণ যাতে একত্র হয়ে নিজেদের এবং সমাজের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আলোচনা করতে পারেন, সে উদ্দেশ্যে বেগম পত্রিকার অফিসেই ১৯৫৪ সালের ১৫ ডিসিম্বর প্রতিষ্ঠিত হয় বেগম ক্লাব। ক্লাবের প্রথম সভানেত্রী ছিলেন শামসুন্নাহার মাহমুদ এবং সম্পাদিকা নূরজাহান বেগম। ক্লাবটি ১৯৭০ সালে বন্ধ হয়ে যায়। পঞ্চাশের দশকে সাহিত্য-সংস্কৃতি ও সমাজকর্মের ক্ষেত্রে বেগম ক্লাবের কার্যক্রম এক নব দিগন্তের সূচনা করে। প্রথম দিকে মাসে একবার, পরের দিকে বছরে একবার লেখিকারা সম্মিলিত হয়ে বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আলোচনা করতেন। 

মুক্ত বিশ্বকোষ উইকিপিডিয়ায় উল্লেখ করা হয়েছে, পত্রিকাটির আলোচ্য বিষয়গুলোর মধ্যে স্থান পায় নারী জাগরণ, কুসংস্কার বিলোপ, গ্রামগঞ্জের নির্যাতিত নারীদের চিত্র, জন্মনিরোধ, পরিবার পরিকল্পনা, প্রত্যন্ত অঞ্চলের মেয়েদের জীবনবোধ থেকে লেখা চিঠি এবং বিভিন্ন মনীষীর বাণী। ১৯৪৮ সালে ‘বেগম’ এর প্রথম ঈদসংখ্যায় ৬২ জন নারী লেখকের লেখা ছাপা হয়। ধর্ম সম্পর্কে মহিলাদের জ্ঞান লাভের জন্য ১৯৪৯ সালে প্রকাশিত হয় ‘বেগম বিশ্বনবী সংখ্যা’। এ সংখ্যায় ২৪টি প্রবন্ধ, ৪টি কবিতা, ২টি সচিত্র প্রতিবেদন ছাপা হয়। ভারতবর্ষ বিভক্ত হবার পরে ১৯৫০ সালে বেগম পত্রিকার অফিস ঢাকায় চলে আসলে এর নতুন ঠিকানা হয় বর্তমান পুরান ঢাকার পাটুয়াটুলিতে। এখন পর্যন্ত বেগম পত্রিকার কার্যালয় এখানেই আছে।

গত বছর ২৩ মে বিবিসি বাংলা “বেগম পত্রিকা যেভাবে গড়ে তুলেছিলেন নূরজাহান বেগম” শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রচার করেছিল। তথ্যবহুল ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়,‘যে সময়টিতে নারীদের ছবি তোলা নিযয়ে অনেকের আপত্তি ছিল, সে সময়ে নারীদের জন্য একটি সচিত্র সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশ করা মোটেও সহজ কাজ ছিল না। ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ বিভক্ত হবার কিছুদিন আগে কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত হয় ‘বেগম পত্রিকা’। এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তৎকালীন সওগাত পত্রিকার সম্পাদক নাসিরউদ্দিন। বেগম পত্রিকার প্রথম সম্পাদক ছিলেন কবি সুফিয়া কামাল। তার সাথেই কাজ করতেন নাসির উদ্দিনের একমাত্র কন্যা নূরজাহান বেগম।’

বিবিসির ওই প্রতিবেদনে কয়েকজন সুধীর মূল্যায়ণ তুলে ধরে বলা হয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী দীর্ঘকাল ধরেই বেগম পত্রিকার সাথে পরিচিতি। তিনি বলেন পিতা এবং কন্যা সমাজে নারীদের অগ্রগতি যেভাবে চিন্তা করতেন, ঠিক সে বিষয়গুলো বেগম পত্রিকায় প্রতিফলিত হতো। শুরু থেকেই বেগম পত্রিকায় নারীদের গৃহকর্মের কথা , ছবি এবং তাদের নানা সমস্যার কথা প্রকাশিত হতো। এই বেগম পত্রিকা তৎকালীন সমাজে নারী পাঠাভ্যাস গড়ে তোলা এবং তাদের জন্য সাংস্কৃতিক বিনোদন দেবার একটি বড় মাধ্যম হয়ে উঠেছিল। তিনি আরো বলেন, বেগম পত্রিকা শুধু নারীদের উদ্দেশ্যে করেই গোড়াপত্তন হলেও এর পাঠক শুধু নারীরাই ছিলেন না। ধীরে ধীরে এই পত্রিকা পুরুষদের মধ্যেও জনপ্রিয় হয়ে উঠে। নূরজাহান বেগম এমন একটি পত্রিকার ইতিহাস রেখে গেলেন যেটি এ অঞ্চলে বহু নারীকে স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে শিখিয়েছে।

কৈশোরে কলকতায় বেগম পত্রিকার সাথে পরিচয় গড়ে উঠে প্রবীণ সাংবাদিক কামাল লোহানীর। তিনি বলেন, তখনকার সমাজে মুসলিম নারী লেখক তৈরীতে বেগম পত্রিকার ভূমিকা ছিল অপরিসীম। ১৯৫০’র দশকে এই বেগম পত্রিকা তৎকালীন সমাজে শিক্ষিত মুসলিম নারী লেখকদের একটি বড় প্লাটফর্ম হয়ে উঠে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ