ঢাকা, রোববার 23 July 2017, ৮ শ্রাবণ ১৪২8, ২৮ শাওয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

বিদেশী কোম্পানিভিত্তিক ব্যয়বহুল আমদানি ও লোননির্ভর --আনু মুহাম্মদ 

 

স্টাফ রিপোর্টার : তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেছেন, দেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণের জন্য সরকার জাপানের জাইকার কনসালট্যান্টের মাধ্যমে ২০৪১ সাল পর্যন্ত বিদ্যুৎ খাতের জন্য যে মহাপরিকল্পনা পিএসএমসি ২০১৬ দিয়েছে তা বিদেশী তহবিল ও বিশেষজ্ঞনির্ভর। দলিলের স্টাডি টিমের তালিকা এর প্রমাণ। ইংরেজিতে প্রণীত এ দলিল জাপানী ব্যবসায়িক সংস্থার যুক্ততা স্পষ্ট।

 গতকাল শনিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে কমিটির পক্ষ থেকে ‘জনস্বার্থে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনা’ (২০১৭-২০৫০ সাল পর্যন্ত) উপস্থাপন করতে গিয়ে তিনি একথা বলেন। এ অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবি'র সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম,  বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি, রুহিত হোসেন প্রিন্স প্রমুখ।

অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ অভিযোগ করেন, ঐ মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের আগে ভূ-প্রকৃতি, জনবসতি, সম্পদের আপেক্ষিক অবস্থান, জাতীয় সক্ষমতা, পরিবেশগত ঝুঁকি, আর্থিক সামর্থ্য এবং জনস্বার্থের প্রশ্ন সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা হয়েছে। কিন্তু এটি প্রণয়নের আগেই তার বাস্তবায়ন শুরু হয়ে গেছে। এ মহাপরিকল্পানা অনুযায়ী বিদুৎ খাতের প্রতিটি প্রকল্পই হবে বিদেশী কোম্পানি ভিত্তিক, আমদানি ও লোননির্ভর। এছাড়াও বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই পরিবেশ বিধ্বংসী উচ্চ ব্যয়বহুল বিদ্যুৎ উৎপাদনকেই অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে।

অনুষ্ঠানে আয়োজকদের পক্ষ থেকে বলা হয় যে, সরকার পশ্চাৎমুখী, লুন্ঠন ও ধবংসমুখি, নিপীড়ন ও বৈষম্যমূলক উন্নয়ন চিন্তার অধীনে জ¦ালানি ও বিদ্যুৎ খাতের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এ কারণে ভবিষ্যতমুখি, প্রগতি ও সমতামুখি প্রবৃদ্ধি, গণতান্ত্রিক, প্রাণ প্রকৃতি ও মানুষপন্থী উন্নয়ন চিন্তার কাঠামোতে এই জ¦ালানি ও বিদ্যুৎ পরিকল্পনা উপস্থাপন করা হয়েছে। 

অনুষ্ঠানে জ্বালানি খাত নিয়ে রামপাল প্রকল্পের ন্যায় পরিবেশ বিধ্বংসি সরকারের নেয়া মহাপরিকল্পনার সমালোচনা করে বিকল্প মহাপরিকল্পনা উপস্থাপন করে তেল গ্যাস খনিজসম্পদ ও বিদ্যুৎ বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি।

অনুষ্ঠানে লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন তেল গ্যাস খনিজসম্পদ ও বিদ্যুৎ বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্যসচিব অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, জ্বালানি খাত নিয়ে সরকার যথাযথ নীতিমালা গ্রহণ করলে বিদেশি কোম্পানি ও কনসালট্যান্ট নির্ভরতা থেকে মুক্ত হয়ে কোনো ধ্বংসাত্মক পথে না গিয়ে শিল্প, কৃষি ও পরিবহনসহ ঘরে ঘরে পরিবেশ সম্মতভাবে এবং সুলভে দেশের বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। সেই লক্ষ্যে আমরা স্বল্প, মধ্য এবং দীর্ঘ মেয়াদকে বিবেচনায় নিয়ে আমাদের মহাপরিকল্পনা উপস্থাপন করছি।

তিনি বলেন, আমাদের দেয়া মহাপরিকল্পনা বিচার বিশ্লেষণ করে যথাযথ নীতি গ্রহণ করলে ২০৪১ সাল পর্যন্ত দেশের বিদ্যুৎ চাহিদা নিজেদের গ্যাস থেকেই মেটানো সম্ভব। কিন্তু সেই লক্ষ্য বাস্তবায়ন করতে হলে গ্যাস নিয়ে রপ্তানিমুখি চুক্তি বাতিল করতে হবে। বাপেক্সকে কাজের সুযোগ দিতে হবে, জাতীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন ঘটাতে হবে এবং স্থলভাগ এবং গভীর সমুদ্রে নিয়মিতভাবে অনুসন্ধান চালাতে হবে।

তিনি বলেন, সরকারের নেয়া মহাপরিকল্পনায় দেশের ভূপ্রকৃতি, জনবসতি, সম্পদের অপেক্ষিক অবস্থান, পরিবেশগত ঝুঁকি, আর্থিক সামর্থ্য এবং জনস্বার্থ প্রশ্ন সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা হয়েছে। এই মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী বিদ্যুৎ খাতের প্রতিটি প্রকল্পই হবে বিদেশি কোম্পানীভিত্তিক, আমদানি ও ঋণনির্ভর।

আনু মুহাম্মদ অভিযোগ করেন, যথাযথ পরিবেশ সমীক্ষা ছাড়া, জনসম্মতির বিরুদ্ধে, অনিয়ম, বল প্রয়োগ করে সুন্দরবন বিনাশীসহ প্রায় ২০ হাজার মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র ৭ হাজার ২শ মেগাওয়াট ভয়ানক ঝুঁকিপূর্ণ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং সম্পূর্ণ আমদানি করা এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার বিভিন্ন প্রকল্পকে যৌক্তিকতা দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।

শুধু তাই নয়, এই মহাপরিকল্পনায় নিয়মিতভাবে গ্যাস ও বিদ্যতের দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে এলএনজি আমদানি ও গ্যাসের আন্তর্জাতিক দাম বিবেচনায় প্রতি বছর ১৯ থেকে ২৯ শতাংশ হারে গ্যাসের বৃদ্ধি পাবে, যা সম্পূর্ণ জনস্বার্থবিরোধী।

সরকারের এ মহাপরিকল্পনার বিপরীতে তেল গ্যাস বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির প্রণিত মহাপরিকল্পনার স্বল্প মেয়াদে বলা হয়েছে, বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিদ্যমান কাঠামোতে অল্প পরিবর্তনের সুপারিশ করা হয়েছে। ২০২১ সালের মধ্যে আমাদের প্রস্তাবিত কাঠামোতে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের মধ্যে গ্যাস থেকে শতকরা ৫৯ ভাগ, তেল থেকে ১৯ ভাগ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে শতকরা ১০ ভাগ এবং আঞ্চলিক সহযোগীতা থেকে শতকরা ৫ ভাগ বিদ্যুৎ আসবে। এক্ষেত্রে আমাদের মূল প্রস্তাবনায় রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনসহ জাতীয় কমিটির ৭ দফা বাস্তবায়ন করতে হবে।

মধ্য মেয়াদে ২০৩১ সাল পর্যন্ত পুরানো গ্যাসক্ষেত্র থেকে গ্যাস পাওয়ার হার হ্রাস পেলেও যথাযথ অনুসন্ধান করলে গভীর ও অগভীর সমুদ্র থেকে নতুন পর্যায়ে গ্যাস সরবরাহ শুরু হবে। কোন কারণে তা ঘাটতি দেখা দিলে গ্যাস আমদানিও অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হবে। এছাড়া ততদিনে নবায়নযোগ্য উৎসগুলো ব্যবহারের সক্ষমতাও অনেক বৃদ্ধি পাবে। এই সময়কালেও গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ শীর্ষস্থানে থাকবে।

দীর্ঘ মেয়াদে ২০৪১ সাল গুণগত পরিবর্তন নিশ্চিত করে নবায়নযোগ্য উৎস থেকেই বিদ্যুৎ উৎপাদন শীর্ষস্থানে পৌছাবে। সেজন্য ২০৪১ সাল নাগাদ বিদ্যুৎ উৎপাদনের শতকরা ৫৫ ভাগ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে আনা সম্ভব হবে।

এ সময় তিনি সরকারের নেয়া মহাপরিকল্পনা এবং জাতীয় কমিটির মহাপরিকল্পনার তুলনামুলক পার্থক্য তুলে ধরেন।

তাতে বলা হয়, ২০৪১ সাল পর্যন্ত বিদ্যুৎ চাহিদা পূরনের লক্ষমাত্রা সরকারের মহাপরিকল্পনায় ২৪৫ টেরাওয়াট আওয়ার, আমাদেরও তাই।

এই লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নে সরকারের মূল বৈশিষ্ট্য আমদানি ও রাশিয়া-চীন-ভারতের ঋণনির্ভর এবং পরিবেশ বিধ্বংসী অন্যদিকে আমাদের মূল বৈশিষ্ট্য দেশের সম্পদ নির্ভর। রাশিয়া চীন- ভারতের ঋণমুক্ত এবং পরিবেশবান্ধব। সরকারের উৎস কয়লা, এলএনজি ও পারমানবিক। আমাদের উৎস- প্রাকৃতিক গ্যাস ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি।

 আনু মুহাম্মদ আরও  বলেন, সরকারের মূল চালিকা শক্তি বিদেশি কোম্পানী, অর্থলগ্নীকারি প্রতিষ্ঠান, কনসালট্যান্ট। আমাদের চালিকা শক্তি জাতীয় সংস্থা, দেশি প্রতিষ্ঠানও জন উদ্যোগ। এর ফলে ২০২১সাল নাগাদ সরকার উৎপাদন করবে ২৩হাজার ৫শ মেগাওয়াট। আর আমাদের হবে ২৫ হাজার ২৫০ মেগাওয়াট।

২০৩১ সাল পর্যন্ত সরকারের হবে ৩৪ হাজার ৫শ মেগাওয়াট। আর আমাদের হবে ৪৯ হাজার ৭শ মেগাওয়াট। আর ভিশন ২০৪১ সাল পর্যন্ত সরকারের হবে ৫৭ হাজার মেগাওয়াট আর আমাদের মহাপরিকল্পনায় হবে ৯১ হাজার ৭শ মেগাওয়াট।

তিনি বলেন, সরকার যখন পশ্চাৎমুখি, লুণ্ঠন ও ধ্বংসমুখি, নিপীড়ন ও বৈষম্যমুলক এ রকম উন্নয়ন চিন্তার অধীনে জ্বালানী ও বিদ্যুৎ  খাতের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে তখন গত প্রায় দু’দশকের জনআন্দোলনের শক্তি ও আকাঙ্খার ওপর দাঁড়িয়ে আমরা ভবিষ্যৎমুখি, প্রগতি ও সমতামুখি প্রবৃদ্ধি, গণতান্ত্রিক প্রাণ প্রকৃতি ও মানুষপন্থী উন্নয়ন চিন্তার কাঠামোতে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ পরিকল্পনা উপস্থাপন করছি। বিপুল জনসমর্থিত চিন্তা ও আন্দোলনের ধারায় জনপন্থী মহাপরিকল্পনার খসড়া উপস্থাপন বাংলাদেশে নতুন চিন্তা ও জনআন্দোলনের শক্তিরই প্রকাশ ঘটাচ্ছে। আমরা এই খসড়া উপস্থিত করছি দেশের সকল পর্যায়ের মানুষের মতামতের ভিত্তিতে দেশে অগ্রসর উন্নয়ন চিন্তা ও বিদ্যুৎ প্রাপ্যতা নিশ্চিত করবার দিকনির্দেশনা চূড়ান্ত করতে।

প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর জনগণের শতভাগ মালিকানা, খনিজসম্পদ রপ্তানি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং জাতীয় সক্ষমতার বিকাশসহ জাতীয় কমিটির ৭ দফা বাস্তবায়নের মধ্য দিয়েই এই নতুন যাত্রা শুরু সম্ভব হবে। এ সময় জ্বালানি খাত নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাসহ একটি সার্বিক প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন জাতীয় কমিটির গবেষণা প্যানেল।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ