ঢাকা, শনিবার 22 July 2017, ৭ শ্রাবণ ১৪২8, ২৭ শাওয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

প্রতি বছর বহু মানুষ হতাহত হলেও দুর্যোগ আইনে পাহাড়ধস শব্দটি নেই!

** সমন্বিত ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠনের তাগিদ

স্টাফ রিপোর্টার : রাজধানীতে এক সেমিনারে বিশেষজ্ঞরা ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, প্রতি বছর বহু মানুষ হতাহত হলেও দেশের দুর্যোগ আইনে পাহাড়ধস শব্দটি নেই। দুর্যোগ বিষয়ক সরকারি স্থায়ী আদেশে ঘূর্ণিঝড় ও বন্যা শব্দটি কয়েকশ’ বার থাকলেও পাহাড়ধস আছে মাত্র তিনবার। তারা বলেন, অপরিকল্পিভাবে পাহাড় কাটায় একের পর এক ভূমিধসের ঘটনা ঘটছে। রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া পাহাড়ধস থামানো যাবে না। পাহাড়ে ভূমিধস ঠেকাতে পাহাড়ের সংখ্যা নির্ধারণ করে পাহাড়ী অঞ্চলকে সার্বিক পরিকল্পনার আওতায় আনতে একটি সমন্বিত পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠনের তাগিদ দেন তারা। 

গতকাল শুক্রবার সকালে নগরীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘ভূমিধস : কারণ, ফলাফল এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা’ শীর্ষক এক সেমিনারে তারা এভাবেই ক্ষোভ ও উদ্বেগের কথা জানান। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা), বাংলাদেশ-চীন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (বিসিসিআই), বাংলাদেশ-চীন সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক কেন্দ্র (সিসিসিইসি) এবং ঢাকাস্থ চীনা দূতাবাস যৌথভাবে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। বিশিষ্ট লেখক-বুদ্ধিজীবী ও বাপা’র সহসভাপতি সৈয়দ আবুল মকসুদের সভাপতিত্বে এতে প্রধান অতিথি ছিলেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন। মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক এম শহীদুল ইসলাম। নির্ধারিত আলোচক ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. বদরুল ইমাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ডিজেস্টার ম্যানেজমেন্ট এন্ড ভালনারেবিলিটি স্টাডিজের পরিচালক ড. মাহবুবা নাসরিন এবং ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী আহাম্মেদ খান। 

বাপা’র সাধারণ সম্পাদক ডা. মো. আব্দুল মতিনের সঞ্চালনায় উক্ত অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য রাখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক এ কিউ এম মাহবুব, বাপা যুগ্ন সম্পাদক মিহির বিশ্বাস, সিসিসিইসি’র সাধারণ সম্পাদক মোঃ শাহজাহান মৃধা প্রমুখ। সেমিনারের শুরুতে এদিন ভোরে চট্টগ্রামের সীতাকুন্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুরে একই পরিবারের ৫ জন নিহতের ঘটনায় শোক প্রকাশ করা হয়।

রাশেদ খান মেনন পাহাড়ধস থামাতে রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রয়োজন উল্লেখ করে বলেন, আমরা উন্নয়ন করতে গিয়ে প্রকৃতিকে কতটুকু ধ্বংস করব আর প্রকৃতিকে কতটুকু রক্ষা করব, সেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তিনি বলেন, দেশের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পরিবেশ সুরক্ষার কোন বিকল্প নেই। এ জন্য আমাদেরকে পরিবেশের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ সার্বিক পরিকল্পনা নিতে হবে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশের সুনামের উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, এক্ষেত্রে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। কিন্তু এই সাফল্যকে একই সঙ্গে উন্নয়ন ও পরিবেশের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত সার্বিক পরিকল্পনার ভিত্তিতে এগিয়ে নিতে হবে।

 সৈয়দ আবুল মকসুদ ক্ষোভ ও দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, গত জুনে পাহাড় ধসে ১৬০ জন মারা গেছে। আজও সকালে সীতাকুন্ডে ৫ জন মারা গেছে বলে জানা গেছে। পাহাড়ধসের মতো দুর্যোগকে শুধু প্রকৃতির কান্ড হিসেবে দেখলে হবে না। এর পেছনে দুর্বৃত্ত ও নষ্ট রাজনীতি জড়িত। ধস প্রতিরোধে সরকারের একটি বিশেষ সেল গঠন এবং দেশের সব পাহাড়কে সংরক্ষিত বনভূমি ঘোষণা করে সংরক্ষণের পরামর্শ দেন তিনি।

মূল বক্তব্যে অধ্যাপক শহীদুল ইসলাম উদ্বেগের সাথে বলেন, সংরক্ষিত রেকর্ড অনুযায়ী, ১৯৬৮ সালে কাপ্তাই এলাকায় প্রথম ভূমিধসের ঘটনা ঘটে। এরপর এ পর্যন্ত পাহাড় ধসে ৪৪৮ জন মারা গেছেন। এত মানুষ মারা গেলেও দেশের দুর্যোগ আইনে পাহাড়ধস নামে কোনো শব্দ নেই। দুর্যোগ বিষয়ক সরকারি যে স্থায়ী আদেশ আছে, তাতে ৩৭৬ বার ঘূর্ণিঝড় ও ২২৯ বার বন্যা শব্দটি আছে, অথচ পাহাড়ধস আছে মাত্র তিনবার। বিশ্বব্যাপী ভূমিধস একটি অন্যতম দূর্যোগ হিসেবে স্বীকৃতি পেলেও বাংলাদেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় এটি এখনো দুর্যোগ হিসেবে পর্যাপ্ত স্বীকৃতি পায়নি। পাহাড়ধস বন্ধে ব্যবস্থা নিতে আইনি ক্ষমতাসহ একটি পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠনের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন ড. শহীদ। তিনি আরো জানান, ২০০৭ সালে চট্টগ্রামে ভূমিধসের পর বিশেষজ্ঞ কমিটি প্রদত্ত রিপোর্টটি আলোর মুখ দেখেনি। উক্ত রিপোর্টে স্বল্প, মধ্য ও দীর্য মেয়াদী ২২টি সুপারিশ করা হয়েছিল।

আলোচনাকালে অধ্যাপক ড. বদরুল ইমাম উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, এত বড় একটি পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটার পরও সরকারের তরফ থেকে এখনো তা প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগ নেয়া হয়নি। ফলে মনে হচ্ছে, সামনের বছর বা এর পরের বছরও আমাদের আরো বড় বড় পাহাড়ধসের মতো ঘটনা দেখতে হবে। তিনি বলেন, পাহাড়ের স্তরগুলো সম্পর্কে জ্ঞান থাকা জরুরি। পাহাড় ধস রোধে এখনই একটি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে এবং যেসকল পাহাড় ঝুঁকিপূর্ণ সেগুলো চিহ্নিত করতে হবে। পাহড়ের পাশে অপরিকল্পিত উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা যাবে না । 

দুর্যোগ বিশেষজ্ঞ ড. মাহবুবা নাসরিন বলেন, বন্যা-ঘূর্ণিঝড়ের সাথে আজ ভূমিধস ও পাহাড়ধস যুক্ত হয়েছে। পাহাড়ধস দিন দিন বেড়েই চলেছে। অপরিকল্পিত শিল্পায়ন গড়ে উঠা ,বাসস্থান গড়ে উঠা এর কারণ। পাহাড় বিনষ্ট রোধে জনসনচেতনা তৈরী জরুরি। তাছাড়া নীতিনির্ধারকদের সমন্বয়হীনতা অনেকাংশে দায়ী।

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী আহাম্মেদ খান বলেন, পাহাড়ী এলাকায় অনেক উন্নয়ন হচ্ছে, রাস্তা তৈরী হচ্ছে। এক্ষেত্রে সঠিক সমীক্ষা খুুব হচ্ছে না। যথাযথ সমীক্ষার মাধ্যমে উন্নয়ন করতে হবে। পাহাড়ী এলাকায় বসবাসকারীদের অন্যত্র বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। তিনি প্রশিক্ষণ ও জরুরি সেল গঠনসহ পাহাড়ধসের মত দুর্যোগ মোকাবিলায় একটি পরিকল্পনা ও সুপারিশ তুলে ধরেন। একটি সমন্বিত মনিটরিং সেল গঠনের আহ্বান জানান। পাশাপাশি পাহাড় ব্যবহারকারীদের দায়িত্ববান ও সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ