ঢাকা, রোববার 23 July 2017, ৮ শ্রাবণ ১৪২8, ২৮ শাওয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

খতীব ও ইমামদের জুমার খুৎবা, সমাজ সংস্কারে ভূমিকা রাখছে

মাহমুদুল হক আনসারী : মসজিদ আল্লাহর ঘর। পবিত্র মক্কা শরীফ আর মদীনা শরীফ এর জুমার খুৎবার অনুসরণে পৃথিবীর সকল মসজিদের খুৎবা প্রদান ও ভাষণ পেশ করে থাকেন, সম্মানিত মসজিদের ইমাম ও খতীব সাহেবানগণ। নির্যাস কোরআন ও হাদীসের বাণীর উদ্ধৃতি উল্লেখ করে খুৎবা রচনা ও পাঠ করা হয়ে থাকে। কোন খতীব বা ইমাম ইচ্ছে করে নিজের মনগড়া বক্তব্য পেশ করার শরয়ী কোন বিধান নাই। সম-সাময়িক সমস্যা জাতীয় আন্তর্জাতিক বিষয়াবলী খতীবগণ সমাজ, রাষ্ট্র, মানুষের উপকার্থে জুমার খুৎবায় পেশ করে থাকেন। বাংলাদেশের জাতীয় মসজিদ বায়তুল মুকাররম, ঢাকার লালবাগ মসজিদ, মসজিদে গাউসুল আজম, চকবাজার কেন্দ্রীয় মসজিদ, গুলশান জাতীয় মসজিদ, চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদ, জমিয়াতুল ফালাহ জাতীয় মসজিদ উল্লেখযোগ্য। এ সকল মসজিদে কখনো দেশ, স্বাধীনতা, রাষ্ট্রবিরোধী কোন বক্তব্য খতীব সাহেবগণ দিচ্ছেন বলে আমার জানা নেই। সমস্ত মসজিদের খতীব সাহেবানগণ কোরআন ও হাদীসের জ্ঞানে জ্ঞানর্জন করে মসজিদের বক্তব্য পেশ করার জন্য উপস্থিত হন। ইসলামী তাহযিব তমদ্দুন, কোরআন ও হাদীসের বাইরে কোন বক্তব্য তারা এ ক্ষেত্রে রাখেন বলে এমন ধারণা ও বক্তব্য আমি শুনি নাই। সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে শুধুমাত্র তাদের বক্তব্য উত্তেজনা সামাজিক বিশৃংখলা তৈরী হচ্ছে এমন ধারণা ঠিক নয়। কোন ইমাম খতীব চায় না যে, সমাজে রাষ্ট্রে বিশৃংখলা ও হানাহানী লেগে থাকুক বা বিশৃংখলা হউক। সমাজ ও রাষ্ট্রকে সুন্দর ও সু-শৃংখলভাবে পরিচালনার উপদেশ প্রদান করেন খতীব সাহেবগণ। তাদের বক্তব্যের কারণে সমাজ কখনো বিপদগামী হবে না। এ ধারণের বক্তব্য তারা রাখতেও পারে না। তারা মসজিদ, সমাজ, আল্লাহ ও রাসূল (সা:) এর নিকট দায়বদ্ধ। কখনো তাদের পক্ষে সমাজ ও রাষ্ট্রের ক্ষতিকর কোন বক্তব্য পেশ করা সম্ভব নয়।
সমাজে গুণে জ্ঞানে যারা অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও ভক্তির পাত্র তারাই মসজিদের ইমাম ও খতীব হিসেবে মসজিদে নিয়োগ প্রাপ্ত হন। অনেক বিষয় বিবেচনা করে কমিটির সদস্য ও বিজ্ঞ আলেমগণ খতীব নির্বাচিত করে থাকেন। যে কেউ ইচ্ছে করলে ইমাম ও খতীবের আসন গ্রহণ করতে পারে না। কমিটির মতামত ও বিজ্ঞ আলেমের ইন্টারভিউর মাধ্যমে ইমাম খতীব মসজিদে নিয়োগ হয়ে থাকে। এমন সম্মান জনক পেশা দুনিয়ায় আরেকটা আছে বলে আমার জানা নেই। এ খতীব ইমামদেরকে সমাজের সর্বস্থরের মুসল্লী অতি যতেœর সাথে আপ্যায়ন ও মেহমানদারী করে থাকেন। তাদের সাথে খুবই ভাল ব্যবহার করতে দেখা যায়। ইহ ও পরকালীন সমস্যার জন্য তাদের শরনাপন্ন হতে দেখা যায় মুসল্লীদের। সহজ ও সরল প্রকৃতির এ সকল সমাজ শ্রেষ্ঠ মানুষদের নিয়ে বিভিন্ন সময় ভিন্ন ভিন্ন ধরণের বক্তব্য রাখেন সমাজের অন্য শ্রেণী ও পেশার ব্যক্তিগণ। আসলে কোন জায়গায় গলদ, কেনই বা এমন ধরনের বক্তব্য আসছে সেটাও রাজনৈতিক, সমাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে চিন্তায় আনতে হবে। দুনিয়ার সকল ধর্ম ও মতের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ধর্ম হচ্ছে ইসলাম। মুহাম্মদ (সা:) শ্রেষ্ঠ নবী ও রাসূল। তাঁর উপরে কোন নবী রাসূলের মর্যাদা নেই। পবিত্র কোরআন শরীফ, মুহাম্মদ (সা.) ও ইসলাম পৃথিবী শ্রেষ্ঠ ধর্ম। এর বাইরে আর যত ধর্ম ও আদর্শ আছে সেগুলো ইসলামের সাথে তুলনা হয় না। ইসলাম হচ্ছে কালজয়ী শ্রেষ্ঠ ধর্ম জীবন বিধান। ইসলাম ধর্মের মধ্যে মানবতার সব সূখ ও শান্তির কথা আছে। সমস্ত বিষয়ের সমাধান পাওয়া যায়। ইহ পরকালীন মুক্তি এ ধমে পাওয়া যায়। দুনিয়ার যাবতীয় কল্যাণ অকল্যাণ পবিত্র কোরআন ও হাদীসে বিদ্যমান। এ সকল বাণী ও উদ্ধৃতি মসজিদের খতীবগণ তাদের সাপ্তাহিক খুৎবায় তুলে ধরার চেষ্টা করেন। মানবজাতিকে তাঁরা সঠিক সহজ সরল রাস্তা পরিচয় করার চেষ্টা করে থাকেন বলেই তারা হয়েছেন “ওয়ারাছাতুল আম্বিয়া”। প্রকৃত পক্ষে নির্ভেজাল ও বিজ্ঞ ওলামায়েকেরামগণ হচ্ছেন নবী রাসূলগণের উত্তরসূরী।
নবী রাসূলদের যে মিশন ছিল ওলামায়ে হক্কানীর সে মিশন। এখানে কোন ধরণের সন্দেহের অবকাশ নাই। আজকের দুনিয়ায় নবী-রাসূলগণ জীবিত নেই। আছে তাঁদের কালজয়ী আদর্শ, পথ নিদর্শন। ছাহাবায়ে ক্বেরাম (রা:) এর মহান শ্রেষ্ঠ আদর্শ, উন্নত চরিত্র, তাঁদের পাথেয়। তাদের যুগশ্রেষ্ঠ শাসন ব্যবস্থার ইতিহাস তুলে ধরেন তারা। অনুরূপ ভাবে আছে মহান চার খলীফার উন্নত জীবনাদর্শ। এক কথায় ইসলামের উজ্জ্বল জীবন বিধান কালজয়ী আদর্শ, মানবতার মুক্তির শ্রেষ্ঠ সনদ, পৃথিবীর আর কোন ধর্মীয় গ্রন্থ ও শ্বাসনে ইসলামের মত এমন কোন আদর্শ ও চরিত্র পাওয়া বিরল। এ মহান আদর্শের ধারক বাহক মসজিদের খতীব ও ইমাম সাহেবান। তাঁরা কখনো নিজের জীবন জীবিকার তাগিদে কিংবা অন্য কোন ক্ষমতা বা দলীয় চিন্তায় কখনো ইসলামের নীতি-নৈতিকতার সাথে আপোষ করেন বলে বিশ্বাস হয় না। তাঁদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় সাধনা ইসলামের খেদমাতে ব্যয় করতে দেখা যায়। তাঁদের বক্তব্য খুৎবায় কখনো সমাজ পিছলিয়ে পড়ে না। তাঁরা সমাজকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে শিখাচ্ছে । বিভাজন তারা দেখাতে চায় না। সকল মানবতার ঐক্য শান্তি শৃংখলা মমত্ববোধ তাঁদের উদ্দেশ্য ও মিশন। কতিপয় কিছু ওলামাকে অর্থ ক্ষমতার লোভ লালসায় ফেলে বিভ্রান্ত করতে সক্ষম হলেও নিরানব্বই ভাগ ধর্মীয় মসজিদের খতীব ইমাম তাঁদের ঈমানী চেতনা ও মানবতার দায়িত্ব পালনে সর্বদা সচেষ্ট আছেন। কোন অবস্থায় তাদেরকে তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব থেকে বিচ্যুত করতে পারবে না।
মহান পেশার মহান নেতা মসজিদের খতীব ইমাম সাহেবানদের নিয়ে যখন সমালোচনা হয়, তখন দায়িত্ব এবং ঈমানে দাবী পালন করতে গিয়ে কিছু না লিখলে হয় না। আবহমান কাল থেকে বাংলার জমিনে মহান আল্লাহ তা‘আলার শ্রেষ্ঠ বাণী প্রচারে খতীব ইমামগণ নিয়োজিত আছেন। তাঁদের কারণে কোন এলাকায় গ্যাঞ্জাম, সমস্যা হয়েছে এমন ঘটনা কেউ দেখাতে পারবে না। সমাজের বিশুদ্ধ পরিচ্ছন্ন মানুষদের মধ্যে তাঁরা এখনো পরিচ্ছন্নভাবেই আছেন। তাদের বিরুদ্ধে কোর্ট-কাচারিতে এক পার্সনও ফৌজদারী মামলা পাওয়া যাবে না। তাদের মধ্যে কোন দূর্নীতি নেই। সমাজকে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। মানবতার কল্যাণে নিয়োজিত রয়েছেন। আজকের বাংলাদেশের রাজনৈতিক, সামাজিক প্রেক্ষাপটে কেন তাদের বক্তব্য আলোচনা কণ্ঠরোধ করা হচ্ছে সেটা বুঝতে এখন আর তেমন কষ্ট হওয়ার কথা নয়। কারণ তারা যেভাবে সমাজ বিশুদ্ধ সন্ত্রাস, জঙ্গীমুক্ত রাখার জোরালো বক্তব্য দিতে পারেন আর কেউ এমন ধরণের বক্তব্য ও ভূমিকা রাখতে পারেন না। তাই তাঁদের বক্তব্যকে অনেকের ভাল লাগার কথা নয়। ভালো না লাগলেও তাঁরা তাঁদের বক্তব্য রেখেই যাবে। ইহা তাঁদের উপর নবী-রাসূলের (সা.) অর্পিত দায়িত্ব। শরীরে বিন্দু পরিমাণ রক্ত থাকতে তারা সত্যিকারের কোরআন ও হাদীসের অনুস্বরণ থেকে সরে আসবে না।
তাদের বক্তব্য খুৎবা কখনো কী নিয়ন্ত্রণ সম্ভব? আমি বলব না। দুনিয়া ব্যাপী সমস্ত মসজিদ সুহে যেভাবে খুৎবার ভাষণ অব্যাহত আছে ঠিক একই নিয়মে খুৎবার বক্তব্য মেহরাব থেকে প্রচারিত হবে যতদিন জমিন ও আসমান থাকবে। জমিন আর আসমানের মালিক যিনি, যিনি আলো বাতাস দিয়ে সমাজ ও রাষ্ট্র পৃথিবীকে বাঁচিয়ে রেখেছেন তারই ধারাবাহিক নিয়মনীতি আদর্শ প্রচারের দায়িত্ব আছে ইমাম ও খতীব সাহেবদের উপর। এটা নিছক দুনিয়ার লোভ লালসার কোন দায়িত্ব নয় এটা মহান আল্লাহ ও রাসূলের পক্ষ হতে দেয়া অর্পিত দায়িত্ব। এ দায়িত্ব পালনে যে কোন ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত খতীব সাহেবানগণ। তাঁদের নিয়ন্ত্রণ না করে আয়ত্বে রাখুন। ক্ষেপিয়ে না তুলে বুঝাবার চেষ্টা করুন। তাঁদের চিন্তা চেতনা ভালোবাসা ও আচার অনুষ্ঠানে বাধা না হয়ে রাস্তাকে প্রশস্ত করে দিন। তাহলে সকলেই উপকৃত হবো। তাঁরা কখনো ক্ষমতা, জুলুম, নির্যাতন আর মামলাকে ভয় পায় না। তাঁরা ভয় করে একমাত্র আল্লাহ ও রাসূল (সা.) কে। দুনিয়ার আর কোন শক্তিকে তাঁরা দুই পয়সার পরওয়া করে না। তারাই হচ্ছে প্রকৃত আল্লার  সৈনিক “হিজবুল্লাহ”।
এ মহান নেতাদের কণ্ঠ রোধ ও বক্তব্যকে কাটছাঁট করে তাঁদের দায়িত্ব পালন হতে তাদেরকে দূরে রাখার যে কোন চেষ্টা প্রচেষ্টা যে কোন সরকারের জন্য মারাত্মক ভুল ছাড়া আর কিছুই না। মসজিদ, মেহরাব, খতীব, ইমামদের স্বাধীন বক্তব্য হস্তক্ষেপ কখনো কারো জন্য ভাল হবে না। মঙ্গল বয়ে আনবে না। দুনিয়ার কতিপয় রাষ্ট্র প্রধান তাদের ক্ষমতা দীর্ঘায়ু করার জন্য এ ধরনের চেষ্টা করতে দেখা গেছে। যা ইতিহাসে পাওয়া যায়। কিন্তু তার সফল হয়নি। এখনো হবে না। সে ধরনের চিন্তা-চেতনা থেকে সরে আসার আহ্বান জানিয়ে আমি বলব, যারা দেশ শাসন করছেন তারা যেন মসজিদ, মেহরাব, খতীব মুখী হন। তা হলেই বুঝবেন আসলে মসজিদের মেহরাব থেকে কী প্রচারিত হয়। মসজিদের বক্তব্য না শুনলে আপনি কখনো সঠিক ভাবে ধারণা পাবেন না। অন্যের কথায় কান না দিয়ে নিজের কানে শুনে তার পর সিদ্ধান্ত ও পরামর্শ দিন। তাহলেই সঠিক সিদ্ধান্ত দিতে এবং নিতে সুবিধা হবে। নিজের কাজ নিজে করে খতীব ও ইমামদের তাদের দায়িত্ব পালনে রাষ্ট্রীয়ভাবে সার্বিক সাহায্য সহযোগিতা দিন তাহলে মানুষ ও রাষ্ট্র আরে বেশী উপকৃত হবে।
লেখক : সংগঠক, গবেষক, কলামিস্ট

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ