ঢাকা, রোববার 23 July 2017, ৮ শ্রাবণ ১৪২8, ২৮ শাওয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

ল্যাংড়া বাঘ

আব্দুস সালাম : একটি বড় বনের মধ্যে সুন্দর একটি বাড়ি ছিল। বাড়িটি অনেকখানি জায়গা নিয়ে প্রাচির দিয়ে ঘেরা ছিল। বনের পশুপাখিরা জানতো এটি বাঘের বাড়ি। বাড়িটি প্রাচীর দিয়ে ঘেরা থাকায় বাঘের জন্য খুব নিরাপদ ছিল। সহসায় কোন ভয়ংকর পশু-পাখি বাঘের বাড়িতে ঢুকতে পারতো না। আর নিরীহ পশুপাখিরা বাড়িটির ধারের কাছেও ঘেঁষতো না। পাছে বাঘ যদি দেখে ফেলে তাহলে আর রক্ষা নেই। নির্ঘাত তাদেরকে বাঘের আহার হতে হবে। বাড়ির মধ্যে আম-কাঁঠালের গাছসহ বেশ কিছু বড় বড় গাছ ছিল। মাঝে মাঝে বাঘটি বড় গাছের উপরে উঠে বিশ্রাম করত। শিকারে বের হওয়ার পূর্বে সে বড় কোন গাছের ওপরে উঠে বনের চারিদিকে একবার দেখে নিত। যেদিকে শিকারদের আনাগোনা বেশি থাকতো সেদিকেই সে শিকারের উদ্দেশ্যে বের হতো।
একদিন দুপুরবেলায় বাঘটি বড় একটি গাছে উঠে একটি শাখার ওপর শুয়ে শুয়ে বিশ্রাম করতে থাকে। একপর্যায়ে সে ঘুমিয়ে পড়ে। অসতর্ক অবস্থায় থাকায় সে ঘুমের ঘোরে গাছ থেকে পড়ে যায়। এতে তার দুটি পা ভেঙে যায়। অনেক  চিকিৎসা নেওয়ার পরও বাঘটি আর ভালো হয়নি। সে ল্যাংড়া হয়ে যায়। ভালোভাবে দৌড়াতে পারে না। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটে। ফলে তার শিকার ধরতে তার খুব সমস্যা হয়। যত দিন যায় ততই তার সমস্যা বাড়তে থাকে। সে আস্তে আস্তে দুর্বল থেকে দুর্বলতর হতে থাকে। ভারী দুঃশ্চিন্তায় তার সময়গুলো কাটতে থাকে। সে মনে মনে একটি ফন্দি আঁটল। তাকে যেভাবেই হোক বেঁচে থাকতে হবে। সে জানতো বনের মধ্যে অনেকগুলো ছাগল বাস করে। ছাগলগুলোকে যদি কৌশলে বন্দি করা যায় তাহলে তার খাবারের জন্য আর চিন্তা করতে হবে না। পরিকল্পনা মোতাবেক বাঘটি একদিন ছাগলদের আস্তানায় গেল এবং একটি গাছের নিচে লুকিয়ে থাকল। একটি ছাগলছানা খেলা করতে করতে গাছটির দিকে এগিয়ে এলে বাঘটি ছাগলছানাকে ধরে ফেললো। সে ছাগলছানাটি না খেয়ে নিজের বাড়িতে নিয়ে গেল। ছাগলছানাটি ভয়ে কাঁপতে থাকে। বাঘ তাকে অভয় দিল এবং খুব যতœ করে কাঁঠালের পাতাসহ ভালো ভালো খাবার খেতে দিল। দুই দিন সেবাযতœ করে পরে ছাগলছানাটিকে ছেড়ে দিল। ছেড়ে দেওয়ার সময় সে ছানাটিকে বলল, এটি আমার বাড়ি। আমি এখানে একা একা বাস করি। তোমার যখন খুশি চলে আসবে। ইচ্ছামতো খাবার খাবে। তারপর আবার চলে যাবে। আর তুমি যখন আসবে তখন তোমার ভাই-বোনদেরও সঙ্গে নিয়ে এসো। কোন সমস্যা নেই। এখানে যথেষ্ট খাবারের ব্যবস্থা রয়েছে।
ওদিকে ছাগলছানাটির চিন্তায় তার মা-বাবার দুই দিন ধরে ঘুম হল না। খুব কাঁন্নাকাটি করে সময়গুলো পার করল। তাদের বিশ্বাস- ছানাটি নিশ্চয় কোন মাংসাশী প্রাণীর কবলে পড়ে প্রাণ হারিয়েছে। সুতরাং আমাদের চোখকান খোলা রেখে চলাফেরা করতে হবে। বনের সকল ছাগল খুব সতর্ক হয়ে গেল। তারা সাবধানে চলাফেরা করতে থাকল। দুইদিন পর ছাগলছানাটি যখন বাড়িতে ফিরে এলো তখন তার মা-বাবা তাকে দেখে খুব খুশি হল। তাকে জড়িয়ে ধরল। সে দুইদিন কোথায় ছিল তারা জানতে চাইলে ছাগলছানাটি সব কথা মা-বাবাকে খুলে বলল। বাঘের মহানুভবের কথা শুনে মা-বাবাসহ অন্যান্য ছাগলগুলোও খুব অবাক হল! দুদিন পরেই অন্য একটি ছাগল ছানাটির সঙ্গে পুনরায় বাঘের বাড়িতে বেড়াতে গেল। তারা সেখানে গিয়ে ভালো ভালো খাবার খেয়ে আবার ফিরে এলো। একথাটি যখন কয়েকটি ছাগল জেনে গেল তখন তারাও ছানাটির সঙ্গে বাঘের বাড়িতে যাওয়ার জন্য ইচ্ছাপোষণ করল। কিন্তু ধূর্ত বাঘটি তখনও কোন ছাগলকেই হত্যা করল না। এভাবে একে একে অনেক ছাগল বাঘের বাড়িতে যাতায়াত করতে শুরু করলো। ছাগলগুলো বাঘের ভালো ব্যবহার পেয়ে খুব মুগ্ধ হলো। বাঘের ভালো ব্যবহারের কথা একদিন ছাগলরাজার কানেও পৌঁছে গেল। সেও বাঘটির ভালো ব্যবহারের প্রামাণ পেল।
একদিন বাঘটি ছাগলরাজাকে ডেকে বলল : আমার ইচ্ছা তোমাদের সকল ছাগলকে দাওয়াত করে খাওয়াবো। আমি চাই তোমরা সবাই আগামী পরশু আমার বাড়িতে বেড়াতে আসবে। তোমাদের ভালো ভালো খাবার খাওয়াবো। বাঘের দাওয়াত পেয়ে ছাগলরাজা খুব খুশি হলো। লোভে ছাগলদের জিভ দিয়ে লালা ঝরতে থাকল। তাদের আর তর সয়লো না। নির্দিষ্ট দিনে বনের সকল ছাগল বাঘের বাড়িতে হাজির হলো। সকল ছাগলকে একযোগে দেখতে পেয়ে বাঘটি ভীষণ খুশি হলো। সে মনে মনে বলল, এখনই সুযোগ আর দেরি করা মোটেও ঠিক হবে না। ছাগলগুলোকে বাড়ির মধ্যে বসতে দিতে বাঘটি বাড়ির প্রধান ফটকের দিকে এগিয়ে গেল। তারপর ফটকটি ভালোভাবে তালা লাগিয়ে দিল। যাতে একটি ছাগলও বাইরে যেতে না পারে। বাঘটি ছাগলরাজাকে বললো : তোমাদের জন্য একটি সুসংবাদ আছে- তোমরা এখন থেকে আমার এখানেই থাকবে। এখানে অনেক গাছপালা রয়েছে। তোমরা ইচ্ছামতো সেগুলো খেতে পার। কোন সমস্যা নেই। তবে তোমরা কক্ষনও আমার শোবার ঘরের নিকটে আসবে না। ছাগলগুলো বাঘের কথা শুনে খুশি হলো।
কদিন যেতে না যেতেই ছাগলদের মুখের হাসি ম্লান হয়ে যায়। এখন তারা খুব আতঙ্কে থাকে। কারণ তারা লক্ষ্য করেছে বাঘটি এর মধ্যে কয়েকটি ছাগলকে ধরে খেয়ে ফেলেছে। ছাগলরাজা এর প্রতিবাদ করলে বাঘটি তার প্রতি খুব রেগে যায়। ফলে কোন লাভ হলো না। এতদিন পর বাঘের আসল রূপ দেখতে পেয়ে বুঝতে পারলো যে, তারা বিপদে পড়েছে। বাঘটি কৌশলে তাদেরকে বন্দি করে রেখেছে।
তারা ভয়ে কাঁপতে থাকে। তারা পালানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলো। কারণ বাঘটি বাড়ির প্রধান ফটকে তালা লাগিয়ে দিয়েছে। ওই ফটকটি ছাড়া আর পালাবার কোন রাস্তা ছিল না। তারা মনে মনে বলে- বাঘ মাংসাশী প্রাণী। ওকে বিশ্বাস করা আমাদের মোটেও ঠিক হয়নি। প্রাণের ভয়ে অনেকে কাঁন্নাকাটি করতে থাকে। অনেকে বাঘের নিকট উপস্থিত হয়ে প্রাণ ভিক্ষা চাইল। কিন্তু বাঘটি মোটেও তাদের কথায় কর্ণপাত করল না। কী আর করা, ছাগলগুলোকে অগত্যা বাঘের বাড়িতেই বন্দি থাকতে হলো। আর  দুই এক দিন পর পর একটি করে ছাগল ল্যাংড়া বাঘটির আহারের যোগান দিতে থাকলো। এভাবে একে একে সকল ছাগলকে একদিন ল্যাংড়া বাঘটির পেটে যেতে হলো।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ