ঢাকা, সোমবার 24 July 2017, ৯ শ্রাবণ ১৪২8, ২৯ শাওয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

সিদ্দিকুরের দু'চোখ : অন্ধ মানবতার নিশানা!

তোফাজ্জল হোসেন কামাল : গরীব মেধাবী ছাত্র সিদ্দিকুরের চোখ জোড়াই ছিল তার স্বপ্ন জয়ের অবলম্বন। যে চোখে চোখ রেখে স্বপ্ন দেখতেন এক কিষাণি মা। তার সাথে স্বপ্ন আওড়াতেন পরিবারের অন্য সদস্যরা। সে স্বপ্ন আজ ফিকে হতে বসেছে, হয়তোবা হারাতেও হতে পারে স্বপ্ন দেখা সেই জোড়া চোখের সকল আলো। যে আলোর সাথে মিলে মিশে একাকার হয়ে আছে একটি পরিবারের ভবিষ্যত। সেই আলোকেই পুলিশের টিয়ার শেল খুব কাছ থেকে নিশানা করেছিল। যা অন্ধ মানবতার নিশানা, অনেকে হয়তো তা দেখতে পায়নি।

কিষাণি মায়ের দিকে চোখভরা আশ্বাস নিয়ে যে দৃষ্টিতে সিদ্দিকুর বলেছিল, ‘আম্মা, আর দুইটা বছর কষ্ট করো’, সেই দৃষ্টি ফেরাতে এখন সিদ্দিকুরের ব্যকুলতা। কী দোষ ছিল আমার? সেশনজটের অভিশাপ থেকে বাঁচতে সহপাঠীদের সঙ্গে রাস্তায় দাঁড়িয়েছিলাম। ওরা আমার চোখটাই নষ্ট করে দিলো! আমি আর কিছুই চাই না, শুধু আমার দৃষ্টিশক্তি ফেরত চাই। কাঁদতে কাঁদতে কথাগুলো বলছিলেন তিতুমীর সরকারি কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র সিদ্দিকুর রহমান।

এদিকে, সিদ্দিকুরের বাম চোখে দৃষ্টি ফিরে আসার ক্ষীণ সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। গতকাল রোববার তার চিকিৎসায় নিয়োজিত মেডিক্যাল বোর্ডের বৈঠক শেষে জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. গোলাম ফারুক এ কথা বলেন।

জানা গেছে, অন্ধকারে টিমটিম আলো ছিলেন সিদ্দিকুরের মা। পৃথিবীর সব দুখু মিয়ার মায়েরা যেমন করেন, ময়মনসিংহের তারাকান্দার এই দুঃখিনী নারীও তা-ই করেছিলেন। অন্যের জমিতে কিষানি খেটে দুই ছেলেকে বড় করেছেন। বড় ছেলে নায়েব আলী। সাধারণত এসব পরিবারে একজন বা দুজন আত্মত্যাগী থাকেন। সিদ্দিকুরের মা-ই একা নন। ছোট ভাইকে আরও উঁচুতে তুলতে বড় ভাই নায়েব আলী মাধ্যমিকের পর পড়া ছেড়ে রাজমিস্ত্রির কাজ নেন। ইট-কাট-সিমেন্ট-রডের কঠিন জগতের এই কোমল প্রাণের মানুষটি বলেছেন, ‘ওর ভবিষ্যৎই ছিল আমাদের ভবিষ্যৎ।’ সিদ্দিকুর বলেছিল, ‘আর দুইটা বছর, তারপর সরকারি চাকরি পামু।’ সিদ্দিকুরের সেই মায়ের জন্য দুই বছর মানে আরও কষ্ট, ভাইয়ের আরও মেহনত। পরীক্ষা পেছানো মানে মায়ের আরও কষ্টের দৈর্ঘ্য আরো বাড়া, প্রতিশ্রুতির দুই বছর আরও লম্বা হয়ে যাওয়া। তাই কি ছেলেটি রুটিনসহ পরীক্ষার তারিখ ঘোষণার দাবিতে আন্দোলনে নেমেছিল? মা যখন কিষানি খাটছেন, বড় বোন যখন শ্বশুরবাড়ির ঘানি টানছেন, বড় ভাই যখন ইট-সিমেন্ট মাখাচ্ছেন, সিদ্দিকুর তখন তিন বেলা পেটচুক্তিতে এক বাড়িতে ছাত্র পড়াচ্ছে। এই সময়ের দুখু মিয়া সিদ্দিকুর।

‘আমি শুধু আমার দৃষ্টিশক্তি ফেরত চাই’

কী দোষ ছিল আমার? সেশনজটের অভিশাপ থেকে বাঁচতে সহপাঠীদের সঙ্গে রাস্তায় দাঁড়িয়েছিলাম। ওরা আমার চোখটাই নষ্ট করে দিল! আমি আর কিছুই চাই না, শুধু আমার দৃষ্টিশক্তি ফেরত চাই। কাঁদতে কাঁদতে কথাগুলো বলছিলেন তিতুমীর সরকারি কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র সিদ্দিকুর রহমান। গত বৃহস্পতিবার শাহবাগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত সাতটি কলেজের আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। ওইদিন পুলিশ খুব কাছ থেকে সিদ্দিকুর রহমানের মুখ লক্ষ্য করে গুলি করে। এতে তার দুই চোখ গুলিবিদ্ধ হয়।

দুই চোখে মোটা ব্যান্ডেজ বাধা অবস্থায় বন্ধুদের কাঁধে ভর দিয়ে গতকাল রোববার দুপুরে জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট হাসপাতালের বারান্দায় হাঁটাহাটি করছিলেন সিদ্দিকুর রহমান। এ সময় আলাপকালে তিনি বলেন, ‘আমি শুধু আমার দৃষ্টিশক্তি ফেরত চাই। আপনাদের কাছে একটাই অনুরোধ, আপনারা আমার চোখে দেখার ব্যবস্থা করে দেন। আমি যাতে সুস্থ হয়ে পুনরায় পড়াশোনা শুরু করতে পারি।’

কৃষক পরিবারের সন্তান সিদ্দিকুর লেখাপড়া শেষ করে চাকরি নিয়ে পরিবারের হাল ধরার স্বপ্ন দেখেছিলেন। এই ঘটনার কারণে দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে সেই সিদ্দিকুরই যেন উল্টো পরিবারের বোঝা হয়ে না পড়েন এমনটাই আশা প্রকাশ করেছেন তার বন্ধুরা।

সিদ্দিকুরের বন্ধু ফরিদ বলেন, বারবার সিদ্দিকুর আমাদের জিজ্ঞাসা করে সে কবে দেখতে পাবে? সুস্থ হতে কতদিন লাগবে? জবাবে আমরা তাকে কোনো সান্তনা দিতে পারি না। তবে সব সময় তার সঙ্গে থাকার চেষ্টা করছি। কারণ আমরা পাশে থাকলে ওর একটু ভাল লাগে, সাহস পায়। তিনি বলেন, আমরা সিদ্দিকুরের দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেতে প্রধানমন্ত্রী সাহায্য চাই। একই সঙ্গে ওই পুলিশি হামলার যাতে সঠিক বিচার হয়, সেটিও দাবি করছি।

ফরিদ বলেন, ‘আমরা তো সেশনজট থেকে মুক্তি পেতে আর ভালভাবে লেখাপড়া করার নিশ্চয়তার জন্য রাস্তায় দাঁড়িয়েছিলাম। তাহলে কেন আমাদের ওপর এমন হামলা হলো?’

জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট হাসপাতালের পরিচালক ডা. গোলাম মোস্তফা বলেন, সিদ্দিকুর দুই চোখেই মারাত্মক আঘাত পেয়েছে। এতে তার একটি চোখ প্রায় অকেজো হয়ে গেছে। সিদ্দিকুরের চিকিৎসায় পাঁচ সদস্যের মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা তাকে অবজারভেশনে রেখেছি। তার দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাওয়ার বিষয়ে এখনই নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না।’

সিদ্দিকুরের বাম চোখে আলো ফেরার আশা

সিদ্দিকুর রহমানের বাম চোখে দৃষ্টি ফিরে আসার ক্ষীণ সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। গতকাল সিদ্দিকুরের চিকিৎসায় নিয়োজিত মেডিক্যাল বোর্ডের বৈঠক শেষে জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. গোলাম ফারুক এ কথা বলেছেন।

ডা. গোলাম ফারুক বলেন, ‘সিদ্দিকুরের ডান চোখের অবস্থা একেবারেই খারাপ। গতকাল (শনিবার) ওই চোখের অপারেশন করা হয়েছে। আর বাম চোখের কর্নিয়ায় ইনজুরি আছে। ওই চোখটি ওয়াশ করা হয়েছে। তবে আরও ক্লিয়ার করে তারপর অপারেশন করতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘তবে আজকে (রবিবার) সকালের এমআরআই রিপোর্ট দেখে আমরা আশাবাদী হয়েছি। সিদ্দিকুরের বাম চোখ নিয়ে পুরোপুরি না হলেও ক্ষীণ আশা আমরা দেখতে পাচ্ছি।’

চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের এ পরিচালক আরও জানান, ‘সিদ্দিকুরের চিকিৎসার জন্য মেডিক্যাল বোর্ড পুনর্গঠন করা হয়েছে। গতকাল সকালে তার এমআরআই ও চোখের আল্ট্রাসনোগ্রাম করানো হয়েছে। এসব পরীক্ষা-নিরীক্ষার আগে ও পরে দুইবার বৈঠক করেছি আমরা। পরীক্ষার রিপোর্টকে আমরা ইতিবাচক মনে করছি।’

সিদ্দিকুরের জন্য গঠিত মেডিক্যাল বোর্ডের অন্য সদস্য অধ্যাপক দীপক কুমার নাগ, সহযোগী অধ্যাপক আব্দুল কাদের, সহযোগী অধ্যাপক লুৎফুর রহমান ও সহযোগী অধ্যাপক ইফতেখার মোহাম্মদ মুনিরের সঙ্গেও কথা হয়। তারা জানান, সহযোগী অধ্যাপক ইফতেখার মোহাম্মদ মুনিরের তত্ত্বাবধানে ভর্তি আছেন সিদ্দিক।

সিদ্দিকুরের বাম চোখের অপারেশনের দায়িত্বে থাকা অধ্যাপক দীপক কুমার নাগ বলেন, ‘তার ডান চোখের অবস্থা বেশি খারাপ ছিল। গতকাল (শনিবার) থেকে আমরা ওষুধ দিচ্ছি। পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফলের ওপর ভিত্তি করে আমরা ওষুধ কমিয়ে-বাড়িয়ে দিচ্ছি। তবে রোগী খানিকটা ট্রমায় আছেন। ফলে তার সমস্যা বা লক্ষণগুলো ঠিকভাবে বলতে পারছেন না। এ কারণে আমরা তাকে একটু সময় দিচ্ছি। যেভাবে চলছে, আশা করছি তার অবস্থার উন্নতি হবে।’

সিদ্দিকুরের চোখের সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে অধ্যাপক দীপক বলেন, ‘তার ডান চোখের অবস্থা খারাপ, সেটা আগেই বলেছি। আজ (রবিবার) সকালে তিনি একবার বলেছেন, দেখতে পাচ্ছেন, একবার বলেছেন দেখতে পাচ্ছেন না। এটা আমাদের কাছে উন্নতির লক্ষণ মনে হয়েছে। ট্রমার কারণে হয়তো তিনি সঠিকভাবে রেসপন্স করতে পারছেন না। তবে খানিকটা ভিশন (দৃষ্টি) পাওয়ার কারণে আমরা আশাবাদী হয়েছি। আরও কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হবে। তবে আমরা আশাবাদী, ডান চোখে না হলেও সিদ্দিকুর বাম চোখে হয়তো দেখতে পাবেন।’ আজ সোমবার সকালে মেডিক্যাল বোর্ড আবার বৈঠক করবেন বলে জানান অধ্যাপক ডা. গোলাম ফারুক।

হাসপাতালে শিক্ষামন্ত্রী

সিদ্দিকুর রহমানকে দেখতে গেলেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। গতকাল বিকালে জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন সিদ্দিকুরকে তিনি দেখতে যান। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র তথ্য অফিসার মোহাম্মদ আফরাজুর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, মন্ত্রী সিদ্দিকুরের শয্যাপাশে কিছু সময় অবস্থান করেন এবং তার খোঁজখবর নেন। এ সময় তিনি সিদ্দিকুরের মা ও ভাইয়ের সঙ্গেও কথা বলেন এবং তাদের সান্তা দেন।

এছাড়া শিক্ষামন্ত্রী তার চিকিৎসার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলেন। এ সময় ডাক্তাররা জানান, সিদ্দিকুরের চিকিৎসার ব্যাপারে কর্তৃপক্ষ সর্বোচ্চ যত্মবান রয়েছে।

এর আগে গতকাল সকারে সচিবালয়ে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের লাঠিচার্জে ছাত্র আহত হওয়ার ঘটনা খুবই দুঃখজনক বলে জানান শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘আন্দোলনত সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের নিয়ে সকালে প্রধানমন্ত্রীল সঙ্গে কথা হয়েছে। উনার দিক নির্দেশনা পেয়েছি। শিগগিরই সমস্যার সমাধান হয় যাবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এ কলেজগুলো চেয়ে নিয়েছে। আমরা তাদের শতভাগ টাকা দেই। কিন্তু সেখানে আমাদের ক্ষমতা শূন্যভাগ। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির সঙ্গে কথা বলে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’

পরীক্ষার রুটিন ও তারিখ ঘোষণাসহ কয়েকটি দাবিতে গত ২০ জুলাই সকাল ১০টার দিকে শাহবাগের জাতীয় জাদুঘরের সামনের রাস্তায় অবস্থান নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হওয়া সাতটি সরকারি কলেজের শিক্ষার্থীরা। পুলিশ তাদের ওই জায়গা ছেড়ে যেতে বললে তারা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুট ওভারব্রিজের পাশের অংশে অবস্থান নেন। এসময় তাদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ লাঠিচার্জ করে ও কাঁদানে গ্যাস ছোঁড়ে। এসময় গুরুতর আহতদের মধ্যে অন্যতম সিদ্দিকুর রহমান (২৩)।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ