ঢাকা, রোববার 23 July 2017, ৮ শ্রাবণ ১৪২8, ২৮ শাওয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

খুলনায় প্রতি মাসে অবৈধ অটোরিক্সা  থেকে ৫১ লাখ টাকা চাঁদা আদায়!

 

খুলনা অফিস : যানজট নিরসনে খুলনার মূল শহরে ব্যাটারি চালিত অটোরিক্সা চলাচল বন্ধ করা হয়েছিলো এক বছর আগে। ওই সময় খুলনা সিটি করপোরেশন ও মেট্রোপলিটন পুলিশ কয়েক দফা অভিযান চালিয়ে অটোরিক্সা আটক করায় শহরের প্রধান সড়কে কিছুটা অটোরিক্সার চাপ কমে যায়। কিন্তু এখন আর অভিযান হয়না। অটো রিক্সাগুলো ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলাচল করছে। এর কারণ সর্ম্পকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে এসব অটোরিক্সা চালকরা প্রতিদিন ১০ টাকা দিচ্ছেন জনৈক নেতাকে। ফলে একটি টোকেন দেয়া হচ্ছে। ওই টোকেন দেখালে আইনশৃংখলা কমিটির সদস্যরা অটোরিক্সা ছেড়ে দেন। প্রতিদিন দশ টাকা নেয়া হলে মাসে একজন অটোরিক্সা চালককে দিতে হয় ৩০০ টাকা। সিটি করপোরেশনের জরিপ অনুযায়ী খুলনা নগরীতে বৈধ ও অবৈধ মিলিয়ে প্রতিদিন ১৭ হাজারের ওপরে অটোরিক্সা চলাচল করে। সাত হাজারের হিসেব করলে দেখা যায় প্রতি মাসে ৫১ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। এর ভাগা পুলিশও পেয়ে থাকেন বলে একটি সূত্র জানায়।

দুই সন্তানের জনক আজগর আলী। ২০ হাজার টাকা দিয়ে তিনি পুড়োনো একটি অটোরিক্সা কিনেছেন। এর ওপর তার সংসার চলে। তিনি জানান, তিনি মাসিক টাকা দেন। শ্রমিক নেতাদের প্রতি মাসে ৩০০ টাকা করে দিতে হয়। নগরীর খালিশপুর, দৌলতপুর, আড়ংঘাটা ও খানজাহার আলি থানা এলাকায় প্রকাশ্যে টোকেন দেয়া হচ্ছে।

সূত্র জানায়, প্রতিদিন ১০ টাকা করে প্রতিটি ব্যাটারি চালিত রিক্সার জন্য মাসে ৩০০ টাকা গুনতে হয়। বিনিময় এক মাসের জন্য দেয়া হয় একটি টোকেন। টোকেনটি হয় গাড়ির সাথে টানিয়ে রাখতে হবে, না হয় সাথে থাকতে হবে। প্রশাসনের কেউ ধরলে টোকেন দেখালে অবৈধ ব্যাটারি চালিত রিক্সা বৈধ হয়ে যাবে। অন্যথায় তার স্থান হবে ট্রাফিক অফিস না হয় থানায়। আর টোকেন থাকা সত্ত্বেও যদি কখনও প্রশাসন ধরে নিয়ে যায় তবে গাড়ি ছাড়িয়ে আনার দায়িত্ব সেই সকল শ্রমিক নেতাদের যাদেরকে প্রতিমাসে টোকেনে ৩০০ টাকা করে দিতে হয়। প্রতিটি থানা এলাকার টোকেনে প্রতিমাসে কালার পরিবর্তন হয়। যাতে করে কেউ ফাঁকি দিতে না পারে। এসব শ্রমিক নেতারা প্রতিটি থানা এলাকার শ্রমিক নেতাদের সাথে যোগাযোগ রেখে এ সকল টোকেনের কালার পরিবর্তন করেন। যাতে করে সহজে বোঝা যায় কোন এলাকার টোকেন কোনটি। অন্যদিকে এ সকল টোকেন বিক্রি ও যারা টোকেন ছাড়া চলছে তাদের ধরতে বেতনভুক্ত কর্মচারীও রয়েছে। টোকেনের মধ্যে কোন এলাকায় লাল, কোন এলাকায় হলুদ, আবার কোন এলাকায় সবুজ স্টীকার রয়েছে।  অপরদিকে, খুলনা সদর, সোনাডাঙ্গা, হরিণটানা ও লবনচরা থানা এলাকায় ব্যাটারি চালিত রিক্সা-ভ্যান শ্রমিকলীগের নামে টোকেন দেওয়া হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ব্যাটারি চালিত রিক্সা চালক বলেন, নিজের রিক্সা নিজে চালাই। যদি এ সকল রিক্সা অবৈধ হয়, তবে একযোগে সব বন্ধ করে দেয়া হোক। আমরাও তাতে খুশি। কিন্তু আমাদের মাথার ঘাম পায়ে ফেলানো টাকা এ সকল শ্রমিক নেতাদের হাতে তুলে দিয়ে কেন বৈধ করতে হবে। আর যদি টাকা দিয়ে বৈধ করা যায়, তবে এটা প্রশাসন ঘোষণা দিয়ে জানিয়ে দিক। আমরা গরিব আমাদের গাড়ি বৈধ করে দিক। তবে আর এ সকল শ্রমিক নেতাদের টাকা দিতে হবে না।

একাধিক ব্যাটারি চালিত রিক্সা চালকের সাথে কথা বলে জানা যায়, প্রতিমাসের এক থেকে দশ তারিখের মধ্যে সরবরাহ করা হয় টোকেন। চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় মালিকরাও বাড়িয়ে দিয়েছে রিক্সার দৈনিক ভাড়া। ২০০ থেকে বেড়ে হয়েছে ২৫০শ’ টাকা। প্রতি রিক্সা দৈনিক ব্যাটারি চার্জ বিল ৫০-৬০ টাকা। গ্যারেজ ভাড়া ১০ টাকা।

দৌলতপুর ব্যাটারী চালিত ভ্যান-রিক্সা মালিক-শ্রমিক কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক আসলাম হাওলাদার বলেন, আমরা রিক্সা চালকদের কল্যাণে কাজ করি। তাদের সুযোগ সুবিধার জন্য অর্থিক অনুদান দিয়ে থাকি। টোকেনে টাকা নেয়ার কথা স্বীকার করে তিনি জানান, আমরা প্রতিমাসে ৩০০ টাকা করে নিয়ে থাকি এটা সত্য। কিন্তু এ টাকাগুলো মালিকদের থেকে নিয়ে থাকি। কারণ প্রশাসন রিক্সা ধরলে তার কেটে দিলে ক্ষতি হয় মালিকের। এ জন্য মালিকদের থেকে টাকা নিয়ে, বিভিন্ন মহলকে প্রতিমাসে টাকা দিয়ে চালকদের নির্বিঘেœ চলাচলের সুবিধা করা হয়। তিনি বলেন, আমরা ছাড়াও খালিশপুর, আড়ংঘাটা ও খানজাহান আলী থানায় রিক্সা চালক মালিক কল্যাণ সমিতি রয়েছে। তিনি আরও জানান, প্রতিটি থানায় এ সকল রিক্সা নিয়ন্ত্রণে সমিতির ৪ জন কর্মী মাঠে রয়েছে। প্রতিটি কর্মীকে মাসে ৬ হাজার টাকা দিতে হয়। এছাড়া অনেক রিক্সা চালক আমরা অসুস্থ হলে এ টাকা থেকে অনুদান দিয়ে থাকি। অনেক সময় পুলিশে রিক্সা ধরলে এ তহবিল থেকে খরচ করা হয়। 

খুলনা সিটি করপোরেশনের সিনিয়র লাইসেন্স অফিসার এস কে তাছাদুজ্জামান বলেন, দুই হাজার অটো রিক্সাকে লাইসেন্স দেয়া হয়েছে। তবে বর্তমানে ১৭ হাজারেরও ওপরে অবৈধ রিক্সা নগরীতে চলাচল করছে। 

খুলনা নাগরিক আন্দোলনের মহাসচিব এস এম দেলোয়ার হোসেন বলেন, নগরীতে সিটি করপোরেশনের বৈধ লাইসেন্স থেকেও কয়েকগুণ বেশি রিক্সা চলাচল করছে। যা সম্পূর্ণ অবৈধ। এদের যদি এখনই নিয়ন্ত্রণ করা না যায় তবে নগরীতে এক সময় ভয়াবহ যানযট সৃষ্টি হবে। এতে করে বর্তমান তুলনায় আগামীতে দুর্ঘটনা বাড়বে।

এছাড়া কিছু রাস্তাকে ভিআইপি সড়ক ঘোষণার মাধ্যমে এ সকল রিক্সা চলাচলে নিষিদ্ধ করারও দাবি জানান এ নাগরিক নেতা। প্রয়োজনে এ ব্যাটারি চালিত রিক্সাগুলো সিটি করপোরেশনের নিয়ন্ত্রণে নেয়ার পাশাপাশি এদেরকে লাইসেন্সের আওতায় আনার কথাও বলেন তিনি। এতে করে কেসিসির আয় বাড়বে অন্যদিকে এ সকল শ্রমিক নেতাদের চাঁদাবাজিও বন্ধ হবে। টোকেনে পাওয়া নম্বরে কথা বললে সেলিম সিকদার নামে এক শ্রমিক নেতা ফোনে প্রতিমাসে ৩০০ টাকার চাঁদার কথা স্বীকার করে বলেন, আমরা প্রতিটি ভ্যান-রিক্সা থেকে প্রতিদিন ১০টাকা করে মাসে ৩০০ টাকা নিয়ে থাকি এবং তাদের কল্যাণে কাজ করি। আমরা ছাড়াও খুলনায় সাতটি থানায় এরকম কমিটি রয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে নগর ট্রাফিক বিভাগের একজন টিআই বলেন, অভ্যন্তরীণ সড়ক থেকে মাঝে মাঝে মূল সড়কে ব্যাটারী চালিত রিক্সাগুলো চলে আসে। একটি মোড়ে ট্রাফিকের জন্য যে জনবল থাকার প্রয়োজন তারও পর্যাপ্ত নয়। এ কারণে প্রতিদিন যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। তার ওপর এ রিক্সা নিয়ন্ত্রণ কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। মোটররিক্সা চলাচলের জন্য ট্রাফিক বিভাগ একা দায়ী নয়। ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা এজন্য দায়ী। তারা না চাইলে কখনো এ অবৈধ রিক্সা বন্ধ করা সম্ভব নয়। জানতে চাইলে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার হুমায়ন কবির বলেন, কোন চাঁদাবাজকে প্রশ্রয়ই দেয়া হবে না। আমি নগরীর সকল থানা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সাথে বিষয়টি নিয়ে কথা বলার পর পরবর্তী ব্যবস্থা নিব।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ