ঢাকা, সোমবার 24 July 2017, ৯ শ্রাবণ ১৪২8, ২৯ শাওয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

চীন-ভারত সামরিক সংঘাত অনিবার্য?

সৈয়দ মাসুদ মোস্তফা : সীমান্ত বিরোধ নিয়ে চীন ও ভারত মুখোমুখী অবস্থানে। চীন-ভারত সম্পর্ক কখনোই কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না বরং বরাবর তা বৈরিতার মধ্যেই কেটেছে। ১৯৬২ সালে উভয় দেশের মধ্যে হয়ে গেছে এক রক্তক্ষয়ী সীমান্ত যুদ্ধ। মূলত গণচীনের আঞ্চলিক পরাশক্তি হওয়ার প্রয়াস বেশ দীর্ঘ দিনেরই। আর সে প্রয়াসেই দেশটি অবিরাম কাজ করে যাচ্ছে। আর তা মহীরূহে পরিণত হয়েছে বলেই মনে করা হচ্ছে। চীন শুধু সামরিকভাবেই আঞ্চলিক পরাশক্তি হিসাবে অবির্ভূত হয়নি বরং তারা এখন রীতিমত অর্থনৈতিক পরাশক্তির স্থানও দখল করে নিয়েছে। ফলে তারা বিশ্ব পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধের শক্ত অবস্থান গ্রহণ করছে। আর চীনের এই অভিযাত্রা বিরামহীন, লক্ষ্যে অবিচল।
ভারত পাকিস্তানকে জন্মশত্রু মনে করলেও চীনকে হিসাবে রেখেই তাদের প্রতিরক্ষানীতি নির্ধারণ করতে হয়। আর ভারতকে চাপে রাখতেই পাক-চীন অঘোষিত সখ্যতার বিষয়টিও কারো অজানা নয়। তাই পাকিস্তান বা চীনের বিষয়ে কোন সিদ্ধান্ত নিতে ভারত বারবারই সন্তর্পণে এগুতে হয়। সাম্প্রতি সময়ে পাক-ভারত উত্তেজনা, কাশ্মীর সীমান্তে ভারতীয় বাহিনীর চৌকিতে অতর্কিত হামলা চালিয়ে সেনা হত্যা এবং তার প্রত্যুত্তরে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে ভারতীয় বাহিনীর ‘সার্জিক্যাল ষ্ট্রাইক’ পরিচালনা উভয় দেশকেই যুদ্ধের মুখোমুখী দাঁড় করায়। কিন্তু চীন, রাশিয়া, ইরান ও তুরস্কসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ পাকিস্তানকে সমর্থন করায় ভারতে পক্ষে পাকিস্তানের সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া সম্ভব হয়নি বরং অনেকটা পৃষ্ঠপ্রদর্শনই করতে হয়েছে। যা ভারতের জন্য মোটেই সম্মানজনক হয়নি। কিন্তু এ ছাড়া তাদের আর কোন বিকল্প পথও ছিল না।
মূলত পাক-ভারত সম্পর্ককে কেন্দ্র করেই এ অঞ্চলের রাজনীতি ও প্রতিরক্ষানীতি আবর্তিত হচ্ছে। আগের দিনে রাশিয়া ভারতের পক্ষে থাকায় আঞ্চলিক রাজনীতিতে ভারসাম্য সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু পাক-ভারত উত্তেজনাকালে রাশিয়ান সৈন্যদের পাকসেনাদের সাথে মহড়ায় অংশগ্রহণ পুরো পরিস্থিতিকে ভিন্নতর রূপ দিয়েছে। ভারতকে তাদের প্রতিরক্ষা বিষয়কে নিয়ে নতুন করে ভাবতে হচ্ছে। ফলে আঞ্চলিক রাজনীতিতে ভারত পাকিস্তানও চীনের চেয়ে অনেকটাই পিছিয়ে পড়েছে। আর ভারত ক্ষুদ্র প্রতিবেশীদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে পারেনি। ফলে ভারত সবদিক থেকেই কিছুটা হলেও কোনঠাসা অবস্থায় আছে।
এমনই এক সংকটময় সন্ধিক্ষণে ভারত-চীন সীমান্তে নতুন করে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। উভয় দেশের সীমান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে চীন ভারতে বিরুদ্ধে যুদ্ধের হুমকী দিয়ে বসেছে। চীনের পক্ষে বলা হয়েছে, সমস্যা মেটাতে চাইলে ভারতকে অনতিবিলম্বে সিকিমের ডোকা লা’র ‘চীন সীমান্ত’ থেকে সেনা জওয়ানদের সরিয়ে নিতে হবে। না হলে ১৯৬২ সালের যুদ্ধের চেয়ে ভারতকে বেশি মূল্য দিতে হবে। আগের চেয়ে ক্ষয়ক্ষতিটা ভারতের অনেক বেশি হবে। চীনের সরকারি সংবাদপত্র ‘গ্লোবাল টাইমস’-এর সম্পাদকীয়তে গত ৫ জুলাই ভারতকে এই হুমকি দেয়া হয়েছে। খবরে বলা হয়, ‘ভারত সম্মানের সঙ্গে চীনের ওই সীমান্ত (ডোকা লা) থেকে ঢুকে পড়া সেনা জওয়ানদের সরিয়ে না নিলে তাদের ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেয়া হবে।’ ফলে উভয় দেশের মধ্যে ১৯৬২ সীমান্ত যুদ্ধের পর পরিস্থিতির এমন মারাত্মক অবনতি হলো। যা দক্ষিণ এশিয়া আবারও অশান্ত করে তুলতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক মহল।
১৯৬২ সালের চীন-ভারত সীমান্ত যুদ্ধের কথা মনে করিয়ে দিয়ে ওই সম্পাদকীয়তে লেখা হয়েছে, ‘ভারত যদি এবার সংঘর্ষকে অনিবার্য করে তোলে, তা হলে আগের চেয়ে ভারতকে অনেক বেশি মূল্য দিতে হবে। ভারতের ক্ষয়ক্ষতি আগের চেয়ে অনেক বেশি হবে। এবার ভারতের শিক্ষাটা হবে আরো তিক্ত।’
সম্পাদকীয়’র ভাষ্য অনুযায়ী, ‘আমাদের জোরালো বিশ্বাস, চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি (পিএলএ) যথেষ্টই ক্ষমতাধর। যথেষ্টই শক্তিশালী। চীনা সেনাবাহিনী যে কোনো পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে পারে। চীনা ভূখন্ডে ঢুকে পড়া ভারতীয় সেনা জওয়ানদের বের করে দেয়ার মতো শক্তি যথেষ্টই রয়েছে পিএলএ’র। আমরা ভারতীয় সেনাবাহিনীর শক্তি-সামর্থ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল।’
মূলত, সিকিম লাগোয়া ডোকা লা-এ ভারতীয় সেনা জওয়ানদের ঢুকে পড়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করে চীন-ভারত সম্পর্ক গত ৬ জুন থেকে চরম অবনতি হয়েছে। উত্তেজনা চলছে টানা এক মাসেরও বেশি সময় ধরে। ১৯৬২ সালের চীন-ভারত যুদ্ধ আর ২০১৩ সালে জম্মু-কাশ্মীরের লাদাখে ২১ দিনের টানাপড়েনের পর দু’দেশের মধ্যে এত দিন ধরে উত্তেজনা বিরাজ করছে। ফলে যেকোন  মুহূর্তে পরিস্থিতির অবনতি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এদিকে চীন-ভারত সীমান্ত উত্তেজনার মধ্যেই পাকিস্তান পরমাণু অস্ত্র বহনে সক্ষম দুরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছে। ক্ষুদ্রপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ‘নাসর’ এর সফল পরীক্ষা চালানোর দাবি করেছে পাকিস্তান। এক বিবৃতিতে দেশটির সামরিক বাহিনী ‘নাসর’ নামের ওই ক্ষেপণাস্ত্রের সফল পরীক্ষা সম্পন্ন করার কথা জানিয়েছে। পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণ অনুষ্ঠানে দেশটির সেনাপ্রধান জেনারেল কামার জাভেদ বাজওয়া উপস্থিত ছিলেন। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট মামনুন হোসেইন এবং প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ দু জনই ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার সঙ্গে জড়িত বিজ্ঞানীদের অভিনন্দন জানিয়েছেন। সফল উৎক্ষেপণে বিজ্ঞানীদের ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেন তারা। যা ভারতকে বেশ ভাবিয়ে তুলেছে এবং চীনের সাথে সীমান্ত সমস্যা সমাধানে কিছুটা হলেও সিদ্ধান্তহীনতায় ভূগছে।
সামরিক বিবৃতির বরাত দিয়ে পাকিস্তান ও ভারতের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম বলছে, পরমাণু বোমা বহন করে ৭০ কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যে এ ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে আঘাত হানা যাবে। দ্রুত মোতায়েনযোগ্য ‘নাসর’ ক্ষেপণাস্ত্রের সুনির্দিষ্টভাবে আঘাত হানার সক্ষমতা রয়েছে। ভারতের নামোল্লেখ না করে ওই বিবৃতিতে বলা হয়, এই পরীক্ষা বিরাজমান হুমকি মোকাবেলার সক্ষমতা বাড়াবে এবং পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও মজবুত ও শক্তিশালী ভিত্তি দেবে।
উৎক্ষেপণ অনুষ্ঠানে দেওয়া ভাষণে পাক সেনাপ্রধান জেনারেল কামার জাভেদ বাজওয়া বলেন, আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ইসলামাবাদ যে কোনও পথ বেছে নেবে। পাশাপাশি তিনি বলেন, ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার মধ্য দিয়ে আমরা বোঝাতে চেয়েছি যুদ্ধকে বেছে নেয়ার কোনো ইচ্ছা পাকিস্তানের নেই। সংলাপের মাধ্যমে শান্তি স্থাপনে সরকারের তৎপরতাকে সেনাবাহিনী আন্তরিকভাবে সমর্থন করে বলেও জানান তিনি। উঁচু মাত্রায় সামরিকীকরণ এবং যুদ্ধবাজ প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে শান্তি নিশ্চয়তা দেয়া পাকিস্তানের কৌশলগত সক্ষমতা বলে তিনি উল্লেখ করেন। বলেন, প্রতিদ্বন্দ্বী ভারতের প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, পাকিস্তানের কৌশলগত সক্ষমতা উঁচু মাত্রায় সামরিকীকরণ এবং যুদ্ধবাজ প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে শান্তির নিশ্চয়তা দেয়।
পাকিস্তানের এই ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা দিল্লি-ইসলামাবাদ দ্বন্দ্বকে তুঙ্গে নিয়ে যাবে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক মহল। ১৯৯৮ সালে পাকিস্তান পরমাণু সক্ষমতা অর্জন করেছে এবং ভারত অর্জন করেছে ১৯৭৪ সালে। এরপর থেকে দ’ুদেশই নিয়মিতভাবে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়ে আসছে। উভয় দেশ নিজেদের পরমাণু প্রকল্পকে প্রতিপক্ষের চেয়ে সমৃদ্ধ বলে দাবি করে আসছে।
কার্যত, সিকিম সেক্টরের ডোকলামে অচলাবস্থার অবসানে কার্যত যুদ্ধের হুমকি শোনা গেল চীনের মুখে। ভারত কথা না শুনলে সামরিক রাস্তায় হাঁটতে বাধ্য হতে পারে চীন। সেদেশের বিশেষজ্ঞরা এমনই হুঙ্কার ছেড়েছেন। ভারতে নিযুক্ত চীনা দূতও ঘুরিয়ে কার্যত এমনই হুমকি দিয়েছেন। চীনা দূত লুও ঝাওহুই বলেছেন, বল ভারতের কোর্টে। অচলাবস্থার অবসানে কী ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়, সে বিষয়ে ভারত সরকারকেই সিদ্ধান্ত  নিতে হবে।
উল্লেখ্য, ডোকলাম এলাকায় চার সপ্তাহ ধরে অচলাবস্থা বজায় রয়েছে। দুই দেশের মধ্যে এর আগে সংঘাতের মনোভাব এতটা সময় দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। এই অবস্থায় চীনের সরকারি সংবাদমাধ্যম ও থিঙ্কট্যাঙ্কগুলি সতর্ক করে দিয়ে বলছে, ভারত ও চীন সমস্যার সঠিকভাবে মোকাবিলা করতে না পারলে যুদ্ধ বেধে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পরিস্থিতির যেভাবে অবনতি হচ্ছে তাতে উভয় দেশের মধ্যে যেকোন  মুহূর্তে যুদ্ধ আশ্চর্য হওয়ার কিছু থাকবে না।
সাংহাই অকাদেমি অফ সোশ্যাল সায়েন্সেসের এক গবেষক হু ঝিইয়ং দাবি করেছেন, চীন ভারতের কাছে ইতিহাস সংক্রান্ত যুক্তি তুলে ধরেছে এবং শান্তিপূর্ণভাবে সমস্যার সমাধান করতে চাইছে। কিন্তু ভারত কথা না শুনলে সমস্যার সমাধানে চীনের সামরিক পথ গ্রহণ করা ছাড়া গত্যন্তর থাকবে না।
উল্লেখ্য, ডোকলামে গত ৬ জুন অচলাবস্থার সূত্রপাত। ভারত-চীন-ভুটান সীমান্তে সংযোগস্থলে ডোকলাম এলাকায় চীন রাস্তা নির্মাণ করতে চাইলে সমস্যার সূত্রপাত হয়। চলতি সমস্যা নিয়ে চিনা দূত বলেছেন, চীন সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান চায়। কিন্তু এজন্য পূর্বশর্ত হিসেবে ভারতকে ওই এলাকা থেকে সেনা প্রত্যাহার করতে হবে। লুও ঝাওহুই বলেছেন, পরিস্থিতি খুবই উদ্বেগজনক।
ভারত-চীন সীমান্তে উভয় দেশের টানাপড়েনের  প্রেক্ষাপটে ভারত মহাসাগরে চীনা ডুবোজাহাজের আনাগোনা বেড়েছে। আর একই সঙ্গে চীনের সরকারি সংবাদপত্রে প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য তুলে ধরে ভারতকে দেওয়া হল যুদ্ধের হুমকি। যা দু’দেশের সম্পর্কে নতুন করে উত্তেজনার পারদ ছড়িয়েছে।
সম্প্রতি ভারতের বিভিন্ন উপগ্রহের পাঠানো ছবি তথ্য দিয়েছে, ভারত মহাসাগর এলাকায় সক্রিয় রয়েছে অন্তত ১৪টি চীনা যুদ্ধজাহাজ। এগুলির কয়েকটি অত্যাধুনিক লুয়াং-৩ বা কুনমিং শ্রেণির ডেস্ট্রয়ার। যেগুলি থেকে নিখুঁত নিশানা স্থির করে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার অত্যাধুনিক ব্যবস্থা রয়েছে। এরই মধ্যে ভারত মহাসাগরে ডিজেল চালিত ইউয়ান শ্রেণির ডুবোজাহাজ পাঠিয়েছে চীন। তবে এটিই প্রথম নয়, বিভিন্ন সূত্রে ভারতীয় নৌ-বাহিনী জানতে পেরেছে, ভারত মহাসাগরে ভারতের জলসীমার কাছাকাছি এসে নজরদারি চালাতে সাতটি ডুবোজাহাজ পাঠিয়েছে বেইজিং। 
২০১৩-১৪ সাল নাগাদ ভারতের জলসীমার আশেপাশে ২টি চীনা রণতরী ও ডুবোজাহাজ নজরে এসেছিল। তার পর থেকে ভারত মহাসাগরে চীনা নৌ বাহিনীর তৎপরতা বেড়েই চলেছে। সমুদ্রে এভাবে শক্তি দেখানোর পাশাপাশি যুদ্ধের আবহ তৈরি করেও চাপ বাড়াতে চাইছে বেইজিং। আর সে জন্য বেছে নেওয়া হয়েছে সরকারি সংবাদ মাধ্যম ‘গ্লোবাল টাইমস’কে। 
সিকিম সীমান্তের ডোকা লা-য় প্রায় চার সপ্তাহ ধরে মুখোমুখি দু’দেশের সেনা। দু’পক্ষই নিজেদের জমি শক্ত করতে সেনা বাড়িয়ে চলেছে। এই পরিস্থিতিতে সরকারি সংবাদপত্রে চীনা প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ হু জিয়াং মন্তব্য করেছেন, ‘‘ভারত যদি চীনের জমি থেকে সেনা না সরায়, তা হলে চীন বাধ্য হয়ে সামরিক ব্যবস্থা নিতে পারে।’’ তাঁর মতে, ভারত আসলে আমেরিকাকে দেখাতে চাইছে, তারা চীনকে আটকে রাখতে পারে।  অবশ্য জিয়াং-এর দাবি, ‘‘মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভারতকে গুরুত্বপূর্ণ শরিক মনে করেন না। কারণ তিনি জানেন, বেইজিংয়ের সঙ্গে সংঘাতে যাওয়ার মতো শক্তিশালী নয় দিল্লি। ’’
সিকিম সীমান্তে টানাপডড়েনের মধ্যে ১৯৬২ সালের যুদ্ধের কথা মনে করিয়েছিল চীন। তার জবাব দিয়ে প্রতিরক্ষামন্ত্রী অরুণ জেটলি মন্তব্য করেছিলেন, ‘‘বেইজিংয়ের বোঝা উচিত ভারত সেই ৬২ সালে পড়ে নেই। ২০১৭ সালের ভারত অনেক আলাদা। এই প্রসঙ্গেই হু জিয়াং-এর দাবি, ‘‘চীন ও ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার যে ফারাক, তা ৬২ সালের থেকেও এখন অনেক বেশি। নিজেদের ভাল চাইলে ভারত শান্ত থাকবে। ’’
চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জেং শুয়াং ডোকা লা-য় চিনা সেনাকে রাস্তা গড়তে বাধা দেওয়ায় ভারতীয় সেনার পদক্ষেপকে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ বলে আখ্যা দেন। তার পরে দু’দেশের মধ্যে উত্তেজনার বহর বেড়েই চলেছে। আজ ভারতে চীনের রাষ্ট্রদূত লিউ ঝাউউই গোটা পরিস্থিতিকে ‘উদ্বেগজনক’ আখ্যা দিয়ে বলেছেন, ‘‘সেনা সরানোর প্রশ্ন নিয়ে কোনও সমঝোতা হবে না। বল এখন দিল্লির কোর্টে। এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর উপর চাপ বাড়িয়েছে কংগ্রেস। বিরোধী দল কংগ্রেস বলেছে, সিকিম সীমান্তে চীনা অনুপ্রবেশকে গুরুত্ব দিচ্ছে না সরকার। কূটনীতির পথে সমাধান খুঁজতে সরকারকে পরামর্শ দিয়েছেন দলের মুখপাত্র অজয় মাকেন।
ভারত-ভুটান-চীন সীমান্তবর্তী বিতর্কিত এলাকা ‘ডোকলাম’ এ ভারতীয় সেনা পাঠানোর ঘটনাকে ঘিরে কাশ্মীরে ঢুকে পড়তে পারে চীনা সেনারা। চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ মাধ্যম গ্লোবার টাইমসে প্রকাশিত এক নিবন্ধে লং শিংচুন নামে একজন বিশেষজ্ঞ এ মন্তব্য করেছেন। চায়না ওয়েস্ট নর্মাল ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর ইন্ডিয়ান স্টাডিজের এ পরিচালক সাম্প্রতিক ভারত-চীন উত্তেজনার সম্পূর্ণ দায় দিল্লির ঘাড়ে চাপিয়েছেন। ভুটানকে ব্যবহার করে ভারত নিজের প্রয়োজনে ডোকলামের দখল নিয়েছে অভিযোগ করেন শিংচুন। তিনি বলেন, ডোকলাম চীনের ভূমি। কিন্তু ভুটানকে সাহায্য করার নাম করে ভারতীয় সেনারা চীনের ডোকলাম এলাকা দখল করে নিয়েছে।
ভারত-চীন সেনাবাহিনী মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে। এমন অবস্থায় অনেকেই সংঘাতের আশঙ্কা করলেও তা নাকচ করে কূটনৈতিক স্তরে আলোচনা চালিয়ে যাবে বলে জানিয়েছে ভারত। সম্প্রতি এ ব্যাপারে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গোপাল বাগলে জানান, আমাদের কূটনৈতিক মাধ্যম খোলা রয়েছে। দু’দেশেই একে অপরের দূতাবাস রয়েছে। ওই মাধ্যমগুলোকে ব্যবহার করা হচ্ছে।
তবে ভারত-চীন সীমান্তে অশান্তির মাঝেই যুদ্ধের ইঙ্গিত দিয়ে তিব্বতে সেনা তৎপরতা বাড়িয়েছে চীন। প্রচুর যুদ্ধাস্ত্র নিয়ে তিব্বতে লাইভ-ফায়ার এক্সারসাইজ করল চীনা সেনারা। চীনের সংবাদমাধ্যমে জানানো হয়েছে, দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের তিব্বতে এই মহড়া হয়েছে। তবে ঠিক কবে বা কখন এই মহড়া হয়েছে, তা জানা যায়নি। শুধু একটি ফুটেজ দেখিয়ে বলা হয়েছে, চীনা আর্মির তিব্বত মিলিটারি কমান্ড এই মহড়া চালিয়েছে। এটি চীনের অন্যতম মাউন্টেন ব্রিগেড। এই তিব্বত কমান্ডই ভারত-চীন সীমান্ত বা লাইন অফ অ্যাকচুয়াল কন্ট্রোলের (LAC) দায়িত্বে রয়েছে।
জানা যায়, চীনের সেনা মহড়ায় ছিল দেশটির তৈরি লাইট ব্যাটল ট্যাংকসহ অনেক অত্যাধুনিক অস্ত্র। সম্প্রতি ভারতের সঙ্গে সীমান্ত সমস্যা নিয়ে ভারতের সঙ্গে অশান্তি চলছে চীনের। বারবার ভারতকে যুদ্ধের হুমকি দিয়েও আসছে বেইজিং। চীনা আর্মি ভারতে ঢুকে রাস্তা তৈরির কাজে বাধা দিয়েছে বলেও একাধিক বার অভিযোগ উঠেছে।
পরিস্থিতি যেদিকে গড়াচ্ছে তাতে উভয় দেশের মধ্যে সামরিক সংঘাত অনিবার্য হয়ে উঠছে বলেই মনে হচ্ছে। কিন্তু ভারতের পক্ষে চীনের সাথে কোন সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়া সহজসাধ্য হবে না বলে মনে করছেন সামরিক বিশেষজ্ঞগণ। কারণ, আঞ্চলিক রাজনীতিতে খুব একটা সুবিধাজনক অবস্থানে নেই। চির বৈরী পাকিস্তানের সাথে সংঘাত আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। ছোট প্রতিবেশীগুলোর সাথেও খুব একটা ভাল সম্পর্কও নেই। ক্ষুদ্র প্রতিবেশী নেপাল তো বিভিন্ন ইস্যুতে ভারতের বিরুদ্ধেই অবস্থান নিয়েছে। তাই এই মুহূর্তে চীনের সাথে ভারতের সামরিক সংঘাতে জড়ানো ভারতে অখন্ডতার জন্যই মারাত্মক হুমকী হয়ে দেখা দিতে পারে। ফলে সীমান্ত ইস্যুতে ভারতের পক্ষে চীনের সাথে সর্বাত্মক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার আপাত কোন সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। ফলে তাদেরকে কুটনৈতিক পথেই সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করতে হবে। আর এমনটিই মনে করছেন বোদ্ধামহল। আর বিশে^র শান্তিপ্রিয় কুটনৈতিক সমাধানই আশা করে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ