ঢাকা, মঙ্গলবার 25 July 2017, ১০ শ্রাবণ ১৪২8, ৩০ শাওয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

নিবন্ধন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রায় এক লাখ শিক্ষক অপেক্ষার প্রহর গুণেই চলেছেন

ইবরাহীম খলিল : গত এক যুগে শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রায় এক লাখ শিক্ষক চাকরি পাচ্ছেন না। তাদের কেবল অপেক্ষা আর অপেক্ষা। সময় বয়ে যাচ্ছে কিন্তু অপেক্ষার প্রহর আর শেষ হচ্ছে না। এদিকে নিবন্ধনের মেয়াদ তিন বছর হওয়ায় শিক্ষকদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা বলছেন, তিন বছরে যদি সনদ বাতিল হয়ে যায় তাহলে এই সনদ দিয়ে আমরা কি করবো? অন্যদিকে ভূয়া সনদ দিয়ে প্রায় ৬০ হাজার শিক্ষক চাকরি করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেয়াতেও চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ শিক্ষকদের মধ্যে। 

প্রসঙ্গত, এক যুগেরও বেশি সময় ধরে নেয়া শিক্ষক নিবন্ধনের মোট ১২টি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রায় এক লাখ সনদধারী শিক্ষক এখনও নিয়োগের অপেক্ষায় রয়েছেন। এরই মধ্যে আবার ১৩ তম নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু ও ১৪ তম পরীক্ষার নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষ বলছে, শূন্য পদের সংকট থাকায় অপেক্ষমাণদের নিয়োগ দিতে বিলম্ব হচ্ছে। এমতাবস্থায় দাবি আদায়ে বিভিন্ন কর্মসূচী পালন করছেন শিক্ষকরা। গত শনিবার শিক্ষকরা জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে অনশন কর্মসূচি পালন করেন। 

৬০ হাজার ভূয়া সনদনধারী 

অভিযোগ উঠেছে, এরইমধ্যে জাল সনদে নিয়োগ নিয়েছেন ৬০ হাজার ভুয়া শিক্ষক। এছাড়া এক থেকে ১২তম ব্যাচের সনদধারীদের করা রিটের বোঝাও চেপে আছে নন গভর্নমেন্ট টিচার্স রেজিস্ট্রেশন অ্যান্ড সার্টিফিকেশন অথরিটি (এনটিআরসি)-এর ঘাড়ে। সব মিলিয়ে শিক্ষক নিয়োগে জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। উত্তীর্ণ সনদধারীরা অভিযোগ করেন, ২০০৫ সাল থেকে শুরু হওয়া নিবন্ধন পরীক্ষায় যারা উত্তীর্ণ হয়েছেন, তাদের সবাইকে একে একে নিয়োগ দেয়ার কথা। সনদধারীর সংখ্যা দেড় লাখ। ইতোমধ্যে নিয়োগ পেয়েছে মাত্র ৬০ হাজার। কিন্তু শূন্য পদের সংকট দেখিয়ে নিয়োগ আটকে রেখেছে এনটিআরসিএ। অন্যদিকে, ৬০ হাজার লোক জাল সনদে চাকরি করছে বলেও তথ্য প্রমাণ পাওয়া গেছে। ফলে জাল সনদধারীদের চাকরি থেকে বের করে দেওয়া হলে তাদের জায়গায় প্রকৃত সনদধারীরা চাকরির সুযোগ পায় বলেও যুক্তি তুলে ধরেন তারা।

জানা যায়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদফতরের (ডিআইএ) একটি টিম ২০১৪ সালে সরেজমিনে তদন্তে গিয়ে সারাদেশের বেসরকারি বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৬০ হাজার শিক্ষক জাল সনদে শিক্ষকতা করছে বলে তথ্যপ্রমাণ পায়। এসব শিক্ষক এমপিওভুক্তও হয়েছেন। এমন অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার হলেও ব্যবস্থা না নেয়ায় তারা এখনও বহাল তবিয়তে চাকরি করছেন। অভিযোগ রয়েছে, ১ থেকে ১২ তম নিবন্ধনে যারা পাস করতে পারেনি এমন লোকই টাকার বিনিময়ে জাল সনদ নিয়ে চাকরি করছেন। আর এই সরবরাহের পেছনে এনটিআরসিএ’র কর্মকর্তারা জড়িত। 

এ বিষয়ে বাংলাদেশ বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধিত নিয়োগবঞ্চিত জাতীয় ঐক্য পরিষদের সহ-সভাপতি ওবায়দুল ইসলাম বলেন, যে ৬০ হাজার শিক্ষক ভুয়া সনদে চাকরি করছেন তাদেরকে এখনও চাকরি থেকে বের করা হয়নি। অথচ এই ৬০ হাজার পদ শূন্য হলে আমরা আসল সনদধারীরা সেখানে চাকরির সুযোগ পাবো।

শিক্ষকদের অভিযোগ, যত অনিয়ম-দুর্নীতি সবই এনটিআরসিএ’র কর্মকর্তারা করেন। তারা চাইলেই এর সুন্দর সমাধান করতে পারতেন। কিন্তু তারা এর সমাধান করতে চান না। এর পেছনে বড় ধরনের স্বার্থ রয়েছে।

২০০৫ সাল থেকে এনটিআরসিএ নিবন্ধিতদের মেধা তালিকা প্রকাশ ও নিয়োগের জন্য চূড়ান্ত করে দিলেও নিয়োগের বিষয়টি স্কুল ম্যানেজিং কমিটির হাতে থাকায়, তারা ঘুষসহ নানারকম অনিয়ম করতেন। পরে ম্যানেজিং কমিটির হাত থেকে এই ক্ষমতা খর্ব করা হয় ২০১৫ সালের ২২ অক্টোবর। এর পরে নিবন্ধন পরীক্ষা গ্রহণ, মেধা তালিকা প্রণয়নসহ নিয়োগের সব ধরনের কার্যক্রমের দায়িত্বভার নেয় এনটিআরসিএ।

নিবন্ধনের মেয়াদ ৩ বছর করায় ক্ষোভ 

নিবন্ধন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পরে এনটিআরসিএ’র সনদ প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী ওই সনদের মেয়াদ মাত্র ৩ বছর। এর সমালোচনা করে নিবন্ধিতরা বলছেন, ১৩ তম পরীক্ষা থেকে সরাসরি নিয়োগ দেয়ার জন্য প্রার্থী বাছাইয়ের চূড়ান্ত পরীক্ষার দায়িত্ব পায় নিবন্ধন কর্তৃপক্ষ। পরীক্ষা পদ্ধতিতেও আনা হয় পরিবর্তন। ইতোমধ্যে ১৩ তম শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষার লিখিত ও মৌখিক ফল প্রকাশ এবং মেধা তালিকাও প্রকাশ করেছে এনটিআরসিএ। এখন এসব নিয়োগ সুপারিশের অপেক্ষায় রয়েছে। জানা গেছে, আগামী মাসের মধ্যেই মেধাতালিকা অনুযায়ী নিয়োগের সুপারিশ করা হবে।প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ১৩ তম নিবন্ধন পরীক্ষায় সনদধারীদেরকে এনটিআরসিএ নিজে সরাসরি নির্ধারিত স্কুলে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করবেন। 

নিবন্ধন সনদের মেয়াদ তিন বছর করার সমালোচনা করেছেন উত্তীর্ণ হয়েও নিয়োগ বঞ্চিত শিক্ষকরা। জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে অনশন করা শিক্ষকরা বলেন, এত কষ্ট করে পাওয়া সনদ কি ফেলে দেবো? চাকরিই যদি না হবে তাহলে সনদ কেন পেলাম?

তিনি বলেন, পদ শূন্য নেই এই কথা বলে বলে সময় পার করছে এনটিআরসি। অথচ সনদের মেয়াদ দিয়ে রেখেছে মাত্র ৩ বছর। এই তিন বছরের মধ্যে তারা নিয়োগ দিতে ব্যর্থ হলে সেই দায় কাদের হবে? তিনবছর পরে পদ শূন্য হলেও তো আমরা আর নিয়োগ পাবোনা।

তিনি আরও বলেন, ১ থেকে ১২ তম নিবন্ধন পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের নিয়োগ পদ্ধতির চেয়ে ১৩ তম নিবন্ধন পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের নিয়োগ পদ্ধতি ভিন্ন করেছে। এতে আমাদের আপত্তি নেই কিন্তু আগে ১ থেকে ১২ তম নিবন্ধিতদের সমস্যা সমাধান না করেই কেন ১৩ তম এর নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করা হচ্ছে। অন্যদিকে ১৪ তম পরীক্ষার নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে। এর অর্থ আমাদেরকে হয়রানি করা।

নিবন্ধিত প্রার্থী আমেনা বেগম বলেন, টাকা খরচ করে পরীক্ষা দিয়েছি। সনদ পেয়েছি। এখন মেধা তালিকা প্রকাশ করে নিয়োগ দেবে। কিন্তু নিয়োগের জন্য আবার আদেরকে ১৮০ টাকা ফি দিয়ে আবেদন করতে হয়েছে। প্রতিজনের কাছ থেকে বাড়তি এই ১৮০ টাকা কেন নিচ্ছে এনটিআরসিএ। নিয়োগের জন্য চূড়ান্ত করতে তো আর কোনও খরচ নেই। মেধা তালিকা প্রকাশ করে নিয়োগের জন্য শুধুমাত্র চিঠি ইস্যু করতে তো এনটিআরসিএর বাড়তি টাকা খরচ হওয়ার কথা নয়।

এদিকে গত ১৪ মে থেকে ১২তম নিবন্ধন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ১৮০ জন পরীক্ষার্থীর মেধাক্রমের ভিত্তিতে কেন নিয়োগ দেয়া হবে না তা জানতে চেয়ে রুল জারি করে হাইকোর্ট। অন্যদিকে, গত ২৮ মে উত্তীর্ণদের মেধাতালিকা তৈরি করে প্রকাশের নির্দেশও দেয় হাইকোর্ট। ওই আদেশে ৩০ জুলাইয়ের মধ্যে মেধা তালিকা প্রকাশ করতে বলা হয়। একইসঙ্গে এই সময়ের মধ্যে সারাদেশের বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকের শূন্য পদের তালিকাও চায় আদালত। 

১ থেকে ১২ তম নিবন্ধিত প্রার্থীদের নিয়োগের বিষয়ে জানতে চাইলে নিবন্ধন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান এ এম এম আজহার বলেন, ১ থেকে ১২ তম নিবন্ধিতদের নিয়োগের বিষয়ে হাইকোর্টে মামলা রয়েছে। আমাদেরকে কোর্টের নির্দেশ অনুসরণ করতে হবে। আর এইসব কারণে এই মুহূর্তেই তো নিয়োগ দিতে পারছি না। এছাড়া নিয়োগে তেমন কোনও জটিলতা নেই।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ