ঢাকা, শুক্রবার 21 July 2017, ৬ শ্রাবণ ১৪২8, ২৬ শাওয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

চুয়াডাঙ্গা থেকে হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ খেলা-ধূলা

এফ.এ আলমগীর, চুয়াডাঙ্গা : মোবাইল, টিভি আর ক্রিকেটের দাপটে চুয়াডাঙ্গার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ খেলা-ধূলা। বর্তমানে আবহমান বাংলার ঐতিহ্যবাহী খেলাগুলোর মধ্যে বেশিরভাগই বিলুপ্তির পথে।

 তবে গ্রামীণ জনপদে এখনও কিছু কিছু খেলা-ধূলা চোখে পড়লেও উৎসাহ-উদ্দীপনা ও সাহায্য-সহযোগিতার অভাবে তাও বন্ধ হতে চলেছে। জেলার বিভিন্ন এলাকার গ্রামাঞ্চলে এক সময় প্রায় শতাধিক গ্রামীণ খেলা-ধূলার প্রচলন ছিল। তার মধ্যে ছেলেরা খেলত হা-ডু-ডু, ডাংগুলি, কাবাডি, গোল্লাছুট, খেটে খেলা, দৌড়-ঝাঁপ, গাদন, চিকে, কপালটোকা, কানামাছি ভোঁ ভোঁ, মালাম খেলা, কুস্তি, ডুব সাঁতার , নৌকাবাইচ, লাঠিখেলা, ষাঁড়ের লড়াই, মোরগ লড়াই, হৈল বৈল, বস্তাদৌড়, লুকোচুরিসহ অনেক খেলা। আর মেয়েরা খেলত দাঁড়িয়াবাঁধা, গোল¬াছুট, এক্কাদোক্কা, পাঁচগুটি, চোরপুলিশ, বৌচি, কিত্কিত্, গাদন, কড়ি খেলা, বালিশ বদল, লুকোচুরি, পুতুল খেলা, রান্নাবাটিসহ অনেক খেলা। এসমস্ত খেলাগুলোর অধিকাংশই এখন বিলুপ্তির পথে।

 তার মধ্যে এখনও হা-ডু-ডু, কাবাডি, লাঠিখেলাসহ হাতেগোনা কয়েকটি খেলার প্রচলন দেখা যায়। এখনও গ্রামাঞ্চলে পহেলা বৈশাখ, মহররম ও গ্রামীণ মেলার সময় এসব খেলা অনুষ্ঠিত হতে দেখা যায়। এসব ঐতিহ্যবাহী খেলা-ধূলার পরিবর্তে অনেকদিন আগেই এদেশে প্রচলন হয় ফুটবল খেলার।

বর্তমানে উপযুক্ত পৃষ্ঠপোষকতা ও খেলার মাঠের স্বল্পতার কারণে তাও বিপন্ন অবস্থায়। ক্রিকেট খেলা আমাদের দেশীয় খেলা না হলেও অন্যান্য দেশের মতো বর্তমানে আমাদের দেশে প্রচলিত খেলাগুলোর মধ্যে অন্যতম। এক সময় রাখাল ছেলেরা মাঠে গরু চরাতে গিয়ে ও স্কুলপড়–য়া ছেলে-মেয়েরা নানা ধরনের গ্রামীণ খেলা-ধূলা নিয়ে মেতে থাকতো। বর্তমানে শহরাঞ্চলে তো বটেই গ্রামাঞ্চলেও খোলা জায়গা বা খেলার মাঠের স্বল্পতার কারণে অনেক গ্রামীণ খেলার মৃত্যু ঘটেছে অনেক আগেই। ফলে বর্তমানে ভিডিও গেম, টেলিভিশন, থ্রিজি মোবাইল ফোন ইত্যাদি গ্রামীণ খেলা-ধূলার সে স্থান দখল করে নিয়েছে । ছেলেমেয়েরা একটু সময় পেলেই মেতে ওঠে এসব জিনিষ নিয়ে। পড়াশুনা যেমন ছেলেমেয়েদের মানসিক বিকাশ ঘটায় তেমনি শারীরিক বিকাশ ঘটাতে খেলাধূলার কোনো বিকল্প নেই। আগেকার দিনে গ্রামাঞ্চলে হা-ডু-ডু, কাবাডি ও লাঠিখেলার জন্য রীতিমত প্রতিযোগিতা চলতো। বিভিন্ন গ্রামে এসব খেলার জমজমাট আয়োজন হতো। 

এ সমস্ত খেলা দেখার জন্য অনেক দূরদূরান্ত থেকে খেলা শুরুর অনেক আগে থেকেই মানুষ দলে দলে এসে উপস্থিত হতো খেলার মাঠে। অনেক খেলোয়াড় টাকার বিনিময়েও বিভিন্ন দলের হয়ে খেলতো। তাতে করে ভালো খেলে যেমন টাকাসহ নানারকম পুরস্কার মিলতো সেইসাথে ভালো খেলোয়াড় হিসেবে এলাকায় ছড়িয়ে পড়তো তার খ্যাতি। সমাজের সর্বস্তরের মানুষ এ সমস্ত খেলোয়াড়দেরকে অনেক সম্মান করতো। আগেকার দিনে প্রতিবছর সব স্কুল কলেজ, মাদরাসাগুলোতে নানা ধরনের খেলাধূলার আয়োজন করা হতো। 

বর্তমানে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিজস্ব কোনো খেলার মাঠও নেই। ফলে খেলাধূলায় উপস্থিতি না থাকায় শিক্ষার্থীদের শারীরিক বিকাশ ঘটছে না। বর্তমানে আকাশ সংস্কৃতির আগ্রাসনের ফলে ছেলেমেয়েরা ক্রমশঃ খেলা বিমুখ হয়ে পড়েছে। এ প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা গ্রামবাংলার হাজার বছরের ঐতিহ্য এসব গ্রামীণ খেলাধূলা তো করেই না এমনকি এসব খেলাধূলার নামও জানেনা। অথচ এক সময় এসমস্ত খেলাধূলাকে বাদ দিয়ে বাঙালি ঐতিহ্যের পূর্ণতাকে কল্পনাও করা যেত না। 

বর্তমানে এসব ঐতিহ্যবাহী খেলাধূলার প্রচলন না থাকায় গ্রামীণ জনপদ থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে হাজার বছরের বাঙালী ঐতিহ্য। এ অবস্থা চলতে থাকলে হয়তো অচিরেই গ্রামীণ খেলা-ধূলা আমাদের সংস্কৃতি থেকে হারিয়ে যাবে। পরিণত হবে রূপকথার গল্পে। তবে এখনও সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে উদ্যোগ নিলে হারিয়ে যাওয়া খেলাগুলোর অনেকটাই টিকেয়ে রাখা স¤ভব। এ সমস্ত গ্রামীণ খেলা-ধূলার সাথে রয়েছে আমাদের পূর্বপুরুষদের নাড়ির সম্পর্ক। তাই তাদের স্মৃতি ও ঐতিহ্য ধরে রাখতে আমাদের উচিৎ এ সমস্ত গ্রামীণ খেলা-ধূলার আয়োজন করে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে এর পরিচিতি ও তার সুফল লাভের জন্য আকৃষ্ট করা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ